ভারতীয় লেখক ও মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায়ের ‘অ্যাপোক্যালিপ্স নাউ অ্যান্ড দেন’ শীর্ষক প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর, ইকুয়েটর ম্যাগাজিনে। প্রবন্ধটির উপশিরোনাম— অর্থাৎ, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুঁজিবাদের চূড়ান্ত গন্তব্য’। ১৯ অক্টোবর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত দ্য পিপলস এআই অ্যাসেম্বলি-তে প্রবন্ধের অংশটি বক্তৃতা হিসেবে অরুন্ধতী রায় পাঠ করেন। দৈনিক এদিন অনলাইন ইকুয়েটর ম্যাগাজিন থেকে সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি পাঠকের জন্য অনুবাদ করে ছাপল।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুঁজিবাদের চূড়ান্ত গন্তব্য
বিপদের পূর্বাভাস এখন চারদিক থেকে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে। ভাবো, নইলে ডুববে। মেনে নাও, নইলে মরবে। মাথা তুলে তাকাও, নইলে পিছিয়ে পড়বে। এই মোলায়েম নয়, বরং রীতিমতো হুমকির মতো শোনানো কথাগুলোর মধ্য দিয়েই আমরা এসে পৌঁছেছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে। তবে একে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বললে ভুল হবে। এ হলো প্রকৃত নির্বুদ্ধিতা; চরম নির্বুদ্ধিতা; আর সেই নির্বুদ্ধিতার এমন এক প্রক্রিয়া, যা নিজেকেই ক্রমাগত বাড়িয়ে চলে, অনেকটা তুষারগোলকের মতো। দেখুন, এই লেখার প্রথম অনুচ্ছেদেই আমি দুটো ড্যাশ ব্যবহার করেছি। বলা হয়, এটাই নাকি একটা লক্ষণ। তাহলে কি লেখাটা আদৌ আমি লিখেছি? সেটা জানতে হলে কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপ দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে। যাচাই করতে হবে, লেখাটা সত্যিই আমার কি না, আমি পুরোপুরি আমি কি না, নাকি আমার মধ্যে অন্য কারও কিছু অংশ ঢুকে পড়েছে। এখন আর নিজের বিচারবুদ্ধির ওপর নির্ভর করলেই চলে না। অ্যাপের কাছে যেতে হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি ড্যাশের মালিকানা দাবি করে বসে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এমিলি ডিকিনসনের কী হবে? ড্যাশের প্রতি এই কবির যে গভীর ভালোবাসা ছিল, সেটাকেও কি যন্ত্র গিলে খেয়েছে? ভবিষ্যতের পাঠকেরা কি তাঁকে একটু কম ভালোবাসবে? ভাষার জগৎ থেকে কি আমাদের ধীরে ধীরে বের করে দেওয়া হচ্ছে? আর তাতে কি আদৌ কিছু যায় আসে?ধর্মবিশ্বাসের চেয়ে লেখকের আত্মগরিমার কারণেই সম্ভবত যোহনের সুসমাচারের প্রথম বাক্যটি আমাকে বরাবর মুগ্ধ করেছে: “শুরুতে ছিল বাক্য, বাক্য ঈশ্বরের সঙ্গে ছিল, আর বাক্যই ছিল ঈশ্বর।” আমি বিশ্বাস করি, কথাটির মধ্যে গভীর সত্য রয়েছে। মানুষ ও ভাষার মধ্যে যে মৌলিক সম্পর্ক, তাকে যদি আমরা নষ্ট করি, তার মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দিই, তাহলে সমাজের সংহতি বলে যা কিছু আছে, তার ভিতও ভেঙে পড়বে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাহিত্যের জগতে এমনভাবে ঢুকে পড়েছে যে লেখক, প্রকাশক, সাহিত্য-এজেন্ট, পাঠক, সমালোচক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সবাই পায়ের তলার মাটি সরে যেতে দেখছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের এখন শিক্ষার্থীদের লেখা সন্দেহের চোখে দেখতে হচ্ছে। প্রকাশকদের নতুন লেখকদের লেখা যাচাই করতে হচ্ছে, যেন তাঁরা কোনো অপরাধের ঘটনাস্থলে এসে প্রমাণ খুঁজছেন। পড়া বা শেখার ওপর এর প্রভাব কী, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার যে আনন্দ, যে চ্যালেঞ্জ, যে তৃপ্তি ছিল, তার জায়গায় এসেছে এক ধরনের বদ্ধ, বিষণ্ন, যান্ত্রিক পরিবেশ। এ যেন মৃত প্রাণীদের চামড়া ছাড়িয়ে, খড় দিয়ে ভেতরটা ভরে, কাচের চোখ বসিয়ে সাজিয়ে রাখা কোনো জাদুকরী স্বর্গ। সবকিছু দেখতে জীবন্ত, সব চোখ আপনার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে। চোখে অর্থপূর্ণ ঝিলিকও রয়েছে। অথচ সেই ঝিলিক মিথ্যা, সেই প্রাণের আভাসও মিথ্যা। কাউকে সামনে দেখে যেমন মনে হতে পারে, মানুষটিকে আমি চিনি, কিন্তু সে কি সত্যিই সেই মানুষ? অথবা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মনে হতে পারে, চেহারাটা আমারই, কিন্তু এ তো আমি নই। একসময় হয়তো এই পার্থক্যটুকু বোঝার ক্ষমতাও আমরা হারিয়ে ফেলব। তখন আর জানব না আমরা কে। এমনকি আমরা আদৌ আছি কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরও আমাদের জানা থাকবে না। আর যখন গোটা সমাজ, গোটা মানবপ্রজাতি এমন অবস্থায় পৌঁছাবে, তখন কী ঘটবে? শত শত বছর ধরে মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যে বিচারবুদ্ধি তৈরি হয়েছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যা আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে, তার ওপর যদি আর নির্ভর করতে না পারি? নিজেদের হৃদয়, চোখ ও কানকে যদি আর বিশ্বাস করতে না পারি? সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য যদি বুঝতে না পারি? বাস্তব আর ভার্চুয়াল জগতের সীমারেখা যদি মুছে যায়? যখন সময় নিজেই ভেঙে পড়বে, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ যখন একাকার হয়ে যাবে, যখন লক্ষ লক্ষ ভাষা ও সংস্কৃতিকে মিশিয়ে এমন এক জগাখিচুড়ি তৈরি করা হবে, যার মধ্যে কোনো কিছুর স্বতন্ত্র পরিচয় আর থাকবে না, তখন কী হবে? মানুষের সামাজিক জীবনের যে প্রাচীন চুক্তি—তার যত সীমাবদ্ধতা, যত ত্রুটি থাকুক না কেন—যদি এমনভাবে ভেঙে ফেলা হয় যে তাকে আর চেনাই যায় না, তাহলে কি আমরা নিজেদের এক সম্মিলিত মানসিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছি?
