ফ্যাসিবাদ কীভাবে ক্ষমতায় আসে? একজন সাধারণ রাজনৈতিক শক্তি কীভাবে ধীরে ধীরে ভয়ংকর একনায়কে পরিণত হয়? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই উত্থান কি ঠেকানো সম্ভব?

জার্মান নাট্যকার ও কবি ‘বের্টোল্ট ব্রেখট’ তার বিখ্যাত নাটক ‘দ্য রেসিসস্টেবল রাইজ অব আর্টুরো উই’-তে এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খুঁজেছেন। নাটকটি লেখা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের উত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে। কিন্তু ব্রেখটের নাটকের বিষয়গুলো আজও রাজনীতি, ক্ষমতা, দুর্নীতি ও স্বৈরতন্ত্র নিয়ে আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।
হিটলারের উত্থান খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন ব্রেখট
হিটলারের ক্ষমতায় আসার আগেই ব্রেখট বুঝতে পেরেছিলেন, নাৎসিদের উত্থান কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। ১৯২৩ সালে মিউনিখে ব্রেখটের নাটক ‘ইন দ্য জঙ্গল’ মঞ্চস্থ হওয়ার সময় নাৎসি সমর্থকেরা হলের মধ্যে শিস ও দুর্গন্ধযুক্ত বোমা ছুড়ে নাটক বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল। ১৯৩০ সালে বার্লিনে তার ব্যঙ্গাত্মক অপেরা ‘দ্য রাইজএন্ড ফল অব দ্য সিটি অব মাহাগনি’-এর প্রদর্শনও নাৎসিদের বাধার মুখে পড়ে।
১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হন। এর মাত্র চার সপ্তাহ পর, ২৮ ফেব্রুয়ারি, জার্মানি ছেড়ে পালান ব্রেখট। এর আগের রাতেই আগুনে পুড়ে যায় জার্মান পার্লামেন্ট ভবন রাইখস্টাগ।
এরপর দীর্ঘ নির্বাসনজীবন। প্রাগ, ভিয়েনা, জুরিখ, স্টকহোম, ডেনমার্ক ও হেলসিঙ্কি ঘুরে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। এই সময়েই মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে লিখে ফেলেন ‘দ্য রেসিসস্টেবল রাইজ অব আর্টুরো উই’।
হিটলার হয়ে গেলেন শিকাগোর গ্যাংস্টার
নাটকের কাহিনি জার্মানির বদলে বসানো হয় ১৯৩০-এর দশকের আমেরিকার শিকাগো শহরে। সেখানে আর্টুরো উই একজন ছোটখাটো গ্যাংস্টার। শহরের ফুলকপি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আর্থিক সংকটে পড়ে গেলে তাদের ‘সুরক্ষা’ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় উই।
ব্যবসায়ীরা প্রথমে তাকে বিশ্বাস করে না। কিন্তু রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে উই।
এরপর শুরু হয় ভয় দেখানো, হত্যা, ষড়যন্ত্র ও দুর্নীতি।
একজন ব্যবসায়ী উইয়ের বিরোধিতা করলে তার গুদামে আগুন লাগে। মামলায় উইয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষীদের প্রভাবিত করা হয়। বিচারব্যবস্থা ও সংবাদমাধ্যমও ধীরে ধীরে তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
এরপর একে একে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দিয়ে পুরো ব্যবসা নিজের হাতে নেয় উই। পাশের শহর সিসেরোর ব্যবসায়ীরাও যখন তার সঙ্গে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন সেখানেও শুরু হয় একই কৌশল—হত্যা, ভয় দেখানো এবং রাজনৈতিক কারসাজি। শেষ পর্যন্ত ছোটখাটো এক গ্যাংস্টার হয়ে ওঠে পুরো অঞ্চলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাধর।
আসলে কে এই আর্টুরো উই?
