বাংলাদেশের প্রশাসনকে বুঝতে গেলে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। আর সেই বিষয়টি হচ্ছে; জেলার সব কর্মকর্তা একই ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে কাজ করেন না। বাইরে থেকে দেখলে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), সহকারী পুলিশ সুপার কিংবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে একই প্রশাসনিক সিঁড়ির বিভিন্ন ধাপে থাকা কর্মকর্তা মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের দায়িত্ব, আইনগত ক্ষমতা পৃথক পৃথক। তাই কে কার চেয়ে বড়, এমন প্রশ্ন মনে আনার আগে, কোন কর্মকর্তা কোন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, সেটিই এই লেখায় আমি তুলে ধরতে চাই।
জেলা প্রশাসনের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক জেলার বেসামরিক প্রশাসনের প্রধান কর্মকর্তা। জেলার সাধারণ প্রশাসন, রাজস্ব, ভূমি ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সরকারি কার্যক্রমের সমন্বয় এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
জেলার বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করেও তাঁকে কাজ করতে হয়। এই সমন্বয়ের কারণে অনেকের ধারণা জেলা প্রশাসক জেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। কিন্তু ধারণাটি ভুল। জেলার ভিতরে অনেকগুলো বিভাগ তাদের দপ্তরের অধীনে কাজ পরিচালনা করে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রকৌশল, জেলা পরিষদ, বিচার বিভাগসহ আরো অনেক বিভাগ রয়েছে। সেইসব বিভাগের আলাদা আলাদা কমান্ড কাঠামো রয়েছে। আমি এখানে সবগুলোর বিস্তৃত বলব না। শুধু ধারণা দেওয়ার জন্য কেবল জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কিছু বিষয় উল্লেখ করব।
জেলা পুলিশের ক্ষেত্রে প্রধান কর্মকর্তা হলেন পুলিশ সুপার। জেলার পুলিশ বাহিনীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, পুলিশ প্রশাসন এবং থানাগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার মূল দায়িত্ব তাঁর ওপর থাকে। পুলিশ সুপারের অধীনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার, সিআইডি, ডিএসপি এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেন। ফলে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে একই প্রশাসনিক সিঁড়ির দুই ধাপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁরা নিজ নিজ কাঠামোর প্রধান এবং জেলার সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সমন্বয় করে কাজ করেন।
এখানে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্ষমতা মানেই সব ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব নয়। একজন জেলা প্রশাসকের প্রশাসনিক ক্ষমতা যেমন বিস্তৃত, তেমনি একজন পুলিশ সুপারের পুলিশি ক্ষমতা তাঁর নিজস্ব ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসক প্রশাসনের দিক থেকে সমন্বয় করতে পারেন, কিন্তু পুলিশ বাহিনীকে পরিচালনার সরাসরি কমান্ড পুলিশ সুপারের হাতেই থাকে। আবার কোনো ভূমিসংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশ সুপারের চেয়ে জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
জেলা প্রশাসকের অধীনে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকরা বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। একটি জেলায় একাধিক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক থাকতে পারেন এবং তাঁদের দায়িত্বও আলাদা হতে পারে। কেউ সাধারণ প্রশাসনের দায়িত্বে, কেউ রাজস্বের দায়িত্বে, কেউ উন্নয়ন বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে কাজ করতে পারেন। তাই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে জেলা প্রশাসকের বিকল্প বা সমপর্যায়ের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং জেলা প্রশাসকের অধীনে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনকারী গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।
উপজেলায় গেলে প্রশাসনিক কাঠামোর চেহারা কিছুটা বদলে যায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলা পর্যায়ের বেসামরিক প্রশাসনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী কর্মকর্তা।
উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়, সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, দুর্যোগ ও ত্রাণ কার্যক্রম এবং আইন অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাঁর ওপর থাকে। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রমের সংযোগ তৈরিতেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মূলত ভূমি প্রশাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা। নামজারি, ভূমি রাজস্ব, সরকারি খাসজমি এবং ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একই উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) দু’জনই গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হলেও তাঁদের কাজের ক্ষেত্র এক নয়।
একজন পুরো উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকেন, অন্যজন ভূমি প্রশাসনের নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করেন। তাই শুধু পদমর্যাদা দিয়ে তাঁদের ক্ষমতার তুলনা করলে বাস্তব চিত্রটি ধরা পড়ে না।