এমন কথা বললে আমাকে অভিযুক্ত করা হতে পারে। বলা হতে পারে, নতুন ও দুর্বোধ্য কোনো কিছুর মুখোমুখি হয়ে মানুষ যে নৈতিক আতঙ্কে ভোগে, আমিও তার শিকার হয়েছি। শিল্পবিপ্লবের আগে যেমন হয়েছিল, কম্পিউটার আসার সময় যেমন হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যাপারটা কি সত্যিই শুধু তা-ই? আমরা কি মানবসভ্যতার তথাকথিত অগ্রগতির পথে এক অস্বস্তিকর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি? নাকি এবার সত্যিই এমন এক বিপর্যয় ঘটতে চলেছে, যা আমাদের পরিচিত পৃথিবীকে ভেঙে দেবে? হয়তো যারা এই নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছে, তাদের কথাই আগে শোনা উচিত। গত মাসে অ্যানথ্রপিকের তরুণ কর্মী জেকব কক্সন চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তার বক্তব্য, এমন একটি প্রকল্পে কাজ করার অনুমতি তার বিবেক তাকে দেয় না, যে প্রকল্পের পরিণতিতে মানবপ্রজাতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কক্সনের বর্ণনায় তার কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ছিল অনেকটা ম্যানহাটন প্রকল্পের মতো, তবে কয়েক গুণ বড় ও ভয়ংকর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে প্রকল্পের মাধ্যমে পারমাণবিক বোমা তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে তুলনা টানা যায়। কিন্তু এবারের বিজ্ঞানীদের চালিকাশক্তি শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়। এখানে মুনাফার লোভ এবং সবার আগে লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা বিরাট ভূমিকা পালন করছে। কক্সনের পদত্যাগের পর যা ঘটল, তা ছিল বিস্ময়কর। বিশ্বের বড় বড় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরা যেন একে অপরকে টপকে তার বক্তব্য নিয়ে কথা বলতে ছুটলেন। যে ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের ভেতরের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন, তাকে কেন্দ্র করে শুরু হলো আলোচনা, তর্ক, সম্মতি ও অসম্মতির প্রদর্শনী। আমাদের পর্দা ভরে গেল সেই ধনকুবেরদের ভিডিওতে। গম্ভীর, প্রায় শবযাত্রার মতো স্বরে তারা জানাতে লাগলেন, যে যন্ত্র-দেবতাকে তারা নিজের হাতে প্রতিষ্ঠা করছেন, তার হাতে মানবসভ্যতার অবসান ঘটার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
মানবপ্রজাতির ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর তারা আমাদের আশ্বস্ত করলেন, ঝুঁকি কমানোর জন্য তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। সরকারকে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও অনুরোধ জানালেন। এই সাহায্যের আবেদন শুনে মনে হয়, এর মধ্যে কোনো অদ্ভুত মানসিক জটিলতা রয়েছে। খানিকটা যেন এমন—আমাকে বেঁধে ফেলো, আমাকে নিয়ন্ত্রণ করো! পুঁজিবাদের লাগামহীন লোভের সামনে অসহায় হয়ে পড়ার এও কি তারই একটি প্রকাশ? এই ধনকুবেরেরা নিজেদের বিলুপ্তির কাহিনিতে যে বিশ্বাস করেন, তার কিছু প্রমাণও রয়েছে। পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে তারা নিজেদের জন্য সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ আশ্রয় বানিয়ে রেখেছেন। সেখানে পানি, খাবার ও গোলাবারুদের মজুত রয়েছে। কিন্তু মানবজাতির বিলুপ্তি তো তারা আমাদের কাছে বিক্রি করছেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রযুক্তি-স্বাধীনতাবাদীরা প্রকাশ্যেই এই আশঙ্কাকে প্রতারণা বলে উড়িয়ে দেন। তাদের বিক্রির আসল পণ্য হলো অগ্রগতি, গৌরব এবং মানবজাতির কল্যাণ। প্যালান্টিরের পিটার থিয়েল তো আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। যারা এই প্রযুক্তির সমালোচনা করেন বা নিয়ন্ত্রণের দাবি তোলেন, তাদের তিনি বলেছেন ‘অ্যান্টিক্রাইস্ট’—যেন তারা শয়তানের পক্ষ নিয়ে কাজ করছেন। এর ফলে তার নিজের কোম্পানি এবং তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে এক ধরনের দেবত্ব দেওয়া হয়। হ্যাঁ, এই সেই মানুষ, যাকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মানবজাতির টিকে থাকা উচিত বলে তিনি বিশ্বাস করেন কি না। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “উমম…”। তারপর আমতা-আমতা করে কথা বলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের ভেতরের বিতর্ক পরিচিত কয়েকটি শিবিরে ভাগ হয়ে গেল—যারা আসন্ন বিপর্যয় দেখছেন, যারা প্রযুক্তির গতি আরও বাড়াতে চান, আর যারা সন্দেহ প্রকাশ করছেন। কিন্তু এই শিল্পের কারণে ইতিমধ্যেই যে বাস্তব, বিপর্যয়কর ক্ষতি হচ্ছে, তা নিয়ে যখন অন্যরা কথা বলেন, তখন তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়, আলোচনার বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়। লক্ষ করার বিষয়, এই ধনকুবেরেরা জেকব কক্সনের ব্যাপারে যতটা স্বচ্ছন্দ, অন্য কিছু সতর্ককারী ব্যক্তির ব্যাপারে ততটা নন।
মেরেডিথ হুইটেকারের পক্ষে তারা এভাবে এগিয়ে আসেননি। তিনি ২০১৯ সালে গুগল ছেড়েছিলেন, কারণ মার্কিন সামরিক ড্রোনের জন্য মেশিন-ভিশন প্রযুক্তি তৈরির চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। সাত বছর পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্প ও অস্ত্রশিল্পের এই যোগসূত্র সবার সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত ধারাবাহিক দ্বৈত হামলার কথা ভাবুন। সেখানে ১৫৬ জন মানুষ নিহত হয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে ১২০ জন ছিল স্কুলপড়ুয়া শিশু। কেউ ক্ষমা চায়নি। কারণ, যেন কেউ কিছুই করেনি। যন্ত্রের পরিকল্পনায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে অপরাধবোধের কোনো জায়গা নেই। গাজায় হামাস সদস্যদের হত্যার জন্য ইসরায়েলের ব্যবহৃত ল্যাভেন্ডার, গসপেল এবং হোয়্যারস ড্যাডি? নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ব্যবস্থাগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ব্যবস্থায় মানুষকে শনাক্ত ও অনুসরণ করার ক্ষেত্রে কখনো কখনো একটি পরিবারের বাড়িকেই লক্ষ্যবস্তুর মৌলিক একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। টিমনিট গেব্রুর ক্ষেত্রেও এই ধনকুবেরদের এমন কোনো সম্মিলিত প্রতিবাদ দেখা যায়নি। সিলিকন ভ্যালির হাতে গোনা কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী জ্যেষ্ঠ প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞের একজন ছিলেন তিনি। ২০২০ সালে গুগল তাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়। কারণ, তিনি সহলেখকদের সঙ্গে তৈরি করা একটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করতে রাজি হননি। সেই গবেষণাপত্রে বৃহৎ ভাষা-মডেল প্রশিক্ষণের পরিবেশগত খরচ তুলে ধরা হয়েছিল, যার মধ্যে গুগলের মডেলও ছিল। গবেষণায় দেখানো হয়, প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত বিপুল তথ্যভান্ডারে থাকা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও নারীবিদ্বেষী প্রবণতা মডেলগুলো গ্রহণ করে এবং আবার সেগুলোই পুনরুৎপাদন করে। গেব্রু সতর্ক করেছিলেন, মডেল যত বড় হবে, এই সমস্যাগুলোও তত বাড়বে। আর মডেলকে যত জটিল করা হবে, তার ভেতরে কী ঘটছে, তা পরীক্ষা করা তত কঠিন হয়ে পড়বে। পরবর্তী সময়ে আরেক গবেষক আবেবা বিরহানের কাজেও এই আশঙ্কার সমর্থন পাওয়া যায়। তার সহলেখকদের সঙ্গে করা ‘অন হেট স্কেলিং লজ ফর ডেটা-সোয়াম্পস’ গবেষণায় বিপুল তথ্যভান্ডারের সঙ্গে ঘৃণার বিস্তারের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন হলো, হুইটেকার ও গেব্রুর মতো মানুষদের নির্দিষ্ট অভিযোগ এই ধনকুবেরদের কাছে এত অস্বস্তিকর কেন? অথচ মানবসভ্যতার অবসান সম্পর্কে সতর্ককারী জেফ্রি হিন্টন বা জেকব কক্সনের বক্তব্য নিয়ে তারা এত সরব? সম্ভবত কারণটা এই যে, হিন্টন ও কক্সনের সতর্কবার্তা বড় আতশবাজির মতো। মুহূর্তের জন্য আকাশ আলোকিত করে, মানুষকে চমকে দেয়, ভয় দেখায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই প্রদর্শনী ধনকুবেরদের ক্ষমতার খেলাকেই আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। বিশেষ করে তাদের কোম্পানিগুলো যখন শেয়ারবাজারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, তখন এই প্রচার তাদের কাজে লাগবে। কোম্পানির বাজারমূল্য নির্ভর করবে তাদের মডেল কত উন্নত, কত শক্তিশালী এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অস্ত্রের ক্ষেত্রে কতটা প্রাণঘাতী—তার ওপর।
----
এই ধনকুবেরেরা কারা, যারা দাবি করছেন মানবজাতির জীবন-মৃত্যু নির্ধারণ করার ক্ষমতা তাদের হাতে? তাদের দেখে মনে হয়, তারা নিজেদের ইতিমধ্যেই মানবপ্রজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। যে পৃথিবীকে আমরা নিজেদের বাড়ি বলে জানি, তার সঙ্গেও যেন তাদের আর কোনো সম্পর্ক নেই। তারা কি অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক যন্ত্র? গ্রিক ও রোমান পুরাণের সেই একচোখা দৈত্যদের কথা মনে পড়ে। আসুন, তাদের নাম দিই সাইক্লোপস—একচোখা দৈত্যদের এক সমষ্টিগত রূপ। একুশ শতকে তাদের গুহাগুলো বিলাসবহুল, আর তাদের ভেড়ার পাল হলো মানুষ। তাদের আলাদা আলাদা কোম্পানি হিসেবে না দেখে একটি সত্তা হিসেবে কল্পনা করুন। একটি অস্বাভাবিক রূপান্তরিত প্রাণী। তার একটি মাথা, কপালের একটু ডানদিকে বসানো একটি ফ্যাকাশে, পলকহীন চোখ। সেই চোখের দৃষ্টিতে সাধারণ মানুষ কেবল সম্পদ। যেমন খনিজসমৃদ্ধ বন দেখে খনি-মালিকেরা। যেমন প্রবল স্রোতে বয়ে চলা নদী দেখে বাঁধ নির্মাতারা। বন তাদের কাছে আহরণযোগ্য সম্পদ, নদীও তাই। সবকিছু তুলে আনতে হবে, জমা করতে হবে, বাজারে বিক্রি করতে হবে। বন ধ্বংস হোক। নদী শুকিয়ে যাক। মানুষের জীবনও যাক। কিন্তু সিনেমার পর্দায় দেখা সেই নীরব, বোকাসোকা দৈত্যের মতো নয় সাইক্লোপস। তার গলা থেকে বেরিয়ে এসেছে কয়েকটি আলাদা শরীর। তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে, প্রতিযোগিতা করে, একে অপরের বিরোধিতা করে। দেখে মনে হয়, তাদের মধ্যে কোনো মিল নেই। কিন্তু যখন আসে পৃথিবীর শেষ সময়—অথবা আরও যথাযথভাবে বললে, নাওমি ক্লেইন ও অ্যাস্ট্রা টেলরের নতুন বইয়ের নাম ধার করে বললে, ‘শেষ সময়ের ফ্যাসিবাদ’—তখন দেখা যায়, তারা সবাই একই দিকে দাঁড়িয়ে আছে।

শিল্পজগতের অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে এই বিলুপ্তির কাহিনি আসলে একটি সাজানো নাটক বলে মনে হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, ক্রমশ ক্ষুব্ধ ও অস্থির হয়ে ওঠা জনগণকে বোঝানো যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলো মার্কিন অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। দেশের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের জন্যও তাদের বিকল্প নেই। তারা যখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানায়, তখন আসলে শিল্পটিকে রাষ্ট্রের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সরকার ও করপোরেশনের মাঝখানে যে সামান্য ফাঁকটুকু আছে, সেটুকুও বন্ধ করে দিতে চায়। তাদের আশা, এই নিয়ন্ত্রণের আলিঙ্গন থেকেই তারা পেয়ে যাবে সেই ফাঁকা চেক, যার জন্য এত দিন ধরে অপেক্ষা করছে। কারণ তাদের যে পরিমাণ অর্থ, জমি, পানি ও শক্তি দরকার, তা কেবল সরকারই সরবরাহ করতে পারে। সোজা কথায়, তারা চায় সরকার যেন তাদের নিজেদের নিয়ম নিজেরাই তৈরি করার অনুমতি দেয়। নিয়ন্ত্রণের বৈধতা থাকবে, কিন্তু প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ থাকবে তাদেরই হাতে। এমন সূক্ষ্ম কৌশল মঞ্চস্থ করতে হলে নাটকের প্রয়োজন হয়। দরকার হয় একজন খলনায়ক, একজন ভয়ংকর শত্রু, যাকে দেখিয়ে ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠা জনগণকে ভয় পাইয়ে রাখা যাবে। ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসতে পারে এমন সরকারগুলোকেও সতর্ক রাখা যাবে, যারা হয়তো ট্রাম্প প্রশাসনের মতো সহজে বশ মানবে না।
আর সেই নাটকে প্রবেশ করে চীন। উত্থানশীল চীনের বিপদ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাইক্লোপস সরকারকে দিচ্ছে স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্রের এক বিশাল ভান্ডার। এমন অস্ত্র, যার কথা অন্য দেশগুলো কল্পনাও করতে পারে না। পাশাপাশি রয়েছে গবেষণাগারে তৈরি অজানা ভাইরাস ও জৈব অস্ত্রের সম্ভাবনা। দেশের ভেতরে অস্থির জনগোষ্ঠীকে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যও রয়েছে নানা প্রযুক্তি। মুখ শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে এমন নজরদারিব্যবস্থা, যা ইসরায়েলের পেগাসাস গুপ্তচর সফটওয়্যারকেও খেলনার মতো দেখাতে পারে। বিনিময়ে সাইক্লোপস চায় অবাধ পুঁজিপ্রবাহ এবং তার বিশাল ডেটা সেন্টার ও সুপারকম্পিউটার চালানোর জন্য যত জমি, পানি ও শক্তি প্রয়োজন, তার সবটুকু। তাদের বক্তব্যটা সরাসরি বললে এমন দাঁড়ায়:
