মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ দুই বছর প্রায়ই ক্ষমতা হারানোর সময়। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে না, জনসমর্থন কমে যায়, নিজের দলের নেতারাও পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবতে শুরু করেন। দেশের ভেতরে আইন পাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু ক্ষমতার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও একজন প্রেসিডেন্টের হাতে একটি বড় ক্ষেত্র খোলা থাকে—পররাষ্ট্রনীতি। ইতিহাসে অনেকে এই সময়টায় নিজেদের উত্তরাধিকার গড়তে চেয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পও তা-ই করতে পারেন। তবে তার ক্ষেত্রে সেই উত্তরাধিকার শান্তির বদলে আরও বিপজ্জনক এক বিশ্বব্যবস্থার সূচনা করতে পারে।
১৯৯২ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ সোমালিয়ায় দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় ২৮ হাজার মার্কিন সেনা পাঠিয়েছিলেন। বিল ক্লিনটন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। বারাক ওবামা কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেন এবং ইরানের পরমাণু চুক্তি চূড়ান্ত করতে ভূমিকা রাখেন।
ট্রাম্পের সামনে অবশ্য ভিন্ন এক পরিস্থিতি। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে তার দলের। সিনেটেও ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারেন। এর ফলে তার অভ্যন্তরীণ নীতির কর্মসূচি আরও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদন্তের মুখে পড়তে পারেন তিনি, এমনকি অভিশংসনের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু দেশের ভেতরে ক্ষমতা কমলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের ছাপ রেখে যাওয়ার চেষ্টা থামবে না তার।
ইরানের সঙ্গে সংঘাত নতুন করে শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনও দুর্বল হচ্ছে। সম্প্রতি ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেন প্রশ্নে রাশিয়া ‘আসলে ঠিকই আছে’। তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ মস্কো সফরে গিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশংসা করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা আর ইউরোপে রাশিয়ার প্রতি নমনীয়তার পাশাপাশি আরও বড় একটি পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে—বিশ্বকে কয়েকটি প্রভাববলয়ে ভাগ করে নেওয়া।
পুতিন প্রস্তাব দিয়েছেন, আগামী মাসে চীনে তার সঙ্গে ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের একটি শীর্ষ বৈঠক হোক। বৈঠকটি হলে তিন নেতার একসঙ্গে বসার ছবি নিছক আনুষ্ঠানিক দৃশ্য হবে না। এর মধ্য দিয়ে এমন এক ধারণা শক্তিশালী হতে পারে, যেখানে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর প্রভাব বিস্তারের অধিকার দাবি করবে।
এর পরিণতি সুদূরপ্রসারী। ইউক্রেনের বাইরে ইউরোপের অন্য দেশগুলোও রাশিয়ার হুমকির মুখে পড়তে পারে, যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব থেকে সরে আসে। পূর্ব এশিয়ায় তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তাও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ছাতা সরে গেলে এসব দেশকে নিজেদের প্রতিরক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেই এই দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত রয়েছে। ২০২৫ সালের কৌশলপত্রে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার ঐতিহ্যগত মিত্রদের সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু রাশিয়া ও চীনের সমালোচনা ছিল লক্ষণীয়ভাবে কম। তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকলেও চীনের নাম একবারও উল্লেখ করা হয়নি। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের সূচনা কিংবা পুতিনের পরাজয়ের প্রয়োজনীয়তার বদলে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ইউরোপ ও রাশিয়ার সম্পর্ক উন্নত করতে পারে, তার ওপর।
নথিটির মূল বার্তা ছিল, অন্য দেশের সমস্যা তখনই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয় হবে, যখন তা সরাসরি মার্কিন স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলবে। এত দিন মিত্রদের নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র রক্ষাকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হতো। এখন সেই অঙ্গীকার শর্তসাপেক্ষ হয়ে পড়ছে।
পুতিনের জন্য এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লক্ষ্যের সাফল্য। পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় গণতন্ত্রের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা তিনি বরাবরই রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিসরে হস্তক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন। এখন এমন এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন, যিনি অনেক ক্ষেত্রেই তার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত। অন্যদিকে, পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দুর্বল হয়ে পড়লে চীনের সমুদ্রপথ ও আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। কানাডার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ডের ভাষায়, ট্রাম্পের চেয়ে বেশি সুবিধা চীনকে আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট দেননি।
এখানে শুধু ভূখণ্ড বা সামরিক প্রভাবের প্রশ্ন নেই। তিন দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ভবিষ্যতের সরবরাহব্যবস্থা ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানিও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মহাকাশ গবেষণা ও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতাতেও তিন দেশই প্রধান শক্তি। তারা যদি ইউরোপ ও বিশ্বের অন্য দেশগুলোর স্বার্থ উপেক্ষা করে সমঝোতায় পৌঁছায়, তাহলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভারসাম্য মৌলিকভাবে বদলে যেতে পারে। একসময় বহুমেরু বিশ্বের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তিন প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এখন সেই সমীকরণে ইউরোপের জায়গা নিতে পারে রাশিয়া।
তবে প্রস্তাবিত বৈঠক স্থায়ী কোনো জোটের নিশ্চয়তা নয়। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি তার নিজের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) শিবিরেও বিভাজন তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ বৈঠকের প্রস্তাবকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম বাজে ধারণা বলে মন্তব্য করেছে। ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বা মার্কো রুবিও হলে তারা স্বৈরশাসকদের সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতা নাও চাইতে পারেন। ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এলে এই নীতি আরও বদলাতে পারে।
কিন্তু ট্রাম্পের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। বৈঠকটি হলে পুতিন আবার আন্তর্জাতিক কূটনীতির মূল মঞ্চে ফিরে আসবেন, আর সি চিন পিংয়ের বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবস্থান আরও দৃঢ় হবে। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলো বুঝতে বাধ্য হবে যে ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকলেই পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা ফিরে আসবে না।
এই তিন নেতার সম্ভাব্য বৈঠক তাই কেবল একটি কূটনৈতিক আয়োজন নয়। এটি এমন এক সময়ের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে, যখন নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং তার জায়গায় তৈরি হচ্ছে অনিশ্চিত এক নতুন বাস্তবতা। ট্রাম্প হয়তো নিজের উত্তরাধিকার হিসেবে একটি স্মরণীয় ছবি চান। কিন্তু সেই ছবির পেছনে বিশ্বকে ভাগ করে নেওয়ার যে ধারণা, তার মূল্য দিতে হতে পারে বহু দেশকে—যারা আলোচনার টেবিলেই থাকবে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









