১৯৪৩ সালের জুন মাসে সার্ত্রের নাটক দ্য ফ্লাইজ–এর উদ্বোধনী মঞ্চায়নে প্রথম দেখা হয়েছিল জ্যঁ-পল সার্ত্র ও আলবেয়ার কামুর। সিমোন দ্য বোভোয়ারের বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন সার্ত্র যখন থিয়েটারের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন শ্যামবর্ণ এক তরুণ এগিয়ে এসে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন, ‘আমি আলবেয়ার কামু।’
তত দিনে কামুর উপন্যাস দ্য স্ট্রেঞ্জার প্রকাশিত হয়েছে। মাত্র এক বছরের মধ্যে বইটি সাহিত্যজগতে আলোড়ন তুলেছে। ছয় মাস আগে প্রকাশিত হয়েছে তার দার্শনিক প্রবন্ধ দ্য মিথ অব সিসিফাস। আলজিয়ার্সের এই তরুণ তখন যুদ্ধের কারণে ফ্রান্সে আটকা পড়ে আছেন। দীর্ঘদিনের যক্ষ্মা রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় তিনি তখন লে প্যানে, শঁবোঁর কাছে, বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ১৯৪২ সালের নভেম্বরে মিত্রবাহিনী ফরাসি উত্তর আফ্রিকা দখল করার পর জার্মান বাহিনী অনধিকৃত ফ্রান্সে প্রবেশ করে। ফলে স্ত্রীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন কামু।
তিনি সার্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে চেয়েছিলেন। সার্ত্র তখন ক্রমেই পরিচিত হয়ে উঠছেন ঔপন্যাসিক, দার্শনিক এবং নাট্যকার হিসেবে। কয়েক বছর আগে কামু তার একটি উপন্যাসের সমালোচনা লিখেছিলেন। অন্যদিকে সার্ত্রও সম্প্রতি কামুর বই নিয়ে দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। তবে প্রথম সাক্ষাৎটি ছিল সংক্ষিপ্ত। কামু নিজের পরিচয় দেওয়ার পর সার্ত্র তাকে বেশ পছন্দসই মানুষ বলেই মনে করেছিলেন। নভেম্বরে কামু প্যারিসে চলে আসেন। সেখানে গালিমার প্রকাশনা সংস্থায় পাঠ-সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই প্রকাশনা সংস্থা থেকেই কামু ও সার্ত্র—দুজনের বই প্রকাশিত হতো। তখন থেকেই তাদের বন্ধুত্বের প্রকৃত সূচনা। ক্যাফে দ্য ফ্লোরে তাদের প্রথম একসঙ্গে বসা। জায়গাটি ছিল সার্ত্র ও বোভোয়ারের প্রায় নিয়মিত আস্তানা। সেখানে তারা কাজ করতেন, খেতেন, শীত থেকে বাঁচতেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। প্রথমদিকে তিনজনের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি ছিল। পরে কথা শুরু হলো সাহিত্য নিয়ে। ফরাসি পরাবাস্তববাদী কবি ফ্রান্সিস পঁজের লে পার্তি প্রি দে শোজ বইটি দুজনেরই প্রিয় ছিল।
বোভোয়ারের মতে, যে বিষয়টি তাদের মধ্যকার জড়তা কাটিয়ে দিয়েছিল, তা হলো কামুর নাটকের প্রতি গভীর আগ্রহ। আলজিয়ার্সে তিনি একটি অপেশাদার রাজনৈতিক নাট্যদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সার্ত্র তখন তার নতুন নাটক নো এক্সিট মঞ্চস্থ করার পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি কামুকে নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার এবং নাটকটি পরিচালনার প্রস্তাব দিলেন। প্রথমে কামু কিছুটা দ্বিধা করলেও সার্ত্রের পীড়াপীড়িতে রাজি হয়ে যান। বোভোয়ারের হোটেলকক্ষে কয়েকবার মহড়া হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, অল্প খরচে নাটকটি বিভিন্ন জায়গায় মঞ্চস্থ করা হবে। বোভোয়ার লিখেছেন, এই কাজে কামুর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তাদের মুগ্ধ করেছিল। একই সঙ্গে বোঝা যাচ্ছিল, তার হাতে বেশ সময়ও রয়েছে। তিনি তখনই প্যারিসে এসেছেন, বিবাহিত হলেও স্ত্রী উত্তর আফ্রিকায় রয়ে গেছেন। গার্সাঁ চরিত্রে কামুর অভিনয় সার্ত্রের ভালো লেগেছিল। কিন্তু নাটকটির অর্থ জোগানো ব্যক্তি একসময় সরে দাঁড়ান। তার স্ত্রী, যার নাটকটিতে অভিনয় করার কথা ছিল, প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার সন্দেহে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে সার্ত্র প্যারিসের একটি পেশাদার মঞ্চে নাটকটি প্রদর্শনের সুযোগ পান। তখন কামু স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান। তবে তত দিনে তাদের বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেছে। বোভোয়ার লিখেছেন, ‘কামুর তারুণ্য ও স্বাধীন ব্যক্তিত্ব আমাদের সঙ্গে তার সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করে তুলেছিল। আমরা প্রত্যেকেই ছিলাম একাকী মানুষ। কোনো সাহিত্যিক গোষ্ঠী বা বিশেষ ধারার সাহায্য ছাড়াই নিজেদের মতো করে গড়ে উঠেছিলাম।’
