সমুদ্রের নিচে এমন এক প্রাণী আছে, যার শরীর প্রায় স্বচ্ছ, চলাফেরা ধীর আর সৌন্দর্য যেন কোনো রূপকথার দৃশ্য। তার নাম জেলিফিশ। দেখতে নরম ও শান্ত হলেও এই প্রাণীটি প্রকৃতির এক বিস্ময়। সেই বিস্ময়কে মানুষের আরও কাছে নিয়ে আসতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় খুলেছে জেলিফিশকে ঘিরে একটি বিশেষ জাদুঘর।
ইউক্রেনের দম্পতি আলেক্স ও ইয়ানা ইয়ানোভস্কি এই জাদুঘর তৈরি করেছেন। তাদের দাবি, এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম জাদুঘর, যেখানে শুধু জেলিফিশ নিয়েই আয়োজন করা হয়েছে। ফ্লোরিডার পম্পানো বিচে অবস্থিত জাদুঘরটিতে ২১টি ট্যাংকে রাখা হয়েছে ২০টির বেশি প্রজাতির জেলিফিশ।
প্রবেশমূল্য প্রায় ২০ থেকে ২৪ ডলার।
জেলিফিশ দেখেই নতুন স্বপ্ন
ইউক্রেনে আলেক্স ও ইয়ানা ২০ বছরেরও বেশি সময় অ্যাকুয়ারিয়াম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের অ্যাকুয়ারিয়ামে যখনই জেলিফিশের কোনো ট্যাংক রাখা হতো, দেখা যেত অন্য সব জলজ প্রাণী ছেড়ে দর্শকেরা ভিড় করছেন জেলিফিশের সামনে।
এই দৃশ্যই তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছিল।
মানুষ জেলিফিশকে এত পছন্দ করে, অথচ তাদের নিয়ে আলাদা কোনো জায়গা নেই—এমন চিন্তা থেকেই তাঁরা কিয়েভে একটি জেলিফিশ জাদুঘর তৈরির উদ্যোগ নেন।
কিন্তু তাঁদের সেই স্বপ্ন বেশিদিন এগোয়নি।

যুদ্ধ বদলে দিল সবকিছু
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর আলেক্স ও ইয়ানাকে কিয়েভ ছাড়তে হয়। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় গিয়ে নতুন জীবন শুরু করেন।
সেখানে এসে তাঁরা আবার পুরোনো স্বপ্নের কথা ভাবতে শুরু করেন।
ফ্লোরিডার সমুদ্র দেখে ইয়ানার মনে হলো, জেলিফিশের জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কী হতে পারে!
“যখন আমরা সমুদ্র দেখলাম, তখন মনে হলো—জেলিফিশের জাদুঘরের জন্য এটাই ঠিক জায়গা,” বলেন ৪৭ বছর বয়সী ইয়ানা।
এই ভাবনা থেকেই চলতি বছরের বসন্তে খুলে যায় তাদের নতুন জাদুঘর। ৫২ বছর বয়সী আলেক্স ও ইয়ানা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে জেলিফিশকে উৎসর্গ করা এমন জাদুঘর এর আগে ছিল না।
কাচের ট্যাংকে জলের রূপকথা
জাদুঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ে একের পর এক কাচের ট্যাংক। তার ভেতরে নীলচে পানির মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে নানা ধরনের জেলিফিশ।
কখনো তারা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে, কখনো আবার নিচে নামছে। তাদের স্বচ্ছ শরীরের ভেতর দিয়ে আলো চলে যাচ্ছে। মনে হয়, যেন পানির মধ্যে ছোট ছোট আলো ভাসছে।
ইয়ানা বলেন, “জেলিফিশ অবিশ্বাস্য প্রাণী। তারা সত্যিই অন্যরকম। অন্য কোনো প্রাণীর সঙ্গে তাদের তুলনা করা যায় না।”
জেলিফিশের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যই তাঁদের মুগ্ধ করে।

কিছু প্রজাতির জেলিফিশের চোখের সংখ্যা ২৪টি পর্যন্ত হতে পারে। আবার এমন একটি প্রজাতি আছে, যাকে বলা হয় ‘অমর জেলিফিশ’। বিপদের মুখে এই প্রাণী তার জীবনচক্র আবার নতুন করে শুরু করতে পারে। অর্থাৎ বয়স বাড়ার বদলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেন উল্টো দিকে ফিরে যেতে পারে।
এই বিশেষ প্রজাতিটিকেও নিজেদের সংগ্রহে যুক্ত করতে চান ইয়ানোভস্কি দম্পতি।
দর্শকের আগ্রহ প্রত্যাশার চেয়েও বেশি
জাদুঘর খোলার পর থেকেই দর্শকদের আগ্রহ দেখে খুশি আলেক্স ও ইয়ানা।
তাঁরা ভেবেছিলেন, মানুষ হয়তো কিছুটা কৌতূহল নিয়ে জেলিফিশ দেখতে আসবে। কিন্তু বাস্তবে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া তাঁদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ইয়ানা বলেন, “তারা যা দেখছে, তাতে ভীষণ মুগ্ধ হচ্ছে।”
জেলিফিশ সাধারণত মানুষের কাছে পরিচিত সমুদ্রের প্রাণী হলেও তাদের জীবন, শরীর ও আচরণ সম্পর্কে অনেক কিছুই অজানা। সেই অজানাকে সহজভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরাই এই জাদুঘরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
একদিকে এটি যেমন দর্শনার্থীদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জানারও একটি সুযোগ।
যুদ্ধের ভেতর থেকে সমুদ্রের কাছে
ইয়ানোভস্কি দম্পতির এই জাদুঘরের গল্প শুধু জেলিফিশের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধ, দেশ ছাড়ার কষ্ট এবং নতুন দেশে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস।
কিয়েভে যে স্বপ্ন শুরু হয়েছিল, যুদ্ধের কারণে তা থেমে গিয়েছিল। কিন্তু স্বপ্নটি হারিয়ে যায়নি। হাজার মাইল দূরে ফ্লোরিডার সমুদ্রতীরে এসে আবার তা নতুন জীবন পেয়েছে।
আজ কাচের ট্যাংকের নীল পানিতে জেলিফিশগুলো যখন ধীরে ধীরে ভেসে বেড়ায়, তখন তাদের সঙ্গে যেন ভেসে থাকে দুই মানুষের পুরোনো স্বপ্নও।
যুদ্ধ তাদের দেশ কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









