ধরা যাক, কোনো এক রাতে আপনি একটি শহরের চত্বরে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার পায়ের নিচে পাথর, সামনে একটি ক্যাফে, কয়েকটি খালি চেয়ার, দূরে একটি টাওয়ার এবং মাথার ওপরে কিছু তারা। আপনি ভাবতে পারেন, এর চেয়ে সাধারণ দৃশ্য আর কী হতে পারে? অথচ শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাগুলোর একটি হলো—কখনও কখনও একটি সাধারণ রাতই পৃথিবীর সমস্ত রাতের প্রতিনিধিত্ব করতে শুরু করে।
১৮৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ আর্ল শহরের প্লাস দ্য ফোরামে দাঁড়িয়ে এমনই একটি রাত দেখেছিলেন। অথবা বলা ভালো, তিনি যে রাত দেখেছিলেন, তা আমাদের রাতের সঙ্গে পুরোপুরি এক ছিল না। কারণ তিনি জানতেন, চোখ যা দেখে, সময় তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু লুকিয়ে রাখে।
এই ছবিটির নাম ‘ক্যাফে টেরেস অ্যাট নাইট’। পরে আমরা ‘দ্য স্টারি নাইট’-এর কথা বলব, কারণ তার আগে এই চিত্রকর্মটিকে মনে রাখা দরকার। সেটিই ছিল ভ্যান গঘের প্রথম তারাভরা রাত। এবং সম্ভবত প্রথমবারের মতো তিনি রাতকে অন্ধকার হিসেবে নয়, বরং আলোর আরেকটি রূপ হিসেবে আবিষ্কার করেছিলেন।
আর্লে আসার আগে ভ্যান গঘ বিচিত্র জীবন যাপন করেছেন। শিল্পের ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ধর্মপ্রচারক, তারপর শিল্পী। যেন এক শরীরের মধ্যে একাধিক মানুষ বাস করছিল। প্যারিসের ক্লান্তি থেকে পালিয়ে তিনি দক্ষিণ ফ্রান্সে এসেছিলেন। তার ধারণা ছিল, এখানে আলো এত প্রবল যে পুরোনো মানুষটিকে হয়তো মুছে ফেলে নতুন মানুষ হয়ে ওঠতে সাহায্য করবে।

কিন্তু মানুষ কি কখনও নিজের অতীত থেকে পালাতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর যেন ছবির প্রতিটি পাথর জানে। পাথরের নিচে যে শহর
ছবির সামনের অংশে পাথর বিছানো রাস্তা। প্রথম দেখায় মনে হয়, ভ্যান গঘ যেন পথটিকে শুধু আলোয় ভিজিয়ে দিয়েছেন। হলুদ, বেগুনি, নীল, সবুজ—রাতের পাথরগুলো যেন ছোট ছোট তারায় পরিণত হয়েছে।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই পাথরের নিচে সত্যিই আরেকটি শহর ছিল।
ভ্যান গঘ যে জায়গায় দাঁড়িয়েছিলেন, তার নিচে প্রাচীন রোমান স্থাপত্যের ভূগর্ভস্থ গ্যালারি—ক্রিপ্টোপর্টিকাস। একসময় এই কাঠামো বহন করত রোমান ফোরামকে। অর্থাৎ শিল্পী যখন নতুন একটি রাত আঁকছিলেন, তার পায়ের নিচে তখনও ঘুমিয়ে ছিল দুই হাজার বছরের পুরোনো একটি শহর ও সেই শহরের রাতগুলো।
কী অদ্ভুত, তাই না?
ভ্যান গঘ সামনে তাকিয়ে ভবিষ্যৎ আঁকছেন, অথচ দাঁড়িয়ে আছেন অতীতের ওপর।
এখানে পাথর শুধু পাথর নয়। তারা ইতিহাসের ভাঙা অক্ষর। যে মানুষটি সেই ইতিহাস পড়তে পারে না, সে কেবল রাস্তা দেখে। যে পারে, সে একটি সমাধির ওপর দিয়ে হাঁটতে থাকে।
যে স্তম্ভগুলো সেখানে থাকার কথা ছিল না
এবার আমরা চিত্রকর্মটির মাঝখানে তাকাই; দেখা যায় একটি ভবন, জানালা, পর্দা এবং দুজন মানুষ। কিন্তু বাস্তবের ভবনটি ভ্যান গঘের ক্যানভাসে পুরোপুরি বাস্তব থাকেনি। তিনি সেখানে বসিয়েছেন প্রাচীন রোমান স্থাপত্যের স্তম্ভ ও একটি ভাঙা পেডিমেন্টের অংশ।
এখান আমাদের একটি ছোট প্রশ্ন করতে হয়—শিল্পী কি মিথ্যা বলছেন?
