গরমের দুপুরে এক বাটি ঠান্ডা দই। ভাতের সঙ্গে, রায়তায়, কিংবা পানি মিশিয়ে এক গ্লাস ছাছ—দই আমাদের খাবারের সঙ্গে বহুদিনের পরিচিত সঙ্গী। শুধু স্বাদের জন্য নয়, হজম ভালো রাখা, শরীর ঠান্ডা রাখা এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতেও দই খাওয়ার চল রয়েছে।
তবে দই নিয়ে প্রশ্নেরও শেষ নেই। সকালে খাওয়া ভালো, নাকি রাতে? খালি পেটে দই খাওয়া উচিত? খাবারের সঙ্গে খেলে কি বেশি উপকার? আবার কারও কারও ক্ষেত্রে দই খেলে পেট ফাঁপে বা অস্বস্তি হয় কেন?
পুষ্টিবিদেরা বলছেন, দই সবার শরীরে একইভাবে কাজ করে না। তাই ঘড়ির কাঁটা দেখে নয়, বরং নিজের হজমশক্তি ও শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝেই দই খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো।
দইয়ের উপকার কোথায়?
দইয়ে রয়েছে প্রোবায়োটিক বা উপকারী ব্যাকটেরিয়া। এগুলো অন্ত্রের সুস্থ জীবাণুসমষ্টি বজায় রাখতে এবং হজমপ্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে। নিয়মিত সুষম খাবারের অংশ হিসেবে দই খেলে অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
দইয়ে থাকা ‘ল্যাক্টোব্যাসিলাস ও বিফিডোব্যাকটেরিয়াম’ গোত্রের ব্যাকটেরিয়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে। তবে সব দইয়ে সমান পরিমাণ জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে না। তাই বাজারের দই কেনার সময় ‘লাইভ অ্যান্ড অ্যাকটিভ কালচারস’ লেখা আছে কি না, তা দেখে নেওয়া ভালো। এ ছাড়া দই প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামেরও ভালো উৎস। বিশেষ করে চিনি ছাড়া সাধারণ দই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সহজেই যোগ করা যায়।
দই খাওয়ার সেরা সময় কখন?
দই খাওয়ার জন্য সবার ক্ষেত্রে একই সময় প্রযোজ্য নয়। তবে দিনের প্রথম ভাগে দই খাওয়া অনেকের জন্য তুলনামূলক আরামদায়ক হতে পারে। ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ কোচ ডা. প্রার্থনা শাহ বলেন, দিনের শুরুতে হজমপ্রক্রিয়া সাধারণত বেশি সক্রিয় থাকে। পাকস্থলীর অ্যাসিড, হজমের এনজাইম এবং অন্ত্রের চলাচল দিনের প্রথম ভাগে তুলনামূলক ভালো কাজ করে। তাই সকাল-বেলার মাঝামাঝি বা দুপুরের খাবারের সঙ্গে দই খেলে অনেকের শরীর হালকা লাগে।
২০২৫ সালের একটি গবেষণাতেও দিনের প্রথমার্ধে বিপাকক্রিয়া ও হজমের দক্ষতা তুলনামূলক বেশি থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে দুপুরেই খেতে হবে—এমন কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই। দই খাওয়ার সময় নির্ভর করবে আপনার ল্যাকটোজ সহ্যক্ষমতা, হজমশক্তি এবং কী ধরনের খাবারের সঙ্গে দই খাচ্ছেন তার ওপর।
খালি পেটে নাকি খাবারের সঙ্গে?
ভি৬ ক্লিনিকসের পুষ্টিবিদ ডা. নীতি মুঞ্জালের মতে, অনেকের জন্য খালি পেটের তুলনায় খাবারের সঙ্গে দই খাওয়া বেশি আরামদায়ক। তিনি বলেন, খাবারের সঙ্গে দই খেলে পাকস্থলীতে হজমরস ধীরে ধীরে নিঃসৃত হয়। খাবারের উপস্থিতি দইকে হজমতন্ত্রের মধ্য দিয়ে ধীরে যেতে সাহায্য করে। এতে দইয়ের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো অন্ত্রে পৌঁছানোর ভালো সুযোগ পেতে পারে।
অন্যদিকে, খালি পেটে পাকস্থলীর অ্যাসিডের মাত্রা বেশি থাকতে পারে। এতে কারও কারও অম্বল, গ্যাস বা পেটে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। তাই দুপুরের খাবারের সঙ্গে এক বাটি দই অনেকের জন্য ভালো বিকল্প। তবে খালি পেটে দই খেলে সবার সমস্যা হবে—এমনটিও ঠিক নয়। নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়াই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে খেলে বেশি উপকার?
দই একা খাওয়ার পাশাপাশি নানা খাবারের সঙ্গে মিশিয়েও খাওয়া যায়। এতে খাবারের স্বাদ যেমন বাড়ে, তেমনি হজমেও সহায়তা হতে পারে।
দইয়ের সঙ্গে খেতে পারেন
ভাত বা মিলেট
ডাল ও সবজি
রায়তা হিসেবে শসা, গাজর বা অন্যান্য সবজি
জিরা, আদা ও গোলমরিচ
পানি মিশিয়ে ছাছ বা ঘোল
ঘন দই খেলে যাদের পেট ভার লাগে, তাদের জন্য ছাছ ভালো বিকল্প হতে পারে। পানি মিশিয়ে পাতলা করে নিলে এটি পাকস্থলীর জন্য তুলনামূলক হালকা হয়। হালকা ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতার ক্ষেত্রেও ভালোভাবে ফারমেন্ট করা ঘরে তৈরি দই কিছু মানুষের জন্য সহজে সহ্য হতে পারে। ফারমেন্টেশনের ফলে দইয়ে থাকা ল্যাকটোজের পরিমাণ কিছুটা কমে যায়।
গ্রিক ইয়োগার্ট কি বেশি ভালো?
