বাংলাদেশের ইসলাম ধর্ম পালনকারীদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ মনে করে, গাজায় সংগঠিত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটা হলো, ইহুদী ও মুসলমানদের মাঝে সংগঠিত একটা যুদ্ধ। আসলে বিষয়টা এভাবে সরলীকরণ করাটা ঠিক না। গাজার এখন ভূ-রাজনৈতিক একটি মধুকূপ। কারণ, এই মধুকূপকে কেন্দ্র করে চলছে বিশ্ব রাজনীতিতে নানা সমীকরণ। গাজায় যুদ্ধটা বহু আগেকার। তবে বর্তমানে হত্যাযজ্ঞের শুরুটা করেছিল হামাস, গত বছরের ৭ অক্টোবর, যে হামলাটা ছিল বেশিরভাগ ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের উপর। তারপর ইসরায়েল পাল্টা আক্রমণ শুরু করে, যাকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভিহিত করেছেন ‘ভয়ংকর প্রতিশোধ’ হিসেবে। ইসরাইলী হামলায়ও বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক হত্যার শিকার হচ্ছেন। এই যুদ্ধটা অন্য যুদ্ধ-সংঘাত থেকে ভিন্ন।
কারণ, এটা এমন সময় হচ্ছে যখন মধ্যপ্রাচ্যকে ভাগ করা ফল্ট লাইনে চিড় ধরেছে। গত দুই দশক ধরে এখানকার ভূ-রাজনীতির যে উত্তেজনাকর চিত্র, তার একদিকে ইরান এবং তার বন্ধু ও মিত্ররা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু ও মিত্ররা। বর্তমানে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো গাজা। ভৌগোলিক অবস্থান, ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাত গাজাকে একটি চিরস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক দাবার ছকে পরিণত করেছে। গাজা কেবল ৩৬৫ বর্গ কিলোমিটারের একটি সংকীর্ণ ভূখণ্ড নয়, বরং এটি বর্তমান বিশ্বের এক মেরু বনাম বহু-মেরু কেন্দ্রিক ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রধান ক্ষেত্র। গাজার সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বৈশ্বিক রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আসা কঠিন। গাজার ভৌগোলিক অবস্থান তিন মহাদেশের সংযোগ স্থলে।
গাজা উপত্যকা ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থিত, যা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থল হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গাজার উত্তর ও পূর্বে ইসরায়েল এবং দক্ষিণে মিশরের সিনাই মরুভূমি অবস্থিত। এর ফলে গাজার ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এই দুই প্রতিবেশী দেশের সিদ্ধান্তের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। অক্টোবর ২০২৫-এ একটি নামমাত্র যুদ্ধবিরতি হয়, যা কার্যকর হয়নি। পরবর্তী কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ১৫-দফা শান্তি রোডম্যাপ প্রস্তাব করা হলেও মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি হচ্ছে না স্থিতিশীল।
এই যুদ্ধ বিরতিতে মার্কিন মধ্যস্থতায় হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার শাসনভার একটি টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে হস্তান্তরের পরিকল্পনা ছিল। তবে হামাস শর্ত দিয়েছে, ইসরায়েলি সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং গাজা পুনর্গঠন নিশ্চিত না হলে তারা অস্ত্র ছাড়বে না। অন্যদিকে, ইসরায়েলের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকার সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েল গাজার অভ্যন্তরে বিভাজনকারী দেয়াল, বালির প্রাচীর এবং গেট নির্মাণ করে ভূখণ্ডটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছে। গাজাকে কেন্দ্র করে ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং সিরিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ‘অক্ষ’ ফ্রন্ট, যা বিশ্বে ইসরায়েল ও মার্কিন বিরোধী ফ্রন্ট নামে পরিচিত। গাজা এখন দুনিয়ার ভূ-রাজনৈতিক শক্তির প্রধান প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো পারস্য উপসাগরীয় ধনী দেশগুলো ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিকীকরণ বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
একে আর্ন্তজাতিকভাবে বলা হয় আব্রাহামীয় সংযোগ (পৃথিবীর ধর্মগুলো দু’ভাগে বিভক্ত- একটি আব্রাহামীয়, অন্যটি নন আব্রাহামীয়, আব্রহামীয় ধর্মগুলো হলো ইহুদী , খৃস্টান ও মুসলমান আর পৃথিবীর বাকী ধর্মগুলো নন আব্রাহামীয়) । তবে গাজা সংকটের কারণে এই অঞ্চলে এক ধরনের জন-অসন্তোষ ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এখন সৌদি আরব। তাই সৌদি আরব নতুন করে ‘মক্কা প্যাক্ট’ নামে আরেকটি আর্ন্তজাতিক ফোরাম তৈরি করার পথে এগুচ্ছে। অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাজার ফিলিস্তিনিদের সিনাই বা জর্ডানে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে।
এটি আবার তৈরি করেছে একটি নতুন বির্তক। এই প্রস্তাব মিশর ও জর্ডানের অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যা ও নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তার আধিপত্য ধরে রাখতে চায়। তাই গাজার যুদ্ধ তাদের একটি কৌশলগত দাবার চাল। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া গাজা ইস্যুতে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একচেটিয়া প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের রুলিং সত্ত্বেও পশ্চিমা দেশগুলোর নির্লিপ্ততা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে আইনের শাসন ও মানবাধিকারের দ্বিমুখী নীতিকে স্পষ্ট করেছে। তবে এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে আরো কিছু কারণ। তার মধ্যে একটি এখানকার সামুদ্রিক গ্যাস সম্পদ।
ভূমধ্যসাগরে গাজা উপকূলের কাছে ‘গাজা মেরিন’ নামক বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে। এই গ্যাস ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে- ফিলিস্তিন, ইসরায়েল নাকি কোনো আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম- তা গাজার ভূ-রাজনীতির অন্যতম একটি অদৃশ্য অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। গাজার প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতিও রয়েছে বিশ্বের অনেকের লোভ। এই কারণেও এখানকার হানাহানি ও সংঘাাত। এখানকার গ্যাস ক্ষেত্রটি (গাজা মেরিন) ২০০০ সালে গাজা উপত্যকার উপকূল থেকে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরে পাওয়া যায়। এটি দুটি ভাগে বিভক্ত:গাজা মেরিন-১ ও গাজা মেরিন-২।
এখানে আনুমানিক ১ থেকে ১.৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জটিলতা ও ইসরায়েলি অবরোধের কারণে এই ক্ষেত্রগুলো থেকে এখনও বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। এখানে তেল মজুতের সম্ভাবনাও রয়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থার ২০১৯ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামগ্রিক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে (যার মধ্যে পশ্চিম তীর ও গাজা উপকূলবর্তী লেভান্ট বেসিন অন্তর্ভুক্ত) বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল ও গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। পুরো লেভান্ট বেসিন অঞ্চলে প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ব্যারেল উত্তোলনযোগ্য তেলের মজুত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। গাজার সমুদ্র উপকূলে এবং এর তলদেশে প্রধান যে সম্পদটি রয়েছে তা হলো প্রাকৃতিক গ্যাস।
এখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ১.১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (যাকে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ঘনমিটার বলা হয়)। গাজার উপকূল থেকে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের তলদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের এই বিশাল মজুদ রয়েছে। এই গ্যাস ক্ষেত্রটি 'গাজা মেরিন' নামে পরিচিত। এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত সম্