বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় জাপান দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। স্বাধীনতার পর থেকে সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ, বন্দর ও নগর উন্নয়নে দেশটির সহায়তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এখন শুধু ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তা নয়, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদনভিত্তিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে এই সম্পর্কের পরিধি বেড়েছে। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ সড়ক, রেল, বন্দর, বিদ্যুৎ ও নগর অবকাঠামো খাতে ঋণ, অনুদান ও কারিগরি সহায়তা পেয়েছে। বাংলাদেশে জাপানের উন্নয়ন সহায়তার প্রতিশ্রুতির পরিমাণ প্রায় ৩৩ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। তবে, প্রতিশ্রুত অর্থ আর বাস্তবে ছাড় করা অর্থ এক নয়।
বাণিজ্য বাড়লেও ঘাটতি রয়ে গেছে
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, নিট পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও জুতা জাপানের বাজারে রপ্তানি হয়। অন্যদিকে, জাপান থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে যন্ত্রপাতি, লোহা-ইস্পাত, যানবাহন ও শিল্পের বিভিন্ন সরঞ্জাম।
বাংলাদেশ দূতাবাসের টোকিও কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে বাংলাদেশ জাপানে ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। বিপরীতে আমদানি করে ১ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ, বাণিজ্য বাড়লেও বাংলাদেশকে রপ্তানি আয় বাড়ানোর দিকে আরো মনোযোগ দিতে হবে। তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। এ জন্য পণ্যের মান, নকশা, নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ও জাপানি ক্রেতাদের চাহিদা পূরণে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির সুযোগ
২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের প্রথম এ ধরনের চুক্তিতে পণ্য ও সেবাবাণিজ্য, বিনিয়োগ, শুল্ক, বাণিজ্য সহজীকরণ, ই-বাণিজ্য ও মেধাস্বত্বের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হলে নির্ধারিত শর্ত অনুসারে বাংলাদেশের ১ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। একইভাবে জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্য বাংলাদেশের বাজারে এ সুবিধা পাবে।
চুক্তি স্বাক্ষর করলেই সুফল নিশ্চিত হয় না। ব্যবসায়ীদের চুক্তির শর্ত সম্পর্কে সচেতন করা, পণ্যের মান বজায় রাখা এবং রপ্তানিকারকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যেন জাপানের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিনিয়োগের সঙ্গে চাই প্রযুক্তি হস্তান্তর
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপান অর্থনৈতিক অঞ্চল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে শুধু জমি ও অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, উন্নত বন্দরসেবা, দ্রুত শুল্ক কার্যক্রম, স্থিতিশীল নীতিমালা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো প্রয়োজন। বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তরও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ, যৌথ উদ্যোগ, গবেষণা এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াতে হবে। তা না হলে উৎপাদনব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির জন্য দীর্ঘদিন বিদেশের ওপর নির্ভরশীল থেকে যেতে পারে।
দক্ষ জনশক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন
জাপানের সহযোগিতায় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু নির্মাণকাজ শেষ হওয়াকে সাফল্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রকল্পের ব্যয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফলও বিবেচনায় নিতে হবে। একইভাবে জাপানে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং প্রবাসীদের অর্জিত দক্ষতা দেশে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা গেলে দুই দেশই লাভবান হতে পারে। বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের সাফল্য শুধু ঋণ বা বিনিয়োগের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে, এই সহযোগিতায় কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কত নতুন প্রযুক্তি দেশে এল, কত পণ্যের রপ্তানি বাড়ল এবং দেশীয় শিল্প কতটা প্রতিযোগিতামূলক হলো। সহায়তার গণ্ডি পেরিয়ে উৎপাদন, উদ্ভাবন ও পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে সম-মর্যাদার অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই হওয়া উচিত দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









