কোনো একদিন আপনি এমন একটি দ্বীপে গিয়ে পৌঁছালেন যার মানচিত্রে কোনো নাম নেই। দ্বীপটির এক প্রান্তে সমুদ্র, অন্য প্রান্তে যুদ্ধ, মাঝখানে একটি পুরোনো শহর—আর শহরের প্রতিটি দেয়ালে লেখা আছে এমন সব বাক্য, যেগুলোর অর্ধেক কেউ মুছে দিয়েছে।
আপনি সেই বাক্যগুলোর একটি পড়তে গেলেন। দেখলেন, সেখানে লেখা ছিল—‘আমি’। কিন্তু ‘আমি’-র পরের শব্দটি নেই। কেউ শব্দটি মুছে দিয়েছে, অথবা হয়তো যুদ্ধের বিস্ফোরণে শব্দটি উড়ে গেছে। অথবা আরও ভয়ংকর কোনো ব্যাপার ঘটেছে; শব্দটি সেখানে ছিলই না।
মারিয়া স্তেপানোভার ‘ওয়্যার অব দ্য বিস্টস এন্ড দ্য এ্যানিমেল’ পড়তে গিয়ে আপনার বারবার এমন একটি দ্বীপের কথা মনে হতে পারে। এমন এক দ্বীপ, যেখানে ইতিহাস আছে কিন্তু তার মালিক নেই; স্মৃতি আছে কিন্তু স্মরণকারী নেই; ভাষা আছে, অথচ কথা বলার মানুষগুলোর ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
২০২১ সালে সাশা ডাগডেলের অনুবাদে ব্লাডঅ্যাক্স থেকে প্রকাশিত এই বইটি ছিল স্তেপানোভার কবিতার প্রথম ইংরেজি অনুবাদ। একই সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল তার স্মৃতিকথা ‘ইন মেমোরি অব মেমোরি’। দুটি বইকে পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, স্তেপানোভার কাছে স্মৃতি কোনো শান্ত, ধুলো জমা জাদুঘর নয়। স্মৃতি বরং এমন একটি ঘর, যার দরজা খুললেই অন্য একটি দরজা পাওয়া যায়; আর সেই দরজা খুললে দেখা যায়, সেখানে আমরা একা নই—আমাদের আগে যারা ছিল, তাদের কণ্ঠ, ভয়, ভুল, মৃত্যু এবং অসমাপ্ত বাক্যগুলো আমাদের অপেক্ষায় আছে।
কিন্তু প্রথমেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে। ‘ওয়্যার অব দ্য বিস্টস এন্ড দ্য এ্যানিমেল’ বইটি আসলে যুদ্ধের বই কি?
প্রশ্নটির উত্তর দিতে গেলে আমরা আবার বিপদে পড়ব। কারণ দনবাসের যুদ্ধ, রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাত—যে রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে এই কবিতাগুলোর জন্ম—তা কবিতায় খুব কমই সরাসরি উপস্থিত। যেন স্তেপানোভা যুদ্ধকে দেখছেন না, দেখছেন যুদ্ধের ছায়াকে; অথবা বলা ভালো, যুদ্ধের পরে ভাষার ওপর যে ছাই জমে থাকে, সে ছাই বইটি।

মারিয়া স্তেপানোভার কবিতার অর্ন্তগত শক্তি এটাই।
প্রাচীন কোনো রাজা যুদ্ধ শুরু করার আগে নিশ্চয়ই ভাবতেন, সৈন্য কতজন, ঘোড়া কতটি, তলোয়ার কতটি। আধুনিক রাষ্ট্রের যুদ্ধ একটু আলাদা। এখানে সৈন্যের সঙ্গে অভিধানও প্রস্তুত থাকে। কারণ মানুষকে হত্যা করার আগে কখনো কখনো শব্দকে হত্যা করতে হয়।
‘শত্রু’, ‘দেশ’, ‘জাতি’, ‘ফ্যাসিস্ট’, ‘বীর’, ‘শহিদ’, ‘সীমান্ত’—এই শব্দগুলোকে যতবার পুনরাবৃত্তি করা যায়, ততবার জীবন্ত মানুষ অদৃশ্য হতে থাকে। একটি মৃত মানুষ তখন আর মানুষ থাকে না; সে হয়ে ওঠে একটি সংখ্যা, একটি পরিসংখ্যান, একটি জাতীয় স্মৃতির উপাদান।
স্তেপানোভা এই ভাষার ধারণাকেই সন্দেহ করেন। তিনি জানেন, ইতিহাস কখনো কেবল যা ঘটেছিল তার পরিচয় নয়। ইতিহাস হলো যা ঘটেছিল তার ওপর পরে বসানো ভাষা। এবং ভাষা যদি ক্ষমতার হাতে যায়, তবে ইতিহাসও তার নিজের মুখ হারিয়ে ফেলে।
স্পোলিয়া নামের কবিতায় স্তেপানোভা লিখছেন:
‘আই’এম এ বেগেল, ‘আই’এম এ বেগেল,
সেইস দ্য স্পিকার-ইউআউট-এন-আই’
এখানে হাসি পেতে পারে। কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ থাকবে না। কারণ ‘আমি’হীন বক্তা যখন বলে, ‘আমি একটি ব্যাগেল’, তখন সে আসলে নিজের পরিচয় নিয়ে মজা করছে না; সে জানাচ্ছে, তার নিজের হয়ে কথা বলার ক্ষমতাই নেই। এ যেন এমন এক মানুষের স্বগতোক্তি, যার মুখ আছে কিন্তু কণ্ঠ নেই।
