বুর্গোস শহরে প্রথমবার গেলে হয়তো কেউ আপনাকে বলবে না, এই শহরের একটি পুরোনো বইয়ের দোকানের ভেতর স্পেনের শিক্ষার ইতিহাসের একটি দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ অধ্অংযায় লুকিয়ে আছে। আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন। পুরোনো বাড়িগুলো দেখবেন। কোনো ক্যাফেতে বসবেন। হয়তো গির্জার ঘণ্টা শুনবেন। তারপর একসময় আপনার চোখে পড়বে একটি নাম—
হিজোস দে সান্তিয়াগো রদ্রিগেজ।
নামটি একটু দীর্ঘ। প্রথম দেখায় বোঝাও যায় না, এর ভেতরে কত বছরের গল্প আছে। কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়ালে আমার মনে হয়, একটি পুরোনো বইয়ের দোকানের দরজা কখনো শুধু দোকানের দরজা নয়। সেটি সময়ের দরজাও। এই দরজা দিয়ে একসময় শিশুরা স্কুলের বই কিনেছে। শিক্ষকরা বই নিয়েছেন। বাবা তার ছেলের জন্য গল্পের বই কিনেছেন। কোনো তরুণ হয়তো প্রথমবার কবিতার বই হাতে নিয়েছে। কেউ হয়তো এমন একটি বই কিনেছে, যার একটি বাক্য পরে তার পুরো জীবন বদলে দিয়েছে।
১৮৫০ সালে যে প্রতিষ্ঠানটি শুরু হয়েছিল, তার সামনে দাঁড়ালে মনে হবে—একটি বইয়ের দোকান আসলে কতটা পুরোনো হতে পারে? একশ বছর? দুইশ বছর? নাকি একটি বই যতদিন একজন মানুষের মনে বেঁচে থাকে, ততদিন?

আন্তোনিও মাচাদোর মতন আপনিও বলে উঠবেন—পথিক, কোনো তৈরি পথ নেই; চলতে চলতেই পথ তৈরি হয়। ১৮৫০ সালে সান্তিয়াগো রদ্রিগেস যখন বুর্গোসে তাঁর প্রতিষ্ঠান শুরু করেছিলেন, তিনি সম্ভবত জানতেন না ভবিষ্যতে কী অপেক্ষায় আছে। তার সামনে কোনো নিশ্চিত পথ ছিল না।
বইয়ের দোকান খুলবেন। ছাপাখানা করবেন। বই প্রকাশ করবেন। শিক্ষাবই ছাপবেন। শিশুদের বই তৈরি করবেন। কিন্তু এই সবকিছু একসঙ্গে তখন কোথায় নিয়ে যাবে, তা তিনি জানতেন না। তিনি শুধু হাঁটতে শুরু করেছিলেন। পরে পথ তৈরি হয়েছে। আর সেই পথ এত দীর্ঘ হয়েছে যে আজ আমরা তার শুরু থেকে ১৭৫ বছরেরও বেশি সময় পর দাঁড়িয়ে আছি।
সান্তিয়াগো রদ্রিগেস আলোনসো ছিলেন স্বশিক্ষিত মানুষ। তার জীবনের এই বিষয়টি সকচেয়ে আকর্ষণীয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় বা বড় কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানুষ ছিলেন না। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, শিক্ষা মানুষের জীবন বদলাতে পারে।
১৮৫০ সালে তিনি বুর্গোসে হিজোস দে সান্তিয়াগো রদ্রিগেজ নামের বইয়ের দোকানটি শুরু করেন। সেটি শুধু বইয়ের দোকান ছিল না। বই বিক্রির পাশাপাশি ছাপাখানা ও প্রকাশনার কাজও ছিল এর সঙ্গে যুক্ত।
এ যেন একটি ছোট ঘরের ভেতর তিনটি দরজা—একটি দরজা বইয়ের দিকে, একটি ছাপাখানার দিকে, আর একটি শিক্ষার দিকে। সান্তিয়াগোর প্রতিষ্ঠানের একটি বাক্য পরে তার পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায়—‘স্কুল মানুষকে মুক্ত করে এবং সভ্য করে।’
