প্রিয়তমা আমার,
বিবর্তিত জলবায়ু আর এল-নিনো’র ধেয়ে আসার এই সন্ধ্যায়, যখন গাজার শিশুদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে বোমারু বিমান ক্ষুধা আর নিরাপত্তাহীনতার প্রতিটি মুহূর্ত যখন রক্কাক্ত হয়ে যাচ্ছে তখন, কোথায় কান্নার রোল পড়েছে? কোথায় কাদের হাতে উঠে এসেছে প্রতিরোধের পাথর? আরো বেদনায় কারো হাতে উঠে এসেছে রাইফেল! কিন্তু এমনটা তো কথা ছিল না প্রিয়তমা! কিন্তু সত্যিই এটাই; ইয়েমেন, কাম্মীর, সুদান, নাইজেরিয়া, ইউক্রেন, মায়ানমার আর মানুষের আর্তকান্নার চাপারোল বাজছে।
এ আর্তনাদের উৎস কোথায়, আমাদের সকলেরই জানা। কিন্তু এই নির্বিকার নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমাদের বুকের গহীনে যতই বেদনার জলোচ্ছ্বাসই হোক; আমরা কি পারছি প্রতিরোধের সেই স্ফূলিঙ্গে জ্বলে উঠতে? না, পারছি না প্রিয়তমা। এ বেদনা কি আমার মতন তোমারও?

এমনটা তো চাইনি প্রিয়তমা। এমন পৃথিবীতে শিশুরা বেড়ে উঠুক। এ আতঙ্কের বিষাদ আমাদের প্রতি মুহূর্তে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। এখানে আমার পাজর ছিন্ন হয় আর যেখানেই থাক তুমি, তোমার চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুধারা। এই নির্মমতার শেষ নেই! শেষ নেই অসুরতার! আছে? কিন্তু কোথায়? প্রিয়তমা।
আমরা কি ভুলে গেছি সেইসব প্রেম আর সম্মিলনের মানবগাঁথা।
প্রিয়তমা আমার
বুকের ভেতর জ্বলছে আগুন, আগুন আনবে নতুন ফাগুন-নতুন দিন-নতুন পৃথিবীর গান। যুদ্ধ-সাঁজোয়া যান যতই আমাদের মগজে ঢুকে পড়ুক-গুলি চালাক, ছিন্ন করুক পাজর, ড্রোন আর গোলার শব্দে যতই মস্তিষ্কের কোষে কোষে আতঙ্কের স্ফূরণ ঘটুক-মানুষ ঘুরে দাঁড়াবে। ভয়ের টুঁটি চেপে ধরে ঘুরে দাঁড়াবে। পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলতে বুক উঁচিয়ে দাঁড়াবে, প্রিয়তমা।
এমনই আর্তনাদগুলোর কাঁধে হাত রাখেন শহীদ কাদরী তার কবিতা নিয়ে। শহীদ কাদরীর ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ বাংলা কবিতার এমন একটি শব্দবান, যেখানে প্রেমের কবিতা, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, যুদ্ধবিরোধিতা, রাষ্ট্রব্যবস্থার সমালোচনা এবং ভবিষ্যৎ সমাজের স্বপ্ন—সবকিছু একই সঙ্গে এসে মিলেছে। কবিতাটি প্রথম পাঠে যেন একজন প্রেমিকের আশ্বাসবাণী; কিন্তু একটু গভীর অনুভব নিয়ে পাঠ করলে বোঝা যায়, এই প্রেমিক আসলে কেবল একজন নারীকে নয়, একটি স্বপ্নময়, মানবিক ও যুদ্ধমুক্ত পৃথিবীকে সম্বোধন করছেন।
এখানেই কবিতাটির আধুনিকতা। শহীদ কাদরী প্রেমকে ব্যক্তিগত আবেগের সংকীর্ণ পরিসর থেকে বের করে রাষ্ট্র, যুদ্ধ, অর্থনীতি, নির্বাচন, বিপ্লব, সামরিক বাহিনী এবং মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে ‘প্রিয়তমা’ হয়ে উঠেছে একই সঙ্গে প্রেমিকা, দেশ, মানুষ এবং কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ পৃথিবীর প্রতীক।
কবিতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর আপাত সরলতা। বারবার ফিরে আসে—‘ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো’ এই বাক্যটি প্রথমে প্রেমিকের আশ্বাসের মতো শোনায়। কিন্তু পরের লাইনেই দেখা যায়, সেই আশ্বাসের মধ্যে ঢুকে পড়ছে সেনাবাহিনী, রণতরী, আর্মারকার, বি-৫২, মিগ-২১, নির্বাচন, সমরমন্ত্রী, বিরোধী দল, সীমান্ত, মুদ্রাস্ফীতি, স্টেট ব্যাংক ও গণরোষ। অর্থাৎ কবি প্রেমের প্রচলিত ভাষাকে রাজনৈতিক বাস্তবতার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছেন।
আধুনিক কবিতার একটি প্রবণতা তা হল— ব্যক্তিগত জীবন ও জনজীবনের বিভাজন ভেঙে দেওয়া। আধুনিক মানুষ আর শুধু প্রেমিক বা নাগরিক নয়; সে একই সঙ্গে যুদ্ধ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, সংবাদ, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে বসবাস করে। তাই তার প্রেমও সেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না।
