মঞ্চে ওঠার মুহূর্তে ইয়াসমিন হামদানের কণ্ঠ এখনো রহস্যময়, এখনো মায়াবী। প্যারিসের ল্য ত্রিয়ানোঁ থিয়েটারে মার্চের এক সন্ধ্যায় তিনি কালো পোশাকে মঞ্চে দাঁড়ালেন—একজন পুরোনো রক সংগীতশিল্পীর মতো। তারপর শুরু হলো তার সংযত অথচ গভীর সংবেদনশীল পরিবেশনা। সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রকাশিত তার চতুর্থ একক অ্যালবাম ‘আই রিমেম্বার, আই ফরগেট’–এর পর ধারাবাহিক কনসার্টের সূচনা আজকের এ সন্ধ্যা থেকেই।
পঞ্চাশ বছর বয়সী এই শিল্পী একসময় লেবাননের আন্ডারগ্রাউন্ড সংগীতজগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ ছিলেন। কিংবদন্তিতুল্য জুটি সোপকিলসের অর্ধেক হিসেবে তিনি যে পথ তৈরি করেছিলেন, আজও তার ওপর দিয়ে হাঁটছে আরব বিশ্বের বিকল্প সংগীত। হামদান একই সঙ্গে একজন বাহক, বিদ্রোহী এবং স্মৃতির রক্ষক। আরব সংগীতের দীর্ঘ ঐতিহ্য তার কাছে কোনো জাদুঘরের বস্তু নয়; বরং এমন এক জীবন্ত শরীর, যার ভেতর তিনি প্রতিনিয়ত নতুন শব্দ, নতুন ছন্দ ও নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন।
তার পরিবেশনা মনে হয় সাময়িক কোনো আশ্রয়ের মতো। আবার কখনো মনে হয় স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব স্মরণসভা।
প্যারিসের যে শহরে তিনি বসবাস করেন, সেই শহরের দর্শকদের সামনে মঞ্চে উঠেই তিনি তাদের আকর্ষণ করে ফেলেন। ল্য ত্রিয়ানোঁর মৃদু অন্ধকারে তার কণ্ঠ ওঠানামা করে, কখনো একটি মাইক্রোফোনের প্রতিধ্বনি নিয়ে খেলেন, কখনো অন্যটির সঙ্গে মিশে যান। পাশে থাকে সিন্থেসাইজার এবং তার লাইভ ব্যান্ডের সদস্যরা। শব্দগুলো তখন আর কেবল গান থাকে না; তারা অন্ধকারের মধ্যে চলাচল করতে থাকা এক ধরনের আলো হয়ে ওঠে।
এই অ্যালবামের গভীরে রয়েছে সংগীতের সমষ্টিগত এবং নিবার্ণ শক্তির প্রতি বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তিনি তার বোনকে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান। দুজন একসঙ্গে গান করেন ফিলিস্তিনি গান ‘শমেল্লি’। পরে যোগ দেন ওমর হারব, যিনি অ্যালবামটির কাজেও সহযোগিতা করেছেন।
তার শেষ অ্যালবাম ‘আল জামিলাত’ প্রকাশের পর কেটে গেছে নয় বছর। কোমল ও ধ্যানমগ্ন সেই গানের সংকলনের পর ‘আই রিমেম্বার, আই ফরগেট’–এ তিনি আবারও তার দীর্ঘদিনের সহযোগী, প্রযোজক মার্ক কোলাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন। তবে এবার তাঁদের সংগীতের পরিসর আরও বিস্তৃত, আরও বহুমাত্রিক।
নিজের স্বভাবের মতোই হামদান এমন এক সংগীতশিল্পী, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর সংগীতশিল্পের চাপ থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন। বিরতিটি প্রথমে যতটা দীর্ঘ হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়েও দীর্ঘ হয়েছে। এর মধ্যে তার জন্মভূমি লেবাননের পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে গেছে। অবশেষে যে শব্দগুলো তিনি তার অনুভূতিগুলো প্রকাশের জন্য খুঁজে পেয়েছেন, আজ সেগুলোর অর্থ যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে—যখন লেবানন আবারও আক্রমণের শিকার, আর গাজায় ফিলিস্তিনিরা এখনো সেই ধ্বংস ও যন্ত্রণা বহন করছেন, যাকে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই অ্যালবামের সৃষ্টিশীলতা ও সামাজিক প্রতিধ্বনি অন্য শিল্পীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে তিউনিসীয় ডিজে দিনা আবদেলওয়াহাব এবং চিলীয় সংগীতশিল্পী নিকোলাস ইয়ারসহ খ্যাতিমান শিল্পীরা অ্যালবামের বিভিন্ন রিমিক্স প্রকাশ করেছেন।
এই অ্যালবামের গানগুলো কীভাবে তৈরি হলো? পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে একটু বলবেন?
