ডিজিটাল দুনিয়া আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জোয়ারে বদলে গেছে মানুষের প্রতিদিনের চেনা জীবনযাত্রা। আর এর প্রভাব পড়েছে প্রেম, ভালোবাসা ও সম্পর্কের মনস্তত্ত্বে।
গবেষকেরা বলছেন, আধুনিক যুগে এসে মানুষের ডেইটিং করার ধরন কেবল ‘একজনকে ভালোলাগার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে যুক্ত হয়েছে ক্যারিয়ারের ব্যস্ততা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং তীব্র মানসিক টানাপোড়েন।
সিচুয়েশনশিপ
আধুনিক প্রেমের দুনিয়ায় আলোচিত নাম ‘সিচুয়েশনশিপ’। এটি এমন এক সম্পর্ক যেখানে দুজন মানুষ নিয়মিত ডেইট করেন, সম্পর্কের সব রকম মানসিক ও শারীরিক সুবিধা উপভোগ করেন, তবে কোনো প্রকার 'অফিশিয়াল লেবেল' বা ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি নন।
বিবিসি ওয়ার্কলাইফ-এ প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধ ‘সিচুয়েশনশিপ : হোয়াই জেন জি আর এমব্র্যাসিং দ্য গ্রে এরিয়া’-তে সমাজবিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেন যে, ‘তরুণ প্রজন্ম এখন প্রেমকে একটি চরম ‘প্রাগম্যাটিক’ বা বাস্তবসম্মত কোণ থেকে দেখছে। তারা ক্যারিয়ার ও পড়াশোনার তীব্র চাপের মুখে কোনো সম্পর্কের জন্য নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে চায় না, আবার একাকিত্বেও ভুগতে চায় না।’ এই দুই চাহিদার মেলবন্ধন হল ‘সিচুয়েশনশিপ।’
স্লো ডেইটিং বা স্লো-বার্ন রোমান্স
ডেইট বা মিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার দিন শেষ। ২০২৬ সালের ডেইটিং দুনিয়ায় যে ধারাটি আত্মপ্রকাশ করেছে, তা হল ‘স্লো ডেইটিং’।
টাইমস অব ইন্ডিয়া ডটকম’য়ে এই সম্পর্কের ধারা নিয়ে করা ‘দ্য বিগেস্ট ডেইটিং ট্রেন্ড অফ ২০২৬’ ম্যাচুয়র সিঙ্গেলস আর সেইং নো টু সিচুয়েশনশিপস’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘সিচুয়েশনশিপের তীব্র অনিশ্চয়তায় ক্লান্ত হয়ে এখনকার তরুণ ও পরিণত ‘সিঙ্গল’রা ‘স্লো-বার্ন’ রোমান্সের দিকে ঝুঁকছেন।’
এই ধারা অনুযায়ী, প্রেমের নাম দেওয়ার আগে সঙ্গীরা দীর্ঘদিন ধরে স্রেফ খোলামেলা কথা বলেন, একে অপরের জীবনবোধ এবং মানসিক চাহিদার মিলগুলো ধীরে ধীরে যাচাই করেন এবং ধৈর্য ধরে বিশ্বাসের ভিত গড়েন।
তাড়াহুড়ো করে ভুল সম্পর্কে জড়ানোর চেয়ে স্পষ্টতা এবং সময় নেওয়াকেই তারা বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।

ডিজিটাল দূরত্বের অভিশাপ
একই সোফায় পাশাপাশি বসে আছেন দুই সঙ্গী, তবে দুজনের চোখই নিবদ্ধ নিজেদের স্মার্টফোনের পর্দায়; এই যন্ত্রণাদায়ক অভ্যাসটির নাম ‘ফাবিং’, যা কিনা ইংরেজি ‘ফোন’ ও ‘স্নাবিং’ বা উপেক্ষা শব্দের মিলিত রূপ।
আর এর হাত ধরেই জন্ম নিচ্ছে ‘ডিলেশনশিপ’ বা ‘ডিলেইড রিলেশনশিপ’। যেটাকে বলা হচ্ছে ডিজিটাল নির্ভরতা ভিত্তিক সম্পর্ক।
ফোর্বস হেলথ’য়ে প্রকাশিত ‘ডিল-ব্রেকার ডেইটিং স্ট্যাটিস্টিকস’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৈরি করা ‘পারফেক্ট পার্টনার’-এর অবাস্তব তুলনা আধুনিক তরুণ-তরুণীদের সম্পর্কের গভীরতা কমিয়ে দিচ্ছে।
একই টেবিলে বসেও স্ক্রল করার এই ‘ফাবিং’ বা ডিজিটাল আসক্তি বর্তমান সময়ে সম্পর্কের বিচ্ছেদের একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওপেন বা পলিঅ্যামোরাস সম্পর্ক
প্রথাগত একগামী বা মনোগ্যামাস সম্পর্কের বাইরে গিয়ে একাধিক মানুষের সঙ্গে প্রেম বা সম্পর্কে জড়ানোর প্রবণতাও বর্তমান সময়ে বেশ আলোচিত।
আন্তর্জাতিক ডেইটিং অ্যাপ টিন্ডার এবং হিঞ্জ-এর ২০২৫-২০২৬ বার্ষিক ট্রেন্ড প্রতিবেদনে (যেমন- হিঞ্জ’স জেন জি ডি.এ.টি.ই রিপোর্ট)-এ উঠে এসেছে যে, তরুণ প্রজন্মের প্রায় ৫৫ শতাংশের বেশি মানুষ নিজেদের যৌন ও রোমান্টিক পছন্দের ক্ষেত্রে ‘ফ্লুইড’ বা মুক্তমনা হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন।
তারা সঙ্গীকে ভালোবেসেও একে অপরের ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমানাকে সম্মান জানাতে কোনো এক তরফা সামাজিক নিয়মে বাঁধতে চান না।
পরিসংখ্যান যা বলে
গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যে প্রায় ৫৬ শতাংশই বর্তমানে পুরোপুরি ‘সিঙ্গল’ বা একক জীবনযাপন করছেন। যা আধুনিক ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড!
এর বড় কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিয়ের খরচ এবং সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব নেওয়ার অনীহাকেই দায়ী করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই গবেষণা সংস্থা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