আমরা দিমিত্রিয়েভার কাছে ফিরে যাই—রুশ প্রতীকবাদী নারী কবি, যিনি ‘কেরুবিনা গাব্রিয়াক’ নামের সাহিত্যিক নামের মুখোশ ব্যবহার করেছিলেন। কেন? কারণ কখনো কখনো একজন নারীকে নিজের নামে কথা বলার চেয়ে একটি গ্রহণযোগ্য মুখোশের আড়াল থেকে কথা বলা সহজ হয়। সুতরাং স্তেপানোভার ‘আমি’ নিছক ব্যক্তিগত ‘আমি’ নয়। এটি নারী, কবি, নাগরিক এবং ইতিহাসের মধ্যে আটকে থাকা একটি কণ্ঠ।
আর সেই কণ্ঠের একটি অদ্ভুত কৌশল আছে। সে নিজের হয়ে কথা না বলে অন্যদের হয়ে কথা বলে।
স্তেপানোভার কবিতা পড়লে মনে হয়, কবিতা যেন কোনো একক লেখকের লেখা নয়। পুশকিন এসে কথা বলেন। ব্লক এসে দাঁড়ান। পুরোনো গান ঢুকে পড়ে। শিশুর ছড়া এসে যুদ্ধের পাশে বসে। কথ্য ভাষা, ধর্মীয় বাক্য, লোককথা, রূপকথা, গালি, হাস্যরস, পুরোনো কবিতা—সবাই যেন একই ঘরে এসে নিজেদের চেয়ার টেনে নেয়।
কবিতা তখন আর একটি কণ্ঠের সংগীত নয়; হয়ে ওঠে এক ধরনের জনসভা। কিন্তু সভাটির সভাপতি কে? সম্ভবত কেউ নয়। অথবা কবি নিজেই, যিনি মাঝেমধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন; ‘যথেষ্ট হয়েছে।’ তারপর তিনি ঘোষণা করেন:
‘এনাফ, আই সেইড, আই এ্যাম প্রিগ্রভ’
দিমিত্রি প্রিগভের নাম এখানে শুধু একটি সাহিত্যিক উদ্ধৃতি নয়। প্রিগভ ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি শিল্পের সীমারেখাকে সচেতনভাবে অস্বস্তিকর করে তুলেছিলেন। কবিতা, ধারণা, ব্যঙ্গ, অভিনয়—সবকিছুকে তিনি একসঙ্গে ব্যবহার করতেন। স্তেপানোভার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। তিনি যেন ভাষার একজন চোর। তবে তার চুরি করা জিনিস টাকা বা রত্ন নয়; স্তেপানোভা চুরি করেন বাক্য।
একজন কবির কাছ থেকে একটি লাইন, একটি পুরোনো গান থেকে একটি শব্দ, কোনো মৃত মানুষের স্মৃতি থেকে একটি নাম—তারপর সবকিছু এনে নিজের কবিতার ঘরে রেখে দেন। এবং আশ্চর্য ব্যাপার, চুরি করা জিনিসগুলো সেখানে এসে নতুন অর্থ পেতে শুরু করে।
কিন্তু এই সমস্ত সাহিত্যিক খেলা হঠাৎ এক জায়গায় থেমে যায়। স্তেপানোভা ১৯৪৩ সালের একটি রাস্তার মানুষের তালিকা লিখতে শুরু করেন।
একজন নার্স। সতেরো বছরের এক আয়া। পাশের সিঁড়ির জুতা পালিশকারী। একজন ভূতত্ত্ববিদ। একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। ভাসিয়া—‘কে?’ বিশ বছরের এক যুবক, যুদ্ধে নিহত। তার বাবা। তার মা। আর একটি ছোট মেয়ে, যে একদিন এসব কিছু মনে রাখবে।
এই তালিকাটি পড়তে গিয়ে মনে হয়, আমরা যেন কোনো পুরোনো জাদুঘরের দেয়ালে টাঙানো ছবির নিচে লেখা পরিচয়গুলো পড়ছি। কিন্তু পার্থক্য আছে। জাদুঘর সাধারণত রাজাদের নাম মনে রাখে। স্তেপানোভা মনে রাখেন পাশের সিঁড়ির জুতা পালিশকারীকে। ইতিহাস যেখানে বলে—‘যুদ্ধ’, কবি সেখানে বলেন—‘একজন বিশ বছরের যুবক।’ ইতিহাস যেখানে বলে—‘জনগণ’, কবি সেখানে বলেন—‘তার মা।’ এই ছোট্ট পার্থক্যটির মধ্যেই কবিতার নৈতিক শক্তি।
এক জায়গায় একজন পঙ্গু মানুষকে আমরা কথা বলতে শুনি। রাশিয়ার সীমানা কী দিয়ে তৈরি? মাটি দিয়ে? নদী দিয়ে? সীমান্তরেখা দিয়ে? না। তার উত্তর আরও অদ্ভুত: দেশের প্রতিটি মাটির অংশ যেন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের দিকে এগিয়ে যায়। রাষ্ট্র যেন শুধু সীমান্তে থাকে না; রাষ্ট্র ঢুকে পড়ে মাটির ভেতর, মানুষের চলাফেরায়, স্মৃতিতে, ভাষায়। এমনকি আকাশও যেন নজরদারির অংশ। আকাশ তাকিয়ে আছে। সব দেখছে। কিন্তু কিছু বলছে না।
স্তেপানোভার কবিতায় প্রকৃতি আর নির্দোষ নয়। আকাশও সাক্ষী। মাটিও সাক্ষী। গর্তও সাক্ষী। আর সেই গর্তের মধ্যে কবি নিজের ‘আমি’-কে খুঁজে পান। তার কবিতায় গর্তের একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। গর্ত মানে শূন্যতা। কিন্তু শূন্যতা মানে কি সত্যিই কিছু নেই? নাকি শূন্যতা আসলে এমন কিছু, যা একসময় ছিল?