আমি যখন কোনো অ্যালবাম বা প্রকল্প নিয়ে কাজ করি, তখন সাধারণত আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সেই মুহূর্তে আমি যা অনুভব করছি, সেখান থেকেই শুরু করি। এই অ্যালবামের শুরুটা আমার জন্য বেশ যন্ত্রণাদায়ক ছিল। সুর, মেলোডি, হারমনি, অ্যারেঞ্জমেন্ট—এমনকি অ্যালবামটির সামগ্রিক ধারণাটিও কল্পনা করা তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল শব্দ খুঁজে পাওয়া।
আসলে শব্দগুলো এসেছিল অনেক পরে, যখন প্রকল্পটি প্রায় শেষের দিকে পৌঁছে গেছে।
কোনো সহিংসতা যখন আপনাকে ভেতর থেকে এত গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়, তখন তার ওপর শব্দ বসানো খুব কঠিন। ২০১৯ সালের কোনো এক সময়ে আমার মনে হলো, আমাকে থামতে হবে। আমি কিছুটা শূন্য হয়ে পড়েছিলাম। ভাবতে চেয়েছিলাম, কেন আমি প্রথমে সংগীত তৈরি করতে শুরু করেছিলাম। এই পৃথিবীর ভেতরে আমি কী গ্রহণ করতে চাই, আর কী চাই না।
আজ আমরা সংগীতশিল্পীরা এমন কিছু কাজের পদ্ধতির মুখোমুখি হচ্ছি, যা সব সময় আমাদের প্রকৃত ইচ্ছার সঙ্গে মেলে না। যেমন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রচারের যন্ত্রে পরিণত হওয়ার প্রত্যাশা। শিল্পীকে যেন নিজের সংগীতের পাশাপাশি নিজের বিপণন ব্যবস্থাপনাও করতে হবে।
এক অর্থে এটি এক ধরনের একনায়কতন্ত্রের মতো। কিছু নিয়ম আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, আমরা তা চাই কি না, সে প্রশ্ন না করেই।
আমার নীরবতা দরকার ছিল। নিজের শক্তি আবার জড়ো করার জন্য, নিজেকে নতুন করে কেন্দ্রস্থ করার জন্য।
তারপর এলো কোভিড। একই সময়ে লেবাননে শুরু হলো অর্থনৈতিক সংকট। দুটো ঘটনাই ছিল বিধ্বংসী। প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে, কারণ আমার বাবা-মা ও বন্ধুদের জীবন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তারপর নিজের চোখের সামনে একটি দেশকে ভেঙে পড়তে দেখা—এ এক অসহনীয় অভিজ্ঞতা।
একটি দেশকে পতনের দিকে যেতে দেখা হৃদয়বিদারক।
এই সংকট এবং সন্দেহের মধ্যেই আমি ধীরে ধীরে আবার কাজ শুরু করি। প্রথমে খুব ছোট ছোট ভাবনা নিয়ে। কখনো শুধু একটি টুকরো সুর। প্রতিদিন অল্প একটু করে।
শেষ পর্যন্ত মার্ক কোলাঁর সঙ্গে আবার স্টুডিওতে যাই। আমরা একসঙ্গে অনেক সংগীত শুনলাম, নানা ধরনের শব্দ নিয়ে পরীক্ষা করলাম। এরপর বিভিন্ন সংগীতশিল্পীর সঙ্গে সেশন শুরু করলাম। তখনই অ্যালবামের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হতে শুরু করে—আমি আসলে কী ধরনের জগৎ তৈরি করতে চাই।
আর আশ্চর্যের বিষয়, ঠিক তখনই শব্দগুলোও আসতে শুরু করল।
