মানবসভ্যতার ইতিহাসে ১ আগস্ট একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৮৩৪ সালের এই দিনে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া Slavery Abolition Act 1833 -এর আওতায় এদিন থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন ক্যারিবীয় অঞ্চল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও কানাডার বিভিন্ন উপনিবেশে লাখো মানুষ আইনিভাবে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করে।
দাসপ্রথার বিলুপ্তির দিনটিকে স্মরণ করে আফ্রিকান দুটি বিখ্যাত উপন্যাসের রিভিউ থাকল পাঠকদের জন্য ।
ইয়া গিয়াসির ‘হোমগোয়িং’
দাসপ্রথা মানব ইতিহাসের এমন এক নির্মম অধ্যায়, যার ক্ষত কখনো পুরোপুরি শুকায় না। তাই এই বিষয়টি নিয়ে যুগে যুগে অসংখ্য গল্প, উপন্যাস ও গবেষণা হয়েছে। ঘানীয়-মার্কিন লেখক ইয়া গিয়াসির প্রথম উপন্যাস ‘হোমগোয়িং’ সেই ইতিহাসেরই এক হৃদয়স্পর্শী ও নির্মোহ চিত্র তুলে ধরেছে। উপন্যাসটিতে পশ্চিম আফ্রিকার দাসব্যবসা এবং তার প্রভাব সাত প্রজন্ম ধরে কীভাবে মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে, তা গভীর মানবিকতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
গল্পের শুরু ১৮ শতকের শেষ দিকে, তৎকালীন গোল্ড কোস্টের (বর্তমান ঘানা) একটি আসান্তে গ্রামে। সেখানে এফিয়া ওটচার নামে এক কিশোরীকে তার বাবা একজন ব্রিটিশ দাস ব্যবসায়ীর কাছে বিয়ে দেন। এরপর এফিয়া স্বামীর সঙ্গে সমুদ্রতীরের কেপ কোস্ট দুর্গে বসবাস শুরু করে। কিন্তু দুর্গটির নিচের অন্ধকার কারাগারে বন্দি ছিল শত শত দাস, যাদের আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে পাঠানোর অপেক্ষা চলছিল।
সেই বন্দিদের মধ্যেই ছিল এফিয়ার সৎবোন, ১৫ বছর বয়সী এসি আসারে। গ্রামে হামলার সময় তাকে ধরে এনে ইউরোপীয়দের কাছে বিক্রি করা হয়। এরপর উপন্যাসটি এফিয়া ও এসির বংশধরদের সাত প্রজন্মের জীবন অনুসরণ করে। ঘানা ও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সঙ্গে তাদের জীবনের গল্প একসূত্রে গাঁথা হয়েছে।
প্রথম উপন্যাস হলেও ইয়া গিয়াসি দক্ষতার সঙ্গে এত বড় কাহিনি নির্মাণ করেছেন। প্রতিটি অধ্যায়ে নতুন একটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়ে যায়। তাদের প্রত্যেকের জীবনই ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতার কাছে অসহায় হয়ে পড়ে।
দাসজীবনের বিভীষিকা উপন্যাসে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে ফুটে উঠেছে। কেপ কোস্ট দুর্গের অন্ধকার কারাগারে দিনের আলো পৌঁছাত না। বন্দিদের গাদাগাদি করে রাখা হতো, অনেক সময় এত বেশি মানুষ থাকত যে একে অন্যের ওপর শুয়ে থাকতে হতো। অন্যদিকে এসির মেয়ে নেস জন্ম নেয় আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের একটি দাস পরিবারে। চাবুকের আঘাত, তুলার ক্ষেতে অমানবিক শ্রম, পালানোর চেষ্টা করলে কঠোর শাস্তি—এসবই ছিল তার দৈনন্দিন জীবন।
উপন্যাসটি শুধু নির্যাতনের গল্প নয়। ভালোবাসা, পরিবার এবং মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাই গল্পটিকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে। নেস ও তার স্বামী স্যামের সম্পর্ক কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের কোজো ও আন্নার ভালোবাসা দেখায়, নিষ্ঠুর বাস্তবতার মধ্যেও মানুষ ভালোবাসার মধ্যেই বাঁচার শক্তি খুঁজে পায়।
সমালোচকদের মতে, ‘হোমগোয়িং’-এর মূল শক্তি হলো ইতিহাসকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করা। দাসপ্রথা শুধু অতীতের একটি ঘটনা নয়; এর প্রভাব আজও মানুষের পরিচয়, পরিবার, স্মৃতি ও সমাজে রয়ে গেছে—এই সত্যই উপন্যাসটি গভীরভাবে তুলে ধরে।
উপন্যাসের শেষের অংশে অনেক চরিত্র ও ঘটনা একসঙ্গে চলে আসায় গল্প কিছুটা জটিল হয়ে পড়ে এবং মূল ধারাটি কিছুটা দুর্বল মনে হতে পারে। তবুও এই বিস্তৃত পরিসরই দেখায়, দাসপ্রথার ইতিহাস কত অসংখ্য মানুষের জীবনে ছাপ রেখে গেছে।
‘হোমগোয়িং’ শুধু একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়; এটি মানুষের পরিচয়, উত্তরাধিকার, ভালোবাসা ও বেদনার এক অনন্য দলিল। সহজ অথচ শক্তিশালী ভাষায় ইয়া গিয়াসি মনে করিয়ে দেন, ইতিহাসকে ভুলে যেতে চাইলেও তার ক্ষত কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না।
ইথিওপিয়ার অন্ধকার সময়ের আয়না: ‘বিনিথ দ্য লায়ন’স গেজ’