একটি বাড়ি ভেঙে গেলে সেখানে যে গর্ত থাকে, সেটি বাড়ির অনুপস্থিতি নয়; বরং বাড়িটির শেষ চিহ্ন। একজন মানুষ নিখোঁজ হলে তাঁর অনুপস্থিতিও তাঁর অস্তিত্বের সাক্ষ্য। এই জায়গায় এসে স্তেপানোভা নিজের ‘আমি’-কে একটি গভীর অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করেন। যেন দেশের শরীরের ভেতর অসংখ্য গর্ত, সুড়ঙ্গ, খনি—আর সেখানে একটি ছোট্ট ‘আমি’ ঝুলে আছে। ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের এক অদ্ভুত ছবি হয়ে।
‘আমি’ এখানে স্বাধীন কোনো দ্বীপ নয়। বরং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে টিকে থাকা একটি ছোট্ট কুপি।
‘ওয়্যার অব দ্য বিস্টস এন্ড দ্য এ্যানিমেলস’ কবিতায় ভাষা নিজেই ভেঙে যেতে শুরু করে। শব্দে অক্ষর আলাদা হয়ে যায়।বাক্য ভেঙে যায়। কখনো একটি শব্দের অংশ অন্য শব্দের সঙ্গে জুড়ে যায়। মনে হয়, অভিধানের পাতাগুলোতে বিস্ফোরণ ঘটেছে। এটি কেবল অলংকার নয়। যদি যুদ্ধ মানুষের স্মৃতি ভেঙে দেয়, তবে সেই স্মৃতির ভাষাও কি অক্ষত থাকতে পারে?
স্তেপানোভার উত্তর—সম্ভবত পারে না। তাই তার কবিতায় আমরা পাই মৃত জিপসি, মৃত হুসার, সন্ধ্যার অন্ধকার, টেবিলের ওপর ছিটকে পড়া রক্তের মতো শব্দ। কিন্তু এর মধ্যেও ছন্দ আছে। এখানেই কবিতাটি সবচেয়ে অদ্ভুত হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের ভেতর ছড়া। মৃত্যুর পাশে শিশুর গান। ধ্বংসের মধ্যে অন্ত্যমিল। যেন পৃথিবী শেষ হয়ে গেলেও কোনো শিশু এখনও ছড়া কাটছে।
পুরাণও স্তেপানোভার কবিতায় ফিরে ফিরে আসে। ডিমিটার—শস্য ও মাতৃত্বের দেবী। হেকাটি—অন্ধকার ও সীমান্তের দেবী। কিন্তু তাদের আমরা কোনো মন্দিরে দেখি না। তারা কাদার মধ্যে হাঁটছেন। যুদ্ধক্ষেত্রের গন্ধে তাদের পুরাণের মহিমা ম্লান হয়ে গেছে। এখানে প্রাচীন দেবী আর আধুনিক যুদ্ধ একই ছবিতে এসে দাঁড়ায়।
মাতৃত্ব তখন আর শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার বিষয় নয়; সন্তান হারানোরও নাম। মাটি শুধু মাতৃভূমি নয়; মাটি হলো কবরস্থান।
আর আকাশ শুধু স্রষ্টার বাসস্থান নয়; কখনো কখনো সেটি একজন নির্বাক সাক্ষী।
‘ওয়্যার অব দ্য বিস্টস এন্ড দ্য এ্যানিমেলস’ বইয়ের একটি প্রশ্ন আরও ধীরে, প্রায় অদৃশ্যভাবে উঠে আসে। নারী কবিদের নাম কোথায়? পুশকিনের নাম আছে। ব্লকের নাম আছে। পুরুষ কবিদের উদ্ধৃতি অনেক সময় স্পষ্ট। কিন্তু নারী কবিদের ক্ষেত্রে স্তেপানোভা তাদের কণ্ঠ ব্যবহার করেও তাদের নাম আড়াল করেন। কানাডার একজন নারী কবির কবিতা আসে—নাম নেই। ড্যানিশ ভাষায় লেখা আরেক নারী কবির কবিতা আসে—নাম নেই। শেষ পর্যন্ত পাঠককে ধাঁধা সমাধান করতে হয়।
কোনো এক পুরোনো বই খুলতে হয়। কোনো একটি লাইন খুঁজতে হয়। তারপর আবিষ্কার করতে হয়—এই কণ্ঠটি অমুক নারীর। এখানে কবিতাটি যেন নিজের বিরুদ্ধেই একটি প্রশ্ন তোলে।
যে নারী কবি ইতিহাসে নারীর কণ্ঠ হারিয়ে যাওয়ার কথা বলেন, তার কবিতাতেই কেন নারী কবিদের নাম হারিয়ে যায়?হয়তো এটি ইচ্ছাকৃত। হয়তো অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু পাঠকের সামনে প্রশ্নটি রেখে যাওয়া হয়েছে। এবং কখনো কখনো প্রশ্নের চেয়ে বড় কবিতা আর কিছু হয় না।