সেই সময়ে কিছু গান সরাসরি লেবাননের ঘটনাবলি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। বন্দরের বিস্ফোরণ তার মধ্যে অন্যতম। ‘হোন’ গানটিতে সেই অভিজ্ঞতার ছাপ আছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমি কখনো এসব গানকে কোনো নির্দিষ্ট সময় বা স্থানের মধ্যে আটকে রাখতে চাই না। এগুলো কোনো অর্থেই জাতীয়তাবাদী গান নয়।
আমি যা আশা করিনি, তা হলো এত দ্রুত আবারও আমাদের ট্রমার মধ্যে ফিরে যেতে হবে—যেমনটি ঘটেছে গাজায়। লেবাননের যুদ্ধ এবং গাজায় চলমান গণহত্যা আমাকে আবার তীব্র মানসিক চাপ ও গভীর যন্ত্রণার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। সেই কষ্টের কিছু অংশ সংগীতের মধ্যে প্রবেশ করেছে, বিশেষ করে ‘হোন’–এর মতো গানগুলোতে।
প্রবাসে থাকা আমাদের অনেকের জন্য এই সবকিছু দূর থেকে দেখা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। মনে হয়, আমরা একই সময়ে দুটি আলাদা বাস্তবতায় বসবাস করছি। দুটি ভিন্ন স্থান-কালের মধ্যে। এই অভিজ্ঞতার মধ্যে প্রায় এক ধরনের বিভক্তি আছে।
‘মর এল তাগান’–এর মতো পুরোনো গানগুলো নতুন করে করার সিদ্ধান্ত কীভাবে নিলেন? গানগুলো আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে?’
‘মর’ একটি মওয়াশশাহ—শাস্ত্রীয় আরবি কণ্ঠসংগীতের একটি ঐতিহ্যবাহী রূপ। আমার বন্ধু উসামা আবদেল ফাতাহ, যিনি অসাধারণ ওউদবাদক এবং গায়ক, আমাকে গানটি শোনান। প্রথমবার শুনেই আমি তার প্রতি আকৃষ্ট হই। মনে হলো, গানটিকে নতুন করে গাইতে চাই।
এক অর্থে আমার প্রায়ই মনে হয়, আমি গান বেছে নিই না; গানই আমাকে বেছে নেয়।
এই গানটির মধ্যে আমি এক ধরনের ক্যাথারসিস পেয়েছিলাম। এমন কিছু, যা আমাকে শক্তি দেয়। আমার ভালো লাগে আগে থেকেই থাকা কোনো সৃষ্টিকে নতুন একটি প্রেক্ষাপটে স্থাপন করতে। তাকে বদলাতে, পরীক্ষা করতে, তার প্রচলিত নিয়মগুলোর সঙ্গে খেলতে।
প্রয়োজনে সবকিছু সম্পূর্ণ নতুন করে ফেলার স্বাধীনতাটিও আমি উপভোগ করি।
আমরা গানটিকে নতুনভাবে সাজিয়েছি, শেষ পর্যন্ত সেটিকে আমাদের নিজেদের করে নিয়েছি। প্রথমে ওমর হারবের সঙ্গে কাজ করি। তিনি ‘দ্য বিউটিফুল লুজার্স’ গানটিরও সহ-রচয়িতা। পরে মার্ক কোলাঁ এবং আমি গানটিকে আরও দূরে নিয়ে যাই।
ইচ্ছাকৃতভাবেই আমরা গানটির ঐতিহ্যবাহী দিকটিকে অনেকটা ডুবিয়ে দিয়েছি, কিন্তু তার স্মৃতির একটি চিহ্ন রেখে দিয়েছি। যেন পুরোনো গানটিকে পুনর্ব্যবহার করে তাকে নতুন জীবন দেওয়া।

‘প্রাণবন্ত ফিলিস্তিনি গান “শমেল্লি” নতুন করে গাওয়ার ইচ্ছা কেন হলো?’