দর্শকের জন্য ব্রেখট বিষয়টি খুব একটা রহস্য করে রাখেননি। আর্টুরো উই আসলে ‘অ্যাডলফ হিটলারের প্রতীক’।
নাটকের অন্যান্য চরিত্রও নাৎসি জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব করে। গিভোলা চরিত্রে দেখা যায় জোসেফ গোয়েবলসের ছায়া, গিরি চরিত্রে হারমান গোরিং এবং আর্নেস্টো রোমা চরিত্রে আর্নস্ট রোমের প্রতিচ্ছবি। নাটকের ঘটনাগুলোর সঙ্গেও জার্মান ইতিহাসের সরাসরি মিল রয়েছে।
ফুলের ব্যবসায়ীর গুদামে আগুনের ঘটনা ইঙ্গিত করে রাইখস্টাগ অগ্নিকাণ্ডের দিকে। ব্যবসায়িক কেলেঙ্কারি জার্মানির ‘ইস্টার্ন এইড’ কেলেঙ্কারির প্রতীক। রোমার হত্যাকাণ্ড মনে করিয়ে দেয় ১৯৩৪ সালের ‘নাইট অব দ্য লং নাইভস’-কে। আর সিসেরো শহর দখলের ঘটনা ইঙ্গিত করে অস্ট্রিয়াকে জার্মানির সঙ্গে যুক্ত করার আন্সক্লাস-এর দিকে।
অর্থাৎ ব্রেখট ইতিহাসকে সরাসরি মঞ্চে না এনে গ্যাংস্টারদের গল্পের আড়ালে নাৎসি জার্মানির উত্থান দেখিয়েছেন।
‘অনিবার্য’ নয়, ‘প্রতিরোধযোগ্য’
নাটকের নামটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—‘দ্য রেসিসস্টেবল রাইজ অব আর্টুরো উই’।
এখানে ‘রেসিসস্টেব’ শব্দটির অর্থ প্রতিরোধযোগ্য।
ব্রেখটের বক্তব্য ছিল, হিটলারের ক্ষমতায় আসা কোনো অনিবার্য ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল না। সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষ যদি সময়মতো দৃঢ় অবস্থান নিত, তাহলে তার উত্থান ঠেকানো সম্ভব ছিল।
অর্থাৎ স্বৈরাচার একদিনে জন্ম নেয় না। বরং ছোট ছোট আপস, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং অপরাধীদের প্রতি ছাড় দেওয়ার মধ্য দিয়েই তার পথ তৈরি হয়। ব্রেখট যেন দর্শককে সতর্ক করে বলতে চেয়েছেন—একজন বিপজ্জনক নেতাকে শুরুতেই প্রতিরোধ না করলে পরে তাকে থামানো অনেক কঠিন হয়ে যায়।
ভয়ংকর চরিত্রকে মঞ্চে হাস্যকর করে তুললেন ব্রেখট
নাটকটির বিশেষত্ব শুধু এর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, নাট্যরীতিতেও।
ব্রেখট নাটকটিকে লিখেছেন ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের সঙ্গে। আর্টুরো উইকে তিনি কখনো ভয়ংকর, কখনো হাস্যকর করে তুলেছেন। উচ্চাঙ্গের ট্র্যাজেডির ভাষা ব্যবহার করে একজন গ্যাংস্টারের বক্তব্যকে উপস্থাপন করেছেন।
শেক্সপিয়ারের ‘জুলিয়া সিজার’, ‘ম্যাকব্যাথ’এবং গ্যোটের ‘ফাউস্ট’—এসব বিখ্যাত রচনার দৃশ্য ও ভাষারও ব্যঙ্গাত্মক ব্যবহার রয়েছে নাটকে।
এর ফলে হিটলারের মতো একনায়ককে কোনো মহৎ ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে দেখানোর সুযোগ থাকে না। বরং তার আড়ম্বরপূর্ণ ভাষণ ও ক্ষমতার প্রদর্শনের নিচে যে সাধারণ অপরাধী মানসিকতা লুকিয়ে থাকে, সেটিই সামনে আসে।
গ্যাংস্টার থেকে নেতা
নাটকের সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্যগুলোর একটি হলো আর্টুরো উইয়ের অভিনয় শেখার দৃশ্য।
রাজনীতিতে প্রবেশের আগে উই বুঝতে পারে, তার কথা বলার ধরন ও শরীরী ভাষা যথেষ্ট প্রভাবশালী নয়। তাই সে একজন প্রশিক্ষিত অভিনেতার কাছে যায়।
অভিনেতা তাকে শেখায় কীভাবে হাঁটতে হবে, কীভাবে দাঁড়াতে হবে, কীভাবে কথা বলতে হবে এবং কীভাবে মানুষের সামনে ক্ষমতাবান ব্যক্তির ভাবমূর্তি তৈরি করতে হবে।
