পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা আবারও দেখিয়ে দিল, ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ঠেকাতে পশ্চিমা সরকারগুলো কতটা ব্যর্থ। ফিলিস্তিনিদের ভূমি থেকে উচ্ছেদের ব্যবস্থা ভাঙতে হলে শুধু নিন্দা নয়, বসতি প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মদদদাতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
ফিলিস্তিনিরা প্রতিদিন যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন, পশ্চিম তীরের তাইবেহতে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ওপর হামলা সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে। এর মাত্র এক দিন আগে আবু ফালাহতে হামলার শিকার হয়েছিলেন মার্কিন আলোকচিত্রী হেইডি লেভিন। ফিলিস্তিনি কৃষকেরা জমিতে কাজ করতে বাড়ি থেকে বের হন, কিন্তু নিরাপদে ফিরতে পারবেন কি না, তা জানেন না। এবার হামলার শিকার হয়েছেন এমন কিছু মানুষ, যাঁদের দেশের সরকার ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করে আসছে। কিন্তু সেই বিরোধিতা বসতি প্রকল্প থামানোর কার্যকর পদক্ষেপে খুব কমই রূপ নিয়েছে।
এখন ইউরোপের সামনে প্রশ্নটি সরাসরি হাজির: যে ব্যবস্থা থেকে এই সহিংসতার জন্ম, তার মোকাবিলায় তারা কতটা প্রস্তুত?
১৬ অক্টোবর আবু ফালাহতে জলপাই সংগ্রহের সময় ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর হামলা চালান ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। তাদের মধ্যে ছিলেন আলোকচিত্রী হেইডি লেভিনও। গায়ে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত সংবাদমাধ্যমের সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও তাঁকে মারধর করা হয়। এতে তাঁর হাড় ভেঙে যায় এবং হাতে অস্ত্রোপচার করতে হয়। পরদিন তাইবেহতে ফরাসি, বেলজীয় ও পোলিশ কূটনীতিক, গির্জার প্রতিনিধি এবং সংহতি জানাতে আসা ব্যক্তিদের একটি দলের ওপর হামলা হয়। এক ফরাসি মেয়রকে মারধর করা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেলজিয়ামের একটি গাড়ি।
এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তুরমুস আয়াতেও গাড়িতে আগুন দেওয়াসহ ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও সম্পত্তিতে হামলা হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ২৭৫টি ফিলিস্তিনি জনপদে বসতি স্থাপনকারীদের ১ হাজার ৬০০টির বেশি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মানুষ হতাহত হয়েছেন কিংবা সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ইয়েশ দিন সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ১৭০টির বেশি হামলার হিসাব দিয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরুর পর থেকে চারজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন।
এই সহিংসতার প্রভাব কেবল শারীরিক আঘাতেই সীমাবদ্ধ নয়। জলপাই ফিলিস্তিনিদের খাদ্যনিরাপত্তা, আয় ও জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জমিতে পৌঁছানো যদি প্রতিবারই হামলা বা মৃত্যুর ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে কৃষকেরা আয় হারান, পরিবারগুলো জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। আর সেই শূন্যস্থান দখল করে বসতি স্থাপনকারীরা। পশুপালনের জন্য অবৈধ আউটপোস্ট গড়ে তোলা, জমি দখল, বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া এবং চলাচলে বাধা—সব মিলিয়ে এই প্রক্রিয়া আরও জোরদার হয়।
সাংবাদিক ও সংহতি জানাতে আসা ব্যক্তিদের ওপর হামলার আরেকটি উদ্দেশ্যও রয়েছে: ফিলিস্তিনিদের পাশে থাকা আন্তর্জাতিক প্রত্যক্ষদর্শীদের দূরে সরিয়ে দেওয়া। বাইরের মানুষের উপস্থিতি কখনো কখনো হামলা ঠেকাতে সহায়তা করে। সেই উপস্থিতি কমে গেলে ফিলিস্তিনিদের আরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সহজ হয়। প্রতিটি হামলার পেছনে সরাসরি সরকারি নির্দেশ ছিল কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু এসব ঘটনার সম্মিলিত ফল হলো—ভূখণ্ডের চরিত্র ও জনবিন্যাস বদলে দেওয়া।

ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর উপস্থিতিতে হামলার ঘটনা ঘটলে এই ব্যবস্থার প্রকৃতি আরও স্পষ্ট হয়। আবু ফালাহতে রয়টার্সের সাংবাদিকেরা দেখেছেন, বসতি স্থাপনকারীরা হামলা চালিয়ে যাওয়ার সময় ফিলিস্তিনিদের দিকে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়েছে। একজন সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীকে গুলি ছুড়তেও দেখা গেছে। এ অবস্থায় হামলাকারীদের সেই ব্যবস্থা থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কম, যে ব্যবস্থা তাদের কাজের সুযোগ করে দেয় এবং শাস্তি এড়ানোর পথ খুলে রাখে।