আসলে গানটি আমি কাকতালীয়ভাবেই আবিষ্কার করি। প্রথমে আমাকে আকৃষ্ট করেছিল এর সুর এবং আবেগের শক্তি। পরে এর অর্থ আমাকে আরও গভীরভাবে টানতে শুরু করে—গোপন ভাষার ধারণা, ফিলিস্তিনি নারীদের প্রতিরোধ, এবং গানটির ভেতরে থাকা কবিতা।
কারাগারে বন্দী প্রিয়জনদের কাছে গোপন বার্তা পৌঁছে দিতে তারা সংকেতময় গান গাইতেন। নিয়ন্ত্রণ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে তারা কবিতা ও সংগীতকে ব্যবহার করেছিলেন। এই কৌশলের মধ্যে যে শক্তি এবং মর্যাদা রয়েছে, তা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
সবকিছুর পরও তারা বিজয়ী। কারণ তারা নিজেদের কণ্ঠ হারাতে দেননি। এই গানগুলোকে “তারওয়েদা” বলা হয়। উসমানি সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের সময় থেকেই এ ধরনের গান প্রচলিত। আজ যা ঘটছে, তার সঙ্গে এসব গানের এক অদ্ভুত প্রতিধ্বনি রয়েছে। সে কারণেও গানটি নতুন করে গাইতে চেয়েছি।
যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে, তা হলো এই নারীদের সৃষ্টিশীলতা। তারা শুধু নিপীড়ন সহ্য করেননি; নিজেদের অভিজ্ঞতাকে অন্য এক শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। নিজেদের জীবনের ওপর আবারও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছেন।
তারা কারারক্ষীকে নিজেদের জগৎ থেকে বাদ দিয়েছিলেন। আজ দখলদারিত্ব এবং ফিলিস্তিনিদের চলমান ভয়াবহতার কারণে গানটির প্রতীকী অর্থ আরও গভীর হয়েছে। আমি এটিকে অসাধারণ অনুপ্রেরণাদায়ক বলে মনে করি।
আমার সব ফিলিস্তিনি বন্ধু এ ধরনের গান চেনেন। মা থেকে মেয়ের কাছে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে গানগুলো চলে এসেছে। কয়েক দশক ধরে টিকে থাকা এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এটি। আমার কাছে বিষয়টি অত্যন্ত কাব্যিক।
লেবাননেও আমাদের একই ধরনের গান ছিল। আমি কল্পনা করি, দখলদারিত্বের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন আরও অনেক দেশেই এ ধরনের ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে। মানুষের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেওয়া যেতে পারে। তবু তারা প্রতিরোধ করে যেতে পারে।
অ্যালবামের নামটি আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে?
আমি অ্যালবামের নাম নিয়েছি *আই রিমেম্বার, আই ফরগেট* গানটি থেকে। এখন পেছনে তাকালে বুঝতে পারি, গানটি অনেক যন্ত্রণার মধ্য থেকে জন্ম নিয়েছিল। এটি শেষ করতে আমার দীর্ঘ সময় লেগেছে। আর গানটি আসলে কী বলতে চাইছে, তা বুঝতেও আরও বেশি সময় লেগেছে।
এক অর্থে গানটি প্রায় দুর্ঘটনাবশত তৈরি হয়েছিল। প্রায় তিন বছর ধরে আমি এর সঠিক সুর ও টোন খুঁজে বেড়িয়েছি।
এখন যখন গানটির কথাগুলো আবার পড়ি, তখন বুঝতে পারি এটি অনেকগুলো বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত—স্মৃতি, দায়িত্ব, কঠিন স্মৃতির সঙ্গে আমাদের বেঁচে থাকার পদ্ধতি, এবং কীভাবে সহিংসতা আজকের সমাজে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
এটি সেই প্রত্যাশার কথাও বলে যে, একদিন আমাদের এই স্বাভাবিকীকৃত সহিংসতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। এবং প্রশ্ন তো থেকেই যায়—এখন আমরা যা জানি, তা জেনেও কীভাবে বেঁচে থাকব?
