বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

মহান মে দিবস আজ

নারী আজও বঞ্চিত শক্তি

প্রকাশিত: ০১ মে ২০২৬, ০৯:০৩ এএম

আপডেট: ০১ মে ২০২৬, ১০:১২ এএম

নারী আজও বঞ্চিত শক্তি

আজ মহান মে দিবস। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন। ১৮৮৬ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ওইদিন তাদের আত্মদানের মধ্যদিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিকদের আত্মত্যাগের এই দিনকে তখন থেকেই সারা বিশ্বে 'মে দিবস' হিসেবে পালন করা হচ্ছে। এবারের মে দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত’।

মহান মে দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধী বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আজ দুপুর আড়াইটায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি নয়াপল্টনের দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শ্রমিক সমাবেশের আয়োজন করেছে। এতে দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

এদিন বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেইটে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের উদ্যোগে শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান করবেন। শ্রমিক দিবস উপলক্ষ্যে আজ বিকাল ৩টায় শাহবাগ জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গণে “শ্রমিক সমাবেশ” করবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এমপি। এছাড়াও সারাদেশে যথাযথ মর্যদায় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হবে।

বাংলাদেশে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ অভাবনীয়ভাবে বাড়লেও, তাঁদের ন্যায্য মজুরি এবং কর্মস্থলের নিরাপত্তা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শ্রমিকদের ঘিরে নানা অনুষ্ঠান থাকলেও মাঠপর্যায়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সরকারী-বেসরকারি চাকুরি, তৈরি পোশাক, কৃষি, চা-বাগান, গৃহকর্ম ও নির্মাণ ছাড়াও বিভিন্ন খাতে কর্মরত আছেন বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক। এসব খাতে নারী ও পুরুষের কর্ম সময় একই হলেও আধুনিক যুগে এসেও এখনো ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত এবং অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক নারী। একই কাজের জন্য পুরুষের তুলনায় কম পারিশ্রমিক, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ওভারটাইমের স্বচ্ছ হিসাবের অভাব এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি এসব যেন এখন নারী শ্রমিকদের জীবনের নিত্যসঙ্গী।

বিভিন্ন প্রকার আইন ও নীতিমালা থাকলেও নেই কোন বাস্তবায়ন। নারী শ্রমিকদের অধিকার অনেকাংশেই শুধুমাত্র কাগজেই লিপিবদ্ব রয়ে যায়। আর সহিংসতা-হিংস্রতা শ্রমজীবী নারীদের আরও বেশি তাড়া করে। পুরুষতান্ত্রিক প্রতাপ আজও গিলে চলে নারী শ্রমিকদের। শ্রম চুরি হয়। পারিশ্রমিকদের শর্ত অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল। গামের্ন্টস, কৃষি, গৃহ, দিনমজুরে ব্যাপক নারী শ্রমিক থাকলেও সর্বক্ষেত্রে নেই নিরাপত্তা, সম্মানও। ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্রে লাঞ্ছনা সহ্য করাই যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। আজ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস যা সচরাচর মে দিবস নামে অভিহিত। প্রতি বছরই ক্যালেন্ডার ধরে দিনটি আসে, চলেও যায়। কিন্তু নারী শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি-নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। 

