মানুষের মাংস খাওয়ার ঘটনা যেন দেখিয়ে দেয়—মানুষ নিজেকে কতটা অমানবিকতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কন ইচিকাওয়া, জাপানি চলচ্চিত্র নির্মাতা
চারদিকে তাকিয়ে দেখি, এক নারী উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। তিনি মৃত, শরীরে কোনো কাপড় নেই। তার মুখের এক পাশ এবং স্তনের কিছু অংশ যেন কেউ কামড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে। কয়েক গজ দূরে দুজন ক্ষুধার্ত চেহারার পুরুষ এবং এক নারী বসে আছে। তারা নেকড়ের মতো চোখে মৃতদেহটির দিকে তাকিয়ে আছে। দুর্ভিক্ষ কি মানুষকে এমন ভয়াবহ ভোজের দিকে ঠেলে দিতে পারে? আমি তা বিশ্বাস করতে চাইনি। অথচ তাদের ক্ষুধার্ত, উন্মত্ত চেহারা দেখে সন্দেহও করতে পারছিলাম না যে অসম্ভব বলে মনে হওয়া এই ঘটনাটিই হয়তো সত্য।
উইলিয়াম ব্রিটলব্যাংক
মানসিক বিপর্যয়ও ছিল ব্যাপক। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মানুষের মাংস খাওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল—কখনো নিজের পরিবারের সদস্যের দেহও। যতদূর আমরা জানতে পারি, এসব ঘটেছিল এমন কিছু মানুষের মধ্যে, যারা নিজেরাই দুর্ভিক্ষের শিকার ছিলেন এবং ক্ষুধার যন্ত্রণায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন।
জোসেফ লি, আইরিশ ইতিহাসবিদ
জন পোস্টের দ্য লাস্ট গ্রেট সাবসিস্টেন্স ক্রাইসিস ইন দ্য ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড (১৯৭৭) দুর্ভিক্ষের ইতিহাস নিয়ে লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। বইটির শিরোনাম যে দুর্ভিক্ষকে বোঝায়, তা ঘটেছিল ১৮১৬ সালের সেই অন্ধকার ও শীতল ইউরোপীয় গ্রীষ্মের সময়। তখন লর্ড বায়রন লিখেছিলেন—
‘উজ্জ্বল সূর্য নিভে গেল, আর তারাগুলো যেন অন্ধকারে পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়াল; আলোহীন, পথহীন, বরফশীতল পৃথিবী চাঁদহীন আকাশের নিচে অন্ধ ও কালো হয়ে দুলছিল।’

মানুষের মাংস খাওয়ার কথা ভাবলেই আমাদের সভ্যতার মুখোশটি যেন একটু সরে যায়। আমরা জানতে চাই—মানুষ কতদূর পর্যন্ত নিজেকে নামিয়ে নিতে পারে? কিন্তু আরও তীক্ষ প্রশ্নটি অন্য জায়গায়— কোন পরিস্থিতি একজন মানুষকে এমন জায়গায় ঠেলে দেয়, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য মৃত মানুষের দেহও খাদ্য হয়ে ওঠে?
