মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে পারে—এমন উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই এ ধরনের হামলা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে একদিকে সামরিক হুমকি, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনা—দুই পথই খোলা রেখেছে তেহরান।
ইরানের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কাতারে কয়েক দিন আলোচনার পর দেশটির প্রতিনিধিদল সেখান থেকে চলে গেছে। তবে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। আলোচনার সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা এ তথ্য জানান। নতুন করে হামলা ঠেকাতেই কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। তেহরান হুমকির মাত্রা বাড়ালেও যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। ইরানের একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন কয়েকটি শর্ত পূরণ করলে দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করা হবে।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত রবিবার সাংবাদিকদের বলেন, আগের দিন শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ‘খুব ভালো’ কথা হয়েছে। আলোচনায় ইরান প্রসঙ্গও এসেছে বলে জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি।

গত সপ্তাহের নির্বাচনে নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর আগেই ইরানে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। আশঙ্কা ছিল, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে জরুরি সরকারের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। তবে নির্বাচনের পর থেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।
ট্রাম্পের সঙ্গে সর্বশেষ ফোনালাপ নিয়ে নেতানিয়াহু বা তার দপ্তরের পক্ষ থেকেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ট্রাম্প কখনো ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন, আবার কখনো দেশটিতে কঠোর হামলার হুমকি দিচ্ছেন।
লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অচলাবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে কাতার ও ইসরায়েল। কাতার আঞ্চলিক দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইসরায়েল সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
হুমকি বাড়ালেও আলোচনার পথ খোলা রাখছে ইরান
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরান প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান জানাচ্ছে। দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের ও মাত্রার হুমকির জবাব তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত নয়। পাশাপাশি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রথম দফায় তার বাবা এবং ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন। এরপর থেকে মোজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানে হামলা হলে নতুন অস্ত্র ব্যবহার করে হামলাকারীদের ওপর ‘বিধ্বংসী আঘাত’ হানা হবে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রেজায়ি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে, যা ‘খুব ভালো লক্ষণ’। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছ থেকে পাওয়া চিঠি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি তিনি। গত সপ্তাহে ইরান ওই চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছিল। রেজায়ি বলেন, চিঠির জবাব এখনো দেওয়া হয়নি।
ইরানের পারমাণবিক নীতিতে পরিবর্তন আনার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানান তিনি। তবে ইরানে আবার হামলা হলে পারমাণবিক নীতিতে পরিবর্তন আনা উচিত কি না, তা নিয়ে দেশটির কিছু নাগরিক প্রশ্ন তুলেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। অন্যদিকে ওয়াশিংটন চায়, ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। নতুন আলোচনায় এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরান পারমাণবিক ইস্যুটি পরবর্তী সময়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে।
সোমবার প্রতিবেশী তুর্কমেনিস্তানে এক দিনের সফরে থাকা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের প্রশ্নগুলোর কী জবাব দেওয়া হয়, তার ওপর আলোচনার চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করছে।
পাল্টাপাল্টি অবস্থানে উদ্বিগ্ন উপসাগরীয় দেশগুলো
গত অক্টোবর মাসে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছে। মার্চে যুদ্ধ শুরুর পর কোনো এক মাসে এটিই ছিল জাহাজে হামলার সবচেয়ে ব্যস্ত সময়।
বাহরাইনে অনুষ্ঠিত বার্ষিক নিরাপত্তাবিষয়ক সম্মেলন ‘মানামা সংলাপ’-এ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আঞ্চলিক নেতারা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, তাঁরা এ অঞ্চলে আরেক দফা সংঘাত দেখতে চান না।
তিনি স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। এ ব্যবধান দূর করা না গেলে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কা থেকেই যায়।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইআইএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ইরানের হামলার সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির বিমানবন্দর, সামরিক স্থাপনা ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে তিন হাজারের বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। তবে এর বেশির ভাগই প্রতিহত করা হয়েছে।
বাহরাইনের সম্মেলনে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি সতর্ক করে বলেন, সংঘাতের দ্বিতীয় দফা আরও বিপজ্জনক ও ধ্বংসাত্মক হবে। এতে কোনো সমাধান আসবে না।
এদিকে নভেম্বরের প্রথম থেকে মাঝামাঝি সময়ে ইরান, ওমান ও সৌদি আরব সফরে বিশেষ দূত পাঠাবে চীন। সোমবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং এ তথ্য জানান।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবরণ অনুযায়ী, ওমানের সুলতানের সঙ্গে বৈঠকে দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল যেন বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে। বৈঠকে দুই দেশই আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