সাশা ডাগডেলের কাজটি ছিল এক অর্থে আরেকটি সমুদ্রযাত্রা। একটি রুশ শব্দের পেছনে হয়তো রয়েছে শত বছরের ইতিহাস। একটি ছড়ার পেছনে রয়েছে শৈশবের স্মৃতি। একটি গালির পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ভাষা। একটি নামের পেছনে রয়েছে মৃত একজন কবি। এসবকে ইংরেজিতে নিয়ে যাওয়া মানে কেবল শব্দ বদলানো নয়। যেন এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে মানুষের স্মৃতি নিয়ে যাওয়া।
কিন্তু অনুবাদক মাঝসমুদ্রে বুঝতে পারেন—সবকিছু সঙ্গে নেওয়া যায় না। কিছু শব্দ হারিয়ে যাবে। কিছু ইঙ্গিত হারিয়ে যাবে। কিছু ইতিহাস পাঠকের চোখ এড়িয়ে যাবে। তাই বইটির সঙ্গে আরও ব্যাখ্যামূলক টীকা থাকলে পাঠকের জন্য ভালো হতো। বিশেষ করে রুশ সাহিত্য, সোভিয়েত ইতিহাস এবং রাজনৈতিক ভাষার অসংখ্য ইঙ্গিত ইংরেজি পাঠকের কাছে স্বাভাবিকভাবে পরিচিত নয়। তবু ডাগডেলের অনুবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এই যে, তিনি কবিতার ভাঙনটিকে মসৃণ করে দেননি। তিনি ফাটলগুলো রেখেছেন। আর সেই ফাটল দিয়েই আলো ঢোকে।
একটি কবিতার বইকে কখনো কখনো একটি দ্বীপের সঙ্গে তুলনা করা যায়। দ্বীপটি সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। তার চারপাশে ইতিহাস। তার ভেতরে মৃতেরা। কোথাও একটি পুরোনো বই। কোথাও একটি শিশুর স্মৃতি। কোথাও একজন নির্বাসিত মানুষ। কোথাও একটি নামহীন নারী কবির কণ্ঠ।
আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন মারিয়া স্তেপানোভা।
তিনি জানেন না, নিজের কণ্ঠটি কোথায়। তাই তিনি অন্যদের কণ্ঠ ধার করেন। তিনি জানেন না, ইতিহাস কীভাবে মনে রাখা উচিত। তাই তিনি মৃতদের নাম লেখেন। তিনি জানেন না, যুদ্ধের ভাষাকে কীভাবে বিশ্বাস করবেন। তাই তিনি শব্দগুলো ভেঙে দেন। তিনি জানেন না, ‘আমি’ কোথায় শেষ এবং ‘আমরা’ কোথায় শুরু। তাই তিনি বলেন—‘আমরা।’ এই কারণে ‘ওয়্যার অব দ্য বিস্টস এন্ড দ্য এ্যানিমেলস’ শেষ পর্যন্ত শুধু যুদ্ধের কবিতা নয়।
এটি স্মৃতির কবিতা। ভাষার কবিতা। অনুপস্থিতির কবিতা। আর সবচেয়ে বেশি—নিজের কণ্ঠ হারিয়ে ফেলার পরও কীভাবে কথা বলা যায়, সেই প্রশ্নের কবিতা।
সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নামহীন দ্বীপে হয়তো শেষ পর্যন্ত কোনো মানচিত্রই কাজে আসে না। শুধু কয়েকটি শব্দ থাকে।
একজন নার্স।
একজন সতেরো বছরের মেয়ে।
একজন জুতা পালিশকারী।
একজন মৃত যুবক। তার মা।
একটি ছোট মেয়ে, যে সবকিছু মনে রাখবে।
আর দূরে কোথাও, ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি ভাষার ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ একটি কণ্ঠ বলবে—
‘আমি।’ তারপর থেমে যাবে। কারণ সেই ‘আমি’-এর পরের শব্দটি এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
স্মৃতির দ্বীপে ‘ইন মেমোরি অব মেমোরি’
মনে করুন আপনার কাছে একটি পুরোনো ছবি আছে। ছবিটিতে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে একজন আপনার দাদি, যাঁকে আপনি হয়তো চিনতে পারেন। আরেকজন এমন একজন মানুষ, যাঁকে আপনি কখনো দেখেননি। তিনি ছবির একেবারে কোণে দাঁড়িয়ে আছেন, চোখে পিন্স-নে, মুখে এমন এক গম্ভীর ভাব, যেন পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত আপত্তি আছে।
এখন প্রশ্ন হলো—তিনি কে?