শুরু থেকেই তাদের বন্ধুত্ব এত সহজ হয়ে ওঠার একটি কারণ ছিল, পরিচয়ের আগেই তারা একে অপরকে লেখার মধ্য দিয়ে চিনে নিয়েছিলেন। দুজনেই ছিলেন নিবিড় পাঠক। নিজেদের চিন্তা ও লেখার ধরন নির্মাণে ব্যস্ত এই দুই তরুণ পরস্পরের বই পড়েছিলেন সামনাসামনি পরিচিত হওয়ার অনেক আগেই। একে অপরের প্রথম দিককার বই নিয়ে তাদের লেখা পর্যালোচনাগুলো আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে প্রশংসা ছিল, সমালোচনাও ছিল; কিন্তু সবকিছুর মধ্যেই প্রকাশ পেয়েছিল এক ধরনের সাহিত্যিক ও দার্শনিক আত্মীয়তা। এই সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও তখন থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে। তারা পরস্পরকে নিয়ে কখনো সরাসরি, কখনো আড়ালে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করতেন। পরবর্তী বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের সম্পর্কের ইতিহাসে এই লিখিত কথোপকথন বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে। প্রথম সাক্ষাৎ থেকে শেষ বিনিময় পর্যন্ত তাঁদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাতের সন্ধান পাওয়া যায় লেখার পাতায়।
সার্ত্রের লেখার সঙ্গে কামুর প্রথম পরিচয়
১৯৩৮ সালের অক্টোবরে সার্ত্রের নজিয়া উপন্যাসটি পড়ে তার সমালোচনা লেখেন কামু। তখন তিনি আলজিয়ার্সের একজন তরুণ সাংবাদিক। একটি বামপন্থী দৈনিক পত্রিকায় ‘পাঠকক্ষ’ নামে তার নিয়মিত সাহিত্য-কলাম ছিল। এর আগে স্থানীয়ভাবে তার দুটি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে—দ্য রং সাইড অ্যান্ড দ্য রাইট সাইড এবং নাপচিয়ালস। প্রথম উপন্যাসটি অসমাপ্ত রেখে তখন তিনি লিখছিলেন দ্য স্ট্রেঞ্জার। বয়স পঁচিশের কাছাকাছি হলেও প্যারিসে প্রকাশিত নতুন বই নিয়ে তার মন্তব্য ছিল আত্মবিশ্বাসী ও পরিণত। আন্দ্রে জিদের দ্য কাউন্টারফিটার্স, পল নিজানের দ্য কনস্পিরেসি, ইগ্নাজিও সিলোনের ব্রেড অ্যান্ড ওয়াইন, অলডাস হাক্সলির দোজ ব্যারেন লিভস, জর্জ আমাদোর বাহিয়া—এসব বইয়ের পাশাপাশি সার্ত্রের নজিয়া ও দ্য ওয়াল নিয়েও তিনি লিখেছিলেন। নজিয়া নিয়ে কামুর সমালোচনা ছিল একই সঙ্গে প্রশংসামূলক ও কঠোর। তিনি সার্ত্রের লেখায় মুগ্ধ কোনো প্রাদেশিক পাঠক ছিলেন না, যিনি প্যারিসের সাহিত্যিক পরিমণ্ডল থেকে বহু দূরে বসে নতুন কিছু আবিষ্কার করেছেন। বরং তিনি ছিলেন সার্ত্রের সমপর্যায়ের একজন লেখক, যিনি তার সাহিত্যিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে গভীরভাবে একাত্ম বোধ করতেন। তবে সেই প্রশংসার মধ্যেও এমন কিছু সীমাবদ্ধতা তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, যা তাঁকে হতাশ করেছিল।
নজিয়া উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আঁতোয়ান রোকাঁতাঁ। পশ্চিম ফ্রান্সের একটি বন্দরনগরে বসবাসকারী এই মানুষটি ফরাসি বিপ্লবের সময়কার এক অভিজাত ব্যক্তির জীবনী লিখছেন। আপাতদৃষ্টিতে তার জীবন স্বাভাবিক নিয়মে চলছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত কাঠামো ভেঙে পড়তে থাকে। অস্তিত্বের অর্থহীনতা, যা এত দিন অভ্যাস ও পরিচিতির আড়ালে ঢাকা ছিল, তা তাঁর সামনে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় তার বমিভাব বা ‘নজিয়া’ উপন্যাসটি ছিল এক অসাধারণ দার্শনিক পরীক্ষা। চরিত্রচিত্রণ ও বর্ণনায় ছিল বহু স্মরণীয় মুহূর্ত। কামু উপন্যাসটি সম্পর্কে এক বন্ধুকে কয়েক মাস আগেই বলেছিলেন, বইটি নিয়ে তিনি অনেক ভেবেছেন এবং এটি তার নিজের অনুভূতির খুব কাছাকাছি। সমালোচনার শুরুতেই কামু লিখেছিলেন, ‘উপন্যাস আসলে দর্শন ছাড়া আর কিছু নয়, যা চিত্রকল্পের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।’
