শরতের শুরুতে ব্রুকলিনের রাস্তাগুলোতে বাতাস বদলে যায়। গাছের পাতায় তখনও সবুজের শেষ আলো, কিন্তু শহরের মানুষের হাতে বই। কেউ পুরোনো মলাটের উপন্যাস বুকে চেপে হাঁটেন, কেউ সদ্য প্রকাশিত কবিতার বই নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন কোনো লেখকের সামনে। কেউ এমন একটি গল্পের লেখককে খুঁজে বেড়ান, যে গল্প একদিন তাঁর নিজের জীবনের অন্ধকারে আলো জ্বেলেছিল। বই কখনো শুধু বই নয়। কখনো তা একটি ঘর, যেখানে মানুষ একা থেকেও একা থাকে না। কখনো তা হারিয়ে যাওয়া মানুষের কণ্ঠ। কখনো এমন একটি দরজা, যার ওপারে অন্যের জীবন অপেক্ষা করে থাকে।
ব্রুকলিন বুক ফেস্টিভ্যাল সেই দরজাগুলোর অনেকগুলো একসঙ্গে খুলে দেয়।
২০২৬ সালে নিউইয়র্কের এই বিখ্যাত সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত হবে ২০ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর। মূল উৎসব দিবস ও সাহিত্যবাজার বসবে ২৭ সেপ্টেম্বর, ব্রুকলিন বরো হল এবং আশপাশের এলাকায়। তার আগের দিন, ২৬ সেপ্টেম্বর, শিশুদের জন্য থাকবে বিশেষ আয়োজন। ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ভার্চুয়াল ফেস্টিভ্যাল ডে। উৎসবের সঙ্গে যুক্ত ‘বুকএন্ড ইভেন্টস’ ছড়িয়ে পড়বে নিউইয়র্কের বিভিন্ন বরো ও সাহিত্যিক পরিসরে।
একটি শহরের স্মৃতি থেকে বিশ্বসাহিত্যের মঞ্চ
ব্রুকলিন বুক ফেস্টিভ্যালের যাত্রা শুরু ২০০৬ সালে। তখন এর স্বপ্ন ছিল সহজ—বইকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনা। এমন একটি উৎসব, যেখানে লেখক ও পাঠকের মধ্যে কোনো উঁচু মঞ্চ থাকবে না, কোনো দূরত্ব থাকবে না। যেখানে বই কিনতে না পারলেও মানুষ আসতে পারবেন, শুনতে পারবেন, প্রশ্ন করতে পারবেন, নিজের গল্প বলতে পারবেন। শুরুতে এক দিনের ছোট্ট আয়োজন ছিল এটি। কিন্তু ব্রুকলিনের মতো শহরে একটি গল্প কখনো এক জায়গায় থাকে না। তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে, রাস্তায়, বাড়িতে, লাইব্রেরিতে, স্কুলে। উৎসবও তেমনি ধীরে ধীরে বড় হয়েছে।
আজ ব্রুকলিন বুক ফেস্টিভ্যাল শুধু একটি বইমেলা নয়। এটি বহুদিন ধরে বহন করে আসা শহরের স্মৃতি, অভিবাসীদের ভাষা, প্রতিবাদী মানুষের ইতিহাস এবং নতুন প্রজন্মের কল্পনাকে একসঙ্গে ধারণ করে। আট দিনের এই আয়োজনে থাকে লেখক-আলোচনা, কবিতা পাঠ, কর্মশালা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, শিশুদের অনুষ্ঠান এবং প্রকাশকদের নানা কার্যক্রম। ব্রুকলিনের পরিচয়ই বহুস্বরের। এখানে বহু জাতি, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ পাশাপাশি বাস করেন। সেই কারণেই এই উৎসবের সাহিত্যও একরৈখিক নয়। আফ্রিকান-আমেরিকান ইতিহাস, অভিবাসনের স্মৃতি, যুদ্ধ, ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার, জলবায়ু সংকট, প্রেম, ক্ষতি ও প্রতিরোধ—সবকিছুই এখানে গল্পের অংশ হয়ে ওঠে।