আমরা নিজেদের মানবসভ্যতার জ্ঞানের সর্বশেষ সীমান্ত হিসেবে তুলে ধরব। বলব, আমাদের কাছে এমন জ্ঞান রয়েছে, যার কোনো সীমান্ত নেই, কোনো বাধা নেই। আমরা মানবজাতির জ্ঞানের ব্যবস্থাপক, বণ্টনকারী। কিন্তু বাস্তবে আমরা নিজেদের রাষ্ট্রের সঙ্গে এমনভাবে জুড়ে দেব যে, আমাদের অর্থনীতি, গোয়েন্দা ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে আর কোনো পার্থক্য থাকবে না। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্রের মতো হয়ে উঠব। রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের এমন একীভবন ঘটবে যে, একসময় বোঝাই যাবে না আমরা কোথায় শেষ হয়েছি, আর রাষ্ট্র কোথায় শুরু হয়েছে।শুধু আমাদের ব্যাংক হিসাবগুলো আলাদা থাকবে। বিনিময়ে আপনারা এমন ভান করতে পারেন যে, আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই অভিনয় চলবে তত দিন, যত দিন না আমরা চাঁদ ও মহাকাশে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপনের লক্ষ্যে পৌঁছাই।তারপর আপনারা যে মইটি আমাদের ধার দিয়েছিলেন, সেটি আমরা সরিয়ে নেব। আপনাদের আর আমাদের দরকার হবে না। আপনাদের জায়গায় অন্য কাউকে বসানোরও প্রয়োজন হবে না। কারণ, একসময় আপনারা থাকবেনই না।
আপনাদের জনগণ, শহর, যোগাযোগব্যবস্থা, অর্থনীতি, আদালত, সেনাবাহিনী ও পুলিশ—সবকিছু আমরা পরিচালনা করব। যদি আমরা না করি, তাহলে চীন করবে। যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানির সরকারি নিয়ন্ত্রণের দাবির আরেকটি উদ্দেশ্যও রয়েছে। ছোট কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা ঠেকিয়ে দেওয়া। আন্তর্জাতিক চুক্তি যখন হবে—এবং হওয়া উচিত—তখন যাতে এই হাতে গোনা কয়েকটি ‘নিয়ন্ত্রিত’ করপোরেশনই আলোচনার টেবিলে বসতে পারে। করপোরেশন ও রাষ্ট্রের একীভবন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিজ্ঞান নতুন হতে পারে। কিন্তু যেভাবে এই প্রযুক্তি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার ইতিহাস ঔপনিবেশিকতার মতোই পুরোনো। ভারতের মানুষ কোম্পানির হাতে উপনিবেশে পরিণত হওয়ার ইতিহাস জানে। আর হ্যাঁ, আমাদের শাসকশ্রেণি সেই কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আজ আমেরিকার শাসকেরাও অনেকটা সেই কাজই করছেন। একসময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজমুকুটের অধীনে নিয়ে আসা হয়েছিল। এখন ঘটনাটা যেন উল্টো দিকে এগোচ্ছে। ভারতের বিপুল পরিমাণ অবকাঠামোর মালিকানা রয়েছে দুটি বড় করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে—আদানি গ্রুপ ও রিলায়েন্স গ্রুপ। তারাও এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাইক্লোপস যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। প্যালান্টিরের প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স কার্প বলেছেন, তার কোম্পানি, আমেরিকা ও বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এমন এক পশ্চাৎমুখী চিন্তাধারা, যা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে নষ্ট করে দিচ্ছে। কোম্পানির বাজারমূল্য অতিরিক্ত বেশি বলে যখন বিশ্লেষকেরা মন্তব্য করেন, তখন তিনি বিরক্ত হন। যেন কোনো দেবতার মূল্য নির্ধারণ করার সাহস কী করে কারও হয়! এরপর তিনি নিজের পরিচিত ধনী-মানুষের রসিকতায় বলেছিলেন, তার খুব ভালো লাগবে যদি একটি ড্রোন দিয়ে সেই বিশ্লেষকদের গায়ে ফেন্টানিল-মেশানো প্রস্রাব ছিটিয়ে দেওয়া যায়, যারা তার কোম্পানির ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে। ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যানও স্বীকার করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতিকে নরকের দিকে ছোট রাস্তা ধরে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তার বক্তব্যের বাকি অংশের সারকথা হলো, এরই মধ্যে বড় বড় মেশিন-লার্নিং কোম্পানি তৈরি হয়ে যাবে। আর মার্ক আন্দ্রেসেনের কথা শুনুন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এই প্রযুক্তি-উৎসাহী মনে করেন, প্রযুক্তির উচিত অজানার শক্তিগুলোর ওপর হিংস্র আক্রমণ চালানো, যাতে তারা মানুষের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হয়। তার ভাষায়, “আমরা শিকার নই; আমরা বিজেতা।”

মহাপ্রলয়ের নানা রূপ
মহাপ্রলয়ের একাধিক ধরন রয়েছে। আর প্রতিটি ধরনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের দুর্ভোগ। একটি হলো মানবপ্রজাতির বিলুপ্তির ভয়ংকর কাহিনি। আরেকটি হলো, আমাদের চেয়ে বুদ্ধিমান কোনো প্রজাতি একদিন আমাদের অধীন করে ফেলবে।এই দ্বিতীয় সম্ভাবনার পরিণতি বুঝতে হলে পৃথিবীর অন্য প্রাণীদের সঙ্গে আমরা কী করেছি, তা ভাবুন। তাদের ওপর আমাদের আচরণ দেখলে মানবপ্রজাতির বিলুপ্তিকেও হয়তো আকর্ষণীয় বলে মনে হতে পারে। এর বাইরে রয়েছে প্রযুক্তির জগতের বাইরের মানুষদের উদ্বেগ। জলবায়ু আন্দোলনের কর্মীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের বিপুল কার্বন নিঃসরণ নিয়ে চিন্তিত। শিক্ষার্থী ও শ্রমিকেরা দেখতে পাচ্ছেন, ব্যাপক বেকারত্বের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, অথচ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমার মতো লেখক, শিল্পী ও সংগীতশিল্পীরা অনুভব করছেন, এক অদৃশ্য ঘূর্ণি আমাদের শরীর থেকে হৃদয়ের স্পন্দনটুকু টেনে বের করে নিচ্ছে। একই সঙ্গে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার ইস্পাতের সুতো একত্র হয়ে উঠছে একটি শক্ত, যান্ত্রিক মুষ্টিতে। এ অবস্থায় আমাদের কী করা উচিত? শুধু নিয়ন্ত্রণের দাবি তুললেই হবে? ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার ‘অ্যাপোক্যালিপস নাউ’ চলচ্চিত্র—যার মধ্যে বর্ণবাদী ধারণাও রয়েছে—যদি আজকের খবরের প্রতিবেদনের মতো মনে হয়, তাহলে এমন এক শিল্পকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? সাইক্লোপস যেন কর্নেল কার্টজ। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতায় উন্মাদ হয়ে যাওয়া এক বয়স্ক সাবেক মেরিন সেনা। জোসেফ কনরাডের আফ্রিকার অন্ধকার হৃদয়কে কপোলা ভিয়েতনামে স্থানান্তর করেছিলেন। সেখানে কার্টজ নিজের উন্মত্ত, রক্তাক্ত, মাদকাসক্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে, শাসন করছে স্থানীয় মানুষদের।তাকে থামাতে যে তরুণ সেনা কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়, তার কাছে মার্কিন সেনাবাহিনীর নির্দেশ ছিল স্পষ্ট: “নির্মমতার সঙ্গে তাকে নির্মূল করো।” তাহলে আমাদের স্লোগান কী হবে?
