শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসকে দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি নিছক একটি বরফের গোলক। ব্যাস প্রায় ৩০০ মাইল। অথচ এই ছোট্ট জগতটির বরফের নিচে রয়েছে বিশাল এক লবণাক্ত সমুদ্র। সেই সমুদ্র থেকে আবার মহাকাশে ছিটকে বেরিয়ে আসে জলীয়বাষ্প ও বরফকণার বিশাল ফোয়ারা। তাই সৌরজগতের বাইরে প্রাণের সন্ধানের অন্যতম আকর্ষণীয় জায়গা হয়ে উঠেছে এনসেলাডাস।
নতুন এক গবেষণা এই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে। জার্মানির লুডভিগ-ম্যাক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটির ভূ-অণুজীববিজ্ঞানী উইলিয়াম অরসি ও তাঁর সহকর্মীরা পরীক্ষাগারে এনসেলাডাসের সমুদ্রের মতো একটি পরিবেশ তৈরি করেন। পানির সঙ্গে লবণ, কার্বনেট ও গুঁড়ো পাথর মিশিয়ে তাঁরা সমুদ্রের পানি ও পাথরের সম্ভাব্য রাসায়নিক বিক্রিয়াও অনুকরণ করেন। এতে হাইড্রোজেন তৈরি হয়—এনসেলাডাসের সমুদ্রেও এমন প্রক্রিয়া ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
এরপর গবেষকেরা সেখানে ছেড়ে দেন মিথানোজেন নামের অণুজীব। পৃথিবীতে এসব অণুজীব গভীর সমুদ্রের হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের মতো কঠিন পরিবেশে বাস করে। জাপান ও তাইওয়ানের মধ্যবর্তী ওকিনাওয়া ট্রাফ থেকে সংগৃহীত অণুজীবগুলো হাইড্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে মিথেন তৈরি করে শক্তি পায়।
ফলটি ছিল চমকপ্রদ। কৃত্রিম সমুদ্রের পিএইচ বা ক্ষারত্ব ১১-তে পৌঁছালেও অণুজীবগুলো টিকে থাকে এবং বেড়ে ওঠে। পানিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কমে গেলে তারা বিপাকপ্রক্রিয়াও বদলে নেয়।
তবে এর অর্থ এনসেলাডাসে প্রাণ আবিষ্কার হয়েছে—এমন নয়। গবেষণাটি শুধু দেখিয়েছে, পৃথিবীর কিছু অণুজীব এমন একটি রাসায়নিক পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে, যা এনসেলাডাসের সম্ভাব্য সমুদ্রের সঙ্গে মেলে। পরীক্ষাটি চলেছিল মাত্র কয়েক দিন। কোনো অণুজীব সেখানে এক বছর, এমনকি লাখ বা কোটি বছর টিকে থাকতে পারবে কি না, তা অজানা।
এনসেলাডাসের প্রতি বিজ্ঞানীদের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। নাসার ক্যাসিনি মহাকাশযান দুই দশক আগে সেখানে পৌঁছানোর পর দক্ষিণ মেরু থেকে জলীয়বাষ্প ও বরফকণার বিশাল ফোয়ারা দেখতে পায়। পরে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপও এসব ফোয়ারা পর্যবেক্ষণ করে। এসব তথ্য বরফের নিচে তরল লবণাক্ত সমুদ্র থাকার ধারণাকে শক্তিশালী করেছে।
শুধু জল থাকলেই অবশ্য প্রাণের সম্ভাবনা তৈরি হয় না। দরকার শক্তির উৎস, উপযুক্ত রাসায়নিক উপাদান এবং দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল পরিবেশ। এনসেলাডাসে এগুলোর কয়েকটির উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, তার সমুদ্রের তলদেশে হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট থাকতে পারে, যেখানে পানি ও পাথরের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় জীবনের প্রয়োজনীয় শক্তি তৈরি হতে পারে। পৃথিবীর গভীর সমুদ্রেও এমন ভেন্টের আশপাশে সূর্যের আলো ছাড়াই নানা ধরনের প্রাণ বেঁচে থাকে।
আর এনসেলাডাসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—তার সমুদ্রের নমুনা সংগ্রহ করতে বরফ ভেদ করে গভীরে যেতে নাও হতে পারে। সমুদ্রের পানি নিজেই ফোয়ারা হয়ে মহাকাশে উঠে আসছে। ক্যাসিনি এসব ফোয়ারার মধ্য দিয়ে উড়ে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেছে এবং তাতে জৈব পদার্থের সন্ধানও মিলেছে।
আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, ফোয়ারার জলকণা বরফে পরিণত হওয়ার সময় সমুদ্রের বিভিন্ন উপাদান আলাদা করে দিতে পারে। ফলে কোনো জলকণায় অণুজীব বা তাদের চিহ্ন থাকলে তা অল্পসংখ্যক বরফকণার মধ্যে তুলনামূলক বেশি ঘনত্বে জমা হতে পারে। ভবিষ্যতের মহাকাশযানের পক্ষে এসব কণা পরীক্ষা করে জীবনের সম্ভাব্য চিহ্ন খুঁজে পাওয়া তাই তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
তবে এনসেলাডাসে প্রাণ থাকলে তা পৃথিবীর প্রাণের মতোই হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। সেখানে জীবনের উদ্ভব হয়ে থাকলে তার গঠন, বিপাকপ্রক্রিয়া বা পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক আমাদের পরিচিত জীবনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।
এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল তাই কোনো ‘এলিয়েন’ আবিষ্কার নয়; বরং সম্ভাবনার ক্ষেত্রটি আরও স্পষ্ট হওয়া। এখন বিজ্ঞানীরা জানতে চাইছেন—এনসেলাডাসে তরল জল, শক্তির উৎস ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান একসঙ্গে আছে কি না; সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে জীবন টিকে থাকতে পারে কি না; এবং ফোয়ারার বরফকণায় সেই জীবনের চিহ্ন ধরা সম্ভব কি না।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি এনসেলাডাসে একটি মিশনের পরিকল্পনা করছে। প্রস্তাবিত এল৪ মিশনে অরবিটারের পাশাপাশি দক্ষিণ মেরুতে নামার জন্য ল্যান্ডার থাকতে পারে। লক্ষ্য হবে ফোয়ারা থেকে বেরিয়ে আসা পদার্থে জীবনের সম্ভাব্য চিহ্ন খোঁজা। প্রস্তাবিত সময়সূচি অনুযায়ী মিশনটি প্রায় ২০৪২ সালে উৎক্ষেপণ করা হতে পারে এবং শনিতে পৌঁছাতে পারে ২০৫০-এর দশকে।
অর্থাৎ, উত্তর পেতে আমাদের আরও কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে শুধু এটুকুই বলা যায়: এনসেলাডাসের বরফের নিচে এমন একটি পরিবেশ থাকতে পারে, যেখানে অন্তত কিছু ধরনের অণুজীব টিকে থাকতে সক্ষম। প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ এটি নয়। কিন্তু মহাবিশ্বে জীবন কোথায় সম্ভব—এই প্রশ্নের সীমা যে আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বিস্তৃত হতে পারে, এনসেলাডাস সেই সম্ভাবনার একটি অসাধারণ উদাহরণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