তবে একটি সফল উপন্যাসে দর্শন ও চিত্রকল্পকে আলাদা করে দেখা যায় না। দর্শন সেখানে কাহিনি ও চরিত্রের সঙ্গে মিশে যায়। কামুর মনে হয়েছিল, সার্ত্রের উপন্যাসে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। তার জানা ছিল না, ঔপন্যাসিক সার্ত্র একই সঙ্গে একজন দার্শনিকও, যিনি ১৯৩৬ সালে কল্পনা নিয়ে একটি বই এবং পরের বছর ‘দ্য ট্রান্সসেনডেন্স অব দ্য ইগো’ নামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। অন্যদিকে কামু নিজেও দর্শনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল সেন্ট অগাস্টিন ও প্লটিনাসের দর্শন। কামুর মতে, সার্ত্র উপন্যাসে দর্শন ও জীবনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেননি। ফলে তার ‘অসাধারণ কল্পনাশক্তি এবং সবচেয়ে কঠিন ও স্বচ্ছ চিন্তার ক্ষমতা একই সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে, আবার অপচয়ও হয়েছে।’
অপচয় হয়েছে কেন? কারণ উপন্যাসটির প্রতিটি অধ্যায় আলাদাভাবে এক ধরনের তিক্ততা ও সত্যের পূর্ণতা অর্জন করেছে। বুভিল শহরের দৈনন্দিন জীবন সার্ত্র এমন দক্ষতায় এঁকেছেন, যেখানে কোনো আশার অবকাশ নেই। সময় নিয়ে তাঁর প্রতিটি চিন্তা কিয়ের্কেগার্দ থেকে হাইডেগার পর্যন্ত দার্শনিকদের ভাবনাকে কার্যকরভাবে তুলে ধরে। কিন্তু এসব বর্ণনা ও দার্শনিক চিন্তা একত্রে একটি শিল্পকর্ম হয়ে উঠতে পারেনি। কামুর মতে, তাদের মধ্যে যোগসূত্রটি খুব দ্রুত তৈরি হয়েছে, যথেষ্ট স্বাভাবিকভাবে নয়। ফলে পাঠকের মনে উপন্যাসটির প্রতি সেই গভীর বিশ্বাস জন্মায় না, যা একটি সাহিত্যকর্মকে সত্যিকার অর্থে শিল্পে পরিণত করে। কামু সার্ত্রের অস্তিত্বের অর্থহীনতা বর্ণনার ক্ষমতা, পরিচিত জীবনের কাঠামো ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ এবং সেই উদ্বেগ থেকে জন্ম নেওয়া বমিভাবের অনুভূতির প্রশংসা করেছিলেন। অদ্ভুত অথচ সাধারণ এই বিষয়কে সার্ত্র এমন শক্তি ও নিশ্চয়তার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন, যা কাফকার কথা মনে করিয়ে দেয়।
তবে কাফকার সঙ্গে সার্ত্রের একটি মৌলিক পার্থক্যও রয়েছে। কামুর ভাষায়, ‘একটি অস্পষ্ট বাধা পাঠককে আটকে দেয়। সম্মতির একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেও সে আর পুরোপুরি লেখাটির সঙ্গে একাত্ম হতে পারে না।’
এর পেছনে শুধু দর্শন ও চিত্রকল্পের ভারসাম্যহীনতা নয়, সার্ত্রের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও কাজ করেছে। কামুর মনে হয়েছিল, সার্ত্র মানুষের মহত্ত্বের কিছু দিক থেকে হতাশার কারণ খোঁজার পরিবর্তে মানুষের ঘৃণ্য ও কুৎসিত দিকগুলোর ওপরই বেশি জোর দিয়েছেন। উপন্যাসের শেষদিকে রোকাঁতাঁ শিল্পের মধ্যে আশ্রয় খুঁজতে চান। কিন্তু জীবনের কিছু অর্থপূর্ণ মুহূর্তের তুলনায় শিল্প যখন এতই তুচ্ছ, তখন তার এই আশ্রয় খোঁজার চেষ্টাও কামুর কাছে কিছুটা হাস্যকর মনে হয়েছে। এত সমালোচনা সত্ত্বেও সার্ত্রের চিন্তা ও নতুন কিছু আবিষ্কারের ক্ষমতার প্রতি কামুর শ্রদ্ধা ছিল গভীর। সমালোচনার শেষ কথাগুলোতে সেই শ্রদ্ধাই প্রকাশ পেয়েছিল:
‘এটি এমন একজন লেখকের প্রথম উপন্যাস, যার কাছ থেকে আরও অনেক কিছু প্রত্যাশা করা যায়। সচেতন চিন্তার একেবারে সীমান্তে পৌঁছে যাওয়ার এমন স্বাভাবিক দক্ষতা এবং এমন যন্ত্রণাময় স্বচ্ছতা অসীম প্রতিভারই লক্ষণ। তাই ‘নজিয়া’কে আমরা স্বাগত জানাই এক মৌলিক ও শক্তিশালী মনের প্রথম আহ্বান হিসেবে। তার কাছ থেকে আরও লেখা ও শিক্ষা পাওয়ার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।’
এটি কি নিছক একজন সমালোচকের সৌজন্য? কঠোর সমালোচনার পর যথেষ্ট প্রশংসা যোগ করে নিজের বক্তব্যকে ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা? উত্তর পেতে কামুকে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সার্ত্রের পরবর্তী বই তাঁকে পুরোপুরি মুগ্ধ করে।
‘দ্য ওয়াল’: দুই লেখকের চিন্তার মিল
১৯৩৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সার্ত্রের গল্পসংকলন দ্য ওয়াল নিয়ে লিখতে গিয়ে কামু তার স্বচ্ছ চিন্তা, অস্তিত্বের অর্থহীনতা তুলে ধরার ক্ষমতা এবং এমন সব চরিত্র নির্মাণের দক্ষতার প্রশংসা করেন, যাদের স্বাধীনতা বাস্তবে কোনো কাজে আসে না।