শহীদ কাদরীর কবিতার অন্যতম শক্তি তার ‘ব্যঙ্গ’ করার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি সরাসরি রাজনৈতিক বক্তৃতা দেন না; বরং অসম্ভব কিছু কল্পনা করেন। যা মানুষের মধ্যে সম্মিলন আর প্রেমের ফাল্গুন ঢেকে আনে বা আকাঙ্খা করে।
সেনাবাহিনী গোলাপের গুচ্ছ নিয়ে মার্চপাস্ট করবে। যুদ্ধবিমান আকাশে গর্জন করবে, কিন্তু সেখান থেকে বোমার বদলে ঝরে পড়বে চকলেট, টফি ও লজেন্স। রণতরীর কমান্ডার হবেন একজন কবি। একজন গায়ক হয়ে যাবেন বিরোধী দলের নেতা। সীমান্ত পাহারা দেবে রঙিন মাছি। এসকল অসম্ভব দৃশ্যগুলোর মধ্যেই রয়েছে গভীর রাজনৈতিক বিদ্রূপ।

যে রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি সাধারণত ধ্বংসের প্রতীক, কবি তাকে ভালোবাসার কাজে নিয়োজিত করছেন। যে বিমান যুদ্ধের জন্য তৈরি, সেখান থেকে নামছে শিশুর প্রিয় টফি। যে রণতরী যুদ্ধের প্রতীক, সেটি পরিচালনা করছেন কবি।
এখানে ‘ব্রেখটীয় ব্যঙ্গ ও বিচ্ছিন্নকরণ কৌশলের’ সঙ্গে একটি অন্তর্গত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ব্রেখট তার নাটকে পরিচিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে এমনভাবে উল্টে দিতেন, যেখানে দর্শক পরিচিত বিষয়টিকে নতুন চোখে দেখতে বাধ্য হতেন। শহীদ কাদরীও একই ধরনের কৌশলে যুদ্ধ, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার পরিচিত চেহারাকে উল্টে দিয়েছেন। কিন্তু দুজনের চিন্তার মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। ব্রেখটের ব্যঙ্গ অনেক সময় সরাসরি রাজনৈতিক; শহীদ কাদরীর ব্যঙ্গ কাব্যিক, রোমান্টিক এবং দৃশ্যনির্ভর।
শহীদ কাদরীর কবিতায় ব্রেখটের সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিলটি সম্ভবত ক্ষমতার ভাষাকে তার নিজের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা। শহীদ কাদরীও সামরিক ও রাষ্ট্রীয় শব্দভান্ডারকে প্রেমের অভিধানে বসিয়েছেন। ‘মার্চপাস্ট’, ‘স্যালুট’, ‘রণতরী’, ‘আর্মারকার’, ‘বি-৫২’, ‘মিগ-২১’, ‘প্যারাট্রুপার’, ‘সমরমন্ত্রী’, ‘বিরোধীদল’, ‘ট্রেঞ্চ’—এসব শব্দ সাধারণত যুদ্ধ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। কবি এগুলোকে গোলাপ, ভায়োলিন, চকোলেট, গান ও ভালোবাসার সঙ্গে পাশাপাশি বসিয়েছেন।
ফলে শব্দগুলোর প্রচলিত অর্থ ভেঙে যায়। এটাই আধুনিক কবিতার এক বড় শক্তি—পুরোনো শব্দকে নতুন সম্পর্কের মধ্যে বসিয়ে নতুন অর্থ তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে শহীদ কাদরীর সঙ্গে পাবলো নেরুদা’র অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল আমরা খুঁজে পাবো।
নেরুদার কবিতায়ও ব্যক্তিগত প্রেম কখনো বৃহত্তর মানবিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে আলাদা থাকে না। নেরুদার প্রেমের কবিতায় যেমন শরীর, প্রকৃতি, স্মৃতি ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা আছে, তেমনি তার রাজনৈতিক কবিতায় আছে যুদ্ধ, নিপীড়ন, শ্রমজীবী মানুষ ও ইতিহাস। অর্থাৎ ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং সামষ্টিক ইতিহাস তাঁর কবিতায় পাশাপাশি চলেছে।
শহীদ কাদরীর ‘প্রিয়তমা’ও তাই কেবল একজন নারী নন।
‘নৌ, বিমান আর পদাতিক বাহিনী/কেবল তোমাকেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে-ঘিরে/নিশিদিন অভিবাদন করবে’
তখন ‘তুমি’র পরিসর ব্যক্তিগত প্রেমের চেয়ে অনেক বড় হয়ে ওঠে।
এখানে প্রেম এক ধরনের ‘মানবিক ইউটোপিয়া’—যেখানে যুদ্ধের সব অস্ত্র শেষ পর্যন্ত মানুষের ভালোবাসার সেবায় নিয়োজিত হবে।
মতো নগর ও রাষ্ট্রের ভাষা
রুশ কবি মায়াকোভস্কির কবিতার সঙ্গেও কোথাও কোথাও আকর্ষণীয় সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
