টাইগ্রিসের জল তখনও বইয়ের পাতার মতো ধীর। নদীর ওপারে সন্ধ্যার আলো নেমে আসে, আর পুরোনো বাগদাদের সরু গলিতে কাগজের গন্ধ মিশে থাকে চায়ের ধোঁয়া, কালির গন্ধ ও মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত কবিতার সঙ্গে। মনে হয়, শহরটি আসলে ইট-পাথরে তৈরি নয়—তৈরি হয়েছে গল্প, কবিতা, অনুবাদ আর স্মৃতি দিয়ে।
এই বাগদাদেরই এক গলি—আল-মুতানাব্বি স্ট্রিট। আজ এটি বইয়ের বাজার হিসেবে পরিচিত; কিন্তু এর গল্প কেবল বই বিক্রির গল্প নয়। এটি ইরাকের সাহিত্য, আরব সংস্কৃতি, পারস্যের জ্ঞানচর্চা, শিল্প এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া বহন করে। বহু শতাব্দী ধরে বাগদাদ ছিল জ্ঞান ও সংস্কৃতির মিলনস্থল। আর সেই ঐতিহ্যের আধুনিক প্রতীক হয়ে উঠেছে মুতানাব্বি স্ট্রিট।
যে শহরে জ্ঞান ছিল সম্পদের মতো
বাগদাদের ইতিহাসে বইয়ের প্রতি এই ভালোবাসা হঠাৎ তৈরি হয়নি। আব্বাসীয় যুগে শহরটি যখন ইসলামী বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র হয়ে উঠছিল, তখন পৃথিবীর নানা প্রান্তের জ্ঞান এখানে এসে মিলিত হচ্ছিল। বায়তুল হিকমা বা ‘হাউস অব উইজডম’-এর সঙ্গে যুক্ত অনুবাদ ও গবেষণার ঐতিহ্য বাগদাদকে জ্ঞানচর্চার এক অসাধারণ কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। গ্রিক, পারস্যসহ নানা সভ্যতার জ্ঞান আরবিতে অনূদিত হচ্ছিল; একই সঙ্গে নতুন জ্ঞানও সৃষ্টি হচ্ছিল।
এখানে পারস্যের অবদানও ছিল গভীর। আব্বাসীয় দরবারে পারস্যের প্রশাসনিক ঐতিহ্য, সাহিত্য, দর্শন ও জ্ঞানচর্চার প্রভাব প্রবল ছিল। ফলে বাগদাদ কখনো কেবল আরব শহর হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছিল বহু সংস্কৃতির মিলনভূমি।
একদিকে আরবি কবিতা, অন্যদিকে পারস্যের সাহিত্যিক ঐতিহ্য; কোথাও গ্রিক দর্শনের অনুবাদ, কোথাও গণিত ও চিকিৎসাবিদ্যার পাণ্ডুলিপি—সব মিলিয়ে বাগদাদ যেন একটি বিশাল, ছাদহীন গ্রন্থাগার।
আর এই ইতিহাসের কথা ভাবলে মনে হয়, মুতানাব্বি স্ট্রিট আসলে সেই পুরোনো বাগদাদেরই আধুনিক প্রতিধ্বনি।

কবির নামে রাস্তা
আজকের মুতানাব্বি স্ট্রিটের নাম নেওয়া হয়েছে দশম শতকের বিখ্যাত আরবি কবি আবু আল-তাইয়্যিব আল-মুতানাব্বির নামে। ১৯৩২ সালে রাস্তার নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। ধীরে ধীরে এখানে বইয়ের দোকান, ছাপাখানা, প্রকাশনা ও বইয়ের খোলা বাজার গড়ে ওঠে।
কবি মুতানাব্বি ছিলেন এমন এক মানুষ, যার কবিতায় ছিল আত্মমর্যাদা, সাহস, ক্ষমতা ও মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা। তাঁর নামে বইয়ের রাস্তার নামকরণ যেন প্রতীকীও—শব্দেরও তো এক ধরনের শক্তি আছে।
এই রাস্তা একসময় এতটাই বইকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল যে আরব বিশ্বের একটি জনপ্রিয় কথাই যেন তাকে সংজ্ঞায়িত করত—‘কায়রো লেখে, বৈরুত প্রকাশ করে, বাগদাদ পড়ে।’