এই প্রশ্নটিই দুর্ভিক্ষের ইতিহাসের অস্বস্তিকর সত্যকে সামনে আনে। দুর্ভিক্ষ মানে শুধু খাদ্যের ঘাটতি নয়। ইতিহাসে দুর্ভিক্ষ বলতে এমন খাদ্য বা খাদ্য কেনার ক্ষমতার সংকটকে বোঝানো হয়, যা অনাহার বা অনাহারজনিত রোগে অতিরিক্ত মৃত্যুর জন্ম দেয়। অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু মাঠে কত ধান ফলল, গুদামে কত শস্য ছিল, কিংবা আকাশে বৃষ্টি হলো কি না—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, ‘কার কাছে খাদ্য পৌঁছাল, কে তা কিনতে পারল এবং কে খাদ্য থেকে বঞ্চিত হলো।’
জন পোস্ট ১৯৭৭ সালে পশ্চিমা বিশ্বের ‘শেষ বড় জীবিকাসংকট’ নিয়ে যে ইতিহাস লিখেছিলেন, তার শিরোনাম কিছুটা বিভ্রান্তিকর ছিল। কারণ ১৮১৬ সালের পরও ইউরোপে দুর্ভিক্ষের ইতিহাস শেষ হয়ে যায়নি। ১৮৪০-এর দশকের আলু-নির্ভর দুর্ভিক্ষ, বিশেষত আয়ারল্যান্ডের মহাদুর্ভিক্ষ, ফিনল্যান্ডের ১৮৬৭–৬৮ সালের দুর্ভিক্ষ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির খাদ্যসংকট, ১৯২০–২২ ও ১৯৩১–৩৩ সালের সোভিয়েত দুর্ভিক্ষ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভিন্ন যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষ—সবই প্রমান করে যে আধুনিকতার সঙ্গে দুর্ভিক্ষের অবসান স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটেনি। পশ্চিমা বিশ্বের শেষ বড় দুর্ভিক্ষগুলোর একটি ছিল ১৯৪৬–৪৭ সালের মলদোভা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের দুর্ভিক্ষ। প্রায় ২৫ লাখ মানুষের মধ্যে আনুমানিক দুই লাখ মানুষ মারা যেতে পারেন। কিন্তু এই দুর্ভিক্ষের ইতিহাস আজও রাজনৈতিক বিতর্কে আবদ্ধ। কেউ মস্কোর অতিরিক্ত শস্যসংগ্রহকে দায়ী করেন; অন্য গবেষকেরা যুদ্ধোত্তর খাদ্যসংকট, ভয়াবহ ফসলহানি ও অত্যন্ত কম মজুতের ওপর জোর দেন। অর্থাৎ এখানেও দুর্ভিক্ষকে কেবল প্রকৃতির দুর্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত, খাদ্যবণ্টন এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকার—সবই কারণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
মলদোভার দুর্ভিক্ষের স্মৃতি আরও অন্ধকাোচ্ছন্ন হয়ে ওঠে মানুষের মাংস খাওয়ার বিবরণে। কিছু সরকারি নথিতে মৃতদেহের মাংস খাওয়ার কথা পাওয়া যায়। কোথাও আবার অভিযোগ ছিল, মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল তাদের দেহ খাওয়ার উদ্দেশ্যে। ১৯৪৭ সালে কাহুল অঞ্চলের কমিউনিস্ট পার্টির জেলা কমিটির নথিতে কয়েকটি মানুষ-খাওয়ার ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে। বাউরচি গ্রামে হত্যার ঘটনা, কবর থেকে মৃতদেহ তুলে নেওয়া, দেহের অঙ্গ কেটে নেওয়া—এসব বিবরণ প্রশাসনের নজরেও এসেছিল। মলদোভায় দুর্ভিক্ষ চলাকালে মোট ৩৯টি নরখাদনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সংখ্যা ছোট। কিন্তু ইতিহাসের অর্থ সবসময় সংখ্যার আকারে ধরা পড়ে না। দুর্ভিক্ষে মানুষ-খাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর সামান্য অংশের সঙ্গেই যুক্ত। তবু এর গুরুত্ব অন্যত্র। সমাজবিজ্ঞানী পিতিরিম সরোকিন লিখেছিলেন, চরম ক্ষুধা মানুষের ধর্মীয়, নৈতিক, আইনগত ও সামাজিক নিষেধগুলোকে দুর্বল করে দিতে পারে। ড্যানিশ নৃতাত্ত্বিক কির্স্টেন হাসট্রুপের ভাষায়, নরখাদন দেখা দিলে দুর্ভিক্ষ এমন এক সীমায় পৌঁছে যায়, যেখানে বিপদের মাত্রা আর সাধারণ পরিমাপের মধ্যে থাকে না—মানুষের অস্তিত্বই তখন প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মাথায় রাখা জরুরি। মৃত মানুষের দেহ খেয়ে বেঁচে থাকা এক বিষয়; আর জীবিত মানুষকে হত্যা করে তার মাংস খাওয়া সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। প্রথমটিকে বলা যায় বেঁচে থাকার জন্য মৃতদেহ ভক্ষণ; দ্বিতীয়টি হত্যার সঙ্গে যুক্ত মানুষখেকো। ১৮৭৬–৭৮ সালের উত্তর চীনের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের বিবরণে এই সীমারেখাটি একসময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন ক্যাথলিক বিশপ লিখেছিলেন—ক্ষুধার্ত মানুষ প্রথমে মৃতদের দেহ খেত; পরে জীবিত মানুষকেও খাদ্যের জন্য হত্যা করতে শুরু করে। চীনের ঐ দুর্ভিক্ষের সরকারি ও স্থানীয় বিবরণে বারবার ফিরে আসে তিনটি ভয়ংকর বাক্য— মানুষ মানুষকে খাচ্ছে; মানুষ সন্তান বদল করে খাচ্ছে; এমনকি নিকট আত্মীয়ও একে অন্যকে হত্যা করছে।

রুশ ভাষাতেও এই দুই ধরনের ঘটনার জন্য আলাদা শব্দ ছিল—একটি জীবিত মানুষকে হত্যা করে খাওয়ার জন্য, অন্যটি মৃতদেহ ভক্ষণ করার জন্য। ভাষা এখানে ইতিহাসের নির্মমতাকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। তবে ইতিহাসবিদের আসল সমস্যা হলো—এই ধরনের ঘটনা কতটা সত্য? দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা বোঝাতে মানুষখেকোর গল্প কখনো কখনো অতিরঞ্জিত হয়েছে। ইতিহাসবিদ উইলিয়াম চেস্টার জর্ডান সতর্ক করেছিলেন, দুর্ভিক্ষের কাহিনিতে মানুষখেকোর উল্লেখ কখনো একটি প্রচলিত বয়ানে পরিণত হতে পারে—যেন দুর্ভিক্ষকে ‘বাস্তব’ করে তুলতে হলে গল্পে অবশ্যই মানুষখেকো হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করতেই হবে। অন্য ইতিহাসবিদ ডেভিড আর্নল্ডও বহু বিবরণকে গুজব হিসেবে দেখেছেন।
এখানে ক্ষমতার রাজনীতিও কাজ করে। শত্রু জাতি, পরাজিত জনগোষ্ঠী বা ‘অসভ্য’ বলে চিহ্নিত মানুষদের বিরুদ্ধে মানুষখেকোর গল্প ব্যবহার করা হয়েছে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক বয়ানে আফ্রিকা, এশিয়া কিংবা আয়ারল্যান্ডের মানুষকে ‘বর্বর’ প্রমাণ করার জন্য এমন গল্পের ব্যবহার ছিল পরিচিত নোংরা কৌশল। অর্থাৎ একটি মৃতদেহের গল্প কখনো কখনো শুধু ক্ষুধার গল্প থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে অন্য জনগোষ্ঠীকে অমানবিক প্রমাণ করার রাজনৈতিক অস্ত্র।
তবু সব কাহিনি যে মিথ্যা, তা কিন্তু না। ১৮১৬ সালে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে ফরাসি জাহাজ ‘মেদুস’ ডুবে যাওয়ার পর বেঁচে থাকা মানুষদের মধ্যে নরখাদনের ঘটনা ঘটেছিল। ১৮২০ সালে ‘এসেক্স’ নামের তিমিশিকারি জাহাজ ডুবে গেলে বেঁচে থাকা নাবিকেরা নিজেদের মধ্যে কে মারা যাবে তা লটারির মাধ্যমে ঠিক করেছিল, যাতে বাকিরা বেঁচে থাকতে পারে। ১৮৪৬–৪৭ সালে আমেরিকার ডোনার পার্টি সিয়েরা নেভাদায় তুষারে আটকা পড়লে কয়েকজন মানুষখেকোর পন্থা বেছে নেয়। ১৮৪৭ সালে উত্তর-পশ্চিম পথ খুঁজতে গিয়ে স্যার জন ফ্র্যাঙ্কলিনের অভিযানের সদস্যদের মধ্যেও এমন ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
