রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ অভিযোগ করেন।
সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি এজলাস ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন সাংবাদিকরা। তাদের প্রশ্ন ছিল, ওই ঘটনায় আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে ব্যারিস্টার খোকনের অবস্থান সঠিক ছিল কি না।
জবাবে খোকন অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘‘অ্যাটর্নি জেনারেল! হু ইজ হি হেয়ার? আমি সুপ্রিম কোর্ট বারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে... আপনারা জানেন, এই সুপ্রিম কোর্টে আমাকে আইনজীবীরা ১১ বার নির্বাচিত করেছে। বার কাউন্সিলে সারা বাংলাদেশের ল’ইয়াররা তিনবার… আমি আইনজীবীদের কথা বলব, বিচারপতিদের কথা বলব প্রধান বিচারপতির নিকট।’’
অ্যাটর্নি জেনারেলের এ বিষয়ে কোনো ভূমিকা আছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
খোকন আরও বলেন, ‘‘হি ইজ ইররেলিভেন্ট! তার বক্তব্যই ইররেলিভেন্ট! হি ইজ নোবডি ইন আওয়ার ডিসকাশন, ইন আওয়ার ডিমান্ড, অন আওয়ার ডিমান্ড! তার বক্তব্যটা অনভিপ্রেত।’’
অ্যাটর্নি জেনারেল একসময় সুপ্রিম কোর্ট বারের সেক্রেটারি ছিলেন উল্লেখ করে ব্যারিস্টার খোকন বলেন, ‘‘উনি সুপ্রিম কোর্ট বারের সেক্রেটারি ছিলেন না? উনি কে? উনি কীভাবে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন? আই অ্যাম সারপ্রাইজড, শকড অ্যান্ড সারপ্রাইজড!’’
গত ৮ সেপ্টেম্বর তথ্য গোপন ও প্রতারণার অভিযোগে এক নারী আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করার বিষয়কে কেন্দ্র করে আপিল বিভাগের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এজলাস ছেড়ে চলে যান।
ঘটনার পর সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন ব্যারিস্টার খোকন, অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
ব্যারিস্টার খোকন জানান, অন্য একটি মামলার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে ওই নারী আইনজীবীর ওপর আরোপিত পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা মওকুফের অনুরোধ করেছিলেন।
তার ভাষ্য, ওই আইনজীবী একজন জুনিয়র আইনজীবী। তার ওপর পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করা অনেক বেশি হয়েছে, তাই জরিমানাটি মাফ করে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
খোকন বলেন, তিনি ‘ন্যায়বিচারের স্বার্থেই’ বিষয়টি প্রধান বিচারপতির সামনে তুলে ধরেছিলেন। মামলায় আইনজীবীর জয়-পরাজয় হতে পারে, কিন্তু একজন জুনিয়র আইনজীবীর ওপর পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অনেক বেশি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যারিস্টার খোকনের দাবি, ওই কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি আপিল বিভাগে মামলার সংখ্যা কমে যাওয়া এবং এর প্রভাবে আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘‘আমি প্রধান বিচারপতিকে বললাম, যে আপনি মাননীয় প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আসলে মামলা-টামলা খুব একটা হচ্ছে না আপিল বিভাগে। আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’’
তার দাবি, আপিল বিভাগে বেঞ্চের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে মামলার শুনানি কম হচ্ছে—এ বিষয়টিই তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন।
খোকন জানান, আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন এবং তিনটি বেঞ্চে নিয়মিত মামলা শুনানি হতো। বর্তমানে একটি বেঞ্চে মামলা শুনানি হওয়ায় হাজার হাজার মামলা পড়ে আছে। চেম্বার আদালত থেকে কোনো মামলায় স্থগিতাদেশ দেওয়া হলে পরে সেটি শুনানির জন্য আনাও কঠিন হয়ে পড়ছে বলে দাবি করেন তিনি।
নিজের একটি মামলার উদাহরণ দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি বলেন, ওই মামলায় সর্বোচ্চ তিন মাসের সাজা হতে পারে। কিন্তু মামলাটি এক বছর ধরে আপিল বিভাগে স্থগিত রয়েছে। চারবার চেম্বার জজের কাছে শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হলেও মামলাটি শুনানি করাতে পারেননি বলে জানান তিনি।
প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তার কোনো তর্ক হয়নি দাবি করে ব্যারিস্টার খোকন বলেন, আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের স্বার্থের কথা বলা তার দায়িত্ব।
তিনি বলেন, ‘‘আমি তো চিন্তা করি নাই যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি এত রিঅ্যাক্ট করবেন। উনার তো রাগ-অভিমানের ঊর্ধ্বে থাকার কথা। আর লইয়ারদের প্রতিনিধি হিসেবে অবশ্যই আমার অবলিগেশন আছে উনার কাছে লইয়ারদের পক্ষে আবেদন করার।’’
এদিকে পুরো ঘটনা নিয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি জানান, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা মওকুফের অনুরোধের পর প্রধান বিচারপতি তাকে বলেন, আদালতের সঙ্গে ‘প্রতারণা এবং গুরুতর জালিয়াতির’ বিষয়টি বিবেচনা করেই ওই আদেশ দেওয়া হয়েছে। তাই আদালত আদেশটি পরিবর্তন করবে না।
অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলে প্রধান বিচারপতি ব্যারিস্টার খোকনের কাছে জানতে চান, তিনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন যে প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আইনজীবীদের আয় কমে গেছে?
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ব্যারিস্টার খোকন একই বক্তব্য আবার বলার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি তাকে জানান, তার ওই বক্তব্য ‘অ্যাবসোলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল’।
এরপর প্রধান বিচারপতি জানান, তিনি আর দিনের আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না। এ কথা বলেই তিনি এজলাস থেকে উঠে যান বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
রুহুল কুদ্দুস কাজল আরও বলেন, প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবীদের অভিভাবক। আদালতে আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বা মতপার্থক্য হতে পারে, তবে সাধারণত তা আদালতের কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
ব্যারিস্টার খোকন একজন সংসদ সদস্য হওয়ায় তার কাছ থেকে এমন বক্তব্য ‘অপ্রত্যাশিত’ ছিল বলেও মন্তব্য করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









