সময় কী? আর্জেন্টিনার লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস একবার লিখেছিলেন, সময়ই সেই উপাদান, যা দিয়ে আমি তৈরি। সময় একটি নদী, যা আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়; অথচ আমিই সেই নদী।
কথাটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ, কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক গভীর রহস্য। আমাদের চলাফেরা, কাজকর্ম, চিন্তা, অনুভব—সবকিছুই সময়ের মধ্যে ঘটে। আমাদের চেতনার প্রতিটি বিষয়ও সময়ের সঙ্গে প্রসারিত হয়। আমরা সময়ের মধ্যে বাস করি, সময় মেপে জীবন সাজাই; আরও গভীর অর্থে, আমরা নিজেরাই সময়ের প্রাণী। কিন্তু আমরা যে সময়ের মধ্যে বেঁচে থাকি, তা কি সত্যিই একটি নদীর মতো অবিচ্ছিন্নভাবে বয়ে চলে? নাকি তা আসলে আলাদা আলাদা মুহূর্তের সমষ্টি—সুতোর মধ্যে গাঁথা পুঁতির মতো, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত অন্যটি থেকে বিচ্ছিন্ন?
আঠারো শতকের দার্শনিক ডেভিড হিউম দ্বিতীয় ধারণাটির দিকে ঝুঁকেছিলেন। তার মতে, মন আসলে নানা উপলব্ধির একটি সমষ্টি। একটির পর আরেকটি উপলব্ধি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় এসে হাজির হয়; আমাদের মন তাই সর্বদা পরিবর্তনশীল, চলমান। কিন্তু উনিশ শতকের শেষ দিকে মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস এই ধারণার মধ্যে একটি অসুবিধা দেখতে পেলেন। মন যদি বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের সমষ্টিই হয়, তাহলে আমাদের অভিজ্ঞতা এত অবিচ্ছিন্ন বলে মনে হয় কেন? আমরা তো সচরাচর অনুভব করি না যে একটি চিন্তা শেষ হয়ে আরেকটি চিন্তা শুরু হচ্ছে, কিংবা একটি দৃশ্যের পর্দা নামতেই অন্য দৃশ্যের পর্দা উঠছে। আমাদের কাছে চেতনা যেন একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ—যার মধ্যে কোনো ফাটল নেই, কোনো দৃশ্যমান বিচ্ছেদ নেই।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই জেমস চেতনার প্রবাহ বা ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ ধারণাটিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আমাদের চিন্তা ক্রমাগত বদলায়, কিন্তু সেই বদলের মধ্যেও একটা ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। তবু তার মনে প্রশ্ন জেগেছিল: চেতনা কি সত্যিই অবিচ্ছিন্ন, নাকি বিচ্ছিন্ন মুহূর্তগুলোকে আমরা অবিচ্ছিন্ন বলে অনুভব করি? এই প্রশ্নটি বুঝতে হলে আমাদের উনিশ শতকের একটি জনপ্রিয় খেলনার কথা ভাবতে হবে—জোট্রোপ। দেখতে এটি অনেকটা ঘূর্ণায়মান একটি ড্রামের মতো। তার গায়ে আঁকা থাকে কোনো প্রাণীর দৌড়ানোর, কোনো মানুষের লাফ দেওয়ার কিংবা কোনো গাছের বেড়ে ওঠার ধারাবাহিক ছবি। ড্রামটি ঘোরালে ছবিগুলো দ্রুত একের পর এক চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়। একটি নির্দিষ্ট গতিতে ছবিগুলো আর আলাদা আলাদা থাকে না; মনে হয়, একটি প্রাণী সত্যিই দৌড়াচ্ছে, একটি মানুষ সত্যিই লাফাচ্ছে, একটি গাছ সত্যিই বেড়ে উঠছে।
অথচ ছবিগুলো নিজেরা স্থির। গতি কোথায়? ছবির মধ্যে নয়, আমাদের দেখার অভিজ্ঞতার মধ্যে।