১৮৮৪ সালে ‘মিনিওনেট’ জাহাজডুবির পর টম ডাডলি ও এডউইন স্টিফেন্স ১৭ বছর বয়সী কেবিন-বালক রিচার্ড পার্কারকে হত্যা করে খেয়েছিল। আদালত পরে সমুদ্রযাত্রার তথাকথিত ‘প্রয়োজনের আইন’ প্রত্যাখ্যান করে রায় দেয়—ক্ষুধা আইনকে অকার্যকর করে না। এখানে সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব দেখা যায়। রাষ্ট্রীয় আইন বলে, মানুষকে হত্যা করা যাবে না। কিন্তু যখন রাষ্ট্র বা সমাজ এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে অসম্ভব সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তখন নৈতিকতার প্রশ্নটি আর কেবল ব্যক্তির ওপর চাপানো যায় কি? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে নিউ গিনিতে খাদ্যসংকটে আটকে পড়া জাপানি সৈন্যদের মধ্যেও মানুষখেকোর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারেও কয়েকজন জাপানি সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হয়। একইভাবে বার্গেন-বেলসেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দিদের দেহে মাংস কেটে নেওয়ার চিহ্ন পাওয়া যায়। ১৯৭৩ সালে আন্দিজ পর্বতে উরুগুয়ের বিমান দুর্ঘটনার পর বেঁচে থাকা যাত্রীরাও খাদ্যের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেলে মৃতদের দেহ খেয়ে বেঁচেছিলেন। এসব ঘটনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়— ‘চরম ক্ষুধা মানুষকে ‘অন্য প্রজাতি’ বানায় না; বরং আমাদের পরিচিত মানুষকেই এমন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করায়, যা স্বাভাবিক জীবনে অকল্পনীয়।’
এ কারণেই দুর্ভিক্ষের সময়কার মানুষখেকো নিয়ে আলোচনা করলে ‘বর্বর’ ও ‘সভ্য’ মানুষের প্রচলিত বিভাজন ভেঙে যায়। ইতিহাসের উদাহরণগুলোর বড় অংশই ইউরোপীয় বা ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত মানুষের। ডোনার পার্টি, জাহাজডুবির নাবিক, আয়ারল্যান্ডের দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ—তারা কোনো ‘অপর’ জাতির মানুষ ছিলেন না। তারা ছিলেন ক্ষুধার্ত মানুষ। ১৯২১–২২ সালের সোভিয়েত দুর্ভিক্ষে মৃতদেহ খাওয়া এবং মানুষ হত্যা করে খাওয়ার দু ধরনের ঘটনাই নথিবদ্ধ হয়েছিল। ১৯৩২–৩৩ সালের ইউক্রেনীয় দুর্ভিক্ষেও মানুষখেকোর ঘটনা নথিভুক্ত হয়। কিয়েভের গোপন পুলিশ কয়েক ডজন মানুষকে হত্যা করে খাওয়ার এবং মৃতদেহ খাওয়ার ঘটনা নথিবদ্ধ করেছিল। কাজাখস্তানের দুর্ভিক্ষেও একই ধরনের ভয় ছড়িয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেনিনগ্রাদের অবরোধ-দুর্ভিক্ষে মানুষখেকোর অভিযোগে শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। চীনের ১৯৫৯–৬১ সালের গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড দুর্ভিক্ষেও মানুষখেকোর ঘটনা গবেষণায় উঠে এসেছে। কিন্তু চীন এই অভিজ্ঞতা আগে দেখেনি—১৮৭৬–৭৮ সালের উত্তর চীনের দুর্ভিক্ষ, ১৯৪২ সালের হেনান, ১৯৩৬ সালের সিচুয়ান, ১৯২৯ সালের গানসু এবং আরও কিছু দুর্ভিক্ষেও এমন ঘটনা নথিভুক্ত ছিল।