যদি বলেন, তিনি যা দেখেছেন তা আঁকেননি—তাহলে উত্তরটি হ্যাঁ। কিন্তু যদি বলেন, তিনি যা দেখেছিলেন তার চেয়ে বেশি কিছু আঁকতে চেয়েছিলেন—তাহলে উত্তরটি না।
ভ্যান গঘের কাছে বাস্তবতা ছিল কোনো আদালতের সাক্ষ্য নয়। তিনি তাকে বদলে দিতে পারতেন। একটি আধুনিক ভবনের মধ্যে তিনি ঢুকিয়ে দিতে পারতেন রোমান সাম্রাজ্যকে। যেন সময়ের দেয়াল খুব পাতলা; একটু আঁচড় দিলেই খ্রিস্টীয় উনিশ শতকের নিচ থেকে বেরিয়ে আসবে সিজারের পৃথিবী।
এ মুহূর্ত চিত্রকর্মটি আর্ল শহরের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। কারণ প্রতিটি শহরই আসলে বহু শহরের ওপর নির্মিত। আমরা যে রাস্তা দিয়ে হাঁটি, তার নিচে অন্য মানুষের রাস্তা; আমরা যে দেয়াল দেখি, তার ভেতরে অন্য যুগের ধুলো।

এখন আসুন চেয়ারগুলোর কাছে। ক্যাফের সামনে এত চেয়ার, অথচ মানুষ কোথায়?
কেউ বলতে পারেন, ভ্যান গঘ শুধু একটি ক্যাফে এঁকেছেন। কিন্তু খালি চেয়ার কখনও কেবল চেয়ার নয়। একটি পূর্ণ চেয়ার একজন মানুষের উপস্থিতি ঘোষণা করে; একটি খালি চেয়ার তার অনুপস্থিতির সাক্ষ্য দেয়।
এই চত্বরের ইতিহাস আরও অস্বস্তিকর। কয়েক শতাব্দী আগে এখানে এক অভিজাত বিদ্রোহীর মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। মানুষ এসেছিল দেখতে। রাজপরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
আজ সেই মঞ্চ নেই। কাঠের কাঠামো নেই। মৃত্যুদণ্ড নেই। দর্শকরাও নেই। শুধু চেয়ার আছে। কখনও কখনও ইতিহাস সবচেয়ে বেশি কথা বলে তখনই, যখন তার চরিত্রগুলো আর থাকে না। তাই ছবির খালি চেয়ারগুলোকে যদি আমরা মৃতদের জন্য রেখে যাওয়া আসন ভাবি, তাহলে খুব ভুলও হবে না। তারা যেন অপেক্ষা করছে এমন দর্শকদের জন্য, যারা আর কখনও আসবে না।
রাস্তার রেখাগুলো আমাদের চোখকে ধীরে ধীরে দূরে নিয়ে যায়। তারপর একটি টাওয়ার চোখকে ওপরে তুলে দেয়। এই টাওয়ারও সময়ের কাছে নিজের পরিচয় বদলেছে। একসময় ছিল গির্জার ঘণ্টাঘর। পরে তা হয়ে উঠেছিল প্রাচীন প্রত্নবস্তু সংরক্ষণের স্থান। ভ্যান গঘ শহরে এসে সেই সংগ্রহশালা দেখেছিলেন। সেখানে ছিল রোমান শিলালিপি, ভাঙা স্থাপত্য, প্রাচীন খ্রিস্টীয় কফিন।
এখন ভাবুন, তিনি রাতে দাঁড়িয়ে একটি ক্যাফে আঁকছেন। তার সামনে মানুষ, পাশে আলো, পায়ের নিচে রোমান ধ্বংসাবশেষ, আর দূরে এমন একটি টাওয়ার, যার ভেতরে মৃত সভ্যতার স্মৃতি।
এমন অবস্থায় রাত কি আর শুধু রাত থাকে?