শ্রম অর্থনীতিবিদদের মতে, নারী শ্রমিকদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে না পারলে সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক। কিন্তু মজুরি বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা থাকলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। সমান মজুরি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী। তবে মজুরির ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান এখনো বড়—বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, একই বা সমমানের কাজের জন্য নারী শ্রমিকরা গড়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম পারিশ্রমিক পান। খাতভিত্তিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ শ্রমিক নারী হলেও সুপারভাইজরি ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। কৃষি ও চা-বাগানে নারীরা দীর্ঘসময় কাজ করলেও মজুরি নির্ধারণে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। গৃহকর্মী ও নির্মাণ খাতে কর্মরত নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে—এখানে কাজের নির্দিষ্ট সময়, ছুটি বা স্বাস্থ্যসুরক্ষা প্রায়ই অনিশ্চিত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর উপপরিচালক আজিজা রহমান দৈনিক এদিনকে বলেন, শ্রমবাজারে পুরুষের তুলনায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বিশেষ করে শোভন কাজে মেয়েদের অংশগ্রহণ এখনো অনেক কম। নারীদেরকে শোভন কাজে  অংশগ্রহণের আরও সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। তবে শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ সালের  শ্রমবাজারে নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণ ও আয়ের জরিপ অনুযায়ী, পুরুষদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ, যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৩৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। আয়ের ক্ষেত্রেও ব্যবধান লক্ষণীয়। পুরুষ শ্রমিকদের গড় মাসিক আয় ১৬ হাজার ১০৫ টাকা, বিপরীতে নারী শ্রমিকদের গড় আয় ১২ হাজার ৬৮১ টাকা।  

শুধু মজুরি নয়, কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে বড় শঙ্কা। বিভিন্ন গবেষণা ও এনজিও রিপোর্টে দেখা যায়, নারী শ্রমিকদের একটি অংশ কর্মস্থলে যৌন হয়রানি, মানসিক চাপ ও অনিরাপদ পরিবেশের মুখোমুখি হন। নির্মাণ খাতে অনেক নারী শ্রমিক হেলমেট, গ্লাভস বা নিরাপত্তা বেল্ট ছাড়াই কাজ করেন। গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনাও বিচ্ছিন্ন নয়, যা অনেক সময় অভিযোগের পর্যায়েই আসে না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ও অন্যান্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের বড় অংশের কোনো লিখিত চুক্তি নেই। ফলে ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি বা মাতৃত্বকালীন সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুবিধা আইনে থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় না—ফলে গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের সময় নারী শ্রমিকরা আর্থিক ও পেশাগত ঝুঁকিতে পড়েন। এ বিষয়ে শ্রম অধিকার কর্মী রাশেদা খাতুন বলেন, আইনে সমান মজুরি ও নিরাপত্তার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কম। মনিটরিং দুর্বল এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা সীমিত। তিনি মনে করেন, নারী শ্রমিকদের জন্য আলাদা হেল্পডেস্ক, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

আইএলও কনভেনশনে দৈনিক ৮ কর্মঘণ্টার কথা নির্ধারিত থাকলেও বাংলাদেশে তা মানা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর পরিচালক কহিনূর মাহমুদ। তিনি জানান, গৃহশ্রমিক কিংবা যেকোনো নারী শ্রমিক ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত। ৮০ শতাংশের বেশি শ্রমিক মে দিবস ও স্বাভাবিক সরকারি ছুটির দিন কাজ করেন। গৃহশ্রমিকের ৯০ শতাংশই নারী। তাদের ওপর চলে শারীরিক নির্যাতন। কখনো হত্যারও শিকার হন। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ নারী। ২০১৭ সালে এই হার ছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ, অর্থাৎ গত এক দশকে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু তাঁদের কাজের মান ও মর্যাদা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি। এই ব্যবধান শ্রমবাজারে নারীদের সীমিত অংশগ্রহণ, খাতভিত্তিক বৈষম্য এবং মজুরি কাঠামোর অসমতার প্রতিফলন। ক্ষেত্রে স্পষ্ট বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণও এ ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়, বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে যেখানে চুক্তি, ন্যূনতম মজুরি বা নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা অনেক সময়ই অনুপস্থিত। নারীর এই বিশাল অবদান সত্ত্বেও তাঁদের মজুরি, কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনিরাপদ, অনিয়ন্ত্রিত ও অবমূল্যায়িত। 

গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও কৃষিজমির মালিকানায় তাঁদের অংশগ্রহণ কম । ২০২৩ সালের বিবিএস এর তথ্য অনুযায়ী কৃষিজমির মালিকানায় নারীরা পাবে মাত্র ১২ শতাংশ। গ্রাম্য ভাষায় কেউ কেউ বলেন স্বামীর অবর্তমানে  একজন স্ত্রী দুই আনার মালিক। নারী কৃষিশ্রমিকদের বেশিরভাগই মৌসুমি বা দৈনিক মজুরিভিত্তিক কাজে নিয়োজিত, যেখানে তাঁদের পারিশ্রমিক পুরুষের তুলনায় গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম।  অনেক ক্ষেত্রে নারীদের কৃষিকাজকে সহায়তামূলক শ্রম বা গৃহস্থালির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে এই শ্রমের কোনো নিজেস্ব আর্থিক মূল্যায়ন করা হয় না। গ্রাম অঞ্চলে বিশেষ করে ধান থেকে চাল ও গম থেকে আটা উৎপাদন মিল কারখানায় বা বয়লারে নারীদের অংশগ্রহন দেখা যায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কিন্তু শ্রম অনুযায়ী মজুরী পুরুষদের তুলনায় অনেক কম।  

শ্রমজীবী নারী নেত্রীদের ভাষ্য, কিছু নারী নিজ নিজ যোগ্যতায় এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বেশির ভাগের অধিকার ন্যায্যতা তলানিতে। নির্যাতন সহিংতার থাবা তো আছেই। মানুষকে অধিকার দেয় রাষ্ট্র। কিন্তু মহিলাদের অধিকারের ছাড়পত্র আদায় করতে হয় পরিবার ও সমাজের কাছে। পরিবারে চাকরির প্রশ্নে ছেলেরা এগিয়ে। সামাজিক ধারণা অনুযায়ী, মেয়েরা বেকার হয় না, অবিবাহিত হয়। পরিবারে পরিশ্রমে সঞ্চিত অর্থ তাদের বিয়েতে ব্যয় করা হয়। কিন্তু তা দিয়ে তাদের পছন্দ মতো ব্যবসায় নিয়োগ করার উদ্যোগ নেই কিংবা ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। বিয়ের পর পরিবারে যাবতীয় কাজের দায় এক গৃহবধূর মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হয়। তার পরিশ্রমের সময়ের কোনো হিসাব থাকে না, মূল্য থাকে না। 

শ্রমজীবী একাধিক নারী জানান, তারা ঘরের বাইরে কাজ করার জন্য ‘অনুমোদন’পেলে, সেখানেও জরুরি শর্ত থাকে। কর্মক্ষেত্র থেকে সোজা বাড়িতে। বাড়িতে ফিরে রাতের রান্না এবং বাচ্চাদের দেখভাল করতে হবে। পরের দিন বাচ্চা-সংসার সামলে কাজে যেতে হবে। বেতনভাতা কিংবা মজুরি, তাও খরচের স্বাধীনতা থাকে না। স্বামী কিংবা পরিবার সদস্যদের ইঞ্চি ইঞ্চি হিসাব দিতে হয়। রাজধানীর  মোহাম্মদপুরে বাড়ি বাড়ি কাজ করেন ফাতেমা বেগম। ক্ষোভ উগরে বললেন, তিন কাজে সাত হাজার টাকা পান। পুরো টাকা স্বামীর হাতে তুলে দিতে হয়। সংসারে তিন সন্তান। তার আয়ের হিসাব নেওয়া যায় না। পান, সিগারেট কিংবা নেশায় টাকা খরচ করে। উনিশ থেকে বিশ হলেই চলে নির্যাতন। 

করোনায় কারখানার চাকরি হারিয়ে ফুটপাতে সবজির ব্যবসা করতেন মনিরা বেগম। এখন রাজধানীর বসিলা এলাকায় ইট ভাঙেন। মজুরি হিসাবে প্রতিদিন ৪০০ টাকা পাচ্ছেন। সমপরিমাণ কাজ করে পুরুষ শ্রমিক পাচ্ছেন এক হাজার টাকা। রংপুরের শারমীন আক্তার গার্মেন্টেসে কাজ করেছেন বহু বছর। জানালেন, ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। তার নাকি বয়স হয়ে গেছে, তাই বের করে দেওয়া হয়েছে। এখন কী করেন? মানুষের কাছ থেকে সাহায্য তুলে খাই। 