এই বাক্যটি আজ পড়লে হয়তো খুব সাধারণ মনে হয়। কিন্তু উনিশ শতকের স্পেনে শিক্ষা ছিল গভীর এক সামাজিক প্রশ্ন।কে পড়বে? কে বই পাবে? কার সন্তান স্কুলে যাবে? কোন পরিবারের ঘরে বই থাকবে? এসব প্রশ্নের সঙ্গে সমাজের শ্রেণি, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ জড়িয়ে ছিল। সান্তিয়াগোর কাছে বই তাই শুধু একটি পণ্য ছিল না। একটি বই মানে ছিল একজন মানুষের সামনে আরেকটি জানালা খুলে দেওয়া।

একটি শিশুকে যদি পড়তে শেখানো যায়, সে নিজের চারপাশের পৃথিবী পড়তে পারবে। একজন কৃষকের ছেলে যদি ইতিহাস পড়তে পারে, সে বুঝতে পারবে তার গ্রামের বাইরেও একটি পৃথিবী আছে। সেখানেও অনেক গ্রাম আছে। একজন দরিদ্র পরিবারের শিশু যদি সাহিত্য পড়তে পারে, সে এমন মানুষের কণ্ঠ শুনতে পারবে, যাদের সঙ্গে তার কখনো দেখা হবে না। এই বিশ্বাস থেকেই প্রতিষ্ঠানটির কাজ ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার বিখ্যাত পঙ্ক্তির মতন—‘সবুজ, তোমাকে আমি সবুজ বলেই ভালোবাসি।’
লোরকার এই সবুজের মতোই সান্তিয়াগোর বইয়ের দোকানেও এক ধরনের রং ছিল। সেটি ছিল কাগজের রং। পুরোনো কালি। ছাপাখানার কালো অক্ষর। নতুন বইয়ের সাদা পাতা। আর স্কুলে যাওয়া শিশুদের হাতে ধরা বই।
আমি মাঝে মাঝে কল্পনা করি, ১৮৫০-এর দশকের বুর্গোসে হিজোস দে সান্তিয়াগো রদ্রিগেজের ভেতর কেমন শব্দ হতো সম্ভবত বাইরে ঘোড়ার গাড়ি চলত। কেউ দরজা খুলত। কাঠের দরজা বন্ধ হতো। তারপর ভেতরে কাগজের গন্ধ। কোথাও ছাপাখানার শব্দ। কেউ অক্ষর সাজাচ্ছে। কেউ বই বাঁধছে। কেউ দাম লিখছে। কেউ বই কিনতে এসেছে। এই শব্দগুলোর কোনো রেকর্ড নেই। কিন্তু একটি পুরোনো প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস পড়তে গেলে কখনো কখনো শব্দ কল্পনা করতে হয়। কারণ ইতিহাস শুধু তারিখ দিয়ে লেখা হয় না। ইতিহাস তৈরি হয় শব্দ, গন্ধ, হাতের স্পর্শ আর মানুষের ছোট ছোট কাজ দিয়ে।
প্রথমে ছিল একটি বই। একজন মানুষ বইয়ের দোকানে ঢুকে কী খোঁজেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ হতে পারে। একটি বই। কিন্তু সান্তিয়াগোর সময়ে একটি বই খোঁজার অর্থ ছিল আজকের চেয়ে অনেক বড় কিছু। কারণ বই তৈরি করতে সময় লাগত। ছাপাখানা ছিল মূল্যবান প্রযুক্তি। প্রকাশনা ছিল শ্রমের কাজ। আর পাঠকও আজকের মতো অসংখ্য ছিলেন না।সুতরাং একটি বই ছাপা মানে শুধু কাগজে অক্ষর বসানো নয়। এটি ছিল জ্ঞানকে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টাও।
সান্তিয়াগো খুব তাড়াতাড়ি বুঝেছিলেন—শুধু বই বিক্রি করলে হবে না। এমন বই তৈরি করতে হবে, যা মানুষের দরকার।বিশেষ করে স্কুলের বই। শিশুদের বই। সহজ ভাষায় লেখা বই। সস্তা বই। এই সিদ্ধান্তই প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস বদলে দেয়।একটি শিশুর হাতে প্রথম বই—কোনো বড় ইতিহাসের বইয়ে হয়তো সেই শিশুটির নাম নেই। কিন্তু আমরা তাকে কল্পনা করতে পারি।