উই শিখে নেয় শেক্সপিয়ারের ‘জুলিয়া সিজার’-এর বিখ্যাত বক্তৃতার ভঙ্গি। একই সঙ্গে সে আয়ত্ত করে নাৎসি বাহিনীর বিখ্যাত ‘গুজ-স্টেপ’ হাঁটার কৌশল।
একজন ভীতু ও ছোটখাটো অপরাধীকে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী রাজনৈতিক নেতার চেহারায় রূপান্তরিত করে এই প্রশিক্ষণ।
ব্রেখটের এই দৃশ্যের মধ্যেই রয়েছে বড় একটি রাজনৈতিক ইঙ্গিত—ক্ষমতাবান নেতার যে ব্যক্তিত্ব আমরা পর্দায় বা মঞ্চে দেখি, তার অনেকটাই তৈরি করা হতে পারে।

ব্রেখটের ‘এপিক থিয়েটার’
ব্রেখটের নাট্যচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল দর্শককে কেবল আবেগে ভাসিয়ে দেওয়া নয়, বরং তাকে ভাবতে বাধ্য করা। এই নাটকেও তাই মঞ্চে মাঝেমধ্যে পোস্টার, ব্যানার ও লিখিত বক্তব্য ব্যবহার করা হয়েছে। একটি দৃশ্য শেষ হওয়ার পর এমন লেখা দেখা যায়, যেখানে বাস্তব জার্মানির কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়।
ফলে দর্শক শুধু আর্টুরো উইয়ের গল্প দেখেন না। একই সঙ্গে বুঝতে পারেন, এই গল্পের পেছনে কোন বাস্তব ইতিহাস কাজ করছে।
এটিই ব্রেখটের নাট্যরীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য—দর্শক যেন চরিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম না হয়ে কিছুটা দূরত্ব রেখে ঘটনাকে বিচার করেন।
আজও কি আর্টুরো উইয়ের প্রাসঙ্গিক?
ব্রেখটের নাটকটি লেখা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অভিজ্ঞতা থেকে। কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে—আজকের পৃথিবীতে এই নাটক কতটা প্রাসঙ্গিক?
রাজনৈতিক মেরুকরণ, করপোরেট ক্ষমতা, দুর্নীতি, অপরাধ ও রাজনীতির যোগসূত্র এবং বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির উত্থান—এসব কারণে নাটকটির অনেক প্রশ্ন আজও আলোচনায় ফিরে আসে।
ব্রেখট দেখিয়েছিলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে গেলে এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কাছে নীতিকে বিসর্জন দিলে একজন ক্ষমতালোভী নেতা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন।
তার জন্য দরকার হয় না কোনো একদিনের অভ্যুত্থান। বরং ছোট ছোট আপসই তৈরি করে বড় বিপদের রাস্তা।
ব্রেখটের নাটকের শেষ অংশে রয়েছে একটি সতর্কবার্তা। হিটলারের পতনের পরও তিনি মনে করিয়ে দেন, যে পরিস্থিতি থেকে হিটলারের জন্ম হয়েছিল, সেটি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
অর্থাৎ একজন স্বৈরশাসকের পতন মানেই স্বৈরতন্ত্রের সম্ভাবনার অবসান নয়।
এই কারণেই ‘দ্য রেসিসস্টেবল রাইজ অব আর্টুরো উই’ শুধু হিটলারের গল্প নয়। এটি ক্ষমতার চরিত্র, রাজনৈতিক আপস এবং গণতান্ত্রিক সমাজের দুর্বলতা নিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী সতর্কবার্তা।
ব্রেখটের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই আজও একইভাবে প্রাসঙ্গিক—‘স্বৈরাচারের উত্থান কি সত্যিই অনিবার্য, নাকি আমরা সময়মতো প্রতিরোধ করতে পারি?’
নাটকটির উত্তর স্পষ্ট: ‘প্রতিরোধ সম্ভব। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সময়মতো বিপদকে চিনতে পারা এবং আপসের জায়গায় দৃঢ় অবস্থান নেওয়া।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