তবু একটি সতর্কতা জরুরি। সব দুর্ভিক্ষে মানুষখেকোর ঘটনা ঘটে না। সোভিয়েত দুর্ভিক্ষে যে ধরনের সামাজিক ভাঙন দেখা গিয়েছিল, বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের বিয়াফ্রা বা সাহেল অঞ্চলের দুর্ভিক্ষে তার অনুরূপ প্রমাণ নেই। ১৯৪৩–৪৪ সালের বাংলার মহাদুর্ভিক্ষেও মানুষখেকোর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। এর অর্থ এই নয় যে সব দুর্ভিক্ষ একই রকম; বরং দুর্ভিক্ষের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভেদে মানুষের আচরণও বদলে যায়। আবার খাদ্যের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্কটি সামনে আসে। দুর্ভিক্ষ কোনো একক প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। যুদ্ধ, অবরোধ, বাজারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় নীতি, খাদ্যসংগ্রহ, পরিবহনব্যবস্থা এবং সামাজিক বৈষম্য—সব মিলেই তার রূপ নির্ধারণ করে। করম্যাক ও’গ্রাডার বৃহত্তর গবেষণাতেও এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ— আধুনিক দুর্ভিক্ষকে শুধু ‘খাদ্য ছিল না’ বলে ব্যাখ্যা করলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকার আড়ালে পড়ে যায়।

আয়ারল্যান্ড: দুর্ভিক্ষ ও ‘বর্বরতার’ গল্প
আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে মানুষখেকোর অভিযোগ আরও জটিল। কারণ বহু শতাব্দী ধরে ইংরেজ ঔপনিবেশিক বয়ানে আইরিশদের ‘মানুষখেকো’ বা বর্বর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গ্রিক ভূগোলবিদ স্ট্রাবো পর্যন্ত লিখেছিলেন যে আইরিশরা মানুষখেকো। কিন্তু তিনি একই সঙ্গে স্বীকার করেছিলেন, তার কাছে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। পরবর্তীতে আইরিশ ইতিহাসবিদ সিথরুন কেইতিন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভিক্ষের ইতিহাসের নথিপত্র বলছে, চরম খাদ্যসংকটে আয়ারল্যান্ডে কখনো কখনো মানুষখেকোর ঘটনা ঘটেছিল। ৭ম শতকের শেষদিকে এক দুর্ভিক্ষের বিবরণে বলা হয়, তিন বছর ধরে খাদ্য ও রোগের বিভিষিকায় মানুষ মানুষকে খেতে বাধ্য হয়েছিল। ১১১৬ সালের দুর্ভিক্ষের বিবরণেও মানুষে মানুষে খাদ্যভক্ষণ এবং সন্তান বিক্রির কথা রয়েছে। ১৩১০-এর দশকের যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষেও অনুরূপ উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৬ শতকের শেষদিকে আয়ারল্যান্ডে যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের সময় এডমন্ড স্পেন্সার লিখেছিলেন, মানুষ মৃতদেহ খাচ্ছিল, এমনকি একে অপরকেও। পরে ফাইনস মরিসনের বিবরণে এমন নারীদের কথাও আসে, যারা ক্ষুধায় শিশু হত্যা করে খেয়েছিল বলে অভিযোগ উঠে।
এসব বিবরণের কিছু হয়তো সত্য, কিছু অতিরঞ্জিত, কিছু ঔপনিবেশিক প্রচারের অংশ। ইতিহাসবিদের কাজ তাই কোনো গল্পকে শুধু ভয়াবহ বলেই সত্য বলে গ্রহণ করা নয়। আবার লোকস্মৃতি বা মৌখিক ইতিহাসকে শুধু ‘গুজব’ বলে বাতিল করাও যথেষ্ট নয়। ১৭ শতকের আইরিশ গৃহযুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের সময়ও মানুষের মাংস খাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এসব বিবরণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ও ঔপনিবেশিক পক্ষপাত প্রবল। ফলে প্রতিটি ঘটনা যাচাই করতে হয় তার উৎস, প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য বিবেচনা