গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ সবচেয়ে পবিত্র স্থান। এখানে জনগণের আশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে। আইনসভার ভেতরে সুস্থ বিতর্ক একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। তবে মাঝে মাঝে পরিবেশ বেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গতকাল সংসদে তেমনই একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ ও বিরোধীদলীয় নেতার মধ্যে বাকযুদ্ধ শুরু হয়। এই ঘটনার রেশ সমাজেও ছড়িয়ে পড়েছে।
অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ একটি মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বিরোধী দলের প্রশ্নকে ভিন্নভাবে তুলনা করেন। এতে বিরোধীদলীয় সদস্যরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। সংসদ কক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র হট্টগোল শুরু হয়। স্পিকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কোনো পক্ষই সহজে শান্ত হতে চায়নি।
বাকযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিবেশ বিগড়ে যায়। বিরোধী দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা শুরু করে। তারা মন্ত্রীর অতীত বক্তব্যগুলো সামনে নিয়ে আসে। সংসদে নাকি মন্ত্রী শিক্ষকের মতো আচরণ করেছিলেন। এই দাবিতে বিরোধী দল তুমুল বিতর্ক তৈরি করে। সংসদীয় সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে। সব মিলিয়ে পরিবেশ বেশ অশান্ত রূপ নেয়।
ক্ষুব্ধ বিরোধীদল কোনোভাবেই নমনীয় হতে রাজি ছিল না। তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ বা ক্ষমা দাবি করে। সংসদ কক্ষে তখন কেবল চিৎকারের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কোনো গঠনমূলক আলোচনা সেখানে করা সম্ভব হচ্ছিল না। প্রতিটি মন্তব্যের পিঠে কড়া জবাব আসছিল। একে অন্যের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন। এই অবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।
তীব্র হট্টগোলের কারণে সংসদের কার্যপ্রণালী ব্যাহত হয়। বিরোধী দল স্পিকারের আসনের সামনে এসে দাঁড়ান। চিৎকারে অধিবেশনের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়। সরকারি দলের সদস্যরাও চুপ করে বসে ছিলেন না। তারাও পাল্টা যুক্তি দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। পুরো সংসদ যেন একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল তখন। এটি কতটুকু সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার লক্ষণ তা ভাবনার সময় এসেছে।
বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে কড়া বক্তব্য পেশ করেন। তিনি বলেন, আমরা এখানে ছাত্রত্ব বর্জন করেছি। সংসদে আমরা কারো লেকচার শুনতে আসিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছাত্র হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তারা নিজেদের প্রাপ্তবয়স্ক ও নির্বাচিত প্রতিনিধি মনে করেন। তাই কারো অধীনে পড়াশোনা করার ইচ্ছে তাদের নেই। এই মন্তব্য হট্টগোল আরো বাড়িয়ে দেয়।
শিক্ষকতা বন্ধ করার দাবি তোলেন ক্ষুব্ধ বিরোধীদল। তারা সংসদ কক্ষে দাঁড়িয়ে কড়া প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিজের ব্যবহারের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে বলেন। শিক্ষকের ভূমিকা বাদ দিয়ে মন্ত্রী হিসেবে কথা বলুন। এই দাবিতে সংসদ ভবন তখন কাঁপছিল চরম উত্তেজনায়। তাদের মতে সংসদ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা পাঠশালা নয়। এখানে সবাই সমান মর্যাদার অধিকারী সংসদ সদস্য।
