প্রাচীন গ্রিসের কবিতা, পুরাণ আর দর্শনের সঙ্গে আধুনিক মানুষের প্রেম, বিচ্ছেদ, শোক ও একাকিত্বের কথোপকথন ঘটিয়েছেন তিনি। কখনো কবিতায়, কখনো গদ্যে, কখনো প্রবন্ধে, আবার কখনো অনুবাদ ও নাটকের ভেতর দিয়ে। সাহিত্যের প্রচলিত সীমানা তার কাছে যেন খুব ছোট। সেই সীমানা ভেঙেই তৈরি করেছেন নিজের স্বতন্ত্র সাহিত্য ভুবন।
কানাডীয় কবি ও প্রাবন্ধিক ‘অ্যান কারসন’ পেলেন সাহিত্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি—২০২৬ সালের ‘নোবেল পুরস্কার’। সুইডিশ একাডেমি জানিয়েছে, শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে তার ‘সাহসী ও উদ্ভাবনী’ সংলাপ সমকালীন সাহিত্যের জন্য নতুন রূপ তৈরি করেছে।
৭৬ বছর বয়সী কারসনের লেখার জগৎ অদ্ভুতভাবে পুরোনো ও নতুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তার কাছে কয়েক হাজার বছর আগের গ্রিক কবিতাও আজকের মানুষের অনুভূতি বোঝার একটি জীবন্ত জানালা।
স্যাফোর প্রেম ও আকাঙ্ক্ষা, গ্রিক পুরাণের চরিত্র কিংবা প্রাচীন নাটকের ট্র্যাজেডি—সবই তার লেখায় ফিরে আসে নতুন অর্থ নিয়ে। একই সঙ্গে সেখানে থাকে ব্যক্তিগত স্মৃতি, দাম্পত্য, বিচ্ছেদ, মৃত্যু ও শোক।
কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ জুন, কানাডার টরন্টোতে। শৈশবে বাবার চাকরির কারণে পরিবারের সঙ্গে তাকে কানাডার বিভিন্ন ছোট শহরে থাকতে হয়েছে। স্কুলে পড়ার সময় এক ল্যাটিন শিক্ষকের সহায়তায় তিনি প্রাচীন গ্রিক শেখেন। এই ভাষার সঙ্গে পরিচয়ই তার জীবনকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়।
একটি দ্বিভাষিক স্যাফো-কবিতার বইও তার কিশোর বয়সের কৌতূহলকে গভীর করে তোলে। গ্রিক ভাষার অদ্ভুত অক্ষর আর তার পাশে ইংরেজি অনুবাদ—এই পাশাপাশি থাকা দুই জগৎ তাকে মুগ্ধ করেছিল।
তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনও ছিল খানিকটা অপ্রচলিত। টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট মাইকেলস কলেজে পড়ার সময় তিনি দুবার পড়াশোনা ছেড়ে দেন। প্রচলিত পাঠ্যক্রম, বিশেষ করে জন মিল্টন নিয়ে বাধ্যতামূলক একটি কোর্স, তার ভালো লাগেনি।
একসময় গ্রাফিক আর্টের দিকেও ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবার পড়াশোনায় ফিরে আসেন। ১৯৭৪ সালে স্নাতক, ১৯৭৫ সালে স্নাতকোত্তর এবং পরে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি পড়াশোনা করেন এবং স্যাফোকে নিয়ে গবেষণা করেন।
এই শিক্ষাজীবনের প্রভাব তার লেখায় গভীর। কারসন শুধু কবি নন; তিনি ক্ল্যাসিক্যাল সাহিত্যের পণ্ডিত, অনুবাদক ও শিক্ষকও।
স্যাফো, গ্রিক নাট্যকার ও প্রাচীন গ্রিক ভাষা নিয়ে তার দীর্ঘ গবেষণা কবিতার ভেতরেও কাজ করে। তবে তার কবিতা কখনো নিছক একাডেমিক হয়ে ওঠেনি বরং গবেষণার কঠিন জ্ঞানকে তিনি ব্যবহার করেছেন মানুষের খুব ব্যক্তিগত অনুভূতির কাছে পৌঁছানোর জন্য।
১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘ইরোস দ্য বিটারসুই’ তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটি। এখানে তিনি প্রেম ও আকাঙ্ক্ষাকে দেখেছেন প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও দর্শনের আলোকে। তার কাছে প্রেম শুধু আনন্দ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দূরত্ব, অভাব ও যন্ত্রণা। আমরা যাকে চাই, তার সঙ্গে আমাদের যে দূরত্ব—আকাঙ্ক্ষার জন্ম অনেক সময় সেখানেই।