‘চরম নির্মমতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করো’? হতে পারে। যদিও সত্যি বলতে, এর অর্থ কী, বাস্তবে দেখতে কেমন হবে, তা আমি নিজেও জানি না। ২০০৪ সালের সুনামির আগের মুহূর্তটির কথা মনে পড়ে। থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূল থেকে হঠাৎ সমুদ্রের পানি সরে গিয়েছিল। মানুষ দৌড়ে গিয়েছিল সেই অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে। বহু দূর পর্যন্ত নতুন সৈকত জেগে উঠেছিল। বালির ওপর যেন এক নতুন পৃথিবী আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু তারা জানত না, সমুদ্রের অনেক দূরে বিশাল এক জলপ্রাচীর তৈরি হচ্ছে, যা মুহূর্তের মধ্যে এসে তাদের গ্রাস করবে। আমরাও এখন তেমন একটি মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি। নির্বুদ্ধিতার এক বিশাল প্রাচীর আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। ঝকঝকে বালির ওপর ছড়িয়ে থাকা লোভনীয় উপহারের মতো ছোট ছোট সুবিধা আমাদের ক্রমশ সমুদ্রের আরও গভীরে টেনে নিচ্ছে। সেখানে রয়েছে জাদুর মতো সম্পদ, রত্নখচিত ঝিনুক, গোপন দুর্গ। সবকিছু এমন এক চিরস্থায়ী মধুচন্দ্রিমার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যেখানে প্রেমের বদলে চাইলে টাকার বৃষ্টিও পাওয়া যাবে। ঝিনুকগুলো তুলে নিন। দেখুন, সেগুলো আপনার জন্য কী করতে পারে। তাদের কুৎসিত নাম হলো ‘ভোক্তা-অ্যাপ্লিকেশন’। তারা আপনার মা হতে পারে, প্রেমিক বা প্রেমিকা হতে পারে, মনোচিকিৎসক হতে পারে, চিকিৎসক হতে পারে। এক মিনিটে আপনার পছন্দের ভঙ্গিতে উপন্যাস লিখে দিতে পারে। সেটিকে আপনার পছন্দের যেকোনো ভাষায় অনুবাদ করে দিতে পারে। চলচ্চিত্র সম্পাদনা করতে পারে, সংগীত তৈরি করতে পারে, গবেষণা করতে পারে, আইনি নথির খসড়া তৈরি করতে পারে। চিকিৎসাক্ষেত্রে তারা যা করতে পারে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। তবে তাতে গরিব মানুষের কলেরা, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা কিংবা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যে মৃত্যু বন্ধ হবে না। তারা আপনার ফোনের মধ্য দিয়ে তাৎক্ষণিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা ও গণতন্ত্র পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়। আবার আপনার ইচ্ছা যদি অন্য রকম হয়, তাহলে আপনার নাৎসি কায়দায় স্যালুট দেওয়ার ভঙ্গি আরও নিখুঁত করে দিতে পারে, হাতে তুলে দিতে পারে মানসিকভাবে মানুষকে ধ্বংস করার অস্ত্র।
তাহলে ভালো না লাগার কী আছে? এই প্রলোভন প্রতিরোধ করবেন কীভাবে? আর করবেনই বা কেন? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কর্তৃত্ববাদ নিয়ে এত কথা হচ্ছে। কিন্তু এটাও কি সত্য নয় যে, ভারতের বহু জনপ্রিয় ফ্যাসিবাদবিরোধী ইউটিউবার ও অক্লান্ত রাজনৈতিক কর্মী—যাঁদের সম্মিলিত অনুসারীর সংখ্যা কয়েক কোটি—নিজেরাও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রবল সমর্থক?মোদি সরকারের বিরুদ্ধে জেন-জি প্রজন্মের যে ‘তেলাপোকা বিদ্রোহ’ আমাদের শুকনো মাটিতে বৃষ্টির মতো এসে পড়েছিল, তার সঙ্গেও জড়িয়ে ছিল দারুণ মজার, বেপরোয়া, ব্যঙ্গাত্মক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ভিডিও। এটা সত্যি। কিন্তু যখন বিপদের মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায় যে সত্যিকারের বিপর্যয় সামনে, তখন সুযোগের সেই জানালা মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমি যখন এই লেখা লিখছি, তখন দিল্লিতে ‘তেলাপোকা প্রতিবাদ’-এর দ্বিতীয় পর্ব চলছে বলে বলা হচ্ছে। আমার এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাশ্মীর ও মণিপুরের মতো রাজ্যেও প্রতিবাদের সময় ভারত সরকার মাসের পর মাস ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছে।
-----
সাইক্লোপস তার রক্তহীন বাহুতে যন্ত্র-দেবতাকে তুলে ধরেছে। দেবতা এখনো শিশু, কিন্তু তাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই ভক্তির আয়োজন শুরু হয়েছে। সাইক্লোপস আমাদের বলছে, তার সামনে মাথা নত করো। তাকে বিশ্বাস করো। তাকে সবকিছু দিয়ে দাও। বিনিময়ে তিনি তোমাদের চোখধাঁধানো বিস্ময় উপহার দেবেন। ঔপনিবেশিকতা সব সময়ই চকচকে উপহার হাতে নিয়ে আসে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন এক ধরনের উপনিবেশ স্থাপন, যার ব্যাপ্তি আমাদের অধিকাংশের কল্পনারও বাইরে। এটাই পুঁজিবাদের শেষ গন্তব্য। সাইক্লোপস নিজের প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রকাশ করতে কখনো খুব একটা লজ্জা পায় না।প্যালান্টিরের চেয়ারম্যান পিটার থিয়েল আবারও বলছেন, তাদের প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক স্বপ্ন ছিল প্রযুক্তির সাহায্যে গোটা পৃথিবী বদলে দেওয়া, এমনকি বিশ্ব অর্থব্যবস্থাকে উল্টে দেওয়া। তারা নির্বাচনে জিততে পারবেন না, কারণ তারা সংখ্যায় খুবই কম। কিন্তু হয়তো মানুষের কাছে বারবার গিয়ে বোঝানোর, অনুরোধ করার, মিনতি করার প্রয়োজন ছাড়াই একতরফাভাবে পৃথিবী বদলে দিতে পারবেন। ইসরায়েলি প্রযুক্তি কোম্পানি ক্যাটো নেটওয়ার্কসের প্রধান নির্বাহী শ্লোমো ক্রেমারও বলেছেন, প্রথম সংশোধনী—যা যুক্তরাষ্ট্রে বাক্স্বাধীনতার অন্যতম সাংবিধানিক ভিত্তি—রক্ষা করতে হলে সেটিকে সীমিত করার সময় এসেছে। তার মতে, সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। অনলাইনে যে মানুষ নিজের মত প্রকাশ করবেন, তার বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করে একটি ক্রমতালিকা তৈরি করতে হবে। তারপর সেই তালিকার ভিত্তিতে ঠিক করতে হবে, তিনি কী বলতে পারবেন। এই অধিকারবোধ, এই সম্পদ, এই ক্ষমতা, এই ঔদ্ধত্য—এসব কোনো ঈশ্বর তাদের হাতে তুলে দেননি। এসব আমাদের কাছ থেকেই কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
----
মানুষের সমগ্র অর্জনকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করার প্রকল্প