গ্রিক ইয়োগার্ট বা ছাঁকা দইয়ে সাধারণ দইয়ের তুলনায় প্রোটিন বেশি থাকে। ফলে এটি দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে। যারা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, বেশি প্রোটিন খেতে চান অথবা খাবারের পর দ্রুত ক্ষুধা পেয়ে যায়, তাদের জন্য চিনি ছাড়া গ্রিক ইয়োগার্ট ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে বাজারের অনেক ফ্লেভারযুক্ত ইয়োগার্টে অতিরিক্ত চিনি থাকে। তাই দই কেনার সময় প্লেইন বা আনসুইটেনড ধরনের দই বেছে নেওয়া ভালো।
নারীদের জন্য দইয়ের বিশেষ কোনো উপকার আছে?
নারীদের হজমশক্তি ও হরমোনের ভারসাম্যের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে শরীরে হরমোনের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়াতেও সহায়তা হতে পারে। আয়ুর্বেদিক পুষ্টিবিদ ও যোগশাস্ত্র গবেষক ডা. তনু সিং বলেন, যোগ ও আয়ুর্বেদে হজমশক্তি বা ‘অগ্নি’কে হরমোনের ভারসাম্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। সুস্থ অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম ইস্ট্রোজেনের বিপাক ও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে অতিরিক্ত হরমোন শরীর থেকে সঠিকভাবে বেরিয়ে যেতে সহায়তা হতে পারে। তবে মাসিকের আগের সপ্তাহে অনেক নারীর পেট ফাঁপা বা হজম ধীর হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এ সময়ে বেশি পরিমাণ দই না খেয়ে অল্প পরিমাণে দিনের প্রথম ভাগে খাওয়া আরামদায়ক হতে পারে। ডা. সিংয়ের মতে, দইয়ের সঙ্গে ভাজা জিরা বা গোলমরিচ মিশিয়ে খেলে তা তুলনামূলক সহজপাচ্য হতে পারে।
কারা নিয়মিত দই খেতে পারেন?
কিছু মানুষের জন্য দই বিশেষ উপকারী হতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের পর অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে।
হালকা কোষ্ঠকাঠিন্যের ক্ষেত্রে আঁশসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে দই উপকারী হতে পারে।
যাদের প্রোটিনের প্রয়োজন বেশি, তারা খাবারের মাঝখানে দই খেতে পারেন।
যাদের ল্যাকটোজ সহ্যক্ষমতা ভালো, তাদের জন্য এটি সহজলভ্য প্রোবায়োটিক খাবার। তবে কোনো খাবারই সবার জন্য সমান উপযোগী নয়।
কারা সতর্ক থাকবেন?
যাদের অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা তীব্র অ্যাসিডিটি রয়েছে, তাদের দই খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত। একইভাবে বেশি মাত্রায় ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা, দুধজাত খাবারে আইবিএসের উপসর্গ বেড়ে যাওয়া বা দই খেলে নিয়মিত পেট ফাঁপার সমস্যা থাকলেও সাবধান হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে রাতে দই খাওয়ার পর যদি অস্বস্তি হয়, তাহলে রাতের বদলে দিনের অন্য সময়ে খেয়ে দেখতে পারেন। সাধারণ দই সহ্য না হলে বিকল্প হিসেবে ল্যাকটোজ-মুক্ত দই, জীবন্ত কালচারযুক্ত নারকেল বা বাদামের দুধের দই কিংবা কেফির বেছে নেওয়া যায়।
রাতে দই খাওয়া কি নিষেধ?
দই রাতে খাওয়া যাবে না—এমন ধারণার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যাদের হজমশক্তি ভালো, অ্যাসিড রিফ্লাক্স নেই এবং দুধজাত খাবারে বড় ধরনের অসহিষ্ণুতা নেই, তাঁরা রাতের খাবারের সঙ্গে অল্প পরিমাণ দই খেলে সাধারণত সমস্যা নাও হতে পারে। তবে কারও শরীর যদি রাতে দই গ্রহণ করতে না চায়, তাহলে জোর করে খাওয়ারও দরকার নেই।
দই খাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের শরীরকে বোঝা। কারও জন্য সকালের নাশতার সঙ্গে দই ভালো, কারও জন্য দুপুরের খাবারের সঙ্গে। কেউ ঘন দই পছন্দ করেন, কেউ ছাছ খেয়ে বেশি স্বস্তি পান। আবার কারও ক্ষেত্রে ল্যাকটোজ-মুক্ত বিকল্পই ভালো কাজ করে। তাই দই খাওয়ার কোনো একক নিয়ম নেই। পরিমাণ, সময়, খাবারের সঙ্গে মিল এবং নিজের হজমশক্তি—সবকিছুর সমন্বয়েই তৈরি হবে আপনার জন্য উপযুক্ত অভ্যাস। যে খাবার খেয়ে শরীর হালকা লাগে, পেট ভালো থাকে এবং দীর্ঘ সময় স্বস্তি পাওয়া যায়, সেটিই আপনার জন্য সঠিক খাবার। দইয়ের ক্ষেত্রেও এই সহজ নিয়মটি মনে রাখাই সবচেয়ে ভালো।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









