বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরির ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকিং গোষ্ঠী ট্রেডারট্রেইটর। বিশ্বের অন্যতম দক্ষ ও সংগঠিত সাইবার অপরাধী গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত তারা। গত কয়েক বছরে ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো একাধিক বড় হামলার সঙ্গে তাদের নাম জড়িয়েছে।
ট্রেডারট্রেইটর উত্তর কোরিয়ার বৃহত্তর ল্যাজারাস গ্রুপের একটি অংশ বলে মনে করেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। গোষ্ঠীটির অন্য পরিচিত নাম জেড স্লিট, স্লো পিসিস এবং ইউএনসি৪৮৯৯। ধারণা করা হয়, ২০২২ সালের দিকে তারা স্বতন্ত্রভাবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। এর পেছনে রয়েছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সাইবার কার্যক্রমের দীর্ঘ ইতিহাস।
ট্রেডারট্রেইটরের বিশেষত্ব হলো, তারা শুধু কম্পিউটার ব্যবস্থায় দুর্বলতা খোঁজে না; বরং প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের আস্থা অর্জন করেও ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। সফটওয়্যার নির্মাতা, প্রযুক্তিবিদ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা তাদের প্রধান লক্ষ্য। কখনো ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, কখনো অনলাইন সাক্ষাৎকার, আবার কখনো পরিচিত পেশাগত যোগাযোগের ছদ্মবেশে তারা মানুষের কাছে পৌঁছায়। এভাবে কর্মীদের কম্পিউটার ও প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করে।
২০২৩ সালে মাইক্রোসফটের মালিকানাধীন কোডিং প্ল্যাটফর্ম গিটহাবের গবেষণায় দেখা যায়, এই গোষ্ঠী ভুয়া পরিচয়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল সফটওয়্যার নির্মাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ পাওয়া। অর্থাৎ, তাদের কাছে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি মানুষের আচরণ ও বিশ্বাসকে কাজে লাগানোর কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রেডারট্রেইটরের সবচেয়ে আলোচিত হামলাগুলোর একটি ঘটে ২০২৪ সালের মার্চে। জাপানের ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান ডিএমএম বিটকয়েন থেকে প্রায় ৩০ কোটি ৮০ লাখ ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই, প্রতিরক্ষা বিভাগের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং জাপানের পুলিশ এই ঘটনার সঙ্গে গোষ্ঠীটির সংশ্লিষ্টতার কথা জানায়।
এরপর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরির ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। এফবিআই আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার জন্য ট্রেডারট্রেইটরকে দায়ী করে। চুরি হওয়া অর্থ বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেটে সরিয়ে ফেলার ঘটনাটি ক্রিপ্টো বাজারের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করে।

এবার বাইন্যান্সের হামলার ক্ষেত্রেও টিআরএম ল্যাবস ও চেইনঅ্যানালাইসিসের মতো ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রেডারট্রেইটরের দিকে সন্দেহের আঙুল তুলেছে। তাদের মূল্যায়নে এই হামলার সঙ্গে গোষ্ঠীটির আগের কর্মকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। তবে বিন্যান্সের হামলার জন্য এখনো কোনো সরকারি তদন্ত সংস্থা চূড়ান্তভাবে কাউকে দায়ী করেনি।
কেন উত্তর কোরিয়ার জন্য এই ধরনের সাইবার হামলা এত গুরুত্বপূর্ণ? বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠেছে। চুরি হওয়া অর্থের একটি অংশ দেশটির সামরিক ও অস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন। পিয়ংইয়ং অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।
ট্রেডারট্রেইটরের উত্থান তাই কেবল ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় সাইবার কার্যক্রম এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বড় উদ্বেগ। অর্থের লেনদেন যখন ক্রমেই ডিজিটাল হয়ে উঠছে, তখন একটি সুসংগঠিত হ্যাকার গোষ্ঠীর কয়েক মিনিটের অভিযানও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বাইবিট থেকে বাইন্যান্স: ট্রেডারট্রেইটরের ক্রিপ্টো লুটের ইতিহাস
ক্রিপ্টোকারেন্সির জগতে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি ট্রেডারট্রেইটর। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সাইবার কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই হ্যাকারদের বিরুদ্ধে একাধিক বড় ডিজিটাল মুদ্রা চুরির অভিযোগ রয়েছে। তাদের হামলায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শত শত কোটি ডলারের সম্পদ হাতছাড়া হয়েছে।
ট্রেডারট্রেইটরের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ল্যাজারাস গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে মনে করেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই, সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা সিআইএসএ এবং অর্থ বিভাগ উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হামলা সম্পর্কে সতর্ক করেছিল।
২০২৩ সালে তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের বিরুদ্ধে একাধিক বড় চুরির অভিযোগ ওঠে। জুনে অ্যাটমিক ওয়ালেট থেকে প্রায় ১০ কোটি ডলার, আলফাপো থেকে ৬ কোটি ডলার এবং কয়েনসপেইড থেকে ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরির ঘটনায় এফবিআই উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের দায়ী করে।

এরপর ২০২৪ সালের মে মাসে জাপানের ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ডিএমএম বিটকয়েন থেকে প্রায় ৩০ কোটি ৮০ লাখ ডলারের সম্পদ চুরি হয়। এফবিআই ও জাপানের পুলিশ জানায়, ট্রেডারট্রেইটর এই হামলার সঙ্গে জড়িত। একই বছর দক্ষিণ কোরিয়ার আপবিট, ভারতের ওয়াজিরএক্স এবং রেইন ম্যানেজমেন্টসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরি হয়। এফবিআই আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার জন্য ট্রেডারট্রেইটরকে দায়ী করে।
২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর বাইন্যান্স থেকে প্রায় ৬৩৬ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এনেছে গোষ্ঠীটিকে। ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস এই হামলার পেছনে ট্রেডারট্রেইটরের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে উচ্চমাত্রার আস্থার কথা জানিয়েছে। তবে এখনো কোনো সরকারি তদন্ত সংস্থা এ হামলার জন্য তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করেনি।
এফবিআইয়ের মতে, এসব সাইবার হামলার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এই অর্থ দেশটির বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ট্রেডারট্রেইটরের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে, ক্রিপ্টোকারেন্সির নিরাপত্তা এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তারও বড় চ্যালেঞ্জ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