এখানেই লুকিয়ে আছে চেতনা বোঝার একটি সম্ভাব্য সূত্র। হয়তো আমাদের মস্তিষ্কও বিচ্ছিন্ন কিছু মুহূর্ত গ্রহণ করে, তারপর সেগুলোকে এমনভাবে একত্র করে যে আমরা একটি অবিচ্ছিন্ন পৃথিবী দেখতে পাই। জেমস যদি আরও কয়েক বছর পরে লিখতেন, তাহলে হয়তো তিনি চলচ্চিত্রের উদাহরণ দিতেন। সিনেমার প্রতিটি ফ্রেম স্থির, অথচ পর্দায় আমরা দেখি চলমান মানুষ, গাড়ি, নদী, বৃষ্টি। ক্যামেরার জুম, দৃশ্যের মিলিয়ে যাওয়া, হঠাৎ দৃশ্যান্তর, স্মৃতি ও বর্তমানের পাশাপাশি উপস্থিতি—এসবের মধ্যে আমাদের চেতনার কাজ করার ধরনটিরও যেন একটি প্রতিচ্ছবি রয়েছে। দার্শনিক অঁরি বের্গসনও ১৯০৭ সালে তাঁর ক্রিয়েটিভ ইভল্যুশন বইয়ে চিন্তার সঙ্গে চলচ্চিত্রের তুলনা করেছিলেন। তবে তার কাছে মুহূর্তগুলো নিছক আলাদা আলাদা ছবি ছিল না। তারা একে অন্যের মধ্যে প্রবেশ করে, মিশে যায়—যেমন একটি সুরের নোট আরেকটি নোটের সঙ্গে মিলিত হয়ে সংগীত তৈরি করে। সংগীতের অভিজ্ঞতা কেবল বিচ্ছিন্ন শব্দের সমষ্টি নয়; আগের সুরের স্মৃতি পরের সুরকে অর্থ দেয়। চেতনার ক্ষেত্রেও হয়তো তেমনই ঘটে। জেমসের মতে, বর্তমানকে আমরা কখনোই সম্পূর্ণ একা অনুভব করি না। বর্তমানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে থাকে অতীতের স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। কোনো পরিচিত মুখ দেখলে আমরা শুধু সেই মুখটি দেখি না; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্মৃতি, অনুভূতি ও সম্ভাবনাও যেন ফিরে আসে। এই পুরোনো অভিজ্ঞতা এবং নতুন উপলব্ধির পারস্পরিক সম্পর্কই চেতনাকে প্রবাহমান করে তোলে। ভাবুন, যদি আমাদের চেতনা সত্যিই বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের একটি মালা হতো! প্রতিটি মুহূর্ত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি তা চিরতরে হারিয়ে যেত, তাহলে আমরা অতীত সম্পর্কে কিছুই জানতে পারতাম না। কোনো অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া, কাউকে চিনে রাখা, এমনকি নিজের জীবন সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করাও অসম্ভব হয়ে উঠত। প্রতিটি নতুন মুহূর্ত হতো সম্পূর্ণ নতুন এক পৃথিবী—যার সঙ্গে আগের পৃথিবীর কোনো সম্পর্ক নেই।
স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত কিছু মানুষের জীবন আমাদের এই সম্ভাবনার কাছাকাছি নিয়ে যায়। আমার এক রোগী ছিলেন জিমি, যাঁর কথা আমি দ্য ম্যান হু মিস্টুক হিজ ওয়াইফ ফর আ হ্যাট বইয়ে লিখেছি। তিনি যেন একটি মুহূর্তের মধ্যে আটকে ছিলেন। চারপাশের পৃথিবী বদলাচ্ছিল, তার অভিজ্ঞতাও বদলাচ্ছিল, কিন্তু নতুন অভিজ্ঞতাগুলোকে অতীতের সঙ্গে যুক্ত করে নিজের জীবনের ধারাবাহিকতা তৈরি করার ক্ষমতা তার ছিল না। তাঁর কাছে জীবন ছিল এমন এক বর্তমান, যার পেছনে কোনো স্মরণযোগ্য অতীত নেই, সামনে কোনো কল্পনাযোগ্য ভবিষ্যৎ নেই।
এই অবস্থায় চেতনা যেন একটি ক্ষুদ্র আলোর বিন্দু—যার চারদিকে বিস্তৃত অন্ধকার।