ইয়েশ দিনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলিদের আদর্শগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধের যেসব তদন্ত নথি সংস্থাটি পর্যবেক্ষণ করেছে, তার ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশই অভিযোগ গঠন ছাড়াই বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ১৯ অক্টোবর ১০ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার কারণ দেয় না। এটি কূটনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। প্রকৃত জবাবদিহি নির্ভর করবে মামলাগুলোর পরিণতি এবং হামলার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া পরিস্থিতি বদলানোর ওপর।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা'আর বলেছেন, ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর সঙ্গে আগাম সমন্বয় না করলে কূটনীতিকেরা হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। দখলদার বাহিনীও জানিয়েছে, সফরটির বিষয়ে আগে থেকে সমন্বয় করা হয়নি এবং এ ধরনের সমন্বয় ভবিষ্যতে ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সুরক্ষার দায় উল্টো আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর চাপানো হচ্ছে। যেন ফিলিস্তিনি কৃষকের জলপাইবাগানে যেতে হলেও দখলদার বাহিনীর অনুমতি বা পাহারা প্রয়োজন। যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই ব্যবস্থার ওপরই নিরাপত্তার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের ওপর হামলাকে বসতি সম্প্রসারণে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা দেশগুলোর প্রতি ভয় দেখানোর বার্তা হিসেবেও দেখা যায়। হামলার সময় বসতি বাণিজ্য ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছিল। হামলার শিকার প্রতিনিধিরা এমন কয়েকটি দেশের নাগরিক, যেসব দেশ এ ধরনের কিছু উদ্যোগে যুক্ত। এতে প্রশ্ন ওঠে, আন্তর্জাতিক সাক্ষীদের দূরে সরিয়ে দেওয়া এবং রাজনৈতিক দায়মুক্তি বজায় রাখার চেষ্টা কি এই সহিংসতার অংশ?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন মে মাসে বসতি সম্প্রসারণে অর্থায়ন ও ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। লক্ষ্যবস্তুদের মধ্যে ছিল নাহালা, রেগাভিম ও আমানা। জুনে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়। সেপ্টেম্বরে ১২টি দেশ বসতি এলাকায় উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য সীমিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে, অথবা এমন পদক্ষেপ বিবেচনার কথা জানায়। অক্টোবরে যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে তার নিষেধাজ্ঞা কাঠামোও সম্প্রসারণ করে।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আর তা বাস্তবায়ন এক জিনিস নয়। আইনগত ব্যবস্থা তৈরি করা আর সেটি প্রয়োগ করাও এক নয়। পশ্চিমা উদ্যোগের প্রশংসা করার আগে এই পার্থক্য মনে রাখা জরুরি।
ভূমি দখল অব্যাহত থাকলে কয়েকজন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। বসতি প্রকল্পকে টিকিয়ে রাখা অর্থায়ন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বহাল থাকলে এই ব্যবস্থার ভিত অক্ষতই থেকে যায়। অধিকৃত আল-কুদসে ব্রিটিশ কনস্যুলেট নিয়ে বিরোধও দেখিয়েছে, বসতি-সম্পর্কিত পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে ইসরায়েল প্রস্তুত। শেষ পর্যন্ত এমন একটি সমঝোতা হয়, যাতে ভবনটি ব্রিটিশ মিশন হিসেবে থাকে, তবে উপস্থিতি কমানো হয়। এই ঘটনা সাম্প্রতিক হামলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে সহায়তা করে।
আল-কুদসের পূর্বে ই১ বসতি প্রকল্প দেখায়, ভূমি দখলের সঙ্গে অর্থায়ন ও সরকারি দরপত্র কতটা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এই প্রকল্প ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার এবং আল-কুদসকে তার ফিলিস্তিনি পারিপার্শ্বিকতা থেকে আরও আলাদা করার ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই দায় নির্ধারণের প্রশ্নে কোম্পানি, ব্যাংক ও অর্থদাতাদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। হামলাকারীদের খুঁজে বের করা হলেও ভূমি দখলে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আগের মতো কাজ করতে পারে, তাহলে জমি দখলের যন্ত্রটি চলতেই থাকবে।
এই নীতির ইতিহাস বর্তমান ইসরায়েলি সরকার বা বেজালেল স্মোত্রিচ ও ইতামার বেন-গভিরের মতো মন্ত্রীদের সময় থেকে শুরু হয়নি। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার আগেই জায়নবাদী প্রকল্পের সঙ্গে বসতি স্থাপনের ধারণা যুক্ত ছিল। ১৯৬৭ সালে অধিকৃত ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণ পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের আমলেও চলেছে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রথম সরকারের নীতিও এই ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যাটিকে কেবল কয়েকজন চরমপন্থী মন্ত্রীর বিচ্যুতি হিসেবে দেখলে এর দীর্ঘ ইতিহাস আড়ালে থেকে যায়।