ধরা যাক, তার নাম দিয়েই ফেলি—মিগেল। সে বুর্গোসের কোনো সাধারণ পরিবারের ছেলে। একদিন তার বাবা তাকে নিয়ে বইয়ের দোকানে এলেন। ছেলেটি আগে কখনো এত বই একসঙ্গে দেখেনি। তার চোখ আটকে গেল একটি পাতায়। সেখানে একটি ছবি।একজন শিক্ষক বলছেন কিছু। কয়েকটি বড় অক্ষর।
বাবা বইটি কিনলেন। মিগেল বাড়ি গেল। সন্ধ্যায় প্রদীপের আলোয় বইটি খুলল। প্রথম শব্দটি পড়তে তার কষ্ট হলো। পরের দিন স্কুলে শিক্ষক তাকে সেই শব্দ পড়তে বললেন। সে পড়ল। একটু ভুল হলো। তারপর আবার পড়ল। এবার ঠিক হলো। শিক্ষক হাসলেন। মিগেলও হাসল। এই মুহূর্তটি কোন ইতিহাসে নেই।কিন্তু এমন দৃশ্য নিশ্চয়ই হাজার হাজারবার ঘটেছে।
আর যদি ঘটে থাকে, তাহলে হিজোস দে সান্তিয়াগো রদ্রিগেজ-এর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অংশ হয়তো কোনো বিখ্যাত লেখকের নাম নয়। সেটি হলো এইসব অচেনা শিশু।
বইয়ের দাম এবং জ্ঞানের দরজা একটি বই কত সস্তা হওয়া উচিত? আজকের বাজারে এটি ব্যবসায়িক প্রশ্ন। কিন্তু তখন এটি সামাজিক প্রশ্নও ছিল। একটি দরিদ্র পরিবার যদি বই কিনতে না পারে, তাহলে তার সন্তান কীভাবে পড়বে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রতিষ্ঠানটি জনপ্রিয় দামে বই প্রকাশের দিকে মন দেয়। স্পেনের শিক্ষার ইতিহাস নিয়ে করা গবেষণায়ও এর শিক্ষামূলক উদ্দেশ্য এবং সাধারণ পরিবারের শিশুদের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার ভূমিকা উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে ব্যবসা ও আদর্শ এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়। বই বিক্রি করতে হবে—কারণ প্রতিষ্ঠানকে বাঁচতে হবে। কিন্তু বই এমন দামে দিতে হবে, যাতে আরও বেশি মানুষ তা কিনতে পারে। এই ভারসাম্য সহজ ছিল না। তবু প্রতিষ্ঠানটি বহু বছর ধরে সেই পথ অনুসরণ করেছে।
সান্তিয়াগো রদ্রিগেস আধুনিক মুদ্রণপ্রযুক্তির গুরুত্ব বুঝেছিলেন। পরিবারের ইতিহাসে এমন একটি ঘটনা বিশেষভাবে বলা হয়—ইউরোপের একটি প্রদর্শনীতে তিনি নতুন ধরনের মুদ্রণযন্ত্র দেখে মুগ্ধ হন এবং সেই প্রযুক্তিকে বুর্গোসে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেন। সেই যন্ত্র ছিল মিনার্ভা। নামটি সুন্দর। মিনার্ভা—জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক। যেন যন্ত্রটির নামই বলে দিচ্ছে, এটি শুধু অক্ষর ছাপবে না; জ্ঞানও ছড়াবে। ছাপাখানায় যখন একটি একটি করে অক্ষর সাজানো হতো, তখন হয়তো কেউ ভাবত না সেই অক্ষরগুলো কত দূর যাবে।
একটি বই বুর্গোস থেকে অন্য শহরে যেতে পারে। কোন একটি স্কুলে যেতে পারে। একজন শিক্ষকের হাতে যেতে পারে।তারপর একটি শিশুর হাতে। তারপর সেই শিশুর জীবনে। একটি ছাপাখানার ঘর থেকে একটি বই বেরিয়ে কত দূর যেতে পারে, তার কোনো মানচিত্র থাকে না।
