ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শিক্ষা খাতে অর্থায়ন বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে এক লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। শনিবারের এ বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার নতুন করে চাপে পড়েছে। বিক্ষোভের শেষ দিকে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং জলকামান ব্যবহার করে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) বিক্ষোভে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকা এড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নির্ধারিত পথে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। তবে নিষেধাজ্ঞা ও চলাচলে বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেও বিপুলসংখ্যক মানুষ এতে অংশ নেন।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যারিস ছাড়াও লিওঁ, ক্লেরমঁ-ফেরাঁ ও স্ত্রাসবুর্গ শহরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। নিস ও নঁতে শহরে ব্যবহার করা হয় জলকামান। মার্সেই শহরে মিছিলের শেষ প্রান্তের কাছে কয়েক ডজন মানুষের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হলে সেখানেও কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়।
প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর জানিয়েছে, শনিবারের বিক্ষোভের ঘটনায় ৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০ জনকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহ এবং সহিংসতা বা সম্পদের ক্ষতিসাধনের প্রস্তুতি নেওয়া কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বেশির ভাগ গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর মেয়াদের শেষ দিকে এসে এই বিক্ষোভ তার নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আগামী মে মাসে দেশটির ভোটাররা তার উত্তরসূরি নির্বাচন করবেন। এমন পরিস্থিতিতে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দল সরকারের বিরুদ্ধে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছে। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভকে ভোটের মাধ্যমে প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।

বিক্ষোভ মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সারা দেশে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁদের সহায়তায় হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়।
ছোট বিক্ষোভ থেকে দেশজুড়ে আন্দোলন
গত মাসে প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে কর্মীসংকটের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নত পরিবেশের দাবিতে এবং কর্মীরা বেশি মজুরি ও পেনশনের দাবিতে আন্দোলনে যোগ দেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ফ্রান্সের সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় মোট ১ কোটি ৫৪ লাখ ঘণ্টার পাঠদান ব্যাহত হয়েছে। অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ায় নির্ধারিত পাঠদানের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সম্পন্ন করা যায়নি।
অন্যদিকে, দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইনসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সে জ্বালানির দাম বেড়েছে ২১ দশমিক ৩ শতাংশ। এর ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ১ শতাংশে।
শুক্রবার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন ম্যাক্রোঁ। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। তবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ঘোষণা না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এদিকে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সংগঠকেরা আগামী ৩১ অক্টোবর আবারও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। তাদের দাবি, বিক্ষোভ করার অধিকার রক্ষায় আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে।
বিক্ষোভের পথ পরিবর্তন, কয়েকটি শহরে সমাবেশ নিষিদ্ধ
শুক্রবার প্যারিসে বিক্ষোভ মিছিলের নির্ধারিত পথ পরিবর্তন করে পুলিশ। মিছিলের আগের শুরুর স্থান বাস্তিল চত্বরে মাইক ব্যবহার করে লোকজনকে সরে যেতে বলা হয়। অন্যথায় ১৩৫ ইউরো জরিমানার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
৫৮ বছর বয়সী নার্স সৌমায়া আবেদ বলেন, তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু কখনো পোর্ত দ্য ইতালি থেকে কোনো মিছিল শুরু হতে দেখেননি।
তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহে যা ঘটেছে, সেটিকে ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এতে আন্দোলন থামবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নত পরিবেশের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও বন্ধ হবে না।’
মার্সেই শহরে পুলিশ বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ১৭ হাজার বলে জানিয়েছে। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দাবি করেছে, সেখানে এক লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তুলুজ শহরে কর্তৃপক্ষের হিসাবে বিক্ষোভে অংশ নেন ২৬ হাজার ৫০০ জন। এদিকে লিওঁ, নিস ও মন্টপেলিয়েসহ কয়েকটি শহরে সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
শ্রমিক সংগঠনগুলো এসব নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে। তাদের দাবি, সংবিধানস্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী এসব পদক্ষেপ।
শনিবার প্যারিসের দক্ষিণে ওর্লেয়াঁ শহরেও হাজারো মানুষ কট্টর ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করেন। একই সময়ে শহরটিতে দুই দিনের সম্মেলন করছিল মেরিন লো পেনের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল র্যালি।
২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে কম জনপ্রিয়তার মুখে পড়েছেন মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। তাঁর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এই সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তবে শহরের কেন্দ্র, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবন সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
গত সপ্তাহের বিক্ষোভে কয়েকটি শহরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি বলে সোমবার স্বীকার করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। তিনি পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও ম্যাক্রোঁ তা গ্রহণ করেননি।
দোকানপাটে ভাঙচুর, বন্ধ জাদুঘর
গত শনিবারের বিক্ষোভে ফ্রান্সজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। ওই সপ্তাহান্তে সংঘর্ষ ও সহিংসতার মধ্যে দেশটির প্রায় তিন হাজার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা লুটপাটের শিকার হয়। কয়েক বছরের মধ্যে এমন মাত্রার সড়ক সহিংসতা দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্যারিসে দোকানিরা নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় দোকানের সামনের অংশ কাঠের পাটাতন দিয়ে বন্ধ করে দেন। শনিবার সাঁ-লাজার রেলস্টেশনের কাছে ৩৪ বছর বয়সী ঠিকাদার আকরাম আহমেদ একটি চশমার দোকানের সামনের অংশ বন্ধ করছিলেন। তিনি বলেন, ‘গত রাতে আমাকে ফোন করা হয়েছিল। দোকানের মালিককে খুব অসহায় মনে হচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন, আমি তাঁর জীবন বাঁচাচ্ছি।’
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে শনিবার ল্যুভর, ওর্সে জাদুঘর, পিকাসো জাদুঘর ও গ্রঁ পালে বন্ধ রাখা হয়। গ্রঁ পালে তখন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পল সেজানের একটি বড় প্রদর্শনী চলছিল।

বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সমকালীন শিল্পকর্মের প্রদর্শনী আর্ট বাসেল শুক্রবার দর্শনার্থীদের জন্য খোলা হয়েছিল। তবে অস্থিরতার আশঙ্কায় আয়োজকেরা সপ্তাহান্তের কর্মসূচি বাতিল করেন।
শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবি
শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো উচ্চশিক্ষায় আরও আড়াই লাখ আসন বাড়ানো এবং জাতীয় ভর্তি ব্যবস্থা পারকুরসুপের মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
তাদের যৌথ ১০ দফা দাবিতে আরও শিক্ষক নিয়োগ এবং বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো মেরামতের কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে শিক্ষার্থীদের মাসিক ভাতা ২০০ ইউরো বাড়ানো এবং সরকারি ছাত্রাবাসের ভাড়া স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা। প্যারিসের বিক্ষোভকারী লুই লেদু-জাতার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈষম্যপূর্ণ সমাজে পরিণত হতে চান না তাঁরা।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন পরিস্থিতিতে পড়তে চাই না, যেখানে সমাজের একাংশের সবকিছু আছে, আর অন্যদের কিছুই নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ত্রিশ বছর বয়স হওয়ার আগেই আমাকে এতবার রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে হবে, তা কখনো ভাবিনি।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