১৯৯৬ সালে নেতানিয়াহু সরকারের নীতিনির্দেশনায় পশ্চিম তীর, গাজা, জর্ডান উপত্যকা, গ্যালিলি ও নেগেভে বসতি স্থাপনকে জাতীয় গুরুত্বের বিষয় এবং জায়নবাদী লক্ষ্য পূরণের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ১৯৯৭ সালে তিনি ‘অ্যালন প্লাস’ প্রস্তাব এগিয়ে নেন, যার মধ্যে বৃহত্তর আল-কুদস, জর্ডান উপত্যকা, বসতি ব্লক, কৌশলগত সড়ক ও পানিসম্পদ ধরে রাখার পরিকল্পনা ছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে ভূখণ্ডের ওপর তথাকথিত ‘সার্বভৌমত্ব’ প্রতিষ্ঠার আরও স্পষ্ট প্রস্তাব সামনে আসে। এসব পরিকল্পনার রূপ ও পরিধি ভিন্ন হলেও একটি সাধারণ লক্ষ্য দেখা যায়: জমি দখল এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে এমনভাবে খণ্ডিত করা, যাতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে এই বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখা যায়, যদিও দুই ভূখণ্ডে ব্যবহৃত পদ্ধতি ও শক্তি প্রয়োগের মাত্রা এক নয়। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, বারবার বাস্তুচ্যুতি এবং ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা বহু ফিলিস্তিনিকে বাড়িঘর ও জমিতে ফিরতে বাধা দিচ্ছে। ডেনিশ রিফিউজি কাউন্সিল ও ফিলিস্তিনি কৃষি উন্নয়ন সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দখলদার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা বাড়তে থাকায় এবং বাস্তুচ্যুতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় মানুষ ক্রমশ ছোট একটি এলাকায় গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক জীবন পুনর্গঠনের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।

পশ্চিম তীরে বসতি, পশুপালনের আউটপোস্ট, চেকপোস্ট, বাড়িঘর ভাঙা এবং বারবার হামলার মাধ্যমে একই ধরনের ভূমিচ্যুতির প্রক্রিয়া চলছে। এসব পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের বসবাসের জায়গা কমিয়ে দেয়, জনপদগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং নিজেদের জমিতে টিকে থাকাকে প্রতিদিনের সংগ্রামে পরিণত করে। প্রতিটি অভিযানের পেছনে একই নকশা আছে, এমন দাবি না করেও এই নীতিগুলোর অভিন্ন দিক বোঝা যায়: এগুলোর ফল ফিলিস্তিনিদের জমি ও স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত করা। ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমিতে থেকে যাওয়ার দৃঢ়তা এই প্রক্রিয়ার পথে বড় বাধা হয়ে আছে।
১৯৪৮ সালে অধিকৃত ভূখণ্ডে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিরাও ভূমি ও বৈষম্যের এই বাস্তবতার মুখোমুখি, যদিও তাদের আইনি অবস্থান পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের থেকে আলাদা। নাগরিকত্ব তাদের জাতীয় সমতা বা বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা দেয়নি। ২০১৮ সালের ‘নেশন-স্টেট আইন’-এ জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ইহুদিদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয় এবং ইহুদি বসতি উন্নয়নকে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতার যোগ্য জাতীয় মূল্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই আইন রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয় এবং ভূমি-নীতির মধ্যে সম্পর্কটি স্পষ্ট করে।
আইনটিতে সব ফিলিস্তিনিকে বহিষ্কারের কোনো সার্বিক নির্দেশ নেই। কিন্তু বৈষম্যমূলক নগর পরিকল্পনা, বাড়িঘর ভাঙা, আরব শহর ও জনপদের সম্প্রসারণে বাধা এবং বিশেষত নেগেভে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের আশঙ্কার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এর তাৎপর্য বোঝা যায়। বিভিন্ন আইনি পরিস্থিতিতে একই প্রবণতা দেখা যায়—ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের অধিকারের চেয়ে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তাই সমস্যাটিকে শুধু ১৯৬৭ সালের পর অধিকৃত ভূখণ্ডে বসতি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বৃহত্তর বৈষম্যমূলক কাঠামোটি আড়ালে থেকে যায়।