বাগদাদ সত্যিই পড়ত।
শুক্রবার এলেই হাজার হাজার মানুষ মুতানাব্বি স্ট্রিটে আসতেন। কেউ বই কিনতেন, কেউ পুরোনো পাণ্ডুলিপি খুঁজতেন, কেউ কবিতা নিয়ে আলোচনা করতেন। বইয়ের দোকানের পাশাপাশি ছিল চায়ের দোকান, স্টেশনারি, ছোট ছোট খাবারের দোকান। আর ছিল বিখ্যাত শাবানদার ক্যাফে—যেখানে সাহিত্যিক, শিল্পী, রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের আড্ডা বসত।
বইয়ের দোকান, অথচ আসলে একটি সভ্যতা
মুতানাব্বি স্ট্রিটের বিশেষত্ব তার দোকানগুলোর সংখ্যায় নয়, বরং তাদের চরিত্রে।
এখানে একই তাকের পাশে ধর্মীয় বই, ইতিহাস, দর্শন, কবিতা, রাজনীতি, বিজ্ঞান কিংবা বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ দেখা যেত। বইয়ের বাজারটি ছিল মতেরও বাজার। কেউ শিয়া ধর্মীয় বই খুঁজছেন, কেউ সুন্নি চিন্তার বই, কেউ মার্ক্সবাদ পড়ছেন, কেউ পশ্চিমা সাহিত্য। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে বইয়ের বাজারও বদলেছে। কোনো সময় মার্ক্সবাদী বই এসেছে, কোনো সময় জাতীয়তাবাদী সাহিত্য, আবার কোনো সময় রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞায় অনেক বই অদৃশ্য হয়ে গেছে।
তবু বই বিক্রেতারা থেকে গেছেন।
তাদের কাছে বই শুধু পণ্য ছিল না। ছিল উত্তরাধিকার।
একজন বই বিক্রেতা যখন পুরোনো কোনো বইয়ের ধুলো ঝাড়েন, তিনি যেন কেবল একটি বই পরিষ্কার করেন না—নিজের শহরের স্মৃতিটাকেও একটু পরিষ্কার করেন।
আগুনের মধ্যেও বই
কিন্তু ইতিহাস সব সময় কোমল নয়।
২০০৭ সালের ৫ মার্চ মুতানাব্বি স্ট্রিটে ভয়াবহ গাড়িবোমা হামলা হয়। এতে ৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং শতাধিক আহত হন। বইয়ের দোকান, স্টল ও আশপাশের ভবন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সেদিন শুধু মানুষ মারা যায়নি। পুড়ে গিয়েছিল বই, কাগজ, স্মৃতি এবং বহু বছরের সাংস্কৃতিক সম্পদ।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো—মুতানাব্বি স্ট্রিট শেষ হয়ে যায়নি।
ধ্বংসস্তূপ সরেছে। দোকান আবার খুলেছে। বই আবার তাক দখল করেছে।
যেন বাগদাদ বলেছে, বোমা একটি দোকান ভাঙতে পারে, একটি রাস্তা পুড়িয়ে দিতে পারে; কিন্তু পড়ার অভ্যাসকে এত সহজে হত্যা করা যায় না।
এই হামলার পর বিশ্বের নানা দেশের কবি, লেখক ও শিল্পীরা মুতানাব্বি স্ট্রিটের পাশে দাঁড়ান। ‘আল মুতানাব্বি স্ট্রিট স্টার্ট হিয়ার’ নামে একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও শিল্প উদ্যোগ গড়ে ওঠে। শিল্পীরা বই ও ছাপার শিল্পের মাধ্যমে হামলায় নিহতদের স্মরণ করেন এবং রাস্তার সাংস্কৃতিক চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।

পারস্যের সঙ্গে অদৃশ্য সেতু