চেতনার ধারাবাহিকতা যে কতটা ভঙ্গুর, তা আমি আমার রোগীদের মধ্যে আরও বিস্ময়করভাবে দেখেছি। মাইগ্রেনের কিছু আক্রমণের সময় কোনো কোনো রোগীর কাছে চলমান পৃথিবী হঠাৎ স্থির ছবির ধারায় ভেঙে যায়। মানুষ হাঁটছে, কিন্তু তাদের চলাচল আর মসৃণ বলে মনে হয় না। বরং মনে হয়, একেকটি স্থির ছবি পরের ছবির জায়গা নিচ্ছে। কখনো ছবিগুলো স্পষ্টভাবে আলাদা থাকে, কখনো আগের ছবির ছায়া পরের ছবির সঙ্গে মিশে যায়। ১৯৭০ সালে মাইগ্রেন নিয়ে আমার বইয়ে আমি এই অভিজ্ঞতার নাম দিয়েছিলাম ‘সিনেমাটোগ্রাফিক ভিশন’—চলচ্চিত্রের মতো দৃষ্টি। রোগীরা যেন এমন একটি সিনেমা দেখছিলেন, যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক ধীরে চলছে। সেই সময় এই অভিজ্ঞতার কোনো সন্তোষজনক শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যা ছিল না। তবু ঘটনাটি আমাকে ভাবিয়েছিল: স্বাভাবিক অবস্থায়ও কি আমাদের মস্তিষ্ক দৃশ্যমান পৃথিবীকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্থির মুহূর্তে গ্রহণ করে, তারপর সেগুলোকে জুড়ে দিয়ে গতির অনুভূতি তৈরি করে? আরও বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম এমন কিছু রোগীর ক্ষেত্রে, যারা মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত অসুস্থতার পর দীর্ঘদিন নানা স্নায়বিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁদের কাউকে কাউকে লেভোডোপা নামের ওষুধ দেওয়ার পর সাময়িকভাবে যেন চেতনার প্রবাহ থেমে যেত। তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকতেন, কিন্তু কাজ এগোত না; চারপাশের দৃশ্য তাদের কাছে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে আটকে থাকত।
হেস্টার ওয়াই নামে আমার এক রোগীর কথা মনে পড়ে। একদিন তাকে দেখতে গিয়ে দেখি, বাথরুমে পানি উপচে পড়ছে, অথচ তিনি ঘরের মাঝখানে সম্পূর্ণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তাঁকে স্পর্শ করতেই তিনি চমকে উঠলেন।
‘কী হয়েছে?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, ‘সেটা তো আপনারই বলার কথা।’
তিনি জানালেন, তিনি গোসলের জন্য পানির কল খুলেছিলেন। তখন বাথটাবে মাত্র এক ইঞ্চি পানি জমেছে—এই দৃশ্যটিই তার কাছে যেন স্থির হয়ে গিয়েছিল। কতক্ষণ কেটে গেছে, তা তিনি বুঝতেই পারেননি। বাস্তবে পানি উপচে ঘর ভেসে গেছে; কিন্তু তার অভিজ্ঞতা আটকে ছিল সেই আগের মুহূর্তে। এমন ঘটনা দেখায়, আমাদের সচেতন অভিজ্ঞতার প্রবাহ দীর্ঘ সময়ের জন্য থেমে যেতে পারে, অথচ শ্বাসপ্রশ্বাস বা শরীরের ভঙ্গি ধরে রাখার মতো কিছু স্বয়ংক্রিয় কাজ চলতে থাকে। চেতনা যেন একসঙ্গে কাজ করা বহু ব্যবস্থার একটি জটিল সমন্বয়; এর কোনো কোনো অংশ থেমে গেলেও অন্য অংশগুলো চলতে পারে। দৃষ্টির একটি সাধারণ বিভ্রমও এই জটিলতার ইঙ্গিত দেয়। একটি নেকার ঘনকের ছবি দেখুন—কয়েকটি রেখা দিয়ে আঁকা এমন একটি ঘনক, যার সামনে-পেছনের অবস্থান চোখে বারবার বদলে যেতে পারে। ছবিটি একই থাকে, চোখেও তার প্রতিচ্ছবি বদলায় না; তবু কখনো মনে হয় ঘনকের একটি দিক সামনে বেরিয়ে এসেছে, আবার কখনো মনে হয় সেটি পেছনে সরে গেছে। অর্থাৎ, দৃশ্যের পরিবর্তনটি বাইরে ঘটছে না; ঘটছে আমাদের মস্তিষ্কের ব্যাখ্যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় এই পরিবর্তন কয়েক সেকেন্ড পরপর ঘটে। কিন্তু কিছু স্নায়বিক রোগীর ক্ষেত্রে একই দৃশ্য দীর্ঘ সময় ধরে অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এতে বোঝা যায়, আমরা যা দেখি, তা কেবল চোখে প্রবেশ করা আলোর সরল প্রতিলিপি নয়। আমাদের মস্তিষ্ক সেই আলোকে ব্যাখ্যা করে, সম্ভাব্য অর্থের মধ্যে বেছে নেয়, এবং প্রয়োজনমতো ব্যাখ্যা বদলায়।