উৎসবের মূল দিনে অংশ নেবেন প্রায় ৩০০ লেখক এবং ২৫০টি স্বাধীন ও বড় প্রকাশনা সংস্থা। এই সংখ্যা শুধু একটি বড় আয়োজনের পরিচয় নয়; ব্রুকলিন বুক ফেস্টিভ্যাল ঘোষণা করে—বই এখনও মানুষের মধ্যে সেতু তৈরি করার ক্ষমতা রাখে।

পাঠক যখন লেখকের সামনে দাঁড়ান
একজন পাঠক সাধারণত লেখকের সঙ্গে একান্তে দেখা করেন। একটি বই খুলে তিনি নিজের ঘরে বসেন। শব্দগুলো তার দিকে আসে, কিন্তু লেখক জানেন না সেই শব্দ কোথায় পৌঁছেছে। কোন বাক্যে পাঠক থেমেছেন, কোন চরিত্রের মুখে নিজের মুখ দেখেছেন, কোন পৃষ্ঠায় তার পুরোনো কোনো ক্ষত জেগে উঠেছে—এসব লেখকের অজানা থেকে যায়। বইমেলা সেই অজানার মধ্যে একটি ক্ষণিকের আলো জ্বালায়। ব্রুকলিন বুক ফেস্টিভ্যালে একজন পাঠক তার প্রিয় লেখকের সামনে দাঁড়াতে পারেন। বলতে পারেন, “আপনার বইটি পড়ে আমি আমার মাকে নতুন করে বুঝেছি।” অথবা কোনো কবিকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, কেন তার কবিতায় এত দীর্ঘ নীরবতা। একজন লেখকও তখন বুঝতে পারেন, তাঁর লেখা শুধু তার নিজের নয়। তা অন্যের জীবনে গিয়ে নতুন অর্থ পেয়েছে।
সম্পর্কের সৌন্দর্য এখানেই। লেখক শব্দ দেন, পাঠক তাকে জীবন দেন। লেখক একটি পৃথিবী তৈরি করেন, পাঠক সেখানে নিজের স্মৃতি নিয়ে প্রবেশ করেন। কখনো লেখক যা বলতে চেয়েছিলেন, পাঠক তার চেয়েও অন্য কিছু আবিষ্কার করেন। সেই আবিষ্কারই সাহিত্যের দীর্ঘ জীবন। ব্রুকলিন বুক ফেস্টিভ্যাল এই অদৃশ্য সম্পর্ককে দৃশ্যমান করে। সেখানে বইয়ের পাতার মানুষগুলো হঠাৎ রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে ওঠেন। তাদের কণ্ঠ শোনা যায়, তাদের হাসি দেখা যায়, তাদের দ্বিধা ও প্রশ্নও বোঝা যায়।
২০২৬ সালের নতুন আন্তর্জাতিক কণ্ঠ
এবারের উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ নতুন আন্তর্জাতিক লেখকদের সামনে আনা। ‘বুকএন্ড ইভেন্টস’-এর গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন ‘হু? নিউ! ইন্টারন্যাশনাল’। এতে অংশ নেবেন ফিলিস্তিনি লেখক সারা আবু গাজাল, কানাডীয় আদিবাসী লেখক টাইসন স্টুয়ার্ট, কুর্দি লেখক আগরি ইসমাইল এবং আজারবাইজানি কবি এগানা জাব্বারোভা।
তাদের লেখায় যে পৃথিবী উঠে আসে, তা এক দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। নির্বাসন, স্মৃতি, পরিচয়, ভাষা, ভূমি এবং হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ—এসব অভিজ্ঞতা ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস থেকে এলেও মানুষের ভেতরের একাকিত্ব ও প্রতিরোধে মিল খুঁজে পায়। সাহিত্য উৎসবের কাজ শুধু পরিচিত নামগুলোকে আবার সামনে আনা নয়। কখনো তার কাজ হলো নতুন কণ্ঠ শোনা। যারা এখনও বিশ্বসাহিত্যের বড় মঞ্চে পৌঁছাননি, তাদের জন্য জায়গা তৈরি করা। ২০২৬ সালের এই আয়োজন ব্রুকলিনে সেই কাজটিই করতে চাইছে।
ঔপনিবেশিকতার শেষ কোথায়?