পশ্চিমা প্রতিক্রিয়ায় বড় একটি স্ববিরোধিতা রয়েছে। বসতি সম্প্রসারণের কিছু পরিণতির নিন্দা করা হচ্ছে, অথচ যে ব্যবস্থার কারণে তা ঘটছে, সেটিকে অক্ষত রাখা হচ্ছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি আলোকচিত্রী হেইডি লেভিনের ওপর হামলাকে সন্ত্রাসবাদ বলে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু বসতি সম্প্রসারণের প্রতি তাঁর সমর্থন বদলাননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উত্তেজনা কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে পশ্চিম তীর-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে, যেগুলো বাইডেন প্রশাসনের আমলে জারি করা হয়েছিল। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বসতি বাণিজ্যে পশ্চিমা বিধিনিষেধের বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিবৃতি দেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই খসড়া প্রকাশিত হয়নি। তবু এর প্রস্তুতিই মৌখিক নিন্দার সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে দেয়। মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত ‘স্টপ দ্য সেটেলমেন্টস অ্যাক্ট’ এখনো একটি বিল, যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর নীতি নয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স ও বেলজিয়াম বসতি স্থাপনকারীদের সাম্প্রতিক হামলার নিন্দা করেছে এবং এর সঙ্গে বসতি সম্প্রসারণের সম্পর্কের কথা বলেছে। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বসতি স্থাপনকারীদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। পোল্যান্ড জানিয়েছে, তাদের কূটনীতিকেরা নিরাপদে আছেন। হামলার আগে ১৫ অক্টোবরও ইউরোপীয় নেতারা বসতি সম্প্রসারণের নিন্দা জানিয়েছিলেন। এসব অবস্থান চাপ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু এগুলোকে ঐক্যবদ্ধ পশ্চিমা নীতি বলা যায় না। নতুন নিষেধাজ্ঞা আসবেই, এমন নিশ্চয়তাও নেই। ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা আর বসতি প্রকল্পের বিরোধিতা করা এক বিষয় নয়; ভাবমূর্তি রক্ষার কথা বলেও কেউ কেউ এই প্রকল্পকে সমর্থন করতে পারেন।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়ায় একটি বিষয়ে মিল রয়েছে: এসব হামলা ফিলিস্তিনিদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা এবং বসতি স্থাপনকারীদের দায়মুক্তিরই প্রতিফলন। ফিলিস্তিনিদের জীবন ও জমির সুরক্ষাকে যেকোনো প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রে রাখতে হবে। বিদেশি অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যেন ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের পরামর্শমূলক মতামত এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত দায়িত্বের কথা বলেছে। আদালত বলেছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত উপস্থিতি বেআইনি। নতুন বসতি স্থাপন বন্ধ করা এবং অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে সব বসতি স্থাপনকারীকে সরিয়ে নেওয়ার বাধ্যবাধকতার কথাও আদালত উল্লেখ করেছে। অন্য রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব হলো এই বেআইনি পরিস্থিতিকে স্বীকৃতি না দেওয়া এবং তা টিকিয়ে রাখতে সহায়তা না করা।
এর অর্থ, বসতি প্রকল্পে অর্থনৈতিক সহায়তা বন্ধ করা নিছক কূটনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পালনের প্রশ্ন। বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে থাকতে পারে বসতি প্রকল্পে অর্থায়ন ও বাণিজ্য সীমিত করা, সরকারি দরপত্র যাচাই করা এবং এসব প্রকল্পে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ইউরোপীয় দেশগুলো যৌথভাবে অথবা নিজেদের আইনি ক্ষমতার মধ্যে থেকে পৃথকভাবে এসব ব্যবস্থা নিতে পারে।
তবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব কোনো সাময়িক ইউরোপীয় ক্ষোভের ওপর নির্ভর করতে পারে না। ফিলিস্তিনিরাই নিজেদের ভূমি ও অধিকারের প্রধান দাবিদার এবং রক্ষক। তাদের টিকে থাকা, স্বাধীনতা ও জমিতে থাকার অধিকারকে বিদেশি নাগরিকদের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। গাজা, পশ্চিম তীর এবং ১৯৪৮ সালে অধিকৃত ভূখণ্ডে থাকা ফিলিস্তিনিদের ভূমি, স্বাধীনতা ও অস্তিত্বের অধিকার রয়েছে।
বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ঠেকাতে চাইলে সরকারগুলোকে সেই প্রকল্পের ওপর বাস্তব মূল্য আরোপ করতে হবে, যে প্রকল্প এই সহিংসতা তৈরি করছে। একই সঙ্গে বসতি সম্প্রসারণ টিকিয়ে রাখতে নিজেদের দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তাও বন্ধ করতে হবে। বিদেশিরা আক্রান্ত হলে কেবল কূটনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা নিলে, ক্যামেরা ও আন্তর্জাতিক সাক্ষীরা চলে যাওয়ার পর ফিলিস্তিনিরা আবারও সেই একই ব্যবস্থার মুখোমুখি হবেন।
ইউরোপের সামনে পরীক্ষা তাই কেবল হামলার নিন্দা জানানোর নয়। পরীক্ষা হলো—ফিলিস্তিনিদের জমি কেড়ে নেওয়ার যে ব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরে চলছে, তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখাতে পারে কি না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