চলমান পৃথিবীকে স্থির মনে হওয়ার আরেকটি পরিচিত উদাহরণ হলো ঘূর্ণায়মান পাখা বা চাকার বিভ্রম। কখনো পাখার ব্লেডগুলোকে উল্টো দিকে ঘুরতে দেখা যায়, কখনো মনে হয় তারা থেমে গেছে। সিনেমায় ঘোড়ার গাড়ির চাকা উল্টো দিকে ঘুরছে বলে মনে হওয়ার ঘটনাটিও একই ধরনের বিভ্রম। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ক্যামেরার ফ্রেম গ্রহণের গতি এবং চাকার ঘূর্ণনের গতির মধ্যে অসামঞ্জস্য এর একটি কারণ। কিন্তু ঘরের সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়েও যদি একই বিভ্রম হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে: আমাদের নিজের দৃষ্টিব্যবস্থাও কি পৃথিবীকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সময়ের খণ্ডে গ্রহণ করে? স্নায়ুবিজ্ঞানী ডেল পারভস ও তার সহকর্মীরা এ ধরনের বিভ্রম নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাদের গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, দৃষ্টিব্যবস্থা তথ্যকে ধারাবাহিক ছোট ছোট পর্বে প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থায় এই পর্বগুলো এত সুন্দরভাবে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয় যে আমরা কোনো বিচ্ছেদ অনুভব করি না। সম্ভবত চলচ্চিত্র আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, কারণ আমাদের মস্তিষ্কও বাস্তবতাকে অনেকটা একইভাবে গ্রহণ ও একত্র করে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায়। চলাচলের হিসাব করা আর চলাচল অনুভব করা এক কথা নয়। মস্তিষ্ক কোনো বস্তুর অবস্থান বদলেছে কি না, তা নির্ণয় করতে পারে। কিন্তু সেই হিসাব কীভাবে আমাদের কাছে গতির প্রত্যক্ষ অনুভূতি হয়ে ওঠে? নীল রং দেখা, গভীরতা অনুভব করা কিংবা কোনো কিছুকে চলতে দেখা—এসব অভিজ্ঞতার একটি ব্যক্তিগত গুণ রয়েছে। স্নায়ুকোষের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ কীভাবে সেই গুণসম্পন্ন সচেতন অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়, তা এখনো চেতনা-গবেষণার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি।
গত কয়েক দশকে স্নায়ুবিজ্ঞান এই প্রশ্নগুলোর দিকে নতুনভাবে এগিয়েছে। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ, একসঙ্গে বহু স্নায়ুকোষের সংকেত পরিমাপ, এবং কম্পিউটারে স্নায়ুজালের মডেল তৈরি—এসব পদ্ধতি আমাদের বোঝার নতুন পথ খুলে দিয়েছে। একসময় চেতনা নিয়ে গবেষণা প্রায় অধরা মনে হতো; এখন তা স্নায়ুবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আমাদের মস্তিষ্কে প্রায় একশ বিলিয়ন স্নায়ুকোষ রয়েছে। প্রতিটি কোষের সঙ্গে আরও বহু কোষের সংযোগ। অসংখ্য স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ মুহূর্তে মুহূর্তে বদলায়, একে অন্যকে প্রভাবিত করে, কখনো সাময়িক গোষ্ঠী তৈরি করে, আবার ভেঙে যায়। এই বিপুল পারস্পরিক যোগাযোগের মধ্যেই চিন্তা ও সচেতন অভিজ্ঞতার উদ্ভব ঘটে থাকতে পারে।