‘ডাজ কলোনিয়ালিজম এভার এন্ড?’ শিরোনামের আলোচনাটি উৎসবের সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক প্রশ্নগুলোর একটি। ঔপনিবেশিকতা কি সত্যিই ইতিহাসের বইয়ে শেষ হয়ে গেছে? নাকি তার ভাষা, ক্ষমতার কাঠামো, সীমান্ত এবং সহিংসতা এখনও মানুষের বর্তমান জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে? ফিলিস্তিন, স্মৃতি, বেঁচে থাকা এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নিয়ে আলোচনাটি সাহিত্যকে সরাসরি বিশ্বের বাস্তবতার সামনে দাঁড় করাবে।
লেখকের কাজ কখনো শুধু উত্তর দেওয়া নয়। কখনো তিনি এমন প্রশ্ন করেন, যা সমাজ ভুলে যেতে চায়। কখনো তিনি সেই মৃতদের জন্য কথা বলেন, যাদের নাম ইতিহাসের বড় বইগুলোতে লেখা হয়নি। কখনো তিনি দেখান, একটি দেশের গল্প অন্য দেশের নীরবতার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত। ব্রুকলিনের এই আলোচনা সেই অস্বস্তিকর কিন্তু প্রয়োজনীয় জায়গাটিই মেলে ধরবে।
ইতিহাসের ভেতর ফিরে দেখা
২০২৬ সালের উৎসবে ইতিহাসকে নতুনভাবে পড়ার জন্যও রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন।

‘রি-এনঅ্যাক্টিং, রি-ভিজিটিং হিস্ট্রি’ আলোচনায় লেখকেরা বলবেন, ইতিহাস কীভাবে উপন্যাসে ফিরে আসে। কখনো পারিবারিক স্মৃতি হয়ে, কখনো পুরোনো নথি হয়ে, কখনো এমন একটি ক্ষত হয়ে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করা হয়। ‘টু হান্ড্রেড ফিফটি ইয়ার্স অব আমেরিকান অ্যাক্টিভিজম’ অনুষ্ঠানে কমিকস ও গ্রাফিক নভেলের মাধ্যমে আমেরিকার প্রতিবাদ, গণতন্ত্র এবং সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা হবে।
‘উইমেন চেঞ্জিং হিস্ট্রি’ আলোচনায় তিনটি নতুন গ্রাফিক নভেলকে কেন্দ্র করে এমন নারীদের গল্প বলা হবে, যারা ক্ষমতা, স্বৈরশাসন এবং সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।
এই আয়োজনগুলো মনে করিয়ে দিবে, ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের লেখা নয়। ইতিহাসের নিচে আরও অনেক ইতিহাস চাপা থাকে—নারীদের, অভিবাসীদের, নিপীড়িতদের, পরাজিতদের এবং যারা কথা বলতে পারেনি তাদের। সাহিত্য সেই চাপা পড়া কণ্ঠগুলোকে আবার শুনতে সুযোগ করে দেয়।
টনি মরিসনকে স্মরণ, গ্রেগ টেটকে ফিরে পাওয়া
২০২৬ সালের উৎসবে সাহিত্যিক উত্তরাধিকারও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
‘দ্য মেনি ফ্যাসেটস অব টনি মরিসন’ অনুষ্ঠানে টনি মরিসনের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হবে। তার লেখায় যে আমেরিকা দেখা যায়, তা শুধু একটি দেশের নয়; তা স্মৃতি, বর্ণবাদ, পরিবার, ইতিহাস এবং মানুষের বেঁচে থাকার গভীর অভিজ্ঞতার আমেরিকা। মরিসনের সাহিত্য আমাদের স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, মানুষের ইতিহাস কখনো সরল নয়। একটি পরিবারের গল্পের ভেতরেও একটি জাতির দীর্ঘ ইতিহাস লুকিয়ে থাকতে পারে। একটি শিশুর স্মৃতির ভেতরেও একটি সমাজের অপরাধের চিহ্নগুলো খুঁজে পাওয়া যায়।