একপর্যায়ে তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। বিরোধী দলের সব সদস্য একযোগে আসন ত্যাগ করেন। তারা অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। এই ওয়াকআউট সংসদের ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। তবে এবারের ওয়াকআউটের কারণ ছিল বেশ অদ্ভুত। ছাত্র ও শিক্ষকের মর্যাদার লড়াইয়ে সংসদ অচল হয়। বাইরে গিয়েও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দাঁড়ান। তিনি নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করেন। তিনি তিনবার প্রত্যাহার শব্দখানি উচ্চারণ করেন সংসদে। তিনি বলেন, কাউকে আঘাত করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু ততক্ষণে বিরোধী দল কক্ষ ত্যাগ করে ফেলেছে। মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহারও তাদের ফেরাতে পারেনি তখন।
সংসদের ভেতর তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল দীর্ঘক্ষণ। বাতাসে কেবল ক্ষোভ আর প্রতিবাদের বারুদ ভাসছিল। সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যকার দূরত্ব স্পষ্ট হচ্ছিল। কেউ কাউকে এক চুল ছাড় দিতে রাজি ছিল না। এই উত্তেজনা সংসদের বাইরে সাধারণ মানুষের মাঝেও ছড়ায়। সবাই টিভির পর্দায় এই নাটকীয় দৃশ্য দেখছিলেন। এমন উত্তেজনা দেশের রাজনীতির জন্য মোটেও সুখকর নয়।
শব্দচয়ন বিতর্ক নিয়ে আলোচনা এখন সব মহলে। সংসদে কোন শব্দ ব্যবহার করা উচিত তা ভাববার বিষয়। রাজনীতিতে ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেতিবাচক বা ব্যঙ্গাত্মক শব্দ পরিবেশ নষ্ট করে দিতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শব্দচয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীদল।
সরকারি দল থেকেও এই প্রতিবাদের কড়া জবাব আসে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন ওয়াকআউট করা একটি পরিকল্পিত বাহানা। আইন প্রণয়নে অংশ না নেওয়ার এটি অজুহাত। তিনি বিরোধী দলের তীব্র সমালোচনা অব্যাহত রাখেন তখনও। সরকারি দলের অন্য সদস্যরাও মন্ত্রীর পাশে এসে দাঁড়ান। তারা বলেন, বিরোধী দল সংসদীয় ধারা মানছে না। কড়া জবাবে সংসদ আবার তপ্ত হয়।
বিরোধী দলের সদস্যরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে চলেছেন। তারা সংসদ ভবনের লবিতে দাঁড়িয়ে কথা বলেন। তাদের মতে এই আচরণ সংসদীয় ফ্যাসিবাদের শামিল। জনস্বার্থে তারা এই ধরনের আচরণের অবসান চান। তাদের ক্ষোভের আগুন যেন মিডিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়ার প্রমাণ এটি। এই ক্ষোভ যেন সহজে প্রশমিত হওয়ার নয়।
আসন ত্যাগ করার ঘটনাটি ছিল বেশ নাটকীয়। ফাইলপত্র গুছিয়ে তারা দলবেঁধে বের হয়ে যান। সংসদ কক্ষের একটি বড় অংশ তখন ফাঁকা দেখায়। সরকারি দলের সদস্যরা তখন ফাঁকা বেঞ্চের দিকে তাকাচ্ছিলেন। আসন ত্যাগের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর এই সংস্কৃতি পুরনো। তবে এবারের প্রতিবাদের ধরনটি ছিল বেশ হাস্যকর ও আলাদা। ছাত্র হতে না চাওয়ার এই এক অদ্ভুত জেদ।
পুরো ঘটনা দেখে স্পিকার অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি বারবার সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি শঙ্কিত। এভাবে চললে সংসদ কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলবে দ্রুত। স্পিকারের এই চিন্তা অত্যন্ত অমূলক বা মিথ্যা নয়। আইনসভার অভিভাবক হিসেবে তার উদ্বেগ অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী।
গণতান্ত্রিক চর্চা কেবল ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংসদের ভেতরে পরমতসহিষ্ণুতা দেখানোও এর বড় অংশ। অন্যকে কথা বলতে দেওয়া গণতন্ত্রের মূল শর্ত। এবারের ঘটনায় গণতান্ত্রিক চর্চার চরম অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। একে অপরের কথা স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই ধরনের আচরণ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দৈন্যতা প্রকাশ করে। চর্চা ছাড়া গণতন্ত্র কখনো পূর্ণতা পায় না।
