‘যিশুর দেখা পেতে’ অনুসারীদের অনাহারে রেখে ১৯১ জনের মৃত্যুর ঘটনায় কেনিয়ার প্রলয়বাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রধান পল এনথেঙ্গ ম্যাকেনজিকে ২০০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ভয়াবহ এই ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের একজন ছাড়া বাকি সবাই ছিল শিশু।
বিবিসি লিখেছে, ম্যাকেনজির নির্দেশে শিশুদের না খাইয়ে রাখা ও গণকবরে লাশ গুম করার অপরাধে তার ২৮ সহযোগীকেও বিভিন্ন মেয়াদে সর্বোচ্চ ১৬০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিচারক ডায়ানা মোচাচে শুক্রবার এ ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অনুসারীদের অনাহারে মৃত্যুর নির্দেশ দেওয়ার পেছনে অপরাধমূলক মূল দায় বর্তায় ম্যাকেনজির ওপর। বিশ্ব ইতিহাসে এটি অন্যতম প্রাণঘাতী ধর্মীয় উগ্রতার ঘটনা।
বিচারক বলেন, এমন নৃশংসতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বার্তা দিতেই এ সাজা ‘যথোপযুক্ত ও ন্যায়সংগত’ হয়েছে।”
সাজার হিসাব ও মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গ-
আদালত ম্যাকেনজিকে হত্যাকাণ্ডের অপরাধে ১০০ বছর এবং অনাহারে রাখার দায়ে আরও ১০০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। তবে সাজা একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় তাকে সর্বোচ্চ ১০০ বছর কারাভোগ করতে হবে।
মামলার প্রসিকিউশন দল আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিল। তবে বিচারক কেবল কারাদণ্ডের সাজাই দিয়েছেন।
বিচারক বলেন, মৃত্যুদণ্ড দিলে আসামির সংশোধন বা অপরাধের পথ থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগ থাকে না।
বিবিসি লিখেছে, কেনিয়ায় ১৯৮৭ সালের পর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।
দণ্ডিত অপর ২৮ সহযোগীর মধ্যে ছিল ম্যাকেনজির অনুসারী একদল প্রহরী, যারা উপবাসের নির্দেশ কার্যকর করার জন্য পাহারা দিত। আরেক দল ছিল কবরখননকারী, যারা বনের ভেতরে লাশগুলো মাটিচাপা দিত।
নৃশংসতা ও বিকৃত বিশ্বাস-
বিচারক মোচাচে এ হত্যাকাণ্ডকে ‘পরিকল্পিত ও শীতল রক্তের অপরাধ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, আসামিদের মধ্যে কোনো ধরনের অনুশোচনা দেখা যায়নি, এমনকি তারা নিজেরাও অনাহারে মরতে প্রস্তুত বলে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিল।
গত ১৯ অক্টোবর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ম্যাকেনজি ও তার সহযোগীরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আসছিল। তাদের ভাষ্য ছিল, কাউকে মরতে বাধ্য করা হয়নি। শুনানির শেষ মুহূর্তে তারা আদালতের কাছে অনুকম্পা প্রার্থনা করে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অনুসারীরা ম্যাকেনজিকে ‘যিশুর কণ্ঠস্বর’ মনে করত। তার নির্দেশ বা মতবাদের বিরোধিতা করলেই তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হতো।
মামলার এক আসাসি জানান, যারা উপবাসের নির্দেশ অমান্য করত, তাদের ‘লাথি ও ঘুষি মেরে স্বর্গে পাঠানোর’ নির্দেশ দিতেন ম্যাকেনজি।
বনের ভেতরে মৃতদের মাটিচাপা দেওয়াকে তারা ‘বিয়ে’ বলে উদযাপন করত। সেখানে প্রচার করা হতো, যারা মারা যাচ্ছে, তারা মূলত ‘যিশুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে’।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে দীর্ঘ অনাহারে। এছাড়া কিছু মরদেহে শ্বাসরোধ, গলা টিপে ধরা এবং মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন মিলেছে। কিছু দেহ পুরোপুরি পচে যাওয়ায় মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আবার উদ্ধার করার পরপরই কয়েকজন মারা যায়, কারণ অনাহারে তারা চরম কঙ্কালসার ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
২০২৩ সালে কেনিয়ার উপকূলীয় শাকাহোলা বনের গণকবর থেকে চার শতাধিক মরদেহ উদ্ধারের পর ম্যাকেনজিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বন থেকে চারশর বেশি মরদেহ উদ্ধার হলেও এ মামলায় ১৯১ জনের মৃত্যুর দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো।
এই নির্মম ট্র্যাজেডিতে দুই নাতিসহ পরিবারের আট সদস্যকে হারিয়েছেন ফ্রান্সিস ওয়ানজে।
শুনানি শুরুর আগে তিনি বিবিসি বলেছিলেন, “আমি এমন একটি শাস্তির অপেক্ষায় আছি, যা তার (ম্যাকেনজি) কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়।”
২০২৩ সালের মার্চে ওয়ানজে প্রথম পুলিশকে বিষয়টি জানালেও পুলিশ দ্রুত উদ্ধারে নামেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরবর্তীতে পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত তার এক আত্মীয় ও সাবেক এক অনুসারীর সহায়তায় ওয়ানজের এক নাতিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ওই শিশুই পরে পুলিশকে গণকবর দেখিয়ে দেয়।
ওয়ানজে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “ওটাই হয়তো ওর জীবনের শেষ দিন হতো... ওরা আমার নাতিকেও মেরেই ফেলত।”
কেনিয়ার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (কেএনএইচসিআর) তদন্তে দেখা গেছে, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে ম্যাকেনজির কর্মকাণ্ড জেনেও চোখ বন্ধ করে রেখেছিল।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুতো একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন, যদিও পরে আদালত সেটিকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে। এর আগেও ম্যাকেনজিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, কিন্তু প্রমাণের অভাবে তখন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ম্যাকেনজি ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল মিনিস্ট্রিজ’। পরবর্তী ১৬ বছরে কেনিয়াজুড়ে চার্চটির হাজার হাজার অনুসারী তৈরি হয়। নিজস্ব টিভি স্টেশন ‘টাইমস টিভি’তে তার বয়ান সম্প্রচার করা হতো।
প্রলয়বাদী বয়ানে তিনি আধুনিক শিক্ষাকে ‘শয়তানের ফাঁদ’, চিকিৎসাসেবা গ্রহণকে ‘ধর্মের পরিপন্থি’ এবং ডিজিটাল পরিচয়পত্রকে ‘শয়তানের প্রতীক’ বলে প্রচার করতেন। ২০১৯ সালে চার্চ বন্ধ করে অনুসারীদের নিয়ে তিনি শাকাহোলা বনে আস্তানা গাড়েন।
হত্যার দায়ে ২০০ বছরের সাজা পেলেও ম্যাকেনজির বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত নরহত্যা এবং সন্ত্রাসবাদের পৃথক অভিযোগে বিচার এখনও চলমান রয়েছে। তবে সব অভিযোগেই তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