করে। মজার বিষয় হলো, ১৭২৮–৩০ সালের দুর্ভিক্ষে মানুষখেকোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি আরও ভয়াবহ ১৭৪০–৪১ সালের দুর্ভিক্ষেও এর নির্ভরযোগ্য উল্লেখ নেই। এর অর্থ হতে পারে, মানুষখেকোর কোনো স্বয়ংক্রিয় দুর্ভিক্ষ-পরিণতি নয়। ১৭৯৮ সালের বিদ্রোহের পর ওয়েক্সফোর্ডে এক পুরোহিতের দেহ খাওয়ার যে গল্প প্রচলিত হয়েছিল, পরে দেখা যায় তা প্রায় ডাহা মিথ্যা। সমকালীন নথি বলছে, মানুষটি ক্ষুধায় মরছিলেন না; দুর্ঘটনায় পুরোহিতের মৃত্যু হয়েছিল। পরে লেখক ঘটনাটিকে মানুষখেকোর গল্পে পরিণত করেন। ঘটনাটি ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষখেকোর গল্প শুধু মানুষের ক্ষুধা প্রকাশ করে না; কখনো কখনো লেখকের কল্পনা, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং পাঠকের ভয়ও প্রকাশ করে।

মহাদুর্ভিক্ষের নীরবতা
১৮৪০-এর দশকের গ্রেট আইরিশ ফেমিন ছিল ভয়াবহতার এক বিশাল অধ্যায়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেখানে মানুষখেকোর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ অল্প। এই নীরবতার দুটি ব্যাখ্যা হতে পারে। প্রথমত, সত্যিই হয়তো এমন ঘটনা খুব কম ঘটেছিল। দ্বিতীয়ত, ঘটলেও সামাজিক নিষেধাজ্ঞা, লজ্জা ও অপরাধবোধের কারণে মানুষ তা প্রকাশ করেনি। দুর্ভিক্ষের লোকস্মৃতিতে খাবারের অদ্ভুত তালিকা পাওয়া যায়—ঘাস, বুনো শাক, ড্যান্ডেলিয়ন, কুকুরের মাংস, ঘোড়ার মাংস, গাছের বীজ, বুনো উদ্ভিদ, এমনকি গাধার দুধ। কিন্তু মানুষের মাংস প্রায় অনুপস্থিত। এই নীরবতা হয়তো সত্যের অনুপস্থিতি, আবার হয়তো স্মৃতির ওপর সামাজিক নিষেধের দীর্ঘ ছায়া। উইলিয়াম কার্লেটনের উপন্যাসে অবশ্য নিজের সন্তানদের মৃতদেহ খাওয়া বাবার ভয়াবহ ছবি পাওয়া যায়। অন্য লেখকরাও দুর্ভিক্ষের মধ্যে মায়ের সন্তান খাওয়ার কথা লিখেছেন। এগুলোর কিছু হয়তো বাস্তব ঘটনার সাহিত্যিক রূপান্তর হয়ে থাকতে পারে। ১৮৪৯ সালে মেওর বালিনরোবের ধর্মযাজক জেমস অ্যান্ডারসন এক চিঠিতে এমন এক ক্ষুধার্ত মানুষের কথা জানান, যে জাহাজডুবিতে মারা যাওয়া একজনের দেহ থেকে হৃদপিণ্ড ও যকৃৎ বের করেছিল। খবরটি সংসদ পর্যন্ত পৌঁছায়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড জন রাসেল অবশ্য ঘটনাটির ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং দাবি করেন, লোকটি নিজে তেমন ক্ষুধার্ত ছিল না। কিন্তু সংবাদপত্র পাল্টা প্রশ্ন তোলে— একজন ‘সুস্থ ও মোটা’ মানুষ কেন মৃতদেহের হৃদপিণ্ড কাটবে? তার ক্ষুধা যদি অস্বাভাবিকও হয়, তবু কেন এমন কাজের কথা ভাববে? আরেকটি ঘটনা আরও বিশ্বাসযোগ্য। এক দরিদ্র আইরিশ পরিবারে একটি শিশু মারা যাওয়ার পর তার মা শিশুটির পা ও পায়ের অংশ খেয়েছিলেন বলে আদালতে অভিযোগ ওঠে। শিশুটির দেহ কবর থেকে তুলে দেখা হয়—পায়ের হাড় ছাড়া আর কিছু নেই। আদালত স্তব্ধ হয়ে যায়। অভিযুক্ত শিশুটির বাবা তখন ভেড়া চুরির অপরাধে দণ্ডিত হচ্ছিলেন। বিচারক তার পরিবার যে অনাহারে ছিল তা শুনে তাকে মুক্তি দেন।
এই ঘটনাটির অর্থ গভীর। আদালত আইনকে এক মুহূর্তের জন্য সরিয়ে রেখে ক্ষুধাকে দেখেছিল। সেখানে অপরাধী শুধু একজন মানুষ নয়; তার পেছনে ছিল একটি সামাজিক দুর্যোগ।
ক্ষুধার দায় কার?
