রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনাগুলোর তদন্ত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত শেষ করে বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশের চিফ প্রসিকিউটর (অ্যাটর্নি জেনারেল) মো. আমিনুল ইসলাম।
রোববার (২ আগস্ট) যাত্রাবাড়ীর নবী টাওয়ারের কনফারেন্স রুমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের নিয়ে আয়োজিত গণশুনানিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি প্রসিকিউটর শহীদুল ইসলাম বাবু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সিনিয়র আহ্বায়ক নবী উল্লাহ নবী, যাত্রাবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রাজু এবং বিএনপি নেতা ফেরদৌস হোসেন রনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, যাত্রাবাড়ীর ঘটনাগুলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মামলা। এসব মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
তিনি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, থানায় সংরক্ষিত তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতে হবে, যাতে সব মামলার তদন্ত সমন্বিতভাবে একই সংস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়।
শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনাল আন্তরিকভাবে কাজ করছে। যাদের কাছে ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র, তথ্য বা অন্য কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে, সেগুলো তদন্ত সংস্থার কাছে জমা দিলে বিচার প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে একাধিক মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ভিডিও ফুটেজ বিচার প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য সহায়তা করেছে। তাই জুলাই হত্যাকাণ্ড-সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য বা ভিডিও ফুটেজ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে দেওয়ার জন্য তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছেও তদন্তে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যার কাছে যে তথ্য বা প্রমাণ রয়েছে, তা ট্রাইব্যুনালের কাছে পৌঁছে দেওয়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
গণশুনানিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্বজন ও আহত ব্যক্তিরা তাদের অভিজ্ঞতা, ক্ষয়ক্ষতি, বিচার প্রত্যাশা এবং রাষ্ট্রের কাছে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। উপস্থিত কর্মকর্তারা তাদের বক্তব্য শোনেন এবং বিচার প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ গণশুনানিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। আয়োজকদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বক্তব্য সরাসরি শুনে বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহই ছিল এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
আবেগঘন সাক্ষ্যে ভারী হয়ে ওঠে গণশুনানি
গণশুনানিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে একে একে শহীদ পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা প্রতিশোধ নয়, আইনের মাধ্যমে দ্রুত বিচার, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
শহীদ পারভেজের মা কানিজ ফাতেমা বলেন, “সন্তান হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি শুধু আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।”
শহীদ শাহাদাত হোসেন শাওনের বাবা মো. বাসির আলম বলেন, “বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ বহন করার মতো কষ্ট আর নেই। যারা আমাদের সন্তানদের হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
শহীদ সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম বলেন, “আমার বুক খালি হয়ে গেছে। আমি শুধু আমার সন্তানের হত্যার বিচার চাই।”
শহীদ জনির বাবা মো. মনির হোসেন বলেন, ছয় বোনের পর জনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র ছেলে। তাকে হারিয়ে পুরো পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে।
শহীদ শাকিবের মা হেলেনা বলেন, “আমার সন্তানের মতো সব শহীদের হত্যার বিচার হোক।”
শহীদ আব্দুর রহমান জিসানের বাবা মো. বাবুল সরকার জানান, ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তার ছেলে নিহত হন। বর্তমানে পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, “আমার সন্তানসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত সব শহীদের হত্যার পূর্ণ বিচার চাই।”
গণশুনানিতে অংশ নেওয়া অধিকাংশ স্বজনই বলেন, তারা প্রতিহিংসা নয়, আইনের শাসনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা দেখতে চান। দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনারও দাবি জানান তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