যন্ত্র-দেবতাকে প্রশিক্ষণ দিতে সাইক্লোপসকে মানবসভ্যতার অর্জনগুলো খনির মতো খুঁড়ে তুলে আনতে হবে, তারপর সেগুলো মজুত করতে হবে। হাজার হাজার বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষের সম্মিলিত শ্রমে যা কিছু তৈরি হয়েছে—সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, গণিত, দাবা, একাডেমিক গবেষণা, মানুষের জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্র—সবকিছুই কোম্পানির সম্পত্তিতে পরিণত করতে হবে। এই জ্ঞান তারা নিজেদের ভান্ডারে জমা করবে। তারপর তার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। ঠিক করবে কোন জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করা হবে, কোন অংশ পরিষ্কার করে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হবে, কোন অংশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, কে সেই জ্ঞান পাবে আর কে পাবে না। আর পেতে হলে কত দাম দিতে হবে? একে বলা যায় মানবপ্রচেষ্টার ইতিহাস, এমনকি সমগ্র সভ্যতার বেসরকারীকরণ ও করপোরেট দখলদারি। আপনাকে শুধু নিজের আত্মাটিকে ডিজিটাল তথ্য হিসেবে তুলে দিতে হবে। তারপর আপনার মধ্যে যা অবশিষ্ট থাকবে, তা হবে মানুষের এক ধরনের আবর্জনা—শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের মতো।

স্যাম অল্টম্যান বলেছেন, ভবিষ্যতে বুদ্ধিমত্তা বিদ্যুৎ বা পানির মতো একটি সাধারণ পরিষেবায় পরিণত হবে। মানুষ মিটার দেখে তার ব্যবহার অনুযায়ী দাম দেবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বুদ্ধিমত্তা কি সত্যিই তাদের সম্পত্তি, যা তারা আমাদের কাছে বিক্রি করতে পারেন? আমি সেই লক্ষ লক্ষ লেখকের একজন, যাদের বই অ্যানথ্রপিক অনুমতি ছাড়াই তাদের বৃহৎ ভাষা-মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করেছে।
একটি সমষ্টিগত মামলার নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে আমি একটি নোটিশ পেয়েছি। সেখানে প্রতি বইয়ের জন্য কয়েক হাজার ডলার দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এই বইগুলো লিখতে আমার লেগেছে সারাজীবনের অভিজ্ঞতা এবং বছরের পর বছর পরিশ্রম। নোটিশে বলা হয়েছে, কোম্পানিটি দুটি ওয়েবসাইট থেকে বইগুলোর পাইরেটেড পিডিএফ ডাউনলোড করেছিল। কিন্তু একই সঙ্গে অ্যানথ্রপিক দাবি করছে, তারা কোনো অন্যায় করেনি। আমাকে একটি দাবি নম্বর দেওয়া হয়েছে, সঙ্গে একটি পিন কোড। মনে হচ্ছে, আমার অজান্তে আমার শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তারপর তার বদলে ক্ষতিপূরণের একটি নম্বর ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যন্ত্রটি এখন আমার লেখার ওপর প্রশিক্ষিত। তাই আমার ভয় হচ্ছে, খুব শিগগির আমি যখন লিখতে বসব, তখন হয়তো আমাকে বলা হবে, এই লেখা আমার মতো শোনাচ্ছে না। এটি আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি। অথচ যে ভাষাকে কয়েক দশক ধরে শ্রম দিয়ে আমি নিজের মতো করে গড়ে তুলেছি, সেই ভাষায় আমার স্বতন্ত্র কণ্ঠ তৈরি করতেই তো আমার জীবনের এতটা সময় কেটে গেছে।
এখন আমি কী করব? নিজের লেখার ধরন এড়িয়ে চলব? নিজের ভাষার ভেতরেই অন্য কোনো ভাষা খুঁজব? এই লুণ্ঠনের নাম কী হবে? হৃদয় খনন? মস্তিষ্ক খনন? জীবন খনন? ক্যারেন হাওয়ের তীক্ষ্ণ ও ধারালো বই ‘এম্পায়ার অব এআই’-তে এই লুণ্ঠনের বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। কীভাবে জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করা হচ্ছে, কীভাবে দরিদ্র দেশগুলোর শ্রমিকদের নামমাত্র মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যাতে তারা তথ্য সংগ্রহ করে সাইক্লোপসের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে—তার বিবরণ রয়েছে সেখানে। এই বিপুল পরিমাণ শক্তিখেকো কোম্পানি ও তাদের শত শত কোটি ডলারের সুপারকম্পিউটার চালানোর জন্য পর্যাপ্ত পানি ও বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাই সাইক্লোপস ব্যক্তিগত মালিকানাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির জন্য জোরালো তদবির করছে। নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়মকানুন শিথিল করার দাবিও তুলছে। পাশাপাশি কোটি কোটি ডলার ঢালা হচ্ছে এমন এক ধরনের ফিউশন শক্তির উৎস তৈরিতে, যা দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য থাকবে। উদ্দেশ্য, একসময় ডেটা সেন্টারগুলোকে মহাকাশে বা চাদে নিয়ে যাওয়া। আর এই সময়ে আমাদের প্রিয়, পুরোনো, জীর্ণ পৃথিবীতে ভারতের সরকার আরও বেশি শক্তিখেকো ডেটা সেন্টার স্থাপনের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে। শুধু বিশাখাপত্তনমেই ছয়টি ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে গুগলের জন্য ১৫ বিলিয়ন ডলারের একটি কেন্দ্রও রয়েছে। প্রায় কোনো পরিবেশগত তদারকি ছাড়াই এসব প্রকল্প অনুমোদন পাচ্ছে। যেন এগুলো সাধারণ কিছু ভবন, কয়েকটি গুদামঘর মাত্র।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ এক পুরোনো সম্পর্ক। তোমাদের আবর্জনা, তোমাদের বিষাক্ত শিল্প, তোমাদের বিষভরা পাত্র আমাদের দাও। আমরা সেগুলো সযত্নে গ্রহণ করব। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ভারতেও পরিবেশকর্মীরা এখন নিজেদের শরীরকে সামনে রেখে লড়াই করছেন। তাদের উদ্দেশ্য, প্রস্তাবিত এসব ‘গুদামঘর’-এর আশপাশে বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষের পানি ও বাতাসকে বিষাক্ত হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা। যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারের বিরোধিতাকারী কর্মীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে সেই নির্মাণশ্রমিকদের, যারা এসব বিশাল স্থাপনা তৈরির কাজ পেয়েছেন। স্থানীয় মানুষের স্বার্থে লড়াই করা কর্মীদের বলা হচ্ছে বিদেশি অর্থে পরিচালিত বিশ্বাসঘাতক, সন্ত্রাসী কিংবা বামপন্থী চরমপন্থী। অভিযোগ করা হচ্ছে, তারা দেশপ্রেমিক মার্কিন কোম্পানিতে কাজ করা পরিশ্রমী আমেরিকানদের চাকরি কেড়ে নিতে চায় মানুষকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর এই কৌশল এত পুরোনো যে, দুপুরের রোদে পড়ে থাকা মৃতদেহের মতো এর গন্ধ ছড়ায়। ভারতের দক্ষিণের রাজ্য কেরালায়, যেখানে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা, এই একই ঘটনা দেখতে দেখতে আমি বুঝেছি, সবকিছুকে শুধু ‘বাম’ ও ‘ডান’—এই দুই মেরুর মধ্যে ফেলে বিচার করলে সব সময় সত্য বোঝা যায় নাএখানে স্থান ও সময়ের দিক থেকে দূরের একটি গল্প বলি। তবু সেই গল্পের মধ্যে আজকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে কেরালার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার রাজ্যের উত্তরে, কোঝিকোড় শহরের উজানে চালিয়ার নদীর তীরে একটি বড় করপোরেশনকে রেয়ন কারখানা স্থাপনের আমন্ত্রণ জানায়।