মুতানাব্বি স্ট্রিটকে শুধু আরব সাহিত্য দিয়ে বোঝা যায় না। এর পেছনে রয়েছে সেই পুরোনো বাগদাদ, যেখানে পারস্য, আরব, গ্রিক ও ভারতীয় জ্ঞানের মধ্যে চলত অবিরাম আদান-প্রদান।
পারস্যের কবিতা, দর্শন ও জ্ঞানচর্চা ইসলামী বিশ্বের সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। পরবর্তী শতাব্দীতে ফারসি ভাষা হয়ে ওঠে এ অঞ্চলের সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। বাগদাদ সেই বৃহৎ সাংস্কৃতিক ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
তাই মুতানাব্বি স্ট্রিটের বইয়ের তাকের দিকে তাকালে কেবল আরবি বই দেখা যায় না। দেখা যায় মধ্যপ্রাচ্যের বহু শতাব্দীর একটি সাংস্কৃতিক যাত্রা—যেখানে ভাষা বদলেছে, রাজা বদলেছেন, সাম্রাজ্য বদলেছে; কিন্তু জ্ঞানকে খুঁজে নেওয়ার মানুষের আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি।
আজও কেন মানুষ এখানে আসে?
যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার কারণে বহু বই বিক্রেতা একসময় বাগদাদ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ব্যবসাও কমে গিয়েছিল। তবু মুতানাব্বি স্ট্রিট আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কারণ বইয়ের প্রয়োজন শেষ হয়নি।
একজন শিক্ষার্থী এখানে কম্পিউটার শেখার বই কিনতে আসে। অন্য কেউ আরবি কবিতার বই খোঁজে। কেউ ইতিহাস পড়তে চায়, কেউ দর্শন। কারও কাছে বই ভবিষ্যতের চাকরির প্রস্তুতি; কারও কাছে নিজের দেশের অতীতকে বোঝার চাবি।
এই কারণেই মুতানাব্বি স্ট্রিটকে শুধু ‘বইয়ের বাজার’ বলা বোধ হয় কম বলা। এটি বাগদাদের স্মৃতির বাজার।
এখানে পুরোনো বইয়ের সঙ্গে বিক্রি হয় একটি শহরের আত্মপরিচয়। এখানে কাগজের পাতায় ঘুমিয়ে থাকে যুদ্ধের ইতিহাস, কবির স্বপ্ন, নির্বাসনের বেদনা, প্রেমের গল্প, ধর্মের বিতর্ক এবং মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে অগণিত প্রশ্ন।
সন্ধ্যায় টাইগ্রিসের ওপর আলো যখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়, মুতানাব্বি স্ট্রিটের দোকানগুলো হয়তো একে একে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কোনো একটি দোকানের ভেতর তখনও একজন পাঠক শেষ পাতাটি পড়ছেন।
হয়তো তিনি জানেন না, তার হাতে ধরা বইটির পেছনে কত শতাব্দীর ইতিহাস। তিনি শুধু পড়ছেন। আর সেই পড়ার মধ্যেই বেঁচে থাকে বাগদাদ।

একসময় এই শহর জ্ঞানকে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে নিজের কাছে ডেকে এনেছিল। আজও তার একটি সরু গলি সেই পুরোনো আহ্বানটি ধরে রেখেছে। মুতানাব্বি স্ট্রিট তাই কেবল বইয়ের রাস্তা নয়—এটি এমন এক জায়গা, যেখানে সভ্যতা বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে বলে, ‘আমার গল্প এখনো শেষ হয়নি।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