গুস্তাভো আদলফো বেকের লিখেছিলেন—‘মানুষের কাছে যতদিন রহস্য থাকবে, ততদিন কবিতাও থাকবে।” আমরা এই বাক্যটি বইয়ের দোকানের ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চাই। কারণ বইয়ের দোকানও এক ধরনের রহস্যের জায়গা আপনি একটি বই কিনলেন। আপনি জানেন না, বইটি আপনার জীবনে কী করবে। হয়তো কিছুই করবে না। হয়তো দুই পৃষ্ঠা পড়ে রেখে দেবেন। হয়তো পাঁচ বছর পরে আবার খুলবেন। হয়তো কোনো একটি বাক্য আপনার মনে জায়গা করে নিবে। হয়তো সেই বাক্য আপনি কোনো বন্ধুকে বলবেন। হয়তো আপনার সন্তান একদিন সেই একই বই পড়বে। তখন বইটি আর শুধু বই থাকবে না। একটি পরিবারিক স্মৃতি হয়ে যাবে। এই কারণেই একটি পুরোনো বইয়ের দোকানের ইতিহাস আসলে মানুষের স্মৃতির ইতিহাসও।

মাচাদোর আরেকটি পঙ্ক্তি—‘পথিক, তোমার পদচিহ্নই পথ; আর কিছু নয়।’ হিজোস দে সান্তিয়াগো রদ্রিগেজ-এর ইতিহাসও যেন এমন পদচিহ্নে তৈরি। প্রথম পদচিহ্ন সান্তিয়াগোর। তারপর তার সন্তানের। তারপর পরবর্তী প্রজন্মের।প্রতিটি প্রজন্ম প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।
উনিশ শতকের ছাপাখানা বদলেছে। বইয়ের বাজার বদলেছে। শিক্ষাব্যবস্থা বদলেছে। স্পেনের রাজনৈতিক জীবন বদলেছে। দুটি বিশ্বযুদ্ধের সময় পেরিয়ে গেছে। গৃহযুদ্ধ এসেছে। তারপর এসেছে আধুনিক প্রযুক্তি। কম্পিউটার এসেছে।ইন্টারনেট এসেছে। ই-বুক এসেছে। কিন্তু দোকানটি তার দরজা বন্ধ করেনি।
হিজোস দে সান্তিয়াগো রদ্রিগেজ-এর ইতিহাসে শিশুদের জন্য প্রকাশিত বইয়ের সিরিজ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বিব্লিওটেকাস রদ্রিগেজ নামে বিভিন্ন সিরিজের মাধ্যমে শিশুদের হাতে সাহিত্য ও পাঠের বই পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। এসব সিরিজের দীর্ঘ প্রকাশনা ইতিহাস এবং শিশুদের পাঠাভ্যাস তৈরিতে তাদের ভূমিকার কথা স্পেনের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কীত।
এখানে একটি বিষয় আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে পড়ানো আর শিশুকে পাঠক বানানো এক নয়। পরীক্ষার জন্য একটি বই পড়া যায়। কিন্তু নিজের আনন্দে গল্প পড়তে শুরু করা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। একজন শিশু যখন পাঠ্যবই বন্ধ করে গল্পের বই খুলে, তখন তার সামনে আরেকটি পৃথিবীর দরজা খুলে যায়।
সেখানে সে রাজা হতে পারে। ভিখারি হতে পারে। সমুদ্র অভিযানে যেতে পারে। কবি হতে পারে। শিল্পী হতে পারে। অথবা এমন একজন মানুষ হতে পারে, যার সঙ্গে বাস্তব জীবনে তার কখনো কোন অস্তিত্ব ছিল না।
এই কল্পনার ক্ষমতাই সাহিত্য। আর বইয়ের দোকান সেই কল্পনার দরজা খুলে দেয়। হিজোস দে সান্তিয়াগো রদ্রিগেজ স্প্যানিশ শিশুদের সে কল্পনার জগত তৈরি করেছিল।