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম সভাপতি মোশরেফা মিশু জানান, বর্তমানে শ্রমজীবী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব শ্রমজীবী মানুষের হাতে নেই। এতে অসহায় শ্রমিক শোষক সমাজের নিষ্ঠুর পীড়নে নিঃশেষিত হচ্ছে। নারী শ্রমিকরা উন্নত জীবন, বাসস্থান, উন্নত কর্মপরিবেশ কখনো পান না। তাদের শোষণ করা হচ্ছে। বেতন ন্যূনতম ২৫ হাজার করা জরুরি। ৮ ঘণ্টা শ্রম নিশ্চিত করতে হবে-তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারেরও। 

কৃষিতে নারীর সংখ্যা শতক থেকে কোটিতে পৌঁছেছে। কিন্তু স্বীকৃতি নেই শ্রমের। আবার মজুরির ক্ষেত্রেও চরম বৈষম্য। স্বাধীনতার পর কৃষিতে এখন এক কোটির বেশি নারী শ্রমিক কাজ করছেন। ২০১৮ সালে প্রকাশিত সবশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুসারে, কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণের সংখ্যা এক কোটির বেশি। নারী নেত্রীদের ধারণা-গত ৮ বছরে এ সংখ্যায় ন্যূনতম আর ১৫ লাখ কৃষি নারী শ্রমিক বেড়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) তথ্যানুযায়ী, নারী কর্মজীবীদের মধ্যে কৃষিতে প্রায় ৬০ শতাংশ নারী যুক্ত। বিজিএমইএ সূত্র জানায়, গার্মেন্টস শিল্পের ৭০ শতাংশ শ্রমিকই নারী। তাদের সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ। বিভিন্ন গার্মেন্টসে এখন অটোমেটিক মেশিন ব্যবহৃত হওয়ায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমছে।

কৃষি এবং পারিবারিক গৃহশ্রমে নারী শ্রমিকের সংখ্যা এক কোটি ৩০ লাখের উপরে। এ সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু স্বীকৃতি মিলছে না। মজুরি বৈষম্য পদে পদেই। এ দুই খাতে সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছিত হয় নারী শ্রমিকরা। এক স্বীকৃতি নেই-দ্বিতীয় কাজের নিশ্চয়তা নেই। কখনো তাদের বিনা পারিশ্রমিকেই কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। কখনো চলে মধ্যযুগীয় বর্বরতাও। ধর্ষণ নির্যাতন থেকে শুরু করে হত্যার শিকারও হচ্ছেন অসহায় নারীরা। এ ছাড়া গার্মেন্টস শিল্পে ২৮ লাখের উপরে নারী শ্রমিক রয়েছেন। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে তাদের মজুরি দাঁড়াতে পাচ্ছে না। সারা দেশে ১৭৭টি চা বাগান আছে। এর শ্রমিকের মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী। তাদের বাসস্থান থেকে শুরু করে খাদ্য-মজুরিতে বৈষম্য আরও বেশি। অধিকাংশ নারী শ্রমিকের সঙ্গে ক্রীতদাসের ন্যায় ব্যবহার করা হয়। দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হয়। 

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু জানান, প্রত্যন্ত গ্রামেও নারীরা বিভিন্ন শ্রমে যুক্ত হচ্ছেন। তাদের ন্যায্য মজুরি-কর্মঘণ্টার বালাই নেই। অধিকার বাস্তবায়নে যথাযথ উদ্যোগও নেই। ডিজিপিতে নারীশ্রম এগিয়ে। কিন্তু রাষ্ট্র, সমাজ মালিকপক্ষ তাদের অধিকারবঞ্চিত করছে। ন্যায্য মজুরি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