পুলিশ প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পুলিশ সুপারের অধীনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং সহকারী পুলিশ সুপার পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। কোনো কোনো এলাকায় একজন কর্মকর্তা একাধিক থানার সমন্বয় বা তদারকির দায়িত্বে থাকতে পারেন। এই পর্যায়ের কর্মকর্তার অধীনে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং তাঁরা জেলা পুলিশ প্রধানের নির্দেশনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আর একটি থানার সবচেয়ে পরিচিত পুলিশ কর্মকর্তা হলেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। থানার দৈনন্দিন কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মামলা ও তদন্তসংক্রান্ত আইনানুগ কার্যক্রম এবং থানার পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। কিন্তু একটি থানার দায়িত্বে থাকা মানেই তিনি জেলার পুলিশ প্রশাসনের প্রধান নন। তাঁর ওপরে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা এবং জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপারের কমান্ড কাঠামো থাকে।
আমাদের সমাজে অনেক সময় সরকারি কর্মকর্তার ক্ষমতা বিচার করা হয় তাঁর গাড়ি, কার্যালয়, নিরাপত্তা, মানুষের ভিড় কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব দেখে। কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষমতা এসব দৃশ্যমান বিষয়ের সঙ্গে সবসময় এক নয়। একজন কর্মকর্তার প্রকৃত ক্ষমতা নির্ভর করে তাঁর পদ, দায়িত্ব, আইনগত এখতিয়ার, কর্মক্ষেত্র এবং কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর ওপর অর্পিত হয়েছে, এসবের ওপর।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার; বিচার বিভাগকে এই প্রশাসনিক ও পুলিশ কাঠামোর সঙ্গে একই সিঁড়িতে বসানো যায় না। জেলার বিচারিক ব্যবস্থায় জেলা ও দায়রা জজের নিজস্ব বিচারিক এখতিয়ার রয়েছে। তিনি জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপারের অধীন নন এবং তাঁর বিচারিক ক্ষমতাকে প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করাও সঠিক নয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা আলাদা বলেই এই বিভাজন গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে একটি জেলার ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে বুঝব? আমি বিষয়টিকে এভাবে দেখি; জেলা প্রশাসনের কেন্দ্র জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশের কেন্দ্র পুলিশ সুপার, উপজেলা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ভূমি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি), পুলিশ বৃত্তের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট একাধিক থানার তদারকি করেন এবং থানার দৈনন্দিন পুলিশি কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রত্যেকের ক্ষমতার সীমানা আলাদা।
এই কারণে কোনো কর্মকর্তার পদত্যাগ বা দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনাকে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষমতার পতন হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। একজন কর্মকর্তা পদত্যাগ করলে তাঁর পদটির আইনগত ক্ষমতা হারিয়ে যায় না; বরং দায়িত্ব পালনের ব্যক্তি পরিবর্তিত হয়। আবার কোনো কর্মকর্তা বদলি হলে তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে পদটির প্রশাসনিক ক্ষমতাও বদলে যায় না। ক্ষমতাটি মূলত ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রীয় পদ ও আইনের দেওয়া দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের প্রশাসন নিয়ে আলোচনায় তাই শুধু কে সবচেয়ে ক্ষমতাবান; এই প্রশ্নে আটকে থাকলে পুরো ব্যবস্থাটি বোঝা সম্ভব নয়। বরং দেখতে হবে, কে কোন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, তাঁর ওপর কোন দায়িত্ব অর্পিত, কোন আইনের অধীনে তিনি কাজ করেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তের সীমা কোথায়। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কিংবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা- প্রত্যেকেরই ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ক্ষেত্র এক নয়।
আমার কাছে বাংলাদেশের মাঠ প্রশাসনের সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হলো; ক্ষমতার একটি মাত্র সিঁড়ি নেই; বরং পাশাপাশি চলা কয়েকটি সিঁড়ি আছে।
প্রশাসনের সিঁড়ির একদিকে জেলা প্রশাসক, অন্যদিকে পুলিশের সিঁড়িতে পুলিশ সুপার; উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভূমি প্রশাসনে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছেন। আর বিচার বিভাগ চলছে সম্পূর্ণ আলাদা বিচারিক কাঠামোর মধ্যে। এই বাস্তবতাটি বুঝতে পারলেই বাংলাদেশের প্রশাসনে কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, কার কাছে কোন বিষয়ে যেতে হবে এবং কার ক্ষমতা কোন সীমার মধ্যে আছে, সেটা অনেক সহজে বোঝা যায়।
জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কথা আমি এখানে আলোকপাত করেছি। এই দুই প্রশাসনের কর্মকর্তারা যদি সততা ও নিষ্ঠার সাথে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন, তাহলেই দেশের নাগরিক ৯০ ভাগ সন্তুষ্ট থাকবে। এই যে ৯০ ভাগ বললাম- এটা আমার ধারণাপ্রসূত। কারণ, এই দুই প্রশাসনের লোকজনেরাই সরাসরি জনগণের সাথে সম্পৃক্ত। দেশের ভালো-মন্দ এই দুই প্রশাসনের মানুষের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। আমি সারাদেশের কথা বলছি না, বলছি একটি জেলার কথা। জেলার মানুষের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এরা অন্তত সৎ হবেন, নিষ্ঠাবান হবেন, কর্মঠ হবেন; এর বেশি কিছু চাই না।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









