শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

ধনী-গরিব ‘এক কাতারে’

প্রকাশিত: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৯ পিএম

আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৯ পিএম

ধনী-গরিব ‘এক কাতারে’

পৃথিবীর এক প্রান্তে চলা যুদ্ধের দামামা কিভাবে অন্য প্রান্তের সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের চুলায়ও প্রভাব ফেলে তার এক কঠিন বাস্তবতার উদাহরণ বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা কেবল ভূরাজনৈতিক সংকটেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি দেশের সামগ্রিক জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। একদিকে জ্বালানি সংকটে গণপরিবহণের পাশাপাশি বন্ধ হওয়ার পথে বড়লোকের বাহন ‘প্রাইভেট গাড়ি’; অন্যদিকে পরিবহন ব্যয় দ্রুত বাড়ার কারণে সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানো’ পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি দিন দিন আরো কঠিন হয়ে উঠছে। 

অর্থনীতিবিদদের মতে, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির ফলে চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকলে এই শ্রেণির মানুষের সংসার-জীবন আরো দুরূহ হয়ে পড়বে। এর ফলে অনেক পরিবারের খাবারের তালিকায় কাটছাঁট অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে, সীমান্ত পেরিয়ে যুদ্ধের প্রভাব এখন সরাসরি সাধারণ মানুষের হেঁশেলেও পৌঁছে গেছে। তাতে অবস্থাটা এমন যে, এই সংকটকালে ধনী-গরিব যেন ‘এক কাতারে’ এসে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে দেশের জ্বালানি মজুদ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ঢাকা চেম্বারের তথ্য বলছে, দেশে এখন ডিজেলের মজুদ আছে মাত্র ১১ দিনের। অকটেন যে পরিমাণ আছে তা দিয়ে মেটানো সম্ভব সাত দিনের চাহিদা। পেট্রোলের মজুদ আরও কম, চাহিদা মেটানো যাবে মাত্র ছয় দিনের। 

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রতি ইউনিট ৩০-৩৫ ডলারে পৌঁছে যাওয়ায় জ্বালানি আমদানিতে মাসে অতিরিক্ত ৮০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। এই বিপুল ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়বে। ভারি হবে ঋণের বোঝা, যার পরোক্ষ চাপ পড়বে জনগণের ওপরই। 

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে দেশের শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ এরই মধ্যে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর ফলে তৈরি পোশাক, ওষুধ, সিমেন্ট ও ইস্পাত শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। টান পড়েছে বিদ্যুতের উৎপাদনেও। আর উৎপাদন কমলে এবং খরচ বাড়লে বাজারে এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়ে পণ্যের দামের ওপর, যা সাধারণ ক্রেতার পকেট কাটবে। 

বৈশ্বিক এই অস্থিরতা শুধু পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এক কালো মেঘ হয়ে দেখা দিয়েছে। যদি দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা বা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে খাবারের টেবিলের টানাপড়েন নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস তুলে ছাড়বে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত গৃহিণী ও গার্মেন্টস কর্মী সানজিদা খানম পলি এদিন-কে বলেন, ‘আমাদের সংসারটা খুব হিসেব করে চালাতে হয়। মাসের শুরুতে একটা বাজেট করি-কত টাকা বাজারে যাবে, কতটাকা ভাড়া, কতটাকা ওষুধে লাগবে। কিন্তু এখন সেই হিসেব আর মিলছে না। গ্যাস ঠিকমতো পাওয়া যায় না, কখনো চাপ কম থাকে, কখনো একেবারেই থাকে না। তখন বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করতে হয়, কিন্তু সেই সিলিন্ডারের দামও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। একদিকে রান্না করতে খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে গেলে সবকিছুর দাম বেশি।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার করতাম, এখন সেটা ৩-৪ দিনেই শেষ হয়ে যায়। মাছ-মাংস তো প্রায় বাদই দিতে হয়েছে, ডিম আর ডাল দিয়েই কোনোভাবে দিন কাটাচ্ছি। বাচ্চারা ভালো কিছু খেতে চাইলে খুব খারাপ লাগে।বিদ্যুতের সমস্যাও বাড়ছে। লোডশেডিং হলে ছোট বাচ্চা নিয়ে অনেক কষ্ট হয়। গরমে ঘুমাতে পারে না, পড়াশোনাও ঠিকমতো করতে পারে না।আমরা সাধারণ মানুষ, এত বড় বড় হিসাব বুঝি না। শুধু বুঝি, দিন দিন জীবনটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যদি জ্বালানি আর বাজারদর নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’ 