নওগাঁ জেলার রানীনগর উপজেলা শ্রম বিষয়ক কমিটির সদস্য মোঃ মোস্তাক আলী বলেন, চাল উৎপাদন মিল কারখানায় আমার কাজ করার আঠারো বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই উপজেলার বিভিন্ন বয়লারে  দেখেছি সময় এবং শ্রম পুরুষদের তুলনায় বেশি দেয় নারীরা । কিন্তু  নারীরা  মজুরী পায় পুরুষের তিন ভাগের এক ভাগ । তবে এসব কাজে মহিলাদের কষ্ট অনেক বেশি । প্রখর রোদে ধান শুকানো, সেদ্ধ করা, মারায় করা, বস্তায় তোলা থেকে শুরু করে প্যাকেজিং পর্যন্ত মহিলাদের করতে হয়। তবে বয়লার মালিক ভালো হলে অর্থের পাশাপাশি চাল বা ধানের গুড়া দিয়ে সহায়তা করে।

গৃহকর্মী মমতাজ ঢাকা শহরে নয় বছর যাবৎ স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে আজিমপুর এক বস্তিতে বসবাস করেন। স্বামী রিকশা চালিয়ে যা আয় করেন তা দিয়ে তিন ছেলে মেয়ের লেখাপড়া ও সংসার খরচ চলে না। বাধ্য হয়ে মানুষের বাসা বাড়িতে কাজ করি।

রাজধানীর একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত শাহনাজ বেগম বলেন, একই লাইনে একই কাজ করলেও পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় বেতন কম পাই। ওভারটাইমের হিসাবও সবসময় পরিষ্কার থাকে না। যশোরের চৌগাছা উপজেলার এক ইটভাটায় কাজ করা খাদিজা বেগমের ভাষ্য, সারাদিন কষ্টের কাজ করি, কিন্তু মজুরি কম। নিরাপত্তার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই, দুর্ঘটনা হলে নিজেরাই সামলাই। 

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী-

রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন তাঁর বাণীতে বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের কল্যাণে যুগান্তকারী নানান পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার শ্রম আইন সংস্কার, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের যৌক্তিক মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থায়নে পেনশন ব্যবস্থা চালু, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, বন্ধ শিল্প চালু, ন্যায্য মূল্যে খাবার সরবরাহ, স্থায়ী শ্রমিক ও কর্মচারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতসহ শ্রমিক সমাজের ভাগ্যোন্নয়নে নানান কর্মসূচি ও নীতি গ্রহণ করেছে। আমি আশা করি, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে। শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত, মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক এবং শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাধ্যমে একটি উন্নত শ্রমিকবান্ধব সমাজ এবং মানবিক ও ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে বাংলাদেশ-এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতৈ বলেন, বিশ্বের সকল দেশের সাথে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস। ‘মহান মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস ২০২৬’ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের প্রতি জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আজকের এই দিনে আমি দেশে-বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশের সকল শ্রমজীবী-কর্মজীবী ভাই বোন যারা জীবন-জীবিকার জন্য, সর্বোপরি দেশের উন্নয়নের জন্য কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন তাদের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।

শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষই যেকোনো দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি আর অগ্রযাত্রার প্রধান অবলম্বন। শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি। সুতরাং তাদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানতম অঙ্গীকার। 

মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন শ্রমিকের দুটো হাত রাষ্ট্র এবং সমাজের সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নের চাবিকাঠি। শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেই শহীদ জিয়া নানা যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত নীতি ও সংস্কার শ্রমিক কল্যাণের ভিতকে শক্তিশালী করেছে। বিদেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে, শ্রমবাজার তৈরি করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সেই প্রবাসী শ্রমিকরা বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। বিএনপি সরকার যতবার ক্ষমতায় এসেছে, শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের কল্যাণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।

দেশে শ্রম আইন সংস্কার ও আধুনিকীকরণ, বেতন ও মজুরি কমিশন গঠন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, বাস্তবায়ন ও তাদের বোনাস প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের সন্তানদের চিকিৎসা ও তাদের লেখাপড়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের শ্রমিক সমাজের ভাগ্যোন্নয়নে যথাযথ কর্মসূচি বিএনপি সরকারই গ্রহণ করেছিল। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক রয়েছে পোশাক শিল্পে। এই শিল্পে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান অবিস্মরণীয়। পোশাক শ্রমিকদের কল্যাণে দেশ আজ ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.