ইতালির রাজধানী রোমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরোধ, মাদ্রিদে তাঁবু গেড়ে অবস্থান এবং ফ্রান্সের রাজপথে বিক্ষোভ—ইউরোপজুড়ে তরুণরা এমন নানা কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
তাদের অভিযোগ, রাজনীতিকেরা তাদের কথা শুনছেন না, তাদের চাহিদা ও সমস্যাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
তরুণদের দাবিগুলো একেক জায়গায় একেক রকম হলেও একটি বিষয়ে তাদের ঐক্য রয়েছে। তারা চান, রাজনীতি ও সমাজে প্রায়ই উপেক্ষিত তাদের কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পাক। দাবি আদায়ে কখনো কখনো তারা কঠোর কর্মসূচিও ঘোষণা করছেন।
অন্যদিকে, পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের।
রোমের কাভুর হাইস্কুলের ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী দামিয়ানো ফুসা বলেন, ‘আমরা লড়াই করছি এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছি।’
ইতালির রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল কর্মসূচির মধ্যে কাভুর হাইস্কুলই প্রথম অবরুদ্ধ হয়।

ফুসা এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো কেউ নেই।’ তিনি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির কট্টর ডানপন্থি জোটের পাশাপাশি আগের মধ্য-বামপন্থি সরকারগুলোরও সমালোচনা করেন।
তার অভিযোগ, এসব সরকার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমিয়েছে এবং তরুণদের প্রয়োজন উপেক্ষা করেছে।
গত কয়েক সপ্তাহে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কয়েক লাখ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছেন। কোনো কোনো বিক্ষোভ সহিংসতায়ও রূপ নিয়েছে।
সরকারগুলো মূলত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ফ্রান্সের কিছু এলাকায় আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছে, আর ইতালিতে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাসদস্য। তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ তাদের মূল দাবিগুলোকে আড়াল করছে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলতে পারে।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের ১৯ বছর বয়সী মনোবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী লুইস মার্কেস বলেন, ‘রাজনীতিকেরা বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও একেবারেই অযৌক্তিক উপায়ে পরিস্থিতির জবাব দিচ্ছেন।’
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে লাগামহীন বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরক্ষা খাতের পরিবর্তে শিক্ষায় বেশি অর্থ ব্যয় এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিক্ষোভের পেছনে আরও গভীর সংকট রয়েছে। ইউরোপের বহু তরুণ মনে করছেন, তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই।
আন্তর্জাতিক সমাজতাত্ত্বিক সমিতির সভাপতি জিওফ্রে প্লেয়ার্স বলেন, ‘এই তরুণেরা শুধু মনে করেন না যে রাজনীতিতে তাদের কোনো জায়গা নেই; তারা মনে করেন, তাদের কথা একেবারেই শোনা হচ্ছে না।’
রোমের লুইস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোজারিও ফোরলেনজা এই আন্দোলনকে ‘ইউরোপজুড়ে প্রজন্মগত বিদ্রোহ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এর মূলে রয়েছে এমন এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট, যার কার্যকর সমাধান দিতে রাজনীতিকেরা ব্যর্থ হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘তরুণেরা জনসংখ্যার এমন একটি অংশ, যাদের অনুপাত ক্রমেই কমছে। ফলে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্বও ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।’
অন্যদের অনুপ্রাণিত করছি: ফ্রান্স ও ইতালিতে তরুণদের ক্ষোভ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। দেশ দুটিতে শনিবার নতুন করে বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।
গত সপ্তাহান্তে ফ্রান্সের বোর্দো শহরে এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২০ বছর বয়সী এডি নামে এক শিক্ষার্থী এএফপিকে বলেন, ‘মানুষ খুব ক্ষুব্ধ, তারা আর সহ্য করতে পারছে না। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করেও কেনাকাটার ঝুড়ি ভরার মতো সামর্থ্য থাকে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবকিছু ভাঙচুর করলে কি কিছু বদলাবে? আমার মনে হয়, এতে রাজনীতিকদের ঘুম ভাঙতে পারে। নিজেদের কথা শোনানোর জন্য আর কী করতে পারি, তা আমরা জানি না। ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন? এখন আর তাতে আমাদের বিশ্বাস নেই।’
ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন প্রতিবাদী আন্দোলন একে অপরের কাছ থেকে ক্রমেই অনুপ্রেরণা নিচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত ও নেপালের মতো দেশগুলোতে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন থেকেও তারা শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