স্নায়ুবিজ্ঞানী জেরাল্ড এডেলম্যান এই ধারণাকে ব্যাখ্যা করতে ‘নিউরাল ডারউইনিজম’ বা স্নায়বিক ডারউইনিজম শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। জীবজগতে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে যেভাবে কিছু বৈশিষ্ট্য টিকে থাকে, মস্তিষ্কেও অভিজ্ঞতার প্রভাবে কিছু স্নায়বিক সংযোগ শক্তিশালী হয়, কিছু দুর্বল হয়। আমাদের অভিজ্ঞতা তাই শুধু স্মৃতিতে জমা থাকে না; তা মস্তিষ্কের সংযোগ ও কাজ করার ধরনকেও বদলে দেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মস্তিষ্ক কোনো স্থির যন্ত্র নয়, যার মধ্যে জন্মের সময় সব নির্দেশনা লিখে দেওয়া হয়েছে। বরং এটি এমন একটি জীবন্ত ব্যবস্থা, যা অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে পুনর্গঠন করে। আমরা যা দেখি, শুনি, শিখি, ভালোবাসি কিংবা ভয় পাই—এসবই আমাদের স্নায়বিক জগতকে কোনো না কোনোভাবে আকার দেয়। চেতনার এই প্রবাহের একটি গভীর বিবর্তনীয় তাৎপর্যও আছে। একটি প্রাণী যদি বর্তমানের দৃশ্যকে অতীত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। জঙ্গলে কোনো প্রাণী গর্জন শুনল, একই সময়ে বাতাসের দিক বদলে গেল, আলোও কমে এল। প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে হয়তো বিপদের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। কিন্তু আগে বাঘের উপস্থিতির সঙ্গে এমন পরিস্থিতির মিল থাকলে প্রাণীটি দ্রুত পালাতে পারে। বর্তমানের বিভিন্ন সংকেতকে স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাকে বিপদ চিনতে সাহায্য করে।
মানুষের চেতনা এই প্রাথমিক ক্ষমতার ওপর আরও বহু স্তর তৈরি করেছে। ভাষা, আত্মসচেতনতা, অতীতকে স্মরণ করা এবং ভবিষ্যৎ কল্পনা করার ক্ষমতা আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতাকে একটি ব্যক্তিগত কাহিনিতে পরিণত করে। আমরা শুধু পৃথিবীকে দেখি না; পৃথিবীতে নিজেদের অবস্থানও বুঝতে চেষ্টা করি। ধরা যাক, আমি একটি ক্যাফেতে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি। একটি লাল পোশাক পরা মেয়ে হেঁটে গেল, একজন অদ্ভুত দেখতে কুকুর নিয়ে যাচ্ছেন, মেঘের আড়াল থেকে সূর্য বেরিয়ে এল। হঠাৎ কোনো গাড়ির বিকট শব্দে আমার মনোযোগ সরে গেল, অথবা বাতাসে ভেসে আসা সিগারেটের গন্ধ আমাকে অন্য কোনো সময়ের কথা মনে করিয়ে দিল। চারপাশে অসংখ্য ঘটনা ঘটছে, অথচ আমার মন কিছু ঘটনাকে বেছে নিচ্ছে, অন্যগুলোকে উপেক্ষা করছে। কেন এই দৃশ্যগুলোই আমার মনোযোগ আকর্ষণ করল? এর পেছনে আছে স্মৃতি, আবেগ, প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। চেতনা কোনো নিষ্ক্রিয় ক্যামেরা নয়, যা পৃথিবীকে হুবহু ধারণ করে। আমরা কী দেখি, কীভাবে দেখি, কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিই—সবকিছুর মধ্যেই আমাদের নিজস্ব পরিচয় কাজ করে।
লেখক ক্রিস্টোফার ইশারউড তার বার্লিন-দিনলিপি শুরু করেছিলেন ক্যামেরার একটি উপমা দিয়ে: তিনি যেন খোলা শাটারের একটি ক্যামেরা, যা কিছু বিচার না করে চারপাশের দৃশ্য ধারণ করছে। পরে সেই দৃশ্যগুলোকে বিকশিত ও স্থায়ী করা হবে। কিন্তু মানুষের চেতনা আসলে এতটা নিরপেক্ষ হতে পারে না। আমরা চাই বা না চাই, জানি বা না জানি, প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে নিজের মতো করে সাজাই। আমরা যেন নিজেদের জীবনের চলচ্চিত্রের পরিচালক; আবার সেই চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুও আমরা নিজেরাই। তাহলে