তাই গানটি হতাশাবাদী নয়। বরং এটি নির্মোহ।
আমার মনে হয়, অ্যালবামের নামটি মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারে কারণ এটি ব্যাখ্যার জন্য একটি খোলা জায়গা রেখে দেয়। প্রত্যেকে নিজের অর্থ সেখানে বসাতে পারেন।
শাস্ত্রীয় তারাব নান্দনিকতার সঙ্গে ট্রিপ-হপকে মিলিয়ে কাজ করার চ্যালেঞ্জটি আপনি কীভাবে দেখেন?
আমি নিশ্চিত নই, এটাকে সত্যিই ট্রিপ-হপ বলা যায় কি না। আমি অনেক সংগীত শুনতে শুনতেই সংগীত শিখেছি। পুরোনো গান থেকে স্যাম্পল নিয়ে সেগুলো কেটে নতুনভাবে ব্যবহার করতে সব সময়ই আমার ভালো লেগেছে।
আমি নিজেকে কোনো একটি ভূগোল, শৈলী বা ঘরানার মধ্যে আটকে রাখতে চাই না। খুব দ্রুত একঘেয়ে হয়ে যাই। তাই স্রোতের সঙ্গে চলি। একটি ভাবনা আরেকটি ভাবনার দিকে নিয়ে যায়। সর্বত্রই আমি নতুন ধারণা খুঁজি।
সৃষ্টিশীল থাকা ভালো লাগে। তখন আপনি নিজের অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত থাকেন। কোনো না কোনোভাবে আশাবাদীও থাকেন। উত্থান-পতন, সন্দেহ, হতাশা—সবকিছুর মধ্যেও আপনি জানেন, শেষ পর্যন্ত আনন্দ আপনার কাছে আসবে। এই বিশ্বাসই আপনাকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।
কখনো কোনো কিছু কেবল দুর্ঘটনাবশত ঘটে যায়। কখনো অন্তর্দৃষ্টি থেকে। কখনো শুধুই আকাঙ্ক্ষা থেকে। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো সীমানাগুলোকে অস্পষ্ট করে দেওয়া। যে দেয়ালগুলো আমাকে আটকে রাখতে পারে, সেগুলো ভেঙে ফেলা। সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব স্বাধীন বোধ করা।
স্টুডিওতে যখন অন্য সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করি, তখন তারা নিজেদের সংগীতের জগৎ সঙ্গে নিয়ে আসেন। সেখানেই আকর্ষণীয় সাক্ষাৎ ঘটে। এটাই কাজটিকে উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে।
একটি অ্যালবাম কখনো একজন মানুষের একক কাজ নয়। এটি সব সময়ই একটি সমষ্টিগত কাজ। শব্দকে আমি প্রায় কোনো বস্তু বা উপাদানের মতো নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসি। তাকে পরীক্ষা করি, আকার দিই, বদলে ফেলি।
আরবি ভাষায় গান গাওয়া আমার কাছে সব সময়ই একটি রাজনৈতিক কাজ ছিল। যখন শুরু করেছিলাম, তখন এটি মোটেই জনপ্রিয় ছিল না। বরং শুরুতে অনেকে আমার আরবি গাওয়ার ধরন নিয়ে সমালোচনা করতেন। তাদের মনে হতো, আমি ভাষাটি “সঠিকভাবে” গাইছি না। এতে অনেকেই বিরক্ত হয়েছিলেন।
কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, আমাকে সেই পথেই এগিয়ে যেতে হবে।
আরবি সংগীত অসাধারণ। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সৎ থাকতে চাইলে আমি কখনো ভান করতে পারতাম না যে আমি শুধু এই একটি সংস্কৃতি থেকেই এসেছি। আমার মধ্যে একাধিক সংস্কৃতি কাজ করে, আমাকে পুষ্ট করে।