আপনি যদি ছবিটিকে কেবল একটি ছবি হিসেবে দেখেন, তবে তিনি একজন অজ্ঞাতপরিচয় মানুষ।
কিন্তু আপনি যদি ছবিটির ইতিহাস খুঁজতে শুরু করেন, তবে তিনি হয়ে উঠতে পারেন ইয়াকভ স্ভের্দলোভ—রুশ বিপ্লবের এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা, রোমানভ পরিবার হত্যার সঙ্গে যার নাম জড়িয়ে আছে, যিনি পরে রেড টেররের সূচনাকারী এক আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ ফ্লুতে মারা গিয়েছিলেন।
এখন ছবিটির দিকে আবার তাকান। দেখবেন, ছবিটি আর আগের মতো নেই। এখানেই মারিয়া স্তেপানোভার ‘ইন মেমোরি অব মেমোরি’-এর রহস্য ।
কারণ একটি ছবি কখনো শুধু একটি ছবি নয়। একটি চিঠি কখনো শুধু একটি চিঠি নয়। একটি পুরোনো ব্রেসলেট, একটি বিবর্ণ রসিদ, একটি ভাঙা চেয়ার, একটি অচেনা মুখ—এগুলো প্রত্যেকেই এমন দরজা, যার ওপারে আরেকটি ঘর। আর সেই ঘরের ওপারে আরেকটি। শেষ পর্যন্ত আপনি বুঝতে পারেন, আপনি কোনো পরিবারের ইতিহাস খুঁজছেন না; আপনি আসলে খুঁজছেন সেই অদৃশ্য যন্ত্রটিকে, যার সাহায্যে মানুষ অতীতকে বর্তমানের মধ্যে বয়ে নিয়ে আসে।
সেই যন্ত্রটির নাম—স্মৃতি। কিন্তু স্মৃতি কি সত্যিই অতীতকে ধরে রাখে? নাকি সে অতীতকে প্রতিবার নতুন করে বানায়?স্তেপানোভার বইটি এই দ্বিতীয় সম্ভাবনাটির দিকেই আমাদের নিয়ে যায়।
‘ইন মেমোরি অব মেমোরি’ পড়ার সময় প্রথম বিপত্তিটিই হলো—বইটিকে কোথায় রাখা হবে? এটি কি স্মৃতিকথা? হ্যাঁ, কারণ লেখক নিজের পরিবার, নিজের শৈশব এবং নিজের স্মৃতির কথা বলেন। এটি কি ইতিহাস? অবশ্যই, কারণ রাশিয়া, ইউরোপের ইহুদি জীবন, বিপ্লব, যুদ্ধ, সোভিয়েত যুগ এবং বিংশ শতাব্দীর বিপর্যয় এখানে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এটি কি উপন্যাস? কখনো কখনো মনে হয়, অবশ্যই।
আবার কখনো মনে হয়, না, এটি কোনো উপন্যাস নয়; বরং উপন্যাস হওয়ার সম্ভাবনাকে নিয়ে লেখা একটি বই। আর যদি কেউ বলেন এটি প্রবন্ধ, তাকেও পুরোপুরি ভুল বলা যায় না। বইটি যেন একটি আলমারি, যার কোনো তাকের গায়ে নাম লেখা নেই। আপনি একটি বই তুলে নেন, আর সেটি আপনাকে অন্য একটি বইয়ের দিকে পাঠায়।

আপনি একটি পারিবারিক চিঠি পড়েন, আর চিঠিটি আপনাকে রাশিয়ার ইতিহাসে নিয়ে যায়।
আপনি একটি ছবি দেখেন, আর ছবিটি আপনাকে হলোকাস্ট, বিপ্লব, যুদ্ধ, নির্বাসন এবং শেষে আপনার নিজের জীবনের দিকে ফিরিয়ে দেয়।এমন বইয়ের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—এটি শেষ করার পর পাঠক আর আগের মানুষটি থাকেন না।
গল্পটির শুরু প্রায় এমন একটি জায়গায়, যেখানে একজন প্রত্নতাত্ত্বিক আনন্দিত হতে পারেন কিন্তু একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আতঙ্কিত হবেন। একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্ট। সেখানে বই। কাগজ। পুরোনো সংবাদপত্র। গয়না। ছবি। আসবাব। চিঠি।
আর এমন অসংখ্য জিনিস, যেগুলোর কোনোটি ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ প্রত্যেকটির সঙ্গে কোনো না কোনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
এই ঘরটি মারিয়া স্তেপানোভার খালা গালিয়ার।
গালিয়া ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি পৃথিবীকে জিনিসের মাধ্যমে ধরে রাখতে চাইতেন। একটি জিনিস চলে গেলে যেন তার সঙ্গে একটি মানুষও চলে যাবে—এই ভয় থেকেই হয়তো তার সংগ্রহ।
তার ঘর তাই ঘর নয়। এটি একটি আর্কাইভ। অথবা আরও ভালো করে বললে, একটি ক্ষুদ্র মহাবিশ্ব। সেখানে সবকিছুরই কোনো না কোনো অর্থ আছে। এবং এখানেই আমরা স্মৃতির প্রথম সমস্যাটি খুঁজে পাই।
যদি সবকিছুর অর্থ থাকে, তবে কোন জিনিসটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ? পুরোনো ব্রেসলেট? একটি সংবাদপত্রের কাটিং? একটি ভাঙা চশমা? একটি ছবি যার পেছনে তারিখ লেখা নেই? নাকি সেই কাগজটি, যার ওপর এমন একটি নাম লেখা আছে যা আর কেউ চিনতে পারে না?
গালিয়া কোনো উত্তর রেখে যাননি। তার রেখে যাওয়া জিনিসগুলোই প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেল।
স্তেপানোভা তার পরিবারের ইতিহাস খুঁজতে বের হন। তিনি চিঠি পড়েন। ছবি দেখেন। সরকারি নথি খোঁজেন। পুরোনো শহরে যান। কবরস্থান ঘুরে দেখেন। আর্কাইভে বসেন। মানুষের দরজায় কড়া নাড়েন। অর্থাৎ একজন ভালো ইতিহাসবিদ যা করেন, তিনি তাই করেন। কিন্তু সমস্যা হলো—তিনি ইতিহাসবিদ নন। তিনি একজন কবি।
আর কবির বিপদ হচ্ছে, প্রমাণের জায়গায়ও তিনি কল্পনা দেখতে পান। একটি চিঠিতে লেখা আছে— ‘সব ভালো।’ ইতিহাসবিদ হয়তো বলবেন: তথ্য অপ্রতুল। কবি প্রশ্ন করবেন; কেন ‘সব ভালো’ লিখতে হলো? কী ভালো ছিল না? কাকে আশ্বস্ত করা হচ্ছিল? কোন ভয়টি চিঠির বাইরে রাখা হয়েছিল?