‘নজিয়া’র তুলনায় ‘দ্য ওয়াল’–এর চরিত্রগুলো আরও বেশি নেতিবাচক। কিন্তু এবার সেই নেতিবাচকতা কামুকে ততটা বিচলিত করেনি। এই মানুষগুলো নিজেদের স্বাধীনতার ভারে যেন অভিভূত। অস্তিত্বের অর্থহীনতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তারা নিজেদের জীবনকে অতিক্রম করতে পারে না। তাদের কোনো বন্ধন নেই, কোনো নীতি নেই, পথ দেখানোর মতো কোনো সুতোও নেই। কারণ তারা আসলে কাজ করতে পারে না, সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কামুর ভাষায়, ‘এখান থেকেই সার্ত্রের গল্পগুলোর বিপুল আকর্ষণ এবং অসাধারণ শিল্পসাফল্যের জন্ম।’
পাঠক জানেন না, পরের মুহূর্তে চরিত্রগুলো কী করবে। সার্ত্রের শিল্পের শক্তি হলো, তিনি তার এই অর্থহীন অস্তিত্বে আটকে পড়া মানুষদের একঘেয়ে আচরণ ও ছোটখাটো বিবরণ এমন নিখুঁতভাবে তুলে ধরেন যে তাদের জীবন পাঠকের কাছে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কামু স্বীকার করেছিলেন, গল্পগুলো পড়া শুরু করলে তিনি আর বইটি নামিয়ে রাখতে পারছিলেন না। এই গল্পগুলো পাঠককে এমন এক স্বাধীনতার অনুভূতি দেয়, যা নিজেই অর্থহীন, অথচ চরিত্রগুলোকে তাদের পরিণতির দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। এই স্বাধীনতা কোনো মুক্তির পথ দেখায় না। বরং গল্পগুলোর গভীর আবেগময় প্রভাব এবং নির্মম বেদনাকে আরও তীব্র করে তোলে।
সার্ত্র মানুষের অর্থহীন অস্তিত্বকে তুলে ধরেছেন, কিন্তু সেই সত্যের সামনে দাঁড়াতে পিছপা হননি। এবার দর্শন ও চিত্রকল্পের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। কামুর উপসংহারে লেখকের প্রতি তাঁর মুগ্ধতার পাশাপাশি এক ধরনের অভিন্ন সাহিত্যিক উদ্দেশ্যের কথাও প্রকাশ পেয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, সার্ত্র তার দুটি বইয়েই অস্তিত্বের সবচেয়ে জরুরি সমস্যাটিকে সরাসরি ধরতে পেরেছেন এবং তার আবিষ্ট চরিত্রগুলোর জীবনের মধ্য দিয়ে তাকে বাস্তব করে তুলেছেন। ‘একজন বড় লেখক সব সময়ই নিজের একটি জগৎ এবং সেই জগতের নিজস্ব বার্তা তৈরি করেন। সার্ত্রের জগৎ আমাদের শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, কিন্তু একই সঙ্গে শেখায় স্বচ্ছভাবে দেখতে। নিজের জীবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে থাকা মানুষের যে ছবি তিনি তাঁর চরিত্রগুলোর মাধ্যমে তৈরি করেছেন, তা তার লেখার মহত্ত্ব ও সত্যের এক অসাধারণ উদাহরণ।’
‘মহত্ত্ব ও সত্য’—লা গ্রঁদ্যর এ লা ভেরিতে। সার্ত্র কি কামুর এই প্রশংসা পড়েছিলেন? এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায় না। তবে ১৯৪২ সালের শরৎকালে তাঁদের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক যোগাযোগ ঘটে। বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস বইটির পাণ্ডুলিপি প্রকাশকের কাছে পাঠানোর কয়েক সপ্তাহ পর সার্ত্র কামুর লেখা আবিষ্কার করেন। এরপর তিনি দ্য স্ট্রেঞ্জার নিয়ে প্রায় ছয় হাজার শব্দের একটি দীর্ঘ ও উদার সমালোচনা লেখেন। প্রবন্ধটিতে সার্ত্র উপন্যাসটিকে পাশাপাশি পড়েছিলেন কামুর দার্শনিক রচনা দ্য মিথ অব সিসিফাস–এর সঙ্গে। অর্থাৎ তিনি কামুর দর্শনকে বুঝতে চেয়েছিলেন তাঁর কথাসাহিত্যের মধ্য দিয়ে।
সার্ত্রের আলোচনার একটি অংশ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন:
‘অর্থহীনতা মানুষের মধ্যে কিংবা পৃথিবীর মধ্যে আলাদাভাবে অবস্থান করে না। কারণ মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো পৃথিবীর মধ্যে তার অস্তিত্ব। তাই শেষ পর্যন্ত অর্থহীনতা মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থহীনতা প্রথমত নিছক কোনো ধারণার বিষয় নয়; বরং এক বেদনাদায়ক আলোকচ্ছটায় তা আমাদের সামনে প্রকাশিত হয়। “ঘুম থেকে ওঠা, ট্রাম ধরা, চার ঘণ্টা কাজ, খাওয়া, ঘুমানো; তারপর সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার, শুক্রবার, শনিবার—একই নিয়মে চলতে থাকা জীবন…” হঠাৎ একদিন এই দৃশ্য ভেঙে পড়ে। আমরা নিজেদের এক নিরাশ স্বচ্ছতার মুখোমুখি আবিষ্কার করি।’
