হলিউডে মুসলিম ও আরবদের দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে—এমন অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে বেন শাপিরোর নতুন সিনেমা ‘রান হাইড ফাইট: ইনফিডেল’–এর ট্রেলার প্রকাশের পর। সিনেমাটির গল্প ও ট্রেলারে মুসলিমদের নিয়ে প্রচলিত কিছু নেতিবাচক ধারণা তুলে ধরা হয়েছে বলে সমালোচনা করছেন অনেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ‘দ্য ডেইলি ওয়্যার’–এর সহপ্রতিষ্ঠাতা বেন শাপিরো সিনেমাটির ট্রেলার প্রকাশের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘র্যাডিক্যাল ইসলাম’-এর হুমকি বাস্তব। তাঁর দাবি, গত তিন দশকে হলিউড এই হুমকির গল্প বলতে অস্বীকার করেছে।
তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন অনেকেই। মুসলিম চরিত্রকে দীর্ঘদিন ধরে হলিউডের সিনেমা ও টেলিভিশনে সন্ত্রাসী বা হুমকি হিসেবে দেখানোর ইতিহাস রয়েছে—এমন উদাহরণও তুলে ধরা হচ্ছে।
২০০৩ সালে মার্কিন লেখক ও শিক্ষাবিদ জ্যাক শাহীনের ‘রিল ব্যাড আরবস’ বই প্রকাশিত হয়। ৯০০টির বেশি সিনেমায় আরব চরিত্রের উপস্থাপন বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছিলেন, হলিউডের অনেক সিনেমায় আরব ও মুসলিম পরিচয়কে এক করে দেখা হয়েছে। এসব চরিত্রকে প্রায়ই সহিংস, বর্বর, লোভী কিংবা বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বলে তাঁর গবেষণায় উঠে আসে।

এরপরও এমন উপস্থাপনার বেশ কিছু উদাহরণ দেখা গেছে। ‘ট্রু লাইস’(১৯৯৪)-এ আরব সন্ত্রাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্ফোরণের পরিকল্পনা করে। ‘এক্সিকিউটিভ ডিসিশন’ (১৯৯৬)-এ মুসলিম সন্ত্রাসীদের বিমান ছিনতাইয়ের সঙ্গে দেখানো হয়। ‘দ্য সিজ’ (১৯৯৮)-এর গল্পেও নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলার পর আরব-আমেরিকানদের গ্রেপ্তারের ঘটনা রয়েছে।
রুলস অব এসগেজমেন্ট’ (২০০০) এবং ‘আমেরিকান সাইনপার’ (২০১৪) নিয়েও মুসলিম ও আরব জনগোষ্ঠীকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ উঠেছিল।
টেলিভিশন সিরিজেও একই ধরনের গল্প দেখা গেছে। ‘২৪’ ও ‘হোমল্যান্ড’–এর মতো জনপ্রিয় সিরিজে মুসলিম সন্ত্রাসী, গোপন সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ও চরমপন্থীদের নিয়ে বড় গল্প তৈরি হয়েছে।
কিছু সিনেমায় অবশ্য মুসলিম বা আরব চরিত্রকে ইতিবাচক ভূমিকায় দেখা গেছে। যেমন ২০০৭ সালের ‘দ্য কিংডম’ সিনেমায় একজন সৌদি পুলিশ কর্মকর্তা মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কাজ করেন।
তবে সমালোচকদের একটি অংশের মতে, এখানেও মুসলিম চরিত্রের জন্য খুব বেশি বিকল্প রাখা হয়নি—হয় তাঁকে ‘খারাপ’ চরিত্র হতে হবে, নয়তো নিজের সম্প্রদায়ের ‘খারাপ’ মানুষদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ব্যতিক্রমী চরিত্র হতে হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। ‘রামে’, ‘মু’ এবং ‘মিস. মারভেল–এর মতো সিরিজ ও সিনেমায় মুসলিম চরিত্রদের আরও বৈচিত্র্যময় ও মানবিকভাবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। এসব গল্পে মুসলিমদের জীবন, পরিবার, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।
বেন শাপিরোর নতুন সিনেমার ট্রেলার প্রকাশের পর বিতর্কটি আবার সামনে এসেছে।

ট্রেলার অনুযায়ী, সিনেমাটির গল্প একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে ঘিরে। সেখানে ‘র্যাডিক্যাল ইসলামিক সন্ত্রাসীরা’ একটি গাজা সংহতি শিবির দখল করে নেয়। পরে তারা সেখানে একটি ‘অস্থায়ী খেলাফত’ প্রতিষ্ঠা করে, শরিয়াহ আইন চালু করে এবং ‘অবিশ্বাসীদের’ মৃত্যুদণ্ড দেয়—এমনই দেখানো হয়েছে ট্রেলারে।
ট্রেলারে আইএসআইএল (আইএসআইএস)–এর ছবি ও ৯/১১ হামলার দৃশ্যের সঙ্গে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভের ফুটেজও পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়েছে।
এ নিয়েই মূল আপত্তি সমালোচকদের। তাদের অভিযোগ, ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হওয়া বাস্তব ছাত্র আন্দোলনকে চরমপন্থী সহিংসতার সঙ্গে একই ফ্রেমে দেখানো হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এর ফলে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এক করে দেখার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শাপিরো অবশ্য তার সিনেমার উদ্দেশ্য নিয়ে ভিন্ন অবস্থানে আছেন। তার দাবি, ‘র্যাডিক্যাল ইসলাম’-এর হুমকি বাস্তব এবং হলিউড দীর্ঘদিন এই বিষয়টি নিয়ে গল্প বলা থেকে বিরত থেকেছে।
সিনেমাটিকে তিনি ‘দ্য ডেইলি ওয়্যার’–এর প্রকাশিত সবচেয়ে বড়, সাহসী ও মজার চলচ্চিত্রগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে সিনেমাটি মুক্তির আগেই প্রশ্ন উঠেছে—সন্ত্রাসবাদের গল্প বলতে গিয়ে একটি পুরো ধর্মীয় ও জাতিগত জনগোষ্ঠীকে আবারও নেতিবাচক ছকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে কি না।
হলিউডে মুসলিম ও আরব চরিত্রের উপস্থাপন নিয়ে পুরোনো বিতর্কের মধ্যেই তাই নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘রান হাইড ফাইট: ইনফিডেল’। সিনেমাটি মুক্তির পর বিতর্কটি আরও কতটা বাড়ে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সূত্র:


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