এই প্রশ্নগুলোই ধীরে ধীরে বইটির প্রকৃতি বদলে দিল।
স্তেপানোভা বুঝতে পারেন, তার পরিবারের ইতিহাস কোনো মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রত্নবস্তু নয়। তিনি যত খুঁড়বেন, তত নতুন করে তাকে তৈরি করবেন। অতীতকে উদ্ধার করা যায় না। অতীতের সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি করা যায়।
এখানে একটি বিপজ্জনক প্রশ্ন পা টিপে হাঁটে। আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবন নিয়ে গল্প বলার অধিকার আমাদের কতটা?প্রথমে মনে হয়—সম্পূর্ণ অধিকার আছে। তারা আমাদের পূর্বপুরুষ। তাদের জীবন আমাদের জীবন তৈরি করেছে। তাদের গল্প আমাদের গল্প। কিন্তু তারপর স্তেপানোভা একটি চিঠির সামনে এসে থামেন। চিঠিটি তার বাবা লিখেছিলেন।
কাজাখস্তানের তৃণভূমিতে একটি গোপন মহাকাশ প্রকল্পে কাজ করার সময় তিনি প্রাণবন্ত, মজার চিঠি লিখেছিলেন। পড়লে মনে হয়, এক অসাধারণ মানুষ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতার গল্প বলছেন।
স্তেপানোভা সেই চিঠি বইয়ে রাখতে চাইলেন। বাবা রাজি হলেন না। কারণ চিঠির মানুষটি পুরোপুরি তিনি ছিলেন না। তিনি পাঠকের জন্য নিজের একটি চরিত্র তৈরি করেছিলেন। এখানে এসে বইটির মাটি একটু সরে যায়। কারণ তখন প্রশ্নটি শুধু ‘স্মৃতি কি সত্য?’ থাকে না। প্রশ্ন হয়— মৃত মানুষের নিজের গল্পের ওপর কি কোনো অধিকার আছে? জীবিত মানুষ বলতে পারে, ‘আমার চিঠি ছাপবে না।’ মৃত মানুষ পারে না। মৃতেরা আমাদের হাতে অদ্ভুতভাবে অসহায়। তাদের ছবি আমরা ছাপতে পারি। তাদের চিঠি খুলতে পারি। তাদের জীবন নিয়ে গল্প বানাতে পারি। তাদের হয়ে কথা বলতে পারি। আর তারা প্রতিবাদ করতে পারবেন না।
স্তেপানোভা এই উপলব্ধির পর তার নিজের কাজকেই সন্দেহ করতে শুরু করেন।
চিঠির একটি অদ্ভুত গুণ আছে। চিঠিতে যা লেখা থাকে, তার চেয়ে কখনো কখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয় যা লেখা থাকে না।যুদ্ধক্ষেত্র থেকে একজন মানুষ বাড়িতে লিখছে। সে জিজ্ঞেস করছে—বাড়ির সবাই কেমন আছে? কিন্তু সে লিখছে না, সে ভয় পাচ্ছে। সে লিখছে না, তার পাশে মানুষ মারা যাচ্ছে। সে লিখছে না, আগামীকাল সে নিজে বেঁচে থাকবে কি না সে জানে না।
কারণ হয়তো সেন্সর আছে। অথবা সে নিজের পরিবারকে ভয় দেখাতে চায় না।অথবা সে নিজেই নিজের ভয়কে ভাষা দিতে পারছে না। তাই চিঠির ফাঁকগুলোই হয়ে ওঠে আসল ইতিহাস। স্তেপানোভার পূর্বপুরুষদের চিঠিতে পুরুষেরা যেন দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। নারীরা অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। পুরুষেরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে খবর পাঠায়। নারীরা ঘর, সন্তান, ভালোবাসা, অপেক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনকে আগলে রাখে। ইতিহাস যেন তখন পুরুষদের যুদ্ধ নয়, নারীদের অপেক্ষায় লেখা হয়।
স্তেপানোভার বইয়ে এমন কিছু বাক্য আছে, যেগুলো এত ছোট যে প্রথমে মনে হয় সেগুলো হয়তো সাধারণ তথ্য। তারপর হঠাৎ বোঝা যায়—না, এটি ইতিহাসের একটি দরজা। লেনিনগ্রাদের অবরোধের সময় লাইব্রেরির মেঝেতে মৃত লাইব্রেরিয়ানদের দেহ পড়ে ছিল। তবু মানুষ বই ধার নিতে পারত। ভাবুন দৃশ্যটি। বাইরে যুদ্ধ। শহর অনাহারে। মানুষ মারা যাচ্ছে। আর একটি লাইব্রেরিতে মৃত লাইব্রেরিয়ানদের পাশ দিয়ে কেউ হয়তো একটি বই নিতে এসেছে। সভ্যতা কখন শেষ হয়? শেষ মানুষটি মারা গেলে? শেষ বইটি পুড়ে গেলে? নাকি যখন কেউ আর বই ধার নিতে আসে না?
