জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এখন যেকোনো দিন রায় ঘোষণা করতে পারেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়।
এদিন শুরুতে আইনি বিষয়ে যুক্তি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে মানুষ হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মামলায় দাখিল করা অডিও-ভিডিওতেও এর প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রসিকিউশনের দাবি, আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এর ফলেই ৫ আগস্ট পর্যন্ত নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়।
আসামিপক্ষের দাবি, কাদের-নাছিম-আরাফাত দায়ী নন
প্রসিকিউশনের বক্তব্যের জবাব দেন ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম।
তিনি বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় শুট অ্যাট সাইটের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তার তিন মক্কেল কোনো কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন না। কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ক্ষেত্রে তাদের দায়ী করার সুযোগ নেই। তারা কাউকে হত্যা করেননি কিংবা হত্যার নির্দেশও দেননি বলে দাবি করেন তিনি।
এরপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন আইনজীবী ইশরাত জাহান। তার চার মক্কেল হলেন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান এবং যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল।
ইশরাত জাহানের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তার চার মক্কেলের নাম নেই। অন্যরা সেখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অধীনস্থ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ট্রাইব্যুনাল জানতে চান, কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না। জবাবে আইনজীবী বলেন, জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা চলায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
আন্দোলনে নারীদের আহত হওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, এ মামলায় কোনো নারী সাক্ষী নেই এবং সাক্ষ্যপ্রমাণেও এমন ঘটনার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চার আসামির খালাস দাবি
নিজের চার মক্কেলের খালাস চেয়ে ইশরাত জাহান বলেন, শুধুমাত্র রাজনীতি করার কারণে আন্দোলন ঘিরে তারা কিছু বক্তব্য দিয়েছেন এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রসিকিউশনের দাখিল করা ভিডিওতেও তাদের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, চার আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন কোনো ধরনের সরাসরি প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। তাই তাদের খালাস দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।
পরে আসামিপক্ষের যুক্তির জবাবে পাল্টা বক্তব্য দেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্দোলন দমনের সময় একজন মানুষ নিহত হলেও সংশ্লিষ্ট আসামিরা অপরাধের দায় থেকে মুক্ত হতে পারেন না।
‘তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হয়নি’
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম। তিনি বলেন, এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে ২৮ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৬ জন ছিলেন ফরমাল বা বিশেষজ্ঞ সাক্ষী এবং ১২ জন ভুক্তভোগীদের স্বজন।
তার দাবি, সাক্ষীদের কেউই ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম বা মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে জড়িত করে সাক্ষ্য দেননি। এ তিনজনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পারেনি বলে মনে করেন তিনি।
কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ক্ষেত্রেও তাদের দায়ী করা যাবে না বলে দাবি করেন এই আইনজীবী। তার বক্তব্য, সব ধরনের নির্দেশ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকেই এসেছে। তবে তাকে এ মামলায় আসামি করা হয়নি।
সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছে প্রসিকিউশন
এর আগে গত ১২ আগস্ট সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে যুক্তিতর্ক শেষ করে প্রসিকিউশন। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগই প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে বহু মানুষ হত্যা ও আহত করার ঘটনায় তাদের দায় রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অনুকম্পা না দেখিয়ে সাত আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন করা হয়েছে।
গত ৪ আগস্ট মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রথম দিন মামলার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। এরপর টানা পাঁচ কার্যদিবসে সাত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও আইনি যুক্তি তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষ।
কারা আসামি
ওবায়দুল কাদের ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।
গত ২ আগস্ট মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষ্য দেন।
এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন একই আদালত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