বর্তমান জ্বালানি সংকট ও দৈনন্দিন কাজের অবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে রাইড শেয়ার চালক গোলাম রাব্বি বলেন, ‘আগে দিনে ৮-১০ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে যা আয় করতাম, তাতে সংসার মোটামুটি চলে যেত। কিন্তু এখন তেলের দাম বাড়ছে, আবার অনেক সময় পাম্পে গিয়ে তেলই পাওয়া যায় না ঠিকমতো। ডিজেল বা অকটেনের জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এই সময়টায় কোনো ইনকামই থাকে না। আমাদের আয় তো ফিক্সড না—যেদিন গাড়ি চালাব, সেদিনই টাকা। কিন্তু এখন জ্বালানির খরচ এত বেশি হয়ে গেছে যে, আগের মতো ট্রিপ নিলেও লাভ থাকে না। অনেক সময় যাত্রী ভাড়া বাড়াতে বললে ঝামেলা করে, আবার না বাড়ালে নিজের খরচই ওঠে না। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হচ্ছে, বাসায় গেলে বাচ্চার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। আগে যেটুকু বাজার করতাম, এখন সেটা অর্ধেক করতে হচ্ছে। চাল, ডাল, তেল সবকিছুর দাম বাড়ছে। জ্বালানি সংকট শুধু আমাদের রাস্তায় না, ঘরের ভেতরেও আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এইভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য শহরে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে। সরকার যদি দ্রুত কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমরা সত্যিই পথে বসে যাব।’

এছাড়াও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন পরিবহন শ্রমিক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকরা। তেল পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ সারি। কোথাও কয়েকশ মিটার পর্যন্ত লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক সময় মিলছে না কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। এই সংকট সরাসরি আঘাত হানছে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায়। বাস মালিকদের অভিযোগ, জ্বালানি সংগ্রহেই এখন দিনের বড় একটা সময় চলে যাচ্ছে। ফলে নির্ধারিত ট্রিপ কমে যাচ্ছে, যাত্রীসেবায় বিঘ্ন ঘটছে এবং আয়ও কমে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে বাস ডিপো থেকেই বের করা যাচ্ছে না পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায়। এতে শহরের ভেতরে গণপরিবহনের সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।

একটি বেসরকারি বাস কোম্পানির মালিক বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক ট্রিপ চালানোর কথা, কিন্তু এখন তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অর্ধেক সময় শেষ হয়ে যায়। অনেক সময় একেবারেই তেল পাওয়া যায় না। এতে করে গাড়ি বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। কিন্তু ব্যাংকের কিস্তি, স্টাফদের বেতন—এসব তো বন্ধ নেই। ব্যবসা চালানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

শুধু পরিবহন শ্রমিক বা ব্যবসায়ীরাই নন, জ্বালানি সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন উচ্চবিত্ত শ্রেণির ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকরাও। যাদের জন্য জ্বালানি সংকট একসময় দূরের সমস্যা মনে হতো, তারাও এখন বাস্তবতার মুখোমুখি।

রাজধানীর গুলশান এলাকার বাসিন্দা ও একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাজমুল হোসেন বলেন, ‘আগে কখনো ভাবিনি তেলের জন্য এভাবে লাইনে দাঁড়াতে হবে। এখন প্রায় প্রতিদিনই এক-দেড় ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক সময় কাজের মিটিং বা জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিস হয়ে যাচ্ছে। টাকা থাকলেই যে সবকিছু পাওয়া যাবে এই ধারণাটা এখন আর সত্যি নয়। এটা শুধু জ্বালানির সংকট না, এটা একটা সিস্টেমিক সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যখন দেখছি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আমাদের মতো ধনী মানুষও একই লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, তখন বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা গুরুতর।’

জ্বালানি পাম্প মালিকদের ভাষ্য, সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ায় তারা চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে পারছেন না। ফলে একদিকে ক্রেতাদের চাপ, অন্যদিকে সীমিত সরবরাহ দুই দিক সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দেওয়া বন্ধ করে দিতে হচ্ছে, যাতে সবাই কিছুটা হলেও পায়।

পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু পরিবহন খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেই বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পণ্য পরিবহন ব্যাহত হলে বাজারে সরবরাহ কমবে, বাড়বে দাম—যার চূড়ান্ত চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপরই। সবমিলিয়ে, জ্বালানি সংকট এখন আর কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়, এটি সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য এক অভিন্ন বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। যেখানে একই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে শ্রমিক, মধ্যবিত্ত আর ধনী সবার গল্পই এখন একই। 

 মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে। গতকাল শুক্রবার ভোরে এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর সময়ও এ দাম বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গিয়েছে। 

আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এদিন এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর সময় ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ৭৫ ডলারে পৌঁছেছে। এটি আগের তুলনায় প্রায় শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুড তেলের দামও ১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

এদিকে যুদ্ধবিরতির খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম পরিবর্তন হলেও জ্বালানির দাম সাধারণ মানুষের নাগালে ফিরতে এখনো দীর্ঘসময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেও সময় লাগবে।

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.