টাওয়ারটি যেন আকাশের দিকে ওঠা একটি আঙুল। নিচে ইতিহাস, মাঝখানে মানুষ, ওপরে অসীমতা। এবং শেষ পর্যন্ত—তারারা। সবশেষে আমাদের চোখ যেখানে পৌঁছায়, সেটিই ছবির সবচেয়ে নীরব অংশ। আকাশ। তারারা।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পৃথিবীর সবকিছু ভ্যান গঘ বদলে দিয়েছেন। ভবনের রেখা, রং, আলো, স্থাপত্য—সবকিছু তার হাতে বাস্তব থেকে একটু দূরে সরে গেছে। কিন্তু তারাদের ক্ষেত্রে তিনি আশ্চর্য নির্ভুল।
গবেষকরা জানিয়েছেন, ছবির তারাগুলোর অবস্থান ১৮৮৮ সালের সেপ্টেম্বরের আকাশের সঙ্গে মেলে। অর্থাৎ যে শিল্পী পৃথিবীকে নিজের কল্পনায় পুনর্গঠন করছিলেন, তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে তার সময়টিকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু কেন?
সম্ভবত কারণ মানুষ পরিবর্তনশীল, শহর পরিবর্তনশীল, এমনকি নিজের পরিচয়ও পরিবর্তনশীল। কিন্তু আকাশের তারা আমাদের সেই পরিবর্তনের বাইরে একটি মুহূর্তের কথা মনে করিয়ে দেয়। ভ্যান গঘ তার ভাই থিওকে চিঠিতে লিখেছিলেন, তিনি রাতে বাইরে গিয়ে তারাগুলো আঁকেন।
এই বাক্যটিকে যদি আমরা একটু অন্যভাবে পড়ি, তাহলে হয়তো এর অর্থ দাঁড়ায়: দিনের পৃথিবীকে তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না; তাই তিনি রাতের আকাশে এমন কিছু খুঁজছিলেন যা মানুষের হাতে বদলায় না।
‘ক্যাফে টেরেস অ্যাট নাইট’ সেই অন্বেষণের প্রথম চিহ্ন।
পাথরের নিচে মৃত রোমানরা, দেয়ালে হারিয়ে যাওয়া স্থাপত্য, খালি চেয়ারে অনুপস্থিত মানুষ, দূরের টাওয়ারে সংরক্ষিত স্মৃতি—আর তাদের ওপরে কয়েকটি তারা।
যদি আমরা চিত্রকর্মটিকে একটি ঘড়ি ভাবি, তবে তার কাঁটা শুধু সামনে এগোয় না। তারা পেছনেও যায়। রোমান যুগ থেকে মধ্যযুগ, মধ্যযুগ থেকে উনিশ শতক, আর উনিশ শতক থেকে আমাদের চোখের সামনে—সব সময় একই মুহূর্তে এসে দাঁড়ায়।
এ কারণেই ভ্যান গঘের রাত এত অদ্ভুত। এটি সেই রাত নয় যা ঘড়িতে মাপা যায়। এ এমন একটি রাত, যেখানে অতীত মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে, বর্তমান ক্যাফের আলোয় বসে আছে, আর ভবিষ্যৎ মাথার ওপরে তারার মতো জ্বলছে।
সম্ভবত ভ্যান গঘও তখন জানতেন না, তিনি কেবল একটি ক্যাফে আঁকছেন না। তিনি এমন একটি দরজা খুলছেন, যার ওপারে আরও একটি রাত অপেক্ষা করছে—আর সেই রাতের নাম হবে ‘দ্য স্টারি নাইট’।
কিন্তু তার আগে ছিল এই ছোট্ট ক্যাফে। এই কয়েকটি তারা। এই পাথরের রাস্তা। আর এক শিল্পী, যিনি অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রথমবার বুঝতে শুরু করেছিলেন—রাতের আসল রং কালো নয়। রাতের রং হলো স্মৃতি।
আর তার আলো—অসীম।
*ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ‘ক্যাফে টেরেস অ্যাট নাইট’ বর্তমানে টোকিওর উএনো রয়্যাল মিউজিয়ামে ‘দ্য গ্র্যান্ড ভ্যান গঘ এক্সিবিশন’-এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি প্রদর্শিত হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি’র একটি রিপোর্ট অবলম্বনে [https://www.bbc.com/culture/article/20260618-five-details-that-unlock-the-genius-of-van-goghs-original-starry-night]


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









