ধুলজুরী গ্রামে বয়ে যাওয়া বাতাসটা হঠাৎ করেই থমকে গেল। যে বাতাসে প্রতিদিন মিশে থাকত হাজারো পাখির কলকাকলি, তা যেন এক নিমিষেই জমাট বেঁধে গেল অদ্ভুত, ভারী স্তব্ধতায়। বাগানের সুবাসিত ফুলগুলো দুলছে ঠিকই, কিন্তু তাদের বুকে ওড়ার মতো কোনো প্রজাপতি আজ বেঁচে নেই। চারদিক নিস্তব্ধ, ধূসর। কেবল গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভেসে বেড়াচ্ছে বুকফাটা কান্নার রোল। ধুলজুরী গ্রামে সাগর সরকারের আকস্মিক মৃত্যুতে প্রকৃতি যেন অকাল শীতনিদ্রায় চলে গেছে। তার কারণ, ধুলজুরী গ্রামে একটা কথা প্রচলিত আছে—‘নদীর জল আর সাগর সরকারের হাত, দুই-ই সমান। কখনো ফুরায় না।’
সাগর সরকার ধুলজুরী গ্রামের সবচেয়ে ধনী মানুষ। বিশাল অঙ্কের জমিজমা, ধানের চাতাল আর বড় দিঘি মিলিয়ে তার সম্পত্তির শেষ নেই। কিন্তু গ্রামের মানুষ তাকে তার টাকার জন্য চেনে না, চেনে তার বিশাল হৃদয়ের জন্য। তার দুহাত সবসময় মানুষের জন্য খোলা। এক পশলা বৃষ্টির মতো দান সাগর সরকারের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। তিনি দান করার জন্য কোনো ঢাকঢোল পেটান না, আবার কেউ চাইতে এলে খালি হাতেও ফেরান না।
গ্রামের কারো মেয়ের বিয়ে আটকে গেছে? সাগর সরকারের কাছে গেলেই হলো। মাঝরাতে কারো বাড়ির মানুষ অসুস্থ হলে ছুটে যায় সরকারের বাড়ি। তিনি শুধু চিকিৎসার টাকাই দেন না, নিজের গাড়িতে করে শহরের বড় হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। গ্রামের দরিদ্র ঘরের ছেলেমেয়েরা যাতে টাকার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ না করে, তার জন্য প্রতি মাসে তিনি এক বিশাল তহবিল খরচ করেন।
গ্রামের মানুষ তাকে ভালোবেসে ডাকে ‘দানবীর’। ধুলজুরী গ্রামের মানুষ বলে, সাগর সরকার আসলে কোনো মানুষ নন, তিনি এই গ্রামের ওপর ঈশ্বরের এক বিশেষ আশীর্বাদ। তিনি তার দুহাত উজাড় করে গ্রামকে দেন, আর বিনিময়ে গ্রামের মানুষের কাছ থেকে পান অফুরন্ত ভালোবাসা আর দোয়া—যা পৃথিবীর কোনো টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব নয়।
এই গভীর শোকের আড়ালেও নীরব ষড়যন্ত্র, লোভের ফিসফিসানি শুরু হতে সময় লাগেনি। কারণ, সাগর সরকার ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁর কোনো উত্তরসূরি ছিল না। আত্মীয়স্বজনরা বাড়ির উঠানে চোখ মুছতে মুছতে হেঁটে যাচ্ছেন, তখন তাদের মনের ভেতর চলছে সম্পদ ভাগের লোভ। বাইরে কান্নার ভান করলেও মনে মনে প্রত্যেকেই নিজেকে সাগর সরকারের উত্তরসূরি হিসেবে কল্পনা করে ফেলেছেন। পরিবারটি যে একপ্রকার গৃহযুদ্ধে ছারখার হতে চলেছে, তা স্পষ্ট।
যখন লোভী চোখগুলো সাগর সরকারের সম্পদের দিকে এগোচ্ছে, তখনই সামনে এসে দাঁড়াল এক রহস্যময়ী তরুণী। তার পরনে ছিল দামি পোশাক। তবে সবকৈকে চমকে দিল তরুণীর কোলে থাকা এক শিশু। শিশুটির মুখের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন আকাশের লক্ষ নক্ষত্রের আলো এসে এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। এক টুকরো চাঁদের হাট যেন তার নিষ্পাপ হাসিতে খেলা করছে।
তরুণীর চোখের তীব্র তেজ আর কোলের শিশুর অলৌকিক আভা দেখে অনেকে দ্বিধায় পড়ে গেল। তবুও তাদের সসম্মানে নিয়ে গেল সাগর সাহেবের স্ত্রী সালমার কাছে। শোকাচ্ছন্ন সালমা সরকার তখন পাথর হয়ে বসেছিলেন। হঠাৎ এক অচেনা তরুণী ও তার কোল আলো করা শিশুকে দেখে তিনি ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন।
‘কে তুমি? আর এই কঠিন সময়ে কেনই বা এসেছ?’ সালমা সরকারের কণ্ঠস্বর ছিল ক্লান্ত, কিন্তু গম্ভীর।
তরুণী সালমা সরকারের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তারপর বুক ফুলিয়ে, দেয়াল কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলল—
‘আমি শামনাজ সরকার, আমার কোলে থাকা এই পুত্র সন্তান রোহান সরকারই একমাত্র বৈধ উত্তরসূরি সরকার পরিবারের!’
মুহূর্তের মধ্যে ঘরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল। সালমা সরকার চমকে উঠলেন। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, সাগর সরকারের কোনো দ্বিতীয় স্ত্রী ছিল না। এই মেয়েটির দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সূর্যের মতো স্পষ্ট মিথ্যা।
সালমা সরকার শুধু একজন স্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সরকার পরিবারের সবকিছু। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আত্মীয়স্বজনদের লোভী মুখগুলো। এই শিশুটিকে সন্তান হিসেবে স্বীকার না করলে আজই সরকার পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে। লোভী শকুনেরা ছিঁড়ে খাবে সমস্ত সম্পদ।
সালমা তরুণীর চোখের দিকে তাকালেন। সেখানে লোভ নয়, ছিল সরকার পরিবারকে বাঁচানোর আকুতি আর চতুরতা। নতুন ভোরের সূচনা হচ্ছে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নিজের ব্যক্তিগত অহংকার আর সত্যের মায়াকে বিসর্জন দিয়ে তিনি সূর্যের মতো তপ্ত মিথ্যাকে বুকের ভেতর টেনে নিলেন।
ধীরে ধীরে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তরুণীর কোল থেকে নক্ষত্রখচিত সেই উজ্জ্বল শিশুটিকে নিজের কোলে তুলে নিলেন। শিশুটি সালমার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। যেন পুরো ঘরের অন্ধকার কেটে গেল এক নিমেষে।
সালমা দরজা খুলে বাইরে অপেক্ষারত আত্মীয়স্বজনদের দিকে তাকালেন। তার কোলে তখন জ্বলজ্বল করছে সরকার পরিবারের ভবিষ্যৎ। আত্মীয়স্বজনদের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তাদের স্বপ্ন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।
আর বাইরে, স্তব্ধ হয়ে থাকা প্রকৃতিতে যেন আবার প্রাণ ফিরে এল। হঠাৎ করেই থমকে যাওয়া বাতাস আবার বইতে শুরু করল, আর বাগানের ফুলগুলোর ওপর উড়ে এসে বসল একঝাঁক রঙিন প্রজাপতি। একটি মহৎ মিথ্যা কিংবা সত্যি সেদিন ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল গোটা গ্রামকে।
লেখক : ফখরুল হাসান


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