এখানে সার্ত্র আসলে দ্য মিথ অব সিসিফাস–এর একেবারে শুরুর দিকের একটি অংশের সারসংক্ষেপ করেছেন এবং কামুর লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ওই অংশে কামু তার মূল দার্শনিক অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, উদ্ধৃতিটি শুনলে মনে হয় যেন কামু সার্ত্রের নজিয়া উপন্যাসেরই বর্ণনা দিচ্ছেন। সার্ত্র এরপর কামুর সঙ্গে একমত হয়ে লিখছেন, ধর্ম কিংবা অস্তিত্ববাদী দর্শনের বিভ্রান্তিকর আশ্রয় প্রত্যাখ্যান করলে আমরা কিছু মৌলিক সত্যের মুখোমুখি হই: পৃথিবী বিশৃঙ্খল; আগামীকাল বলে কিছু নেই, কারণ প্রত্যেক মানুষকেই একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে। ‘একটি মহাবিশ্ব যখন হঠাৎ তার সমস্ত বিভ্রম ও আলো হারিয়ে ফেলে, তখন মানুষ নিজেকে সেখানে বহিরাগত, অপরিচিত বলে অনুভব করে।’
দ্য মিথ অব সিসিফাস–এ এই বাক্যটির আশপাশের অংশ পড়লে আবার ‘নজিয়া’র কথা মনে পড়ে। সেখানে কামু লিখেছেন, ‘যেকোনো রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়েই একজন মানুষ হঠাৎ অর্থহীনতার অনুভূতির মুখোমুখি হতে পারে।’ পরের পৃষ্ঠাতেই রয়েছে সার্ত্রের উপন্যাসের মতো একটি বর্ণনা—কীভাবে প্রতিদিনের একঘেয়ে জীবন হঠাৎ ভেঙে পড়ে। এরপর কামু সরাসরি সার্ত্রের উপন্যাসের উল্লেখ করেছেন: ‘আজকের একজন লেখক যাকে বমিভাব বলে অভিহিত করেছেন, সেটিও আসলে অর্থহীনতা।’
তাহলে সার্ত্রের উদ্ধৃতিতে আমরা কার কণ্ঠ শুনছি? এক বিস্ময়কর বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মীয়তার প্রকাশ সেখানে। সার্ত্র উৎসাহের সঙ্গে কামুর লেখা উদ্ধৃত করছেন, অথচ কামুর সেই বিশ্লেষণও তৈরি হয়েছিল সার্ত্রের চিন্তার প্রভাব থেকে। আসলে সেখানে দুজনের কণ্ঠই একসঙ্গে শোনা যায়। এই বুদ্ধিবৃত্তিক মিলের পাশাপাশি সার্ত্র কামুর তুলনা করেছেন কাফকা ও আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সঙ্গে। দুজন লেখককেই তিনি শ্রদ্ধা করতেন। দ্য স্ট্রেঞ্জার উপন্যাসের নির্মাণশৈলীরও প্রশংসা করেছিলেন।
সার্ত্র লিখেছিলেন:
‘উপন্যাসে এমন কোনো বিবরণ নেই, যা অপ্রয়োজনীয়। প্রতিটি বিবরণই পরবর্তী সময়ে ফিরে আসে এবং উপন্যাসের বক্তব্যকে আরও স্পষ্ট করে। বইটি শেষ করার পর আমরা বুঝতে পারি, এর সমাপ্তি অন্য কোনোভাবে হতে পারত না। যে পৃথিবীকে কারণ ও কার্যকারণের সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে অর্থহীন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে সবচেয়ে ছোট ঘটনাটিরও গুরুত্ব রয়েছে। প্রতিটি ঘটনাই নায়ককে অপরাধ ও মৃত্যুদণ্ডের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। দ্য স্ট্রেঞ্জার একটি ধ্রুপদি উপন্যাস—অর্থহীনতাকে নিয়ে লেখা, আবার অর্থহীনতার বিরুদ্ধেও লেখা।’
‘নজিয়া’র লেখক যে দ্য স্ট্রেঞ্জার–এর কল্পনাশক্তিতে মুগ্ধ হয়েছিলেন, তা স্পষ্ট। কামুর ভাষার সরলতা, শারীরিক অনুভূতি ও পরিবেশকে জীবন্ত করে তোলার ক্ষমতা, শেষকৃত্যের সময়ের বর্ণনা, পরদিনের শবযাত্রা এবং মেরসোর দৈনন্দিন জীবনের বিবরণ—সবকিছু মিলে উপন্যাসটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি রয়েছে আরও অস্বস্তিকর কিছু বিষয়। মেরসোর স্বাভাবিক মানবিক আবেগের অনুপস্থিতি, এক আরব মানুষকে নির্বিকারভাবে হত্যা করা, মায়ের মৃত্যুতে তার উদাসীনতার জন্য কৌঁসুলির ক্ষোভ, বিচারকদের নৈতিক প্রত্যাশার বিরুদ্ধে তার অবস্থান—সব মিলিয়ে উপন্যাসটি এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় পাঠককে। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক আলজেরিয়ায় একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষের হাতে একজন আরব নিহত হওয়ার পরও মৃত্যুদণ্ডের রায় কতটা অস্বাভাবিক, সেই প্রশ্নও উপন্যাসের রাজনৈতিক পাঠকে জটিল করে তোলে। ফরাসি আলজেরিয়ার বাস্তবতা ও সংকটকে ধারণ করা এক গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হয়ে ওঠে দ্য স্ট্রেঞ্জার।
দর্শনের জায়গায় সার্ত্র, জীবনের জায়গায় কামু