স্তেপানোভার বই কোনো সরল উত্তর দেয় না। সে শুধু দৃশ্যটি রেখে দেয়। আর পাঠককে তাকিয়ে থাকার সুযোগ করে দেয়।
সম্ভবত ‘ইন মেমোরি অব মেমোরি’ বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো—স্মৃতি ও ইতিহাস একই জিনিস নয়। ইতিহাস লিখিত হয়। স্মৃতি উত্তরাধিকার হিসেবে আসে। ইতিহাস নির্ভুল হতে চায়। স্মৃতি ন্যায়বিচার চায়। ইতিহাস হিসাব রাখে। স্মৃতি ব্যথা মনে রাখে। ইতিহাস বলে—কী ঘটেছিল। স্মৃতি বলে—এটি কার সঙ্গে ঘটেছিল।
এই পার্থক্যটি ছোট নয়। কারণ ইতিহাসের একটি মৃত মানুষ এক কোটি মানুষের পরিসংখ্যানের অংশ হতে পারে। কিন্তু স্মৃতির একজন মৃত মানুষ হতে পারে আপনার দাদা। অথবা এমন একজন মানুষ, যার মুখ আপনি কোনো পুরোনো ছবিতে দেখেছেন এবং যার নাম আপনি জানেন না। স্মৃতি তখন ব্যক্তিগত। আর ব্যক্তিগততাই স্মৃতিকে নৈতিক করে তোলে।
শৈশবে স্তেপানোভা সেক্রেতিকি নামে একটি খেলা খেলতেন। ছোট্ট কোনো গর্তে শিশুরা লুকিয়ে রাখত পালক, পাথর, কাগজ, ছোটখাটো প্রিয় জিনিস। তারপর মাটি চাপা দিত। কেউ পরে সেগুলো খুঁজে বের করার কথা ভাবত না। লুকিয়ে রাখাটাই ছিল উদ্দেশ্য।
‘ইন মেমোরি অব মেমোরি’তে খেলাটি হঠাৎ সাহিত্য হয়ে ওঠে। কারণ একটি জিনিসকে পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হতে না দেওয়া—এটিও এক ধরনের প্রতিরোধ। হয়তো কেউ জানবে না, কোথায় সেটি আছে। তবু সেটি আছে। এটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই খেলাকে স্তেপানোভা পরে শিল্পী জোসেফ কর্নেলের বাক্সের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন—যেখানে পরিত্যক্ত ছোট ছোট জিনিস একত্রিত হয়ে নতুন নতুন অর্থ পায়।
এ যেন মানুষের সবচেয়ে পুরোনো প্রবৃত্তিগুলোর একটি; হারিয়ে যেতে বসা জিনিসকে ধরে রাখা।
ফটোগ্রাফ নিয়ে স্তেপানোভার চিন্তা বিশেষভাবে গভীর। আমরা সাধারণত ভাবি, একটি ছবি আমাদের অতীত দেখায়। কিন্তু তিনি প্রশ্ন করেন—ছবিটি কি উল্টোভাবে আমাদেরও পড়তে পারে? আপনি আপনার দাদির পুরোনো ছবি দেখছেন। আপনি তার মুখ দেখছেন।
কিন্তু একই সঙ্গে সেই মুখ আপনার নিজের মুখের কোনো অদৃশ্য রেখা, আপনার পরিবারের কোনো অভ্যাস, আপনার ভয় বা আপনার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ছবি তখন নথি নয়। মাধ্যম। এটি অতীতকে শুধু দেখায় না। বর্তমানকেও বদলে দেয়। এই জায়গায় স্তেপানোভার চিন্তা সুসান সনট্যাগের ফটোগ্রাফি-বিষয়ক ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়।
একটি ছবি অতীতকে সংরক্ষণ করে না শুধু। এটি ভবিষ্যতের মানুষকে অতীত দেখার নতুন পদ্ধতিও শেখায়।
এখন প্রশ্নটি আরও অস্বস্তিকর। আজ আমরা সবাই ছবি তুলি। সেলফি। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি। পরিবারের ছবি। পাসপোর্টের ছবি। প্রতিটি ছবি আমাদের নিজের একটি সংস্করণ তৈরি করছে। আজকের মুখটি আগামীকালের মৃত মুখ হবে। কিন্তু ভবিষ্যতের মানুষ যখন সেই মুখ দেখবে, তারা কি সেই মানুষটিকেই দেখবে, যে আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছিল?
সম্ভবত না। কারণ ছবি কখনো সম্পূর্ণ মানুষকে ধরে রাখতে পারে না। রেমব্রান্ট নিজের অসংখ্য আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছিলেন তবু আমরা তার সেই ছবিগুলোর মাধ্যমে তাকে পুরোপুরি জানতে পারি না। বরং প্রতিটি ছবি নতুন একটি রহস্য তৈরি করে।
সেলফিও তাই। আমরা নিজেদের সংরক্ষণ করছি। কিন্তু একই সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কে একটি কল্পিত ইতিহাসও তৈরি করছি। ভবিষ্যতের মৃতেরা আজকের ক্যামেরার ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে।
বইটির সবচেয়ে অদ্ভুত পরিবর্তন আসে যখন স্তেপানোভার দৃষ্টি অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে মোড় নেয়। ফ্রান্সে তার দাদির পুরোনো পথ অনুসরণ করতে গিয়ে তিনি বর্তমানের ইহুদিবিদ্বেষের নতুন লক্ষণ দেখতে পান। তখন অতীতের ভয়াবহতা অন্যরকম হয়ে ওঠে। আমরা সাধারণত ভাবি, অতীত সবচেয়ে ভয়ংকর। কিন্তু স্তেপানোভা বলেন, এমনও হতে পারে যে ভবিষ্যৎ আমাদের কাছে আরও ভয়ংকর।
কারণ অতীত সম্পর্কে অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিত—সেটি ইতিমধ্যে ঘটে গেছে। ভবিষ্যৎ এখনও আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তাই কখনো কখনো অতীতের সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনাও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার পাশে প্রায় শান্ত মনে হয়।