জাতীয় সীমানা আমাকে খুব বেশি আকর্ষণ করে না। আমি চেয়েছিলাম আরবী ভাষাকে একটি সার্বজনীন সংগীতের রূপ দিতে । কারণ প্রায়ই আমরা যাকে “আমাদের সংস্কৃতি” বলে চিনি, কিংবা যাকে “আরব” বলে চিহ্নিত করি, তা বাস্তবতার জটিলতাকে পুরোপুরি প্রকাশ করে না।
এই অ্যালবামে আপনি বিভিন্ন আরবি উপভাষায় গান গেয়েছেন। বিষয়টি আপনার কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
আমি সব সময়ই আরবির বিভিন্ন রূপে গান গেয়েছি—মিসরীয় আরবি, লেবানিজ আরবি, এমনকি শাস্ত্রীয় আরবিতেও। আমি উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশেও বসবাস করেছি। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গেলে ভাষার সংগীতধর্মিতা কীভাবে বদলে যায়, তা আমার ভালো লাগে।
ছন্দ বদলায়। শব্দ বদলায়। উচ্চারণ বদলায়।
প্রতিটি উপভাষার সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক অনুভূতি যুক্ত থাকে। কিছু উপভাষা আমার মনে নির্দিষ্ট আবহ বা আবেগ তৈরি করে। যেমন মিসরীয় আরবি শুনলে আমার ভেতরে একটি বিশেষ ধরনের অনুভূতি জেগে ওঠে।
তাই কোনো গানকে আমি হালকা করতে চাই, নাকি আরও গম্ভীর করে তুলতে চাই—তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। শাস্ত্রীয় আরবির নিজস্ব একটি ভারী গুণ আছে।
শেষ পর্যন্ত সব সিদ্ধান্তই নির্ভর করে সুরের ওপর এবং আমি কোন আবেগ প্রকাশ করতে চাই, তার ওপর।

পরিচিতি
ইয়াসমিন হামদান সমকালীন আরব সংগীতের অন্যতম স্বতন্ত্র শিল্পী। ১৯৭৪ সালে লেবাননের বৈরুতে জন্ম নেওয়া এই গায়িকা, গীতিকার ও সুরকার শৈশবের কিছু সময় কুয়েত, গ্রিস ও আবুধাবিতে কাটিয়েছেন। বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর সংগীতচিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি সংগীতশিল্পী জেহাদ হাল্লাকের সঙ্গে গড়ে তোলেন ইলেকট্রনিক সংগীতের জুটি সোপকিলস। আরবি ভাষার ঐতিহ্যবাহী গানকে ইলেকট্রনিক বিট, ডাউনটেম্পো ও বিকল্প সংগীতের সঙ্গে মিশিয়ে সোপকিলস দ্রুত লেবাননের আন্ডারগ্রাউন্ড সংগীতজগতে আলোড়ন তোলে। জুটিটি আরব বিশ্বের বিকল্প সংগীতের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিতি পায়।
পরবর্তী সময়ে হামদান একক ক্যারিয়ার শুরু করেন। ফরাসি সংগীতশিল্পী ও প্রযোজক মার্ক কোলাঁর সঙ্গে তার সহযোগিতায় তৈরি হয় ‘ইয়া নাস’ (২০১৩) , ‘আল জামিলাত’ (২০১৭) এবং ‘আই রিমেম্বার, আই ফরগেট’(২০২৫) অ্যালবাম। এসব কাজে তিনি মিসরীয়, লেবানিজ ও শাস্ত্রীয় আরবি ভাষার বিভিন্ন রূপকে আধুনিক ইলেকট্রনিক সংগীতের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
তার কণ্ঠে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন, স্মৃতি ও নির্বাসনের অনুভূতি, এবং স্বাধীন সৃষ্টিশীলতার আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে প্রতিধ্বনিত হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