কিন্তু দ্য মিথ অব সিসিফাস নিয়ে সার্ত্রের মত কী ছিল? সদ্যই তিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মৌলিক ও গভীর দার্শনিক গ্রন্থ বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস শেষ করেছেন। ফলে দর্শনের প্রশ্নে তার নিজের অবস্থান ছিল সুপ্রতিষ্ঠিত। তবু তিনি কামুর দার্শনিক রচনার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা দেখিয়েছিলেন। সার্ত্রের মতে, দ্য মিথ অব সিসিফাস–এর সংযত ভাষা এবং বিষয়বস্তুর কারণে কামু ফরাসি নীতিদার্শনিকদের সেই গুরুত্বপূর্ণ ধারায় স্থান পাওয়ার যোগ্য, যাদের চিন্তা নিৎসের পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি কামুর যুক্তি উপস্থাপনের ধরন, চিন্তার স্বচ্ছতা, ভাষার নির্মাণ এবং এক ধরনের গম্ভীর অথচ বিষণ্ন সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছিলেন। তার মতে, কামুর মধ্যে একজন ধ্রুপদি লেখকের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে সার্ত্র নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলেন, দ্য স্ট্রেঞ্জার উপন্যাসটি কথাসাহিত্য হিসেবে যে শক্তি অর্জন করেছে, নজিয়া তা পারেনি। চার বছর আগে কামু যে বিষয়টি তার নজরে এনেছিলেন, এবার সার্ত্রও যেন তা স্বীকার করলেন। একই সঙ্গে তিনি হয়তো এটাও বুঝেছিলেন, দ্য মিথ অব সিসিফাস জনপ্রিয় দার্শনিক চিন্তার একটি আকর্ষণীয় রচনা হলেও তা একজন পূর্ণাঙ্গ দার্শনিকের সুসংবদ্ধ তত্ত্বনির্মাণ নয়। কামু সেখানে দর্শনের একজন অনুসন্ধিৎসু পাঠক ও চিন্তক। তিনি ইয়াসপার্স, হাইডেগার ও কিয়ের্কেগার্দের মতো অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার বক্তব্য ছিল, মানুষের জীবনের অর্থহীনতা অতিক্রম করার কোনো পথ নেই। অন্যদিকে সার্ত্র দীর্ঘদিন ধরে হাইডেগার ও হুসার্লের দর্শন নিয়ে কাজ করেছেন। তাদের চিন্তার সঙ্গে নিজের ভাবনাকে মিলিয়ে বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস–এ তিনি অস্তিত্বের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছেন। কার্তেসীয় ব্যক্তিচেতনা থেকে শুরু করে মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক কাঠামো, মানুষের বিভিন্ন জীবনপ্রকল্প এবং আত্মপ্রবঞ্চনার মতো আচরণগত বৈশিষ্ট্য তিনি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। পরবর্তী বছরগুলোতে এই দর্শনের পরিণতি তিনি জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসন্ধান করেছেন—দৈনন্দিন জীবন, রাজনীতি, নীতিশাস্ত্র, শিল্পসৃষ্টি এবং জ্ঞানের প্রকৃতি পর্যন্ত। অন্যদিকে দ্য মিথ অব সিসিফাস শুরু হয়েছে একটি প্রশ্ন দিয়ে: ‘জীবনের অর্থ আছে কি না, সেটিই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।’ কামু এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন মানুষের অভিজ্ঞতা, হতাশা ও অস্তিত্বের সীমাবদ্ধতার মধ্যে। তিনি কোনো পাণ্ডিত্যপূর্ণ দার্শনিক তর্কের পথে এগোননি। তার কাছে মানুষের অভিজ্ঞতাই ছিল চিন্তার প্রধান ভিত্তি।
এভাবেই দ্য মিথ অব সিসিফাস এবং বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস—দুটি বইই অর্থহীনতার ধারণা থেকে শুরু হলেও তাদের চিন্তার জগৎ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। এই পার্থক্যটি সার্ত্রের একটি তীক্ষ্ণ মন্তব্যে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি লিখেছিলেন, কামু ইয়াসপার্স, হাইডেগার ও কিয়ের্কেগার্দের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে কিছুটা পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন; ‘কিন্তু মুশকিল হলো, তাদের সবাইকে তিনি সব সময় ঠিকমতো বুঝেছেন বলেও মনে হয় না।’ এখানে একজন প্রতিষ্ঠিত দার্শনিকের কণ্ঠে অন্য একজন লেখক-চিন্তকের প্রতি কিছুটা তাচ্ছিল্য ধরা পড়ে। সার্ত্র ছিলেন ফ্রান্সের বিখ্যাত একোল নরমাল সুপেরিয়রের উচ্চতর ডিগ্রিধারী দার্শনিক। অন্যদিকে কামু আলজিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর দর্শনশিক্ষা অর্জন করেছিলেন। সার্ত্র যেন এই দুই শিক্ষাগত অবস্থানের পার্থক্যটিকেও মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন।