একটি পরিবারের গল্পের মধ্য দিয়ে একটি দেশের ইতিহাস, রক্তাক্ত রাজনীতি ও মানুষের অসহায়তার ছবি তুলে ধরেছেন লেখিকা মাজা মেঙ্গিস্তে। তার প্রথম উপন্যাস Beneath the Lion’s Gaze শুধু ইথিওপিয়ার এক অস্থির সময়ের কাহিনি নয়, বরং ক্ষমতা, ভয়, বিশ্বাসঘাতকতা ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক মানবিক দলিল।
বিশ শতকের ইথিওপিয়ার ইতিহাস ছিল নানা বিপর্যয়ে ভরা। ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির আগ্রাসন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং একের পর এক রাজনৈতিক সংকট দেশটিকে বিপর্যস্ত করেছিল। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৭৪ সালে, যখন সম্রাট হাইলে সেলাসিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। শত বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে দেশটি চলে যায় এক কঠোর মার্কসবাদী সামরিক শাসনের অধীনে।
মাজা মেঙ্গিস্তে তার উপন্যাসে সেই সময়ের শাসক কর্নেল মেঙ্গিস্তুকে সরাসরি নাম দিয়ে উল্লেখ করেননি। তিনি তাকে “মেজর গুদ্দু” নামে তুলে ধরেছেন। আমহারিক ভাষায় “গুদ্দু” শব্দের অর্থ হতে পারে “অসাধারণ কাজ” বা “বিস্ময়কর ঘটনা”—তবে উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে এটি প্রশংসা নয়, বরং এক ধরনের তীব্র ব্যঙ্গ।
উপন্যাসের গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি পরিবারকে ঘিরে। চিকিৎসক হাইলু, তার দুই ছেলে দাওয়িত ও ইয়োনাস, তাদের পরিবার ও ঘনিষ্ঠ মানুষদের জীবনের মধ্য দিয়ে লেখিকা পুরো ইথিওপিয়ার সংকটকে দেখিয়েছেন। তিনি বড় রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বদলে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সামনে এনেছেন। ফলে পাঠক যুদ্ধ ও রাজনীতিকে শুধু ইতিহাস হিসেবে নয়, মানুষের শরীর, ভয়, কষ্ট ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে অনুভব করতে পারেন।
গল্পের শুরু হয় একটি অপারেশন থিয়েটারে। সম্রাটের পুলিশের গুলিতে আহত এক তরুণ প্রতিবাদীকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন চিকিৎসক হাইলু। পরে শাসন পরিবর্তনের পর এক কিশোরীকে তার কাছে আনা হয়, যাকে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছে। নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে হাইলু তাকে সাহায্য করেন। অন্যদিকে, তাঁর ছেলে দাওয়িত রাতে রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহ সংগ্রহ করে। অনেক মৃতের পোশাকে লেখা থাকত—“আমি জনগণের শত্রু। মা, আমার জন্য কেঁদো না। আমার মৃত্যুই প্রাপ্য ছিল।”
মেঙ্গিস্তে দেখিয়েছেন, বিপ্লব শুধু রাজপ্রাসাদ বা সরকারের পরিবর্তন নয়—এটি পরিবার ও সমাজের ভেতরেও বিভাজন তৈরি করে। সন্তান বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, মানুষ একে অন্যকে সন্দেহ করতে শেখে। দীর্ঘদিনের ভয় ও কর্তৃত্ববাদ মানুষের নৈতিক শক্তিকেও দুর্বল করে দেয়।
লেখিকা আরও দেখিয়েছেন, এই সময়ের সবচেয়ে বড় শিকার ছিল সাধারণ মানুষ। যারা পরিবর্তনের আশায় রাস্তায় নেমেছিল, তারাই পরে নতুন শাসনের নিষ্ঠুরতা দেখে হতবাক হয়। সৈন্যরা এমন আদেশ পালন করতে বাধ্য হয়, যা তারা কখনো কল্পনাও করেনি। আবার অনেকের জন্য নীরব থাকাও ছিল অসম্ভব।
উপন্যাসের শক্তিশালী দিক হলো—এখানে কেউ পুরোপুরি ভালো বা খারাপ নয়। প্রত্যেক মানুষই নিজের সিদ্ধান্ত, ভয় ও অপরাধবোধের সঙ্গে লড়াই করে। সবাইকে ক্ষমা করতে হয়—নিজেকেও, অন্যকেও।
তবে সমালোচকদের মতে, কখনো কখনো লেখিকা এই সময়ের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরার চেষ্টা করতে গিয়ে গল্পকে কিছুটা ভারী করে ফেলেছেন। চরিত্রগুলো অনেক সময় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান বা গোষ্ঠীর প্রতীক হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে উপন্যাসে সহিংসতার পরিমাণও অনেক বেশি। মনে হয়, লেখিকা সেই ভয়াবহ সময়ের প্রতিটি ক্ষত পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
এই সহিংসতার পেছনে ছিল বাস্তব ইতিহাস। মেঙ্গিস্তুর প্রায় ১৪ বছরের শাসনামলে হাজারো মানুষ নিহত হয়, অসংখ্য পরিবার হারায় প্রিয়জন। Beneath the Lion’s Gaze সেই অন্ধকার সময়কে একটি পরিবারের চোখ দিয়ে দেখায়—যেখানে রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়, মানুষের জীবন, সম্পর্ক ও স্বপ্নের ওপর গভীর আঘাত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