তবে আন্তর্জাতিকভাবে তাকে সবচেয়ে বেশি পরিচিত করে ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এই বইকে বলা যায় কবিতায় লেখা উপন্যাস। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র গেরিয়ন—গ্রিক পুরাণের এক লাল ডানাওয়ালা দানব।
কারসন সেই পুরোনো মিথকে আধুনিক পৃথিবীতে এনে গেরিয়নকে পরিণত করেছেন এক কিশোরে। সে প্রেমে পড়ে, প্রত্যাখ্যাত হয়, ভেঙে পড়ে এবং নিজের পরিচয় খুঁজতে থাকে। হাজার বছরের পুরোনো একটি পুরাণ এভাবে হয়ে ওঠে আধুনিক কৈশোর ও প্রেমের গল্প।
কারসনের আরেক বিখ্যাত বই ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড: আ ফিকশনাল এসে ইন টোয়েন্টি-নাইন ট্যাঙ্গোস’। ২০০১ সালে প্রকাশিত এই দীর্ঘ কবিতায় প্রেম, বিবাহ, আকর্ষণ, বিশ্বাসঘাতকতা ও বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা এসেছে কবিতা ও গদ্যের মিশ্র রূপে। বইটি একই বছর টি. এস. এলিয়ট পুরস্কার পায়।
এরপর প্রকাশিত হয়েছে ‘মেন ইন দি অফ আওয়ার্স, ‘ইফ নট, উইন্টার: ফ্র্যাগমেন্টস অব স্যাফো’, ‘ডিক্রিয়েশন’, ‘নক্স’, ‘রেড ডক’এবং ‘ফ্লোট’। ‘ইফ নট, উইন্টার’-এ তিনি স্যাফোর খণ্ডিত কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন।
‘ডিক্রিয়েশন’-এ কবিতা, প্রবন্ধ ও অপেরার মতো ভিন্ন ভিন্ন রূপ একসঙ্গে এসেছে। আর ‘নক্স’ তৈরি হয়েছে তার ভাই মাইকেলের মৃত্যুর স্মৃতি ও শোককে কেন্দ্র করে। বইটি যেন একটি ভাঁজ করা স্মৃতি পাত্র—কবিতা, ছবি, অনুবাদ, নোট ও ব্যক্তিগত স্মৃতি সেখানে পাশাপাশি থাকে।
সাম্প্রতিক সময়েও কারসনের সৃষ্টিশীলতা থামেনি। তার ‘রং নর্মা’ প্রকাশিত হয়েছে ২০২৪ সালে। বইটিতে কবিতা ও গদ্যের পাশাপাশি আছে ফ্লবেয়ার, তুষার, রজে'স থিসরাসের মতো বিচিত্র বিষয় নিয়ে লেখা। অর্থাৎ কারসনের সাহিত্যিক কৌতূহলের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই।
তার লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এই সীমা ভাঙার ক্ষমতা। কবিতা কি শুধু কবিতা থাকবে? প্রবন্ধ কি কবিতার সঙ্গে মিশতে পারে না? পুরোনো গ্রিক পুরাণ কি আজকের মানুষের প্রেম ও নিঃসঙ্গতার কথা বলতে পারে না? কারসনের বইগুলো এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। তার সাহিত্য তাই একই সঙ্গে পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং ব্যক্তিগত, প্রাচীন এবং আধুনিক।
নোবেল কমিটির স্বীকৃতিতেও এই বৈশিষ্ট্যই সামনে এসেছে। কারসন দেখিয়েছেন, সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে জাদুঘরের পুরোনো নিদর্শনের মতো সংরক্ষণ করাই শুধু কাজ নয়; তাকে নতুন করে পড়া যায়, ভাঙা যায়, প্রশ্ন করা যায়, নিজের সময়ের সঙ্গে কথোপকথনে বসানো যায়।
অ্যান কারসনের সাহিত্য তাই শেষ পর্যন্ত শুধু গ্রিক পুরাণের পুনর্লিখন নয়। এটি মানুষের পুরোনো কিছু প্রশ্নের নতুন ভাষা খোঁজা—আমরা কাকে ভালোবাসি, কেন হারাই, স্মৃতি কীভাবে আমাদের তৈরি করে, আর শোককে কীভাবে ভাষায় ধরা যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