শিল্পপতি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কারখানাটি তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করবে। বিনিময়ে তিনি চেয়েছিলেন কাঁচামাল, বিদ্যুৎ ও পানির ওপর সরকারি ভর্তুকি। কাছের বন থেকে বাঁশ তাকে দেওয়া হয়েছিল প্রতি টন এক রুপিতে। অথচ মূলত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাঁশশ্রমিকদের একটি বাঁশ কিনতেই দিতে হতো এক রুপি। কারখানাটি উৎপাদন শুরু করার পর দেখা গেল, এক দিনে যত পানি তারা ব্যবহার করছে, তা তখনকার গোটা কোঝিকোড় শহরের দৈনিক পানির ব্যবহারের চেয়েও বেশি। এরপর বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। নদীর ভাটিতে শহরের পানিও দূষিত হয়ে গেল। মাছ মারা পড়ল। হাজার হাজার জেলে জীবিকা হারালেন।
বনের সব বাঁশ শেষ হয়ে গেলে কারখানাটি ইউক্যালিপটাস ব্যবহার করতে শুরু করল। সেই চাহিদা মেটাতে কেটে ফেলা হলো একরের পর একর পুরোনো ঘন বন। সেখানে তৈরি হলো একই প্রজাতির ইউক্যালিপটাসের বাগান। হাজার হাজার বনবাসী, বাঁশশ্রমিক ও বেতশিল্পী জীবিকা হারালেন। কিন্তু কারখানার তিন হাজার শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে তুললেন। তাদের চাকরি ছিল, তারা সংগঠিত হলেন, নিজেদের অধিকার আদায় করলেন। এরপর কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে ক্যানসার ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়তে লাগল। তারা ক্ষতিপূরণের দাবিতে ধর্মঘট করলেন। শিল্পপতি একটি বেসরকারি ক্যানসার হাসপাতাল তৈরি করলেন। অন্যদিকে, কারখানার সংগ্রামী শ্রমিকেরা বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবিতে অবস্থান ধর্মঘট ও লকআউট চালালেন। ধাপে ধাপে তারা কিছু দাবি আদায় করলেন। তারপর আবার কাজে ফিরে গেলেন। কয়েক বছর পর ইউক্যালিপটাসের বাগানটিও উধাও হয়ে গেল। কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। যে শ্রমিকেরা একসময় ভালো ইউনিয়নভিত্তিক চাকরি পেয়েছিলেন, তারা আবার অনশন শুরু করলেন। দাবি করলেন, কারখানা খুলে দিতে হবে।কিন্তু কারখানাটি আর কখনো খোলেনি। এই গল্পে একটি কঠিন দ্বন্দ্ব রয়েছে। এমন এক দ্বন্দ্ব, যার মুখোমুখি আজ সারা পৃথিবীর তথ্য সংগ্রহকারী শ্রমিকেরাও হচ্ছেন। ভারত তার বিপুল জনসংখ্যা নিয়ে সাইক্লোপসের অতৃপ্ত ক্ষুধার জন্য যেন এক বিশাল তথ্যভান্ডার। দূরবর্তী গ্রাম ও ছোট শহরে বসবাসকারী সবচেয়ে দরিদ্র মানুষদেরও এখন এমন সব তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা থেকে মুনাফা তৈরি করা সম্ভব। নির্মাণস্থল ও কারখানায় শ্রমিকদের মাথায় ক্যামেরা লাগিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। তাঁদের প্রতিটি নড়াচড়া রেকর্ড করা হচ্ছে, যাতে সেই তথ্য দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। একসময় সেই প্রশিক্ষিত যন্ত্রই তাদের কাজের জায়গা দখল করবে। শ্রমিকেরা জানেন, তারা নিজেরাই নিজেদের কাজ হারানোর পথ তৈরি করছেন। কিন্তু তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। কারণ, তাদের জায়গায় কাজ করার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে আরও অসংখ্য মানুষ। চাকরি চলে যাওয়ার পর পৃথিবী এই লক্ষ লক্ষ ‘উদ্বৃত্ত মানুষকে’ নিয়ে কী করবে? ফ্যাসিবাদী চিন্তায় এই শব্দটি এমন মানুষদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যারা পৃথিবীর সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে, কিন্তু সমাজে উৎপাদনশীল অবদান রাখে না বলে বিবেচিত হয়। এই ধরনের মানুষদের নিয়ে ফ্যাসিবাদীদের নিজস্ব কিছু পরিকল্পনা বরাবরই রয়েছে। ইতিহাসে সেসব পরিকল্পনার পরিণতি আমরা জানি। গিল দুরানের বইয়ের নাম ধার করে সাইক্লোপসকে বলা যায় ‘নার্ড রাইখ’—প্রযুক্তিবিদদের এক নতুন সাম্রাজ্য। কখনো কখনো এই সাম্রাজ্য আরেকটি পথের কথাও ভেবেছে। সার্বজনীন মৌলিক আয় বা ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (ইউবিআই) দেওয়ার ধারণাটি তারা মাঝেমধ্যে সামনে এনেছে, আবার সরিয়েও নিয়েছে। তবে সেই অর্থ তাদের নিজেদের পকেট থেকে আসবে না। আসবে অন্য মানুষের সম্পদ থেকে। কী চমৎকার! অন্যের অর্থ দিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যার কথা শুনতে পুঁজিবাদবিরোধী মনে হয়।
তাহলে একটা প্রস্তাব দেওয়া যাক। এই প্রযুক্তি কোম্পানির মালিকদের কয়েক বছর নিজেদের জন্য নির্ধারিত সার্বজনীন মৌলিক আয়ের ওপর বাঁচতে বলা হোক। চরম কঠোর নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচির প্রথম ধাপ হিসেবে সেটাই করা যেতে পারে।
একটি কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার। সম্পদ যদি আরও ন্যায্যভাবে বণ্টন করা যেত, তাহলে আজই পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষকে সার্বজনীন মৌলিক আয় দেওয়া সম্ভব হতো। তার জন্য পৃথিবীকে ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই। আরেকটি প্রশ্ন। এই আয় বণ্টন করবে কে? কে ঠিক করবে, কারা এই অর্থ পাওয়ার যোগ্য, আর কারা নয়? শ্লোমো ক্রেমারের চিন্তাকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে কি মানুষের জাতি, বর্ণ, জাতপাত, ধর্ম, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও আনুগত্যের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করা হবে?
