রাত তখন সাড়ে ৯টা। নির্জন সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। হঠাৎ গাড়ির আলোর ঝলকে সড়কের পাশে একটি বাড়ির সামনে তার চোখে পড়ে এক ব্যক্তিকে পড়ে থাকতে। শরীরজুড়ে রক্ত। ছটফট করছিলেন তিনি। বাড়ির গেটেও লেগে ছিল রক্তের ছাপ। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। বাড়ির লোকজনও বেরিয়ে আসেন। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। পুলিশ এসে ওই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করে।
তিনি মোকলেছুর রহমান (৫৫), পেশায় অটোরিকশাচালক। তার গলা কাটা ছিল। নিহত মোখলেছুর রহমান উপজেলার সদর ইউনিয়নের নবনীদাস মৌলভীবাজার এলাকার মৃত হামিদ আলীর ছেলে।
ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি তার অটোরিকশাটি। বিকেলে নিজের অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর রাতে তার গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। অটোরিকশা না পাওয়ায় পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে নিহতের পরিবারের দাবি, অটোরিকশা ছিনতাই নয়, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে মোকলেছুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের কাউয়াফান্দা এলাকায় পুলিশ সদস্য নওশা মিয়ার বাড়ির সামনে থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মোকলেছুর রহমান উপজেলার সদর ইউনিয়নের নবনীদাস এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বাড়ির কাজকর্ম শেষ করে খাওয়া-দাওয়া করেন মোকলেছুর রহমান। এরপর নিজের অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। রাতে আর বাড়িতে ফেরেননি তিনি। রাত সাড়ে ১১টার দিকে কাউয়াফান্দা এলাকায় একটি বাড়ির সামনে তার রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, এক পথচারী ওই সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ির আলোর আলোয় বাড়ির সামনে একজনকে পড়ে থাকতে দেখেন। কাছে গিয়ে দেখতে পান, লোকটি ছটফট করছেন। বাড়ির গেটেও রক্তের ছাপ ছিল। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন জড়ো হন। স্থানীয় লোকজনের ধারণা, গেটে থাকা রক্তের ছাপ দেখে মনে হচ্ছে, হামলার পর রক্তাক্ত অবস্থায় মোকলেছুর রহমান নিজেকে বাঁচাতে ওই বাড়ির গেট পর্যন্ত গিয়ে ডাকাডাকি করেছিলেন।
বাড়ির মালিক পুলিশ সদস্য নওশা মিয়ার স্ত্রী বলেন, ‘আমাদের গেটে লাগা রক্ত দেখে মনে হচ্ছে, লোকটি নিজেকে বাঁচানোর জন্য আমাদের গেটে এসে ডাকছিলেন। আমরা বাসার ভেতর থেকে বুঝতে পারিনি। পরে চিল্লাচিল্লি শুনে বাইরে এসে দেখি এই অবস্থা।’ নিহত মোকলেছুর রহমানের ছেলে মিজানুর রহমান বলেন, তার বাবাকে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের জন্য হত্যা করা হয়নি। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
মোকলেছুর রহমানের ভাই মমিনুর ইসলাম বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের কারণে তার ভাইকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘গত ১৩ তারিখে মামলার তারিখ ছিল। হাজিরা দিয়ে কোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় সেকেন্দার আমার ভাইয়ের গলা কাটতে চেয়েছিল। এই জমি নিয়ে অনেকবার মামলা হয়েছে। যতবার মামলা হয়েছে, আমরা রায় পেয়েছি। সেদিনও কোর্টে আমাদের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। আমাদের বিশ্বাস, এরা লোক দিয়ে আমার ভাইকে মারিয়েছে।’
মমিনুর ইসলাম যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তাদের বাড়িতে গিয়ে তাদের পাওয়া যায়নি। পরে কথা হয় তার ছেলের বউ রুবিনা বেগমের সঙ্গে। রুবিনা বেগম বলেন, ‘আমরা কেন তাকে মারতে যাব? তাদের সঙ্গে আমাদের মামলা চলছে, তাই বলে কেন তাকে আমরা হত্যা করব? সবাই বলছে, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে।’
গঙ্গাচড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস ছবুর বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশের সুরতহাল করেছে। পরে লাশ থানায় নেওয়া হয়। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ওসি বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক ধারণা, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করে থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