প্রত্যেক মানুষের দুটি যুদ্ধ লড়তে হয়। একটি যুদ্ধ বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে। আরেকটি নিজের ভেতরের সঙ্গে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও যেন দুটি যুদ্ধ আছে। প্রথম যুদ্ধ—অজ্ঞতার বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় যুদ্ধ—নিজের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে। একটি বই প্রথম যুদ্ধটিতে সাহায্য করে। আর কখনো কখনো দ্বিতীয় যুদ্ধেও। একজন মানুষ বই পড়ে জানতে পারে, তার নিজের জীবনই পৃথিবীর একমাত্র জীবন নয়। অন্য মানুষও কষ্ট পায়। অন্য মানুষও স্বপ্ন দেখে। অন্য সমাজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছে। অন্য যুগেও মানুষ একই প্রশ্ন করেছে। এই জ্ঞান মানুষকে একা থাকতে দেয় না।
সান্তিয়াগোর পর তাঁর সন্তানরা হিজোস দে সান্তিয়াগো রদ্রিগেজকে এগিয়ে নেন। তারপর পরবর্তী প্রজন্ম। এইভাবে ছয় প্রজন্ম ধরে পরিবারটির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। একজন বৃদ্ধ দোকানে এসে হয়তো বলেন—আমি ছোটবেলায় এখান থেকে বই কিনতাম। তারপর তিনি তার নাতিকে নিয়ে আসেন। নাতি হয়তো আজকের কোনো জনপ্রিয় বই কিনছে। দাদু তাকিয়ে আছেন। দুটি প্রজন্ম একই দোকানে দাঁড়িয়ে। বই বদলে গেছে। দামের ধরন বদলে গেছে। ভাষার ব্যবহার বদলে গেছে। কিন্তু একটি জিনিস বদলায়নি—একজন মানুষ অন্য একজনকে বই কিনে দিচ্ছে। এটাই হয়তো একটি বইয়ের দোকানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পারিবারিক মুহূর্ত।।
বেকেরের পঙ্ক্তি আমাদের মনে পড়বে—‘কবি হয়তো নাও থাকতে পারেন; কিন্তু কবিতা সব সময় থাকবে।’ একটি পুরোনো বইয়ের দোকানও হয়তো একদিন থাকবে না। এটাই জীবনের নিয়ম। কোনো দোকান চিরকাল খোলা থাকে না।কোনো বইয়ের তাক চিরকাল থাকে না। কোনো পরিবারও নয়। কিন্তু বইয়ের দোকান বন্ধ হয়ে গেলেও তার প্রভাব থেকে যেতে পারে।
একজন শিক্ষক থেকে যেতে পারেন। একজন পাঠক থেকে যেতে পারেন। একজন লেখক থেকে যেতে পারেন। একটি শিশুর স্মৃতি থেকে যেতে পারে। আর সেই স্মৃতির ভেতর দিয়ে দোকানটি আবার বেঁচে উঠতে পারে।
এই গল্পের সবচেয়ে দুঃখের অংশটি এখানেই। ২০২৬ সালে হিজোস দে সান্তিয়াগো রদ্রিগেজ গুরুতর আর্থিক সমস্যার মুখে পড়ে। ঋণ ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্পেনের সংবাদমাধ্যমে তখন বইয়ের দোকানটিকে বাঁচানোর জন্য লেখক, পাঠক ও বইপ্রেমীদের আহ্বানের খবর প্রকাশিত হয়।
এখানে ইতিহাস হঠাৎ বর্তমান হয়ে যায়। ১৮৫০ সালে একটি তরুণ যে দরজা খুলেছিল, ২০২৬ সালে সেই দরজাটিই বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পড়ে। একটি দোকান বন্ধ হয়ে গেলে কি শুধু একটি ব্যবসা বন্ধ হয়? না। একটি শহরের একটি স্মৃতি হারিয়ে যায়। একটি পরিবারের ইতিহাস হারিয়ে যায়। কত কত মানুষের শৈশবের একটি ঠিকানা হারিয়ে যায়। কত বইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি হারিয়ে যায়।
চলতে চলতেই পথ তৈরি হয়। হিজোস দে সান্তিয়াগো রদ্রিগেজ-এর ১৭৫ বছরের গল্পও এমনই একটি পথ। সান্তিয়াগো প্রথম পা রেখেছিলেন। তারপর অন্যরা হাঁটতে শুরু করেছিল। একটি বই ছাপা হয়েছিল। তারপর আরেকটি। একটি শিশু পড়েছিল। তারপর আরেকটি শিশু। একটি পরিবার বই কিনেছিল। তারপর আরেকটি পরিবার। একটি প্রজন্ম পড়েছিল। তারপর আরেকটি। এইভাবেই একটি ছোট ব্যবসা ধীরে ধীরে একটি শহরের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে পরিণত হয়।