নাকি ভারত সরকার এ কাজে সাহায্য করবে? সম্প্রতি ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সংখ্যাটি দেশের জনসংখ্যার প্রায় এক-দশমাংশের কাছাকাছি। একটি বিরাট জনগোষ্ঠীকে বাদ দেওয়ার এই প্রক্রিয়া যেন সভ্যতার পোশাক পরা বাছাই করে ছেঁটে ফেলা। এই মানুষদের সার্বজনীন মৌলিক আয় পাওয়ার অধিকার থাকবে না। হয়তো অন্য কোনো অধিকারও থাকবে না। আসামের মতো রাজ্যে তাদেরই কেউ কেউ আটককেন্দ্র তৈরির কাজে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন—যে আটককেন্দ্রে তাদের মতো মানুষদেরই রাখা হতে পারে। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের বেছে নেয়। আর সাইক্লোপস রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। কী চমৎকার ব্যবস্থা! এরপর রয়েছে সদিচ্ছাপ্রসূত গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক প্রস্তাব। বার্নি স্যান্ডার্স চান, অন্তত উত্তর আমেরিকার জনগণ যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলোর সরাসরি মালিকানা পায়। তিনি প্রস্তাব করেছেন, বৃহত্তম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ওপর এককালীন ৫০ শতাংশ কর আরোপ করা হোক। সেই অর্থ দিয়ে স্বাধীন তদারকির অধীনে একটি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গড়ে তোলা যেতে পারে। এই তহবিলের মূল্য প্রায় সাত ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। সেখান থেকে প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলার সরাসরি মার্কিন নাগরিকদের দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান ও শিক্ষার কর্মসূচিতেও অর্থ ব্যয় করা সম্ভব। কিন্তু এখানেও সেই একই প্রশ্ন। এই বিপুল অর্থ তো ইতিমধ্যেই রয়েছে। নেই শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
তাহলে এই প্রস্তাবে কী বদলাবে? আর এই গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও কি দক্ষিণের দেশগুলো—ভারত, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা—থেকে তথ্য শুষে নেওয়া চলবে না? মুনাফা কি শেষ পর্যন্ত উত্তরেই থেকে যাবে? অবশ্যই, কোম্পানিগুলোকে তথ্যের জন্য অর্থ দিতে হবে। কিন্তু পরিস্থিতি কি ইতিমধ্যেই এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে মহাপ্রলয়ের শেয়ার কিনে নেওয়াই আমাদের একমাত্র বিকল্প?
----
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জন্য কী করতে পারে আর কী পারে না, তা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এটি মানুষের সঙ্গে কী করছে, সেই আলোচনা তুলনায় অনেক কম। বিভিন্ন গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও মানুষের জ্ঞানীয় সক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষমতা যত বাড়ছে, মানুষের বুদ্ধিমত্তা কি ততই নিচে নামতে চলেছে? আমাদের অব্যবহৃত মস্তিষ্ক কি ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে? মাথা ছোট হয়ে আসবে? আর আমাদের আঙুলগুলো কি ক্রমশ নির্দেশ দেওয়ার জন্য নড়তে থাকা ছোট ছোট শুঁড়ে পরিণত হবে? আমরা যারা অন্য ধরনের পৃথিবীতে জীবন কাটিয়েছি, তারা জানি কী হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যে প্রজন্ম এখন বড় হয়ে উঠছে, তাদের কী হবে? তাদের কি নিজস্ব ভাষা থাকবে? নিজস্ব চিন্তা থাকবে? নিজেদের দুঃখ, শোক ও বেদনা থাকবে? তাদের কি চেষ্টা করার অধিকার থাকবে? ব্যর্থ হওয়ার? ভুল করার? অপূর্ণ থেকে যাওয়ার? নিজের হাতে একটি গণিতের সমস্যা সমাধান করার সেই অসম্ভব যন্ত্রণা এবং অসীম আনন্দ কি তারা অনুভব করতে পারবে? নিজের শিল্প, সাহিত্য বা সংগীত তৈরি করার আনন্দ কি তারা পাবে—যদিও সেই সৃষ্টি ত্রুটিপূর্ণ হয়?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিজয় হবে মানুষের মানবিকতার বিরুদ্ধে একটি অপরাধ। এটি আমাদের মস্তিষ্ককে ফরমালিনের বোতলে বন্দি করে রাখবে। আমরা যে পৃথিবীকে চিনি, সেই পৃথিবীকে ধ্বংস করবে। যারা এই প্রযুক্তির প্রচার করছে এবং এর থেকে মুনাফা অর্জন করছে, তারা এসব সম্ভাবনা সম্পর্কে অজ্ঞ নয়। তারা ইতিমধ্যেই অন্য কোনো জগতে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছে। এই ধনকুবেরেরা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছেন। গর্বের সঙ্গে, প্রকাশ্যে, উচ্চস্বরে। তারা বলছেন, লড়াইটা আমাদের আর তাদের মধ্যে। তারা এমনকি এ কথাও বলতে দ্বিধা করছেন না যে, সাইক্লোপসের টিকে থাকার জন্য হয়তো মানবজাতিকেই মরে যেতে হবে। যে তরুণ প্রজন্ম আজ এর বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াচ্ছে, তারা বিষয়টি বুঝতে পারছে। এই লেখার আগের অংশে আমি বলেছিলাম, ‘চরম কঠোরতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করো’—হয়তো এটাই আমাদের স্লোগান হওয়া উচিত। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলো সম্পর্কে আমি আসলে যা বলতে চাই, তা হলো:
‘নির্মমতার সঙ্গে তাদের নির্মূল করো।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