মায়াকোভস্কি প্রেমের কবিতায় যেমন ব্যক্তিগত অনুভূতিকে বিশাল নগর, রাজনীতি, বিপ্লব ও ভবিষ্যৎ সমাজের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, শহীদ কাদরীও তেমনই ব্যক্তিগত প্রেমকে রাষ্ট্রের বিশাল যন্ত্রের সামনে দাঁড় করিয়েছেন। দুজনের কবিতাতেই আছে ‘বড় স্কেলের কল্পনা’।
একজন প্রেমিকের ‘আমি’ এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, সে সেনাবাহিনীকে বদলে দিতে পারে, অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে, রাজনীতিকে বদলে দিতে পারে। বাস্তব অর্থে এটি অসম্ভব; কিন্তু কবিতার কল্পনায় এই অসম্ভবই সম্ভব।
এই অতিরঞ্জনই কবিতাটিকে আধুনিক করে তুলেছে।

আর ইংরেজ কবি অডেনের যুদ্ধবোধের সঙ্গে ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ কাদরীর সাদৃশ্যের কথা না বললেই নয়। কবিতায় আধুনিক যুদ্ধ ও ব্যক্তিমানুষের অসহায়তার যে সম্পর্ক দেখা যায়, তার সঙ্গেও শহীদ কাদরীর কবিতার গভীর অন্তরঙ্গতা আছে।
কবিতাটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বক্তব্য সম্ভবত যুদ্ধের বিপরীতে ভালোবাসাকে উপস্থিত করা। কবি যুদ্ধের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘যুদ্ধবিরোধী’ স্লোগান দেননি। বরং যুদ্ধের সমস্ত উপকরণকে ভালোবাসার উপকরণে রূপান্তরিত করেছেন। কবিতাটি নিছক হাস্যরস নয়। এর মধ্যে রয়েছে একটি গভীর নৈতিক অবস্থান:
‘মানুষ যে বুদ্ধি দিয়ে যুদ্ধের অস্ত্র তৈরি করেছে, সেই বুদ্ধি দিয়েই তাকে ভালোবাসার পৃথিবী তৈরি করতে পারে।’
তাই ‘ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ হয়ে যাবে’—এই লাইনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্র যেখানে সাধারণত সীমান্ত, পণ্য, মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে সেখানে কবি একমাত্র ভালোবাসাকেই সীমান্ত অতিক্রমের অনুমতি দিয়েছেন।
জর্জ অরওয়েলের সঙ্গে একটি ধারণাগত সংযোগ
জর্জ অরওয়েলের রাজনৈতিক লেখার সঙ্গে শহীদ কাদরীর কবিতার সরাসরি সাহিত্যিক মিল না থাকলেও দুজনের চিন্তার কেন্দ্রে একটি অভিন্ন প্রশ্ন আছে—‘ক্ষমতা কীভাবে ভাষাকে বিকৃত করে?’
অরওয়েল দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কীভাবে শব্দের অর্থ বদলে দিতে পারে। যুদ্ধকে শান্তি, নিয়ন্ত্রণকে নিরাপত্তা কিংবা দমনকে শৃঙ্খলা হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
কবিতাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো—প্রিয়তমা আসলে কে? এক অর্থে তিনি একজন নারী। আবার অন্য অর্থে তিনি দেশ। আরও বিস্তৃত অর্থে তিনি হতে পারেন সেই মানবিক পৃথিবী, যেখানে যুদ্ধ নেই, ক্ষুধা নেই, রাজনৈতিক সহিংসতা নেই এবং রাষ্ট্র মানুষের বিরুদ্ধে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ায়। এই বহুমাত্রিক ‘তুমি’ কবিতাটিকে ব্যক্তিগত প্রেমের কবিতা থেকে রাজনৈতিক-মানবিক কবিতায় উত্তীর্ণ করেছে।
এখানে প্রেমিকের প্রতিশ্রুতিগুলো আসলে একজন কবির আকাঙ্খার কল্পনা।
বিশ্বকবিতার দিকে দৃষ্টিপাত করলে এর অন্তর্গত আত্মীয়তা খুঁজে পাওয়া যায় ব্রেখটের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, নেরুদার প্রেম ও ইতিহাসের সংযোগ, মায়াকোভস্কির বিপ্লবী কল্পনা এবং অডেনের যুদ্ধবোধের সঙ্গে। কিন্তু শহীদ কাদরী তাঁদের কারও অনুকরণ করেননি। তিনি এসব আধুনিক কাব্যপ্রবণতাকে নিজের সময়, নিজের ভাষা ও রাজনৈতিক-সামাজিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। আর সেখানেই তিনি স্বতন্ত্র।
‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ কবিতাটি একজন প্রেমিকের প্রতিশ্রুতি নয়; এটি এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন, যেখানে ক্ষমতার সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রও শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পণ করবে। এই স্বপ্নই কবিতাটিকে তার সময় অতিক্রম করে আজকের পৃথিবীর কাছেও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









