শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চিন্তাভাবনা, আচরণ ও শেখার ধরনে পরিবর্তন আসে। তবে শুধু বয়স বাড়লেই একটি শিশু আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ হয়ে ওঠে না। তার মানসিক বিকাশে পারিবারিক পরিবেশ, অভিভাবকের আচরণ এবং শেখার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ছোটবেলা থেকে শিশুর মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তুলতে পারলে সে নতুন কিছু শিখতে, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে উৎসাহিত হয়। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে বলা হয় বিকাশমুখী মানসিকতা। এই ধারণা অনুযায়ী, নিয়মিত অনুশীলন, প্রচেষ্টা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।
চ্যালেঞ্জ গ্রহণে উৎসাহ দিন
কোনো কাজে ব্যর্থ হলে অনেক শিশু হতাশ হয়ে পড়ে। এ সময় বকাঝকা না করে বোঝাতে হবে, প্রথমবার সফল না হওয়া মানেই কাজটি কখনোই পারবে না, এমন নয়। শিশুর বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। ভুল হলে কীভাবে তা সংশোধন করা যায়, সেটিও বুঝিয়ে দিন।
স্থির ও বিকাশমুখী মানসিকতার পার্থক্য বোঝান
স্থির মানসিকতার শিশু মনে করতে পারে, কোনো বিষয়ে সে ভালো নয় বলে কখনোই দক্ষ হতে পারবে না। অন্যদিকে বিকাশমুখী মানসিকতার শিশু বিশ্বাস করে, চেষ্টা ও অনুশীলনের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। যেমন, গণিতের কোনো অঙ্ক না পারলে শিশুকে বলা যেতে পারে, ‘তুমি এখনো অঙ্কটি বুঝতে পারোনি। চলো, আরেকবার চেষ্টা করি।’ এ ধরনের কথা শিশুকে শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারে।
ফলাফলের পাশাপাশি প্রচেষ্টার প্রশংসা করুন
শিশু ভালো ফল করলে তাকে উৎসাহ দেওয়া জরুরি। তবে শুধু ফলাফলের প্রশংসা না করে তার চেষ্টা, ধৈর্য, মনোযোগ ও উন্নতির দিকগুলোরও প্রশংসা করতে হবে। পরীক্ষায় প্রত্যাশিত নম্বর না পেলে হতাশ না করে কোথায় আরও অনুশীলন প্রয়োজন, তা বুঝতে সাহায্য করুন। এতে শিশু নিজের ভুল শনাক্ত করতে এবং পরবর্তী সময়ে ভালো করার জন্য প্রস্তুতি নিতে শিখবে।
ব্যর্থতাকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখান
ভুলের জন্য শিশুকে অপমান করা বা অন্যের সঙ্গে তুলনা করার পরিবর্তে কোথায় সমস্যা হয়েছে, তা বুঝতে সাহায্য করুন। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে আলোচনা করুন, কেন এমন হয়েছে, কী শেখা গেল এবং পরেরবার কীভাবে চেষ্টা করা যায়। প্রয়োজনে কঠিন কাজকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে দিন। এতে শেখার প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়তে পারে।
নতুন কিছু শেখার সুযোগ তৈরি করুন
ছবি আঁকা, গল্পের বই পড়া, খেলাধুলা, ধাঁধা সমাধান কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা শেখার সুযোগ শিশুর সামনে তৈরি করা যেতে পারে। কোনো কাজ কঠিন মনে হলেও তাকে ধীরে ধীরে চেষ্টা করতে উৎসাহিত করুন। তবে শিশুর ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়। তার বয়স, আগ্রহ ও সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে শেখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ভুল করা যে শেখার স্বাভাবিক অংশ, তা বুঝতে পারলে নতুন কাজের প্রতি শিশুর ভয় কমতে পারে।
নিজের আচরণ দিয়ে উদাহরণ তৈরি করুন
শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে নয়, বড়দের আচরণ দেখেও শেখে। তাই অভিভাবকদের নিজেদের ভুল স্বীকার করা, নতুন কিছু শেখা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। কোনো কাজে সমস্যা হলে সেটি কীভাবে সমাধান করা যায়, তা শিশুর সামনে আলোচনা করুন। এতে সে বুঝতে পারবে, শেখার সুযোগ সব সময় থাকে এবং চেষ্টা চালিয়ে গেলে নিজের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।
পরিবর্তনের জন্য সময় দিন
শিশুর মানসিকতা এক দিনে বদলে যায় না। নিয়মিত উৎসাহ, ধৈর্য, বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা এবং নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার মধ্যে বিকাশমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা সম্ভব। শিশুকে সব সময় সফল হওয়ার চাপ না দিয়ে চেষ্টা করার সুযোগ দিন। তাকে বোঝান, কোনো কিছু এখনো না পারার অর্থ এই নয় যে, সে কখনোই তা শিখতে পারবে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