অন্যদিকে সাংস্কৃতিক সমালোচক ও সাংবাদিক গ্রেগ টেটকে স্মরণ করে অনুষ্ঠিত হবে ‘হ্যালো ডার্কনাস: রিফ্লেকশন্স অন দি ইন্টারগ্যাল্যাকটিক গ্রেগ টেট’। আর্থার জাফা, কোয়েস্টলাভ, ড্রিম হ্যাম্পটন এবং জেলানি কোবের মতো শিল্পী ও চিন্তকেরা তার জীবন ও কাজ নিয়ে কথা বলবেন। এমন আয়োজন প্রমাণ করে, একটি সাহিত্য উৎসব কেবল নতুন বই উদ্যাপন করে না। এটি সেইসব মানুষের স্মৃতিও ধরে রাখে, যারা আমাদের পড়ার অভ্যাস বদলে দিয়েছেন।
কবিতা চলবে শহরের ভেতর দিয়ে
ব্রুকলিন বুক ফেস্টিভ্যালের আরেকটি বিশেষ আয়োজন ‘পোয়েট্রি ইন মোশন: রিড অ্যান্ড রাইড’। নিউইয়র্কের গণপরিবহনের সঙ্গে কবিতার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হবে এই অনুষ্ঠান। ট্রেন ও বাসে যাত্রা করতে করতে কবিতা পড়া—শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর মধ্যে শহরের সঙ্গে সাহিত্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ কবিতা শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না। তা মানুষের যাত্রাপথে থাকে, জানালার বাইরে ছুটে যাওয়া শহরে থাকে, অচেনা মানুষের মুখেও থাকে।নিউইয়র্কের গণপরিবহনে কবিতা পৌঁছে দেওয়ার দীর্ঘ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত এই অনুষ্ঠান জানাবে, সাহিত্যকে মানুষের কাছে নিয়ে যেতে সবসময় একটি গ্রন্থাগার বা মঞ্চের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি চলন্ত ট্রেনই যথেষ্ট।
শিশুদের হাতে ভবিষ্যতের বই
২৬ সেপ্টেম্বরের ‘চিলড্রেনস ডে’ শিশুদের জন্য আলাদা এক পৃথিবী তৈরি করবে। একটি শিশুর কাছে বই প্রথমে জ্ঞান নয়, আনন্দ। গল্পের চরিত্র তার বন্ধু হয়ে ওঠে, ছবির জগৎ তার নিজের কল্পনার সঙ্গে মিশে যায়। সেই প্রথম সম্পর্কই পরে পাঠাভ্যাসে রূপ নেয়। শিশু দিবসে থাকবে লেখকদের সঙ্গে দেখা, গল্প বলা, বই পড়া এবং সৃজনশীল নানা কার্যক্রম। শিশুদের জন্য এমন আয়োজন জরুরি, কারণ ভবিষ্যতের পাঠক তৈরি হয় আজকের বিস্ময় থেকে।
একটি উৎসব, বহু মানুষের ঘর
ব্রুকলিন বুক ফেস্টিভ্যালের বড় সৌন্দর্য হয়তো তার বিশাল লেখক তালিকায় নয়। বরং সেই ছোট ছোট মুহূর্তে, যা কোনো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে লেখা থাকে না। একজন বৃদ্ধ পাঠক বহু বছর পর তার প্রিয় লেখকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। একজন তরুণী প্রথমবার কোনো কবির পাঠ শুনছেন। একটি শিশু নিজের হাতে প্রথম বই বেছে নিচ্ছে। কেউ একটি রাজনৈতিক আলোচনায় প্রশ্ন করছেন। কেউ অন্যের গল্প শুনে নিজের ইতিহাস নতুন করে ভাবছেন।
এসব মুহূর্তে বই কেবল বস্তু থাকে না। তা হয়ে ওঠে মানুষের মধ্যে একটি সম্পর্ক। ব্রুকলিন বুক ফেস্টিভ্যাল ২০২৬ সেই সম্পর্কেরই উৎসব। এখানে পাঠক শুধু বই কিনতে আসেন না; তিনি নিজের পৃথিবীকে একটু বড় করতে আসেন। লেখক শুধু নিজের লেখা পড়তে আসেন না; তিনি জানতে আসেন, তার শব্দ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। শরতের সেই কয়েকটি দিনে ব্রুকলিন আবার মনে করিয়ে দেবে—একটি গল্প কখনো একজন মানুষের সম্পত্তি নয়। তা যখন পাঠকের হাতে পৌঁছে যায়, তখন তার আরেকটি জীবন শুরু হয়।
আর সেই জীবনই হয়তো সাহিত্যের সবচেয়ে দীর্ঘ উত্তরাধিকার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









