মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে বিশ্ব খাদ্যব্যবস্থার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আর এর ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদনের ওপর গুরুতর চাপ তৈরি হচ্ছে।
যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই বাড়বে বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের আশঙ্কা। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই যুদ্ধ পরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। ওই অঞ্চল বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম হাব হওয়ায় এই যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে গোটা বিশ্বে। আটাশ ফেব্রুয়ারি যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর যৌথ বিমান হামলা শুরু করে, তখন অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন-এটি আরেকটি একতরফা যুদ্ধ, শিগগিরই শেষ হবে। কিন্তু যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর, এখন এটা স্পষ্ট যে ইরান আক্রমণ সম্ভবত মার্কিন প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্তগুলোর একটি। ইরান যুদ্ধ নিয়ে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি সহজে যুদ্ধজয়ের ঘোষণা দিতে পারছেন না।যুদ্ধ ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে। আর যুদ্ধ বন্ধ করলেও কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। ফলে ট্রাম্পের সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই যুদ্ধের সময় যত বাড়ছে ততই গোটা বিশ্ব এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। নানামুখী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট ক্রমে প্রকট আকার ধারণ করছে। ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চল এবং বিশ্বজুড়েই নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে, আর মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই হাজার হাজার মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরেও এর প্রভাব পড়ছে। কোথাও তেলের দাম বেড়ে গেছে, কোথাও আবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের খরচও বেড়ে গেছে।প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে চলমান যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশে না এলেও এর ছাপ যে এখানেও পড়ছে সেটি স্পষ্ট। কারণ বিশ্ববাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষা বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে একটি ‘চেইন রি-অ্যাকশন’ তৈরি করছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জ্বালানি তেল নিয়ে দেশে যে অস্থিরতা চলছে তা পেট্রোল পাম্পের অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়। যদিও সরকার বারবার বলছে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা হবে না। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেলে সরকারকে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি ভাবতেই হবে। কারণ এই চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন নিতে পারবে না।আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে পারে আমদানি করা ভোজ্যতেল, গম কিংবা চিনির দাম, যার ধারাবাহিক প্রভাব পড়তে পারে অন্যান্য প্রয়োজনীয় কিংবা শৌখিন পণ্যে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব পৌঁছে যেতে পারে এ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে। ইরানের ড্রোন আঘাত হেনেছে আরব আমিরাতের মজুদ রাখা জ্বালানি ট্যাংকারে। নিজেদের বেশ কয়েকটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি স্থাপনায় ইরানি হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর জানিয়েছে কাতার।
এছাড়াও হামলা হয়েছে সৌদি আরবের তেল শোধনাগারেও। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি এরই মধ্যে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড।তারা সতর্ক করেছে যে হরমুজ প্রণালি কেউ পার করার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে।অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান থাকলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য শিগগিরই একশ ডলারে পৌঁছাবে। এমন প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য ভয়াবহ বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা না থাকায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেই আসে, যার বড় জোগানদাতা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার ও ওমান। এই দেশগুলো থেকেই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ। এ ছাড়া স্পট মার্কেট থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি কেনা হয়।কিন্তু ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় এরই মধ্যে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ, যার বেশির ভাগই ভারতের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জ্বালানিও আসে এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও কৃষিপণ্য রপ্তানির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে যায়। বিশেষ করে পোশাক খাতের ওপর এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে এরই মধ্যে অর্ডার সংকুচিত করেছে অনেক দেশ।
এ ছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। কেবল পোশাক রপ্তানি নয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে অন্যতম কৃষি উপকরণ সারের ওপরও। কারণ বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় সারের একটি বড় অংশ আমদানি করে কাতার ও সৌদি আরব থেকে।এ ছাড়া দেশীয় কারখানায় সার উৎপাদনের জন্যও জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানিসংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ সার উৎপাদনও প্রভাবিত হতে পারে।বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অন্যতম প্রধান উৎস হলো প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ মেয়াদে প্রবাস আয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে প্রায় এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত, যার বেশির ভাগই রয়েছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমানের মতো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, দেশের বাইরে বসবাস করা বাংলাদেশি অভিবাসীর অন্তত ৬০ লাখেরই গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। এরই মধ্যে নানা সংকট তৈরি হয়েছে এই প্রবাসীদের।ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেতে ইচ্ছুক অনেক বাংলাদেশি নিজ দেশেই থেকে যেতে বাধ্য হয়েছেন।অতীতে কুয়েত যুদ্ধের সময় হাজার হাজার বাংলাদেশিকে শূন্যহাতে দেশে ফিরতে হয়েছিল। এমন পরিস্থিতি পুনরায় তৈরি হলে তা দেশের বেকারত্ব সমস্যার ওপর পাহাড়সম চাপ তৈরি করবে। সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য এক কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গত দেড় বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুরোপুরি রেমিট্যান্সনির্ভর হয়ে পড়েছে।
এই যুদ্ধ রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তির কারণে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করতে পারবে না। সব মিলিয়ে একটা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সরকারকে লড়াই করতে হবে। আর এ লক্ষ্যে এখন থেকেই সরকারকে প্রস্তুতি নিতে হবে। বাস্তবে যুদ্ধ শেষ না হলেও প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হওয়া কঠিন হবে। কারণ বীমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।
একই সঙ্গে ইরান যদি অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাতে থাকে, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি উৎপাদনও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনা করেছেন যে মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজ গুলোকে প্রণালী দিয়ে নিরাপদে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এখনো সে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।যুদ্ধ কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক নয়, এটি মানুষের চিন্তা ও মনস্তত্ত্বকেও প্রভাবিত করে। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের ক্ষেত্রে আমরা দেখছি বিশ্ব জুড়ে রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজন তৈরি হয়েছে। কেউ ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে সমর্থন করছে, আবার কেউ ফিলিস্তিন ও ইরানের অবস্থানকে সমর্থন করছে। এই মেরুকরণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে আরো জটিল করে তুলছে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে কঠিন করে দিচ্ছে। এই সংঘাতের সমাধান যুদ্ধের মাধ্যমে সম্ভব নয়। বরং কূটনৈতিক আলোচনাই একমাত্র কার্যকর পথ।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