কামুর অস্বস্তি: সমালোচনার ভাষা যখন তিক্ত হয়ে ওঠে
সার্ত্রের এই প্রবন্ধে কামু খুব একটা খুশি হননি। দ্য স্ট্রেঞ্জার নিয়ে একই সংখ্যার কাইয়ে দু স্যুদ পত্রিকায় তার শিক্ষক জ্যঁ গ্রেনিয়েও একটি সমালোচনা লিখেছিলেন। তাকে লেখা চিঠিতে কামু সার্ত্রের প্রবন্ধ সম্পর্কে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি লিখেছিলেন:
‘সার্ত্রের প্রবন্ধটি যেন একটি নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ। অবশ্য প্রতিটি সৃষ্টিকর্মের মধ্যে একটি স্বতঃস্ফূর্ত উপাদান থাকে, যা তিনি ধরতে পারেননি। সৃষ্টির ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণই সবকিছু নয়। কিন্তু সমালোচনার নিয়মই এমন। তাতে অসুবিধা নেই। কারণ কয়েকটি জায়গায় তিনি আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছেন, আমি আসলে কী করতে চেয়েছিলাম। তার বেশির ভাগ সমালোচনাই ন্যায্য বলে মনে হয়েছে। কিন্তু এই তিক্ত সুর কেন?’
তিক্ততা অনেক সময় কোনো কিছুকে শুধু বিশ্লেষণ করে না, তাকে ভেঙেও ফেলে। কামুর অস্বস্তির কারণ কি তবে এই যে, সার্ত্র তার সৃষ্টিকর্মকে এত নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন? হয়তো নিজের লেখাকে অন্য একজনের বিশ্লেষণের অধীনে দেখতে তিনি স্বস্তি বোধ করেননি। কামু নিজের সৃজনশীলতার স্বতঃস্ফূর্ত দিকটির কথা তুলে ধরে সার্ত্রের সমালোচনামূলক বুদ্ধিমত্তার বিপরীতে সেটিকে দাঁড় করিয়েছেন। যদিও একই সঙ্গে স্বীকার করেছেন, সমালোচনার ক্ষেত্রে এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। সার্ত্রের তীক্ষ্ণ মন্তব্যটি হয়তো ছিল তার প্রতি কামুর আগের কোনো পরোক্ষ অবজ্ঞার জবাব। দ্য মিথ অব সিসিফাস–এ কামু যখন লেখেন, ‘আজকের একজন লেখক যাকে বমিভাব বলে অভিহিত করেছেন, সেটিও আসলে অর্থহীনতা’, তখন তিনি সার্ত্রের নাম উল্লেখ করেননি। অথচ এর আগে নজিয়া ও দ্য ওয়াল–এর লেখক হিসেবে সার্ত্রকে তিনি একজন বড় লেখক বলে প্রশংসা করেছিলেন। এবার নিজের দর্শনের আলোচনায় এসে সার্ত্রের নাম না নিয়ে তাকে শুধু ‘আজকের একজন লেখক’ বলে উল্লেখ করলেন। অথচ নিৎসে, শোপেনহাওয়ার ও ইয়াসপার্সের নাম তিনি স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সার্ত্রকে তিনি যেন সেই বিখ্যাত চিন্তকদের স্তরের বাইরে রেখেছেন। সার্ত্রের প্রতিক্রিয়ায়ও হয়তো সেই ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে। তিনি কামুর লেখাকে শুধু বিশ্লেষণই করেননি, তাকে সাহিত্য ও চিন্তার জগতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাতারে স্থান দিয়ে প্রশংসাও করেছেন। একই সঙ্গে বুঝিয়ে দিয়েছেন, একজন লেখককে তিনি যেমন গভীরভাবে পড়তে পারেন, তেমনি তার সীমাবদ্ধতাও নির্দ্বিধায় তুলে ধরতে পারেন।
বন্ধুত্বের গভীরে যে পার্থক্য ছিল
এই মন্তব্যগুলো দুই লেখকের মধ্যে সম্ভাব্য বিরূপতার ইঙ্গিত দিলেও তাদের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে। তাদের মধ্যে গভীর মিল ছিল, কিন্তু সেই মিল কখনোই একরকম হয়ে যাওয়ার অর্থ বহন করেনি। সার্ত্রের পৃথিবী ও মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তুলনামূলকভাবে নেতিবাচক। কামু ছিলেন অনেক বেশি ইতিবাচক। দ্য স্ট্রেঞ্জার ও নজিয়া পাশাপাশি পড়লেই এই পার্থক্য চোখে পড়ে। কামুর মেরসো যেন প্রকৃতি ও শরীরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তার লেখায় উত্তর আফ্রিকার আলো, সমুদ্র, রোদ, বাতাস ও প্রকৃতির সৌন্দর্য এক বিশেষ তীব্রতা নিয়ে উপস্থিত। নাপচিয়ালস পড়লে এই জগতের আনন্দ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সৌন্দর্য সহজেই অনুভব করা যায়। সার্ত্রের লেখায় এই ধরনের শারীরিক ও প্রাকৃতিক অনুভূতি খুব কমই দেখা যায়। তিনি প্রকৃতি কিংবা শরীরকে কামুর মতো সরল ও আনন্দময়ভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। আধুনিক কথাসাহিত্যের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ বৈপরীত্যের একটি হলো ‘নজিয়া’র ধূসর, কুৎসিত বুভিল শহর এবং দ্য স্ট্রেঞ্জার–এর উজ্জ্বল, ঝলমলে বন্দরনগর, তার সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে পার্থক্য। তাদের পরস্পরের লেখা সমালোচনা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে। দুজনেই দর্শন, কথাসাহিত্য এবং অন্যান্য সাহিত্যধারায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। কিন্তু তাদের স্বভাবগত প্রবণতা ছিল আলাদা। সার্ত্র ছিলেন মূলত দার্শনিক। তত্ত্ব, ধারণা ও সাধারণ সত্যের অনুসন্ধান তাকে বেশি আকৃষ্ট করত। অন্যদিকে কামু ছিলেন মূলত ঔপন্যাসিক। মানুষের নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা, বাস্তব পরিস্থিতি ও জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তকে তুলে ধরতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। কামুর ভাষায়, এই পার্থক্যটি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ ও সৃজনশীল স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যে। সার্ত্র অর্থহীনতাকে তার চিন্তার সূচনা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। নজিয়া থেকে বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস—এই পাঁচ বছরে তিনি অনুসন্ধান করেছেন, মানুষ কীভাবে তার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অর্থহীন অস্তিত্বের ওপর একটি অর্থপূর্ণ জগৎ নির্মাণ করে। অন্যদিকে কামু তার সমগ্র চিন্তার ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন এই উপলব্ধির ওপর যে, মানুষের অভিজ্ঞতায় অর্থহীনতা একটি অনিবার্য সত্য। একে অতিক্রম করার কোনো সহজ পথ নেই। তবু তাদের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল, তার উৎস ছিল এই অভিন্ন সূচনাবিন্দু এবং কাছাকাছি সাহিত্যিক উদ্দেশ্য। দুজনেই এমন এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যেখানে দর্শন ও সাহিত্যকে সাধারণত সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অথচ তারা দুজনেই দর্শন ও কথাসাহিত্য—উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করছিলেন। তারা দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন, পরস্পরের লেখায় এমন কিছু আছে, যা তাদের নিজেদের চিন্তারও কাছাকাছি। তাদের উপন্যাসের প্রচলিত কাহিনিকাঠামো ছিল না, চরিত্রদের আচরণও অনেক সময় আপাতদৃষ্টিতে উদ্দেশ্যহীন। কিন্তু এই অস্বাভাবিকতার মধ্য দিয়েই তারা অস্তিত্বের অর্থহীনতাকে তুলে ধরেছিলেন। তারা দুজনেই এই সত্যের মুখোমুখি হতে চেয়েছিলেন, কোনো ভান বা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়াই। তাদের মতে, অধিকাংশ মানুষ, এমনকি অনেক দার্শনিকও, এই সত্যকে এড়িয়ে চলে। তাই তারা এমন এক জীবনবোধের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্বের সামনে সৎ থাকতে পারে, নিজের জীবনকে স্পষ্টভাবে দেখতে পারে। এই জায়গাতেই তাদের বন্ধুত্বের সবচেয়ে গভীর ভিত্তি। পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তারা পরস্পরের চিন্তাকে চিনতে পেরেছিলেন। তাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল, ছিল তীক্ষ্ণ সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত অভিমানও। কিন্তু এসবের অনেক আগে, তাদের দুজনের লেখার ভেতরেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল এক বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মীয়তা—যার স্মৃতি পরবর্তী বিচ্ছেদকেও আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছিল।

রোনাল্ড অ্যারনসন তার ‘ক্যামু অ্যান্ড সার্ত্র: দ্য স্টোরি অভ আ ফ্রেন্ডশিপ অ্যান্ড দ্য কোয়ারেল দ্যাট এন্ডেড ইট’ বইয়ে বিশ শতকের দুই প্রভাবশালী চিন্তাবিদ আলবেয়ার কামু ও জ্যাঁ-পল সার্ত্রের বন্ধুত্ব এবং বিচ্ছেদের গল্প তুলে ধরেছেন। ১৯৪৩ সালে তাদের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে দর্শন, রাজনীতি এবং পরিবর্তনের জন্য সহিংসতার ব্যবহার নিয়ে মতবিরোধ বাড়ে। ১৯৫২ সালে সেই বিরোধের মধ্য দিয়ে তাদের বন্ধুত্বের অবসান ঘটে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