এ যেন সেই অদ্ভুত দ্বীপ, যার একদিকে গতকাল, অন্যদিকে আগামীকাল। মানুষ মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কোন দিকের স্রোত তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, সে জানে না।
‘ইন মেমোরি অব মেমোরি’র শেষদিকে স্তেপানোভা একটি পুরোনো ইহুদি কবরস্থানে যান। সমাধিফলকগুলো আগাছায় ঢেকে গেছে। নামগুলো প্রায় অদৃশ্য। সময় তার কাজ করে যাচ্ছে। একদিন এই নামগুলোও হয়তো পড়া যাবে না।
তাহলে স্মৃতির কাজ কী? মৃত মানুষকে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা? অসম্ভব। তাদের জীবনের সম্পূর্ণ সত্য বলা? সেটিও অসম্ভব। একটি ছবি তাদের জীবন নয়। একটি চিঠিও নয়। একজন উত্তরসূরির স্মৃতিও নয়।
তাহলে আমরা কী করতে পারি? আমরা শুধু ছোট ছোট চিহ্ন সংগ্রহ করতে পারি। একটি নাম। একটি ছবি। একটি চিঠি। একটি ব্রেসলেট। একটি পুরোনো রসিদ। একটি শিশুর গোপন কবর। তারপর সেগুলো পাশাপাশি রেখে অপেক্ষা করতে পারি।
হয়তো কোনো গল্প তৈরি হবে। কিন্তু সেই গল্পকে সত্যের শেষ কথা বলে দাবি করা যাবে না। কারণ মৃতেরা আমাদের কাছে তাদের জীবনের কেবল টুকরো রেখে গেছে। জীবন নয়।
এই কারণেই ‘ইন মেমোরি অব মেমোরি’ আসলে কোনো পরিবারের ইতিহাস নয়। এটি ইতিহাসের ভেতর একটি পরিবারকে খুঁজে পাওয়ার গল্পও নয়। বরং এটি সেই মানুষটির গল্প, যে বুঝতে পারে—সে যত বেশি অতীতকে খুঁজছে, তত বেশি নিজের বর্তমানকে আবিষ্কার করছে।
আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের খুঁজি। তারপর আবিষ্কার করি, তাদের ভয় আমাদের ভয় হয়ে গেছে। তাদের নীরবতা আমাদের নীরবতা। তাদের রেখে যাওয়া জিনিস আমাদের ঘরে এসে বসেছে। তাদের গল্প আমাদের নিজের গল্পের ভেতর ঢুকে গেছে।
শেষ পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারি—স্মৃতি অতীতকে বাঁচিয়ে রাখে না। স্মৃতি আমাদের ভেতর অতীতের একটি নতুন জীবন তৈরি করে। আর সেই জীবন কখনো সম্পূর্ণ নয়। তার মধ্যে ফাঁক আছে। ভুল আছে। কল্পনা আছে। ভালোবাসা আছে। অপরাধবোধ আছে। আবার আছে ভুলে যাওয়ার ভয়।
স্তেপানোভার সাহিত্য সেই ভয়কে অস্বীকার করে না। বরং তিনি তার সঙ্গে বসে থাকেন। পুরোনো ছবির সামনে। একটি চিঠির পাশে। একটি কবরের সামনে। একটি শিশুর লুকিয়ে রাখা ছোট্ট পাথরের পাশে। তিনি জানেন, কোনো গল্পই মৃতদের পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারে না।
তবু গল্প বলা দরকার। কারণ ভুলে যাওয়া আরও সহজ। আর হয়তো স্মৃতির আসল কাজ মৃতদের পুনরুত্থান ঘটানো নয়।তার কাজ হলো— অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগে তাদের দিকে আরেকবার তাকানো। তারপর যা আছে, তা সামনে রেখে বলা:
এইটুকুই আমাদের কাছে পৌঁছেছে। এখন তুমি এর অর্থ নিজের মতো করে খুঁজে নাও।
পরিচিতি
রুশ লেখক, কবি ও প্রাবন্ধিক মারিয়া স্তেপানোভা ১৯৭২ সালে মস্কোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মস্কোর ম্যাক্সিম গোর্কি ইনস্টিটিউট অব লিটারেচারে পড়াশোনা করেন এবং কবি হিসেবে সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ করেন। তার কবিতা বিভিন্ন বিখ্যাত সাহিত্যপত্র ও গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে বহু প্রবন্ধও লিখেছেন।
তার উল্লেখযোগ্য বই ‘ইন মেমরি অব মেমরি’ (২০১৭; ইংরেজি অনুবাদ ২০২১)। এটি স্মৃতি, ইতিহাস এবং ব্যক্তিমানুষের অতীতকে নিয়ে লেখা এক ধরনের দার্শনিক-প্রামাণ্য উপন্যাস। বইটিতে তিনি নিজের ইহুদি-রুশ পরিবারের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বিশ শতকের রাশিয়ার রাজনৈতিক নিপীড়ন ও ভয়ের সময়কে তুলে ধরেছেন। ভ্রমণকাহিনি, পুরোনো ছবি, পারিবারিক স্মৃতি ও নানা প্রশ্নের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই অনন্য রচনা। স্তেপানোভা দেখিয়েছেন, স্মৃতি সব সময় নির্ভরযোগ্য নয়; কখনও কখনও স্মৃতি সত্যের সঙ্গে কল্পনাকেও মিশিয়ে দেয়।
তার কবিতাতেও রাশিয়ার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার ছাপ রয়েছে। নারীদেহ, পুরুষের দৃষ্টি, যুদ্ধ, মৃত্যু ও প্রকৃতি তার কবিতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘দ্য জাম্প’ উপন্যাসে তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিজের অনুভূতি ও চিন্তা প্রকাশ করেছেন।
স্তেপানোভা বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন এবং তার লেখা নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি ‘ওপেন স্পেইস.রু’ পরিচালনা করেন এবং পরে ‘ক্রোল্টা.রু’-এর প্রধান সম্পাদক হন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