দুর্ভিক্ষের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। ক্ষুধার্ত মানুষ মৃতদেহ খেলে আমরা তাকে ‘মানুষখেকো’ বলি। কিন্তু যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তাকে এমন অবস্থায় পৌঁছে দেয়, তার নাম কী? দুর্ভিক্ষের ইতিহাসে এই প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে। যুদ্ধের সময় খাদ্য মজুত করা হয়। অবরোধে খাদ্য আটকে যায়। রাষ্ট্র নিজের সেনাবাহিনীকে অগ্রাধিকার দেয়। বাজারে দাম বেড়ে যায়। দরিদ্র মানুষের মজুরি খাদ্যের দামের সঙ্গে তাল রাখতে পারে না। কোথাও শস্য আছে, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের কেনার ক্ষমতা নেই। কোথাও খাদ্য পরিবহনের ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। কোথাও প্রশাসন সংকটকে স্বীকার করতেই দেরি করে। তখন দুর্ভিক্ষ আর শুধু প্রকৃতির ঘটনা থাকে না। তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অর্থনীতির ফল। তাই মানুষখেকোর ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো ‘মানুষখেকো’ নিজে নয়। বরং এই প্রশ্ন—‘একটি সমাজ কীভাবে এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য এমন কাজ করতে হয়, যা স্বাভাবিক অবস্থায় তার নিজের কাছেই অকল্পনীয়?’
মানুষখেকো দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ নয়, মৃত্যুরও প্রধান কারণ নয়। বরং এটি দুর্ভিক্ষের চূড়ান্ত প্রান্তের একটি ক্ষীণ, কিন্তু ভয়াবহ চিহ্ন। যখন মানুষের খাদ্য, আয়, সামাজিক সম্পর্ক, নৈতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের আশা একে একে ভেঙে পড়ে, তখন মানুষ কখনো এমন সীমায় পৌঁছাতে পারে যেখানে মৃতদেহও খাদ্য হয়ে ওঠে। তবু সব দুর্ভিক্ষে তা ঘটে না। বাংলায় ১৯৪৩–৪৪ সালের মহাদুর্ভিক্ষে এর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। আফ্রিকার বহু দুর্ভিক্ষেও এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে মানুষখেকোর দাবি উঠলেও সেগুলোর অনেকগুলোর পক্ষে অকাট্য প্রমাণের অভাব রয়েছে। ফলে ভয়াবহ কোনো গল্প শুনলেই তাকে ইতিহাস বলে গ্রহণ করা ঠিক নয়। ইতিহাসবিদের দায়িত্ব তাই দ্বিমুখী—একদিকে প্রমাণের প্রতি কঠোর থাকা, অন্যদিকে মানুষের যন্ত্রণাকে এমনভাবে সন্দেহ না করা যাতে নথির বাইরে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতাই অদৃশ্য হয়ে যায়।

দুর্ভিক্ষের ইতিহাসে মানুষখেকোর প্রমাণ অল্প। কিন্তু সেই অল্প নথি আমাদের একটি বড় সত্যের সামনে হাজির করায়। সভ্যতা কোনো স্থির অর্জন নয়। তার ভিতরে খাদ্য, সম্পদ, রাষ্ট্র, বাজার ও ক্ষমতার সম্পর্ক কাজ করে। যখন সেই সম্পর্কগুলো মানুষের জীবন রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন সভ্যতার সবচেয়ে গভীর নিষেধগুলোও বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে। গ্রেট আইরিশ ফেমিনের মতো বিশাল দুর্ভিক্ষে মানুষখেকোর নির্ভুল তথ্য প্রমাণ এত কম—এটিই বরং বিস্ময়কর। হয়তো উনিশ শতকের মাঝামাঝি এসে এটি আরও গভীর সামাজিক নিষেধে পরিণত হয়েছিল। হয়তো কোনো সাংস্কৃতিক পরিবর্তন মানুষকে সেই সীমা অতিক্রম করা থেকে বিরত রেখেছিল। আবার হয়তো ঘটেছিল, কিন্তু তার কোনো নথি আমরা পাইনি।
আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। কিন্তু একটি বিষয় আমাদের নিশ্চিতভাবে জানা উচিত: ক্ষুধার্ত মানুষকে দেখে তার নৈতিক পতনের গল্প বলা সহজ; কঠিন হলো সেই ক্ষুধার রাজনৈতিক অর্থনীতি বোঝা। ডোনার পার্টির ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত মানুষরা যখন আমেরিকার পাহাড়ে আটকে পড়ে মৃত সঙ্গীদের মাংস খেয়েছিল, আর একই সময়ে আয়ারল্যান্ডে মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যাচ্ছিল—তখন পৃথিবীর দুই প্রান্তে একই মানবিক সীমা পরীক্ষা হচ্ছিল। ১৮৭৬ সালে মূলত আইরিশ নাবিকদের নিয়ে গঠিত ‘মারিয়া’ জাহাজের যাত্রীরা সমুদ্রে আটকে পড়ে মৃত সহযাত্রীদের মাংস খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছিল। এ ঘটনাগুলো জানিয়ে দেয়—ক্ষুধা কোনো জাতির চরিত্র নয়। কোনো সভ্যতা তার বাইরে নয়।
দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে কুৎসিত সত্য তাই হয়তো মানুষের মাংস খাওয়া নয়। সবচেয়ে কুৎসিত সত্য হলো—মানুষকে এমন ক্ষুধার মধ্যে ফেলে দেওয়া সম্ভব, যেখানে বেঁচে থাকার স্বাভাবিক নিয়মগুলো একে একে ভেঙে পড়ে।
আর তখন প্রশ্নটি এটি নয়, ‘মানুষকে খাওয়া কি ভুল?’ তার আগে প্রশ্ন করতে হয়—‘কোন সমাজে মানুষ এতটা ক্ষুধার্ত হয়ে উঠেছিল যে এই প্রশ্নটি করতেই হলো?’

পরিচিতি
আইরিশ অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ কর্ম্যাক ও’ গ্রাদা একজন দুর্ভিক্ষের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ গবেষক। তিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনের অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক। তার গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ জুড়ে রয়েছে আয়ারল্যান্ডের মহাদুর্ভিক্ষ, জনসংখ্যা, জীবনযাত্রার মান, জলবায়ু এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দুর্ভিক্ষের অর্থনৈতিক ইতিহাস।
২০১৫ সালে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘ইটিং পিপল ইজ রং, অ্যান্ড আদার এসেজ অন ফ্যামিন, ইটস পাস্ট, অ্যান্ড ইটস ফিউচার’ বইটি তার দীর্ঘ গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন। ২৪৮ পৃষ্ঠার এই বইয়ে সপ্তদশ থেকে একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন দুর্ভিক্ষকে ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাজনীতির ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।
বইটির শুরুই এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন দিয়ে—চরম দুর্ভিক্ষে মানুষ কি কখনো মানুষকেও খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছে? ও ’গ্রাদা দেখান, নরখাদকতা দুর্ভিক্ষের কোনো সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য নয় এবং দুর্ভিক্ষজনিত মৃত্যুর খুব সামান্য অংশ এর সঙ্গে যুক্ত; তবু ভয়াবহ খাদ্যসংকটে এমন ঘটনা অতীতে ধারণার চেয়ে বেশি ঘটেছে বলে ঐতিহাসিক প্রমাণ ইঙ্গিত করে।
বইটির বিশেষ গুরুত্ব ১৯৪৩–৪৪ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ এবং চীনের ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ দুর্ভিক্ষের বিশ্লেষণে। বাংলার দুর্ভিক্ষ নিয়ে ও গ্রাদা খাদ্যসংকটের পাশাপাশি যুদ্ধকালীন অগ্রাধিকার, ঔপনিবেশিক শাসন, বাজারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভূমিকা নতুন করে পরীক্ষা করেছেন। তার কাছে দুর্ভিক্ষ কেবল খাদ্যের অভাবের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্র, বাজার, রাজনীতি এবং মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের ইতিহাসও।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