আমি যদি কোন একদিন বুর্গোসে সেই হিজোস দে সান্তিয়াগো রদ্রিগেজ সামনে দাঁড়াই, তাহলে হয়তো প্রথমে ভেতরে ঢুকব না। কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব। ভাবব, ১৮৫০ সালে সান্তিয়াগো কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন। তখন তার সামনে ছিল না ১৭৫ বছরের ইতিহাস। ছিল না এই দীর্ঘ নামের গৌরব। ছিল না পুরোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচয়। ছিল শুধু একটি স্বপ্ন।মানুষকে বই দিতে হবে। শিশুকে পড়াতে হবে। শিক্ষাকে সহজ করতে হবে। আর সেই স্বপ্ন থেকেই তৈরি হয়েছিল একটি দোকান।
তারপর দোকানটি বই ছাপল। বই বিক্রি করল। শিশুদের হাতে বই দিল। শিক্ষকদের হাতে বই দিল। লেখকদের লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিল। একটি শহরের সঙ্গে একটি দেশের শিক্ষার ইতিহাসে নিজের ছোট জায়গা তৈরি করল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তখন হয়তো মনে হবে, দোকানটির সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস কোনো পুরোনো বই নয়।
কোনো ছাপাখানাও নয়। কোনো পুরোনো আসবাবও নয়। সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হলো সময়ের ভেতর দিয়ে চলে আসা পাঠকের স্মৃতি। একজন মানুষ যে প্রথম বইটি এখান থেকে কিনেছিল। একজন শিক্ষক যে এখান থেকে তার ক্লাসের বই নিয়েছিলেন। একজন বাবা যে তার সন্তানের হাতে প্রথম গল্পের বই তুলে দিয়েছিলেন। একজন প্রেমিকা এখান থেকে কবিতার বই কিনে বাড়ি গিয়েছিল। তাদের কেউ হয়তো জানত না, তারা ইতিহাসের অংশ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা হয়েছিল।
কারণ ইতিহাস শুধু রাজা-রানির নয়। ইতিহাস কখনো কখনো একটি বই হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরা শিশুটিরও। আর সেই শিশুটির জন্য বইটি যে দোকানটি খুলে দিয়েছিল, তার ইতিহাসও তাই ছোট নয়। হয়তো এ কারণেই পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোকে শুধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়।
তারা শহরের স্মৃতির ছোট জাদুঘর। তাদের তাকের ওপর বই থাকে। কিন্তু বইয়ের নিচে জমে থাকে মানুষের হাতের স্পর্শ।তাদের দেয়ালে ঝুলে থাকে নাম। কিন্তু নামের আড়ালে থাকে প্রজন্মের গল্প। আর তাদের দরজা দিয়ে প্রতিদিন যে মানুষটি ঢোকে, সে জানে না—হয়তো তার হাতেই কোনো একদিন এই দীর্ঘ ইতিহাসের পরের পৃষ্ঠা লেখা হবে।
কোনো তৈরি পথ নেই। চলতে চলতেই পথ তৈরি হয়। ১৮৫০ সালে সান্তিয়াগো যে পথে হাঁটা শুরু করেছিলেন, সেই পথ এখনও শেষ হয়নি। একটি বইয়ের দোকানের জন্য এর চেয়ে সুন্দর ইতিহাস আর কী হতে পারে?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