এতগুলো বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত একসঙ্গে যুক্ত হয়ে আমাদের জীবনের ধারাবাহিকতা তৈরি করে কীভাবে? উইলিয়াম জেমসের মতে, প্রতিটি চিন্তা আগের চিন্তার উত্তরাধিকার বহন করে এবং পরের চিন্তার হাতে কিছু না কিছু তুলে দেয়। চিন্তাগুলো বুনো গরুর পালের মতো এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায় না; প্রত্যেকটির সঙ্গে আমাদের আত্মপরিচয়ের একটি ছাপ জড়িয়ে থাকে। একটি চিন্তা শেষ হলেও তার কিছু অংশ পরের চিন্তায় বেঁচে থাকে।
এভাবে আমাদের অস্তিত্ব গড়ে ওঠে মুহূর্তের পর মুহূর্তে—কিছু মুহূর্ত স্পষ্ট, কিছু অস্পষ্ট; কিছু স্মৃতিতে থেকে যায়, কিছু হারিয়ে যায়। তবু তারা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমাদের জীবনের কাহিনি তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত আমরা আবার বোর্হেসের নদীর কাছে ফিরে আসি। হয়তো চেতনা সত্যিই একটি অবিচ্ছিন্ন নদী নয়; হয়তো তা অসংখ্য ক্ষুদ্র মুহূর্তের সমাবেশ, যা স্মৃতি, অনুভূতি ও মস্তিষ্কের জটিল কাজের মাধ্যমে এক প্রবাহের রূপ পায়। ফরাসি লেখক মার্সেল প্রুস্তের ভাষায়, আমরা যেন মুহূর্তের একটি সংগ্রহ। কিন্তু সেই মুহূর্তগুলো একে অন্যের মধ্যে মিশে যায়, ঠিক নদীর জলের মতো।
নদী বয়ে চলে, অথচ তার নাম একই থাকে। জল বদলায়, তীর বদলায়, আলো বদলায়—তবু আমরা তাকে একটি নদী হিসেবেই চিনতে পারি। আমাদের চেতনাও কি তেমন নয়? প্রতিটি মুহূর্তে আমরা বদলে যাই, অথচ সেই বদলের মধ্য দিয়েই নিজেকে একই মানুষ বলে অনুভব করি।
সম্ভবত চেতনার সবচেয়ে বড় রহস্য এখানেই: আমরা একদিকে অসংখ্য ক্ষণস্থায়ী অভিজ্ঞতার সমষ্টি, অন্যদিকে সেই অভিজ্ঞতাগুলোকে একসূত্রে গেঁথে রাখা একটি জীবন্ত সত্তা। আমরা সময়ের মধ্যে বেঁচে থাকি, সময়ের সঙ্গে বদলাই, আর সেই বদলের প্রবাহের মধ্যেই নিজেদের খুঁজে পাই।
আমরা সেই নদীর যাত্রী—আবার, কোনো গভীর অর্থে, আমরাই সেই নদী।

পরিচিতি
অলিভার স্যাকস (১৯৩৩–২০১৫) ছিলেন একজন বিখ্যাত ব্রিটিশ স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ও লেখক। মানুষের মস্তিষ্ক, স্মৃতি, অনুভূতি ও চেতনা নিয়ে তার গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি সাহিত্যজগতেও বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে তিনি লক্ষ করেছিলেন, মস্তিষ্কের সামান্য পরিবর্তনও মানুষের পরিচয়, উপলব্ধি ও জীবনযাপনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এসব অভিজ্ঞতা তিনি তুলে ধরেছেন অসাধারণ গল্প বলার ভঙ্গিতে, যেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে মিশেছে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও আবেগ।
তার বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাওয়েকেনিংস, দ্য ম্যান হু মিসটুক হিজ ওয়াইফ ফর আ হ্যাট, মিউজিকোফিলিয়া এবং দ্য রিভার অভ কনশাসনেস। এসব বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন, মস্তিষ্কের অসুস্থতা মানুষের জীবনকে বদলে দিলেও প্রতিটি মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও মর্যাদা রয়েছে। ২০১৫ সালের ৩০ আগস্ট নিউইয়র্কে ৮২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