ইতালিতে গত সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের একটি স্লোগানে বলা হয়, ‘ফ্রান্সের মতো করো’। এছাড়া জলদস্যুদের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ‘জলি রজার’ পতাকাসহ বিভিন্ন অভিন্ন প্রতীক ইউরোপের তরুণদের সমাবেশে দেখা যাচ্ছে।
মাদ্রিদের ২২ বছর বয়সী পরীক্ষাগারের মাননিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তিবিদ মার্কোস নাভারো বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আন্দোলনকারীরা নিজেদের কর্মপদ্ধতি ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
নাভারো বলেন, ‘তারা আমাদের কাছে এসে জানতে চেয়েছেন, ‘তোমরা কীভাবে আন্দোলন করেছ? কীভাবে নিজেদের সংগঠিত করো?’ আমরা ইতিমধ্যে নিজেদের মধ্যে নানা আইডিয়া বিনিময় করেছি।’
আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি ও উচ্ছেদের প্রতিবাদে গত সেপ্টেম্বর থেকে নাভারো মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় পুয়ের্তা দেল সল চত্বরে শত শত মানুষের সঙ্গে তাঁবু গেড়ে অবস্থান করছেন।
ওই শিবিরের চিকিৎসাকেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা ২৬ বছর বয়সী নৃবিজ্ঞানী আইলা হেরেরো বলেন, ‘আমরা অন্যদের অনুপ্রাণিত করছি—এটা জানতে পারা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। আমাদের আন্দোলন শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না।’
এটা গ্রহণযোগ্য নয়: ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সামরিক ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতাও তরুণদের বিক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের এক্সারখিয়া এলাকার ১৭ বছর বয়সী হাইস্কুল শিক্ষার্থী নিকোস মাভরুদিস বলেন, সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিবর্তে তার স্কুলের পেছনে অর্থ ব্যয় করা হলে তা বেশি কাজে আসত। স্কুলের ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে বলে তিনি জানান।
মাভরুদিস বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষ বিপজ্জনক অবস্থায় থাকবে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

ভবিষ্যতে রাঁধুনি হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই শিক্ষার্থী ইউরোপের অন্য কোনো দেশে চলে যেতে চান। তার ভাষায়, তিনি এমন দেশে যেতে চান, ‘যেখানে পরিস্থিতি আরও ভালো’।
রোমের দখল করা মর্গাগনি হাইস্কুলে শিক্ষার্থীরা টেবিল দিয়ে প্রবেশপথ আটকে রেখেছেন। সেখানে বিক্ষোভকারীরা বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ অবকাঠামোকে কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৮ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলেন, ইতালির সংবাদমাধ্যম ও রাজনীতিকেরা কিছু বিক্ষোভকারীর লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘এর ফলে এই ব্যবস্থার শিকার শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেই মানুষের মধ্যে ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে।’
বিক্ষোভে সহিংসতার বিষয়ে ইতালির বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইউনিয়নের সমন্বয়ক ২৪ বছর বয়সী সাবরিনা ব্রিজোলা বলেন, তার সংগঠনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এই ‘প্রজন্মের ক্ষোভকে’ সংগঠিত করা এবং গঠনমূলক পথে পরিচালিত করা।
তিনি বলেন, ‘আমাদের উদ্বেগগুলো একই রকম, যদিও প্রতিবাদের পদ্ধতি একেকজনের একেক রকম।’
সূত্র: এএফপি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