সংসদ আসলে সবার ধৈর্য পরীক্ষা নেওয়ার জায়গা। এখানে চরম উত্তেজনার মুখেও শান্ত থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্যরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন দ্রুত। সামান্য কথাতেই তারা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেন। ধৈর্যের পরীক্ষায় এবার উভয় পক্ষই বেশ অকৃতকার্য হয়েছে। জনস্বার্থে তাদের আরো ধৈর্যশীল হওয়া অত্যন্ত জরুরি ও আবশ্যক।
কথার লড়াইয়ে মেতে উঠেছিলেন দেশের শীর্ষ নেতারা। যুক্তি আর তর্কের বদলে ছিল কেবল খোঁটা দেওয়া। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে হেয় করার চেষ্টা করছিল। এই কথার লড়াই দেখতে ভালো লাগলেও তা অর্থহীন। এতে দেশের বা জনগণের কোনো লাভ হয় না। কেবল সময়ের অপচয় আর সংসদের মর্যাদাহানি ঘটে। কথার লড়াইয়ে শালীনতা বজায় রাখা অত্যন্ত দরকার।
এই পুরো ঘটনার মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক হাস্যরস ছিল। ছাত্র আর শিক্ষকের এই লড়াই বেশ কৌতুকপ্রদ। দেশের আইনপ্রণেতারা যখন পড়াশোনার গণ্ডি নিয়ে মাতেন। তখন সাধারণ মানুষের হাসা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এই হাস্যরস অবশ্য এক ধরনের করুণ রসও বটে। রাজনীতির এই রূপ আমাদের বিনোদন দিলেও ভাবিয়ে তোলে। হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর এক সংকট।
সংসদে সংযম প্রয়োজন- এই কথা সবাই স্বীকার করেন। কিন্তু কাজের বেলায় কেউ সংযম দেখাতে পারেন না। ভাষার ব্যবহারে সংযম না থাকলে বিতর্ক তৈরি হবেই। উভয়পক্ষের উচিত ছিল আরো ভেবে কথা বলা। উভয় পক্ষের সংযমের অভাব সংসদকে অচল করে তুলেছে। সংযমই পারে সংসদকে সুন্দর রাখতে।
বিতর্কিত মন্তব্য করাই যেন এখনকার ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলোচনায় থাকার জন্য অনেকেই এমনটা করে থাকেন। সংসদে দীর্ঘদিন হতে অনেক সদস্য মন্তব্য বেশ বিতর্কিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। অনেকে হয়তো ব্যঙ্গ করে কথাটি বলতে চান। কিন্তু এর ফল হয়েছে উল্টো এবং বেশ ক্ষতিকর। বিতর্কিত মন্তব্য থেকে সবারই দূরে থাকা উচিত জনস্বার্থে।
সংসদ অচল হয়ে পড়া কোনো ভালো লক্ষণ নয়। প্রায় দশ মিনিট সংসদ পুরোপুরি অচল ছিল। কোনো কাজ বা আইন পাস করা যাচ্ছিল না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা সংসদ এভাবে অচল হতে পারে না। এই অচল অবস্থা দূর করার দায়িত্ব সবারই সমান। রাজনীতিতে অচলাবস্থা তৈরি হলে দেশ পিছিয়ে পড়ে। সংসদ সচল রাখাই সবার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
শিক্ষক যদি শিক্ষকের মতো জ্ঞান দান করেন সদা,
তবে তার ছাত্র হতে সমস্যা কোথায় আছে মেধা?
বিনয়ী ছাত্র হলে বাড়ে শুধু নিজেরই সম্মান,
জ্ঞানের আলোয় ধুয়ে যায় অহংকারের সব অবদান।
সংসদে হোক বা বাইরে হোক শিক্ষার নেই শেষ,
ছাত্র হয়ে শেখার মাঝে লুকিয়ে সুন্দর এক দেশ।
ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে এখন আমাদের কাজ করতে হবে। সংসদের পরিবেশ কীভাবে উন্নত করা যায় তা ভাববার সময় এসেছে। আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কেমন সংসদ রেখে যাচ্ছি তা চিন্তার বিষয়। কেবল ঝগড়া আর ওয়াকআউট দেখলে তরুণরা রাজনীতিবিমুখ হবে। ভবিষ্যৎ ভাবনা মাথায় রেখে নেতাদের আচরণ সংশোধন করা উচিত। একটি সুস্থ সুন্দর সংসদের স্বপ্ন আমাদের দেখতেই হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, গঠনমূলক সমালোচনা সংসদের প্রাণ হিসেবে কাজ করে সবসময়। বিরোধী দল সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে এটাই নিয়ম। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে মার্জিত ও প্রাঞ্জল। কাদা ছোঁড়াছুড়ি কখনো গঠনমূলক সমালোচনা হতে পারে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধী দলের এই বাকযুদ্ধ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। ভবিষ্যতে তারা গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নেবেন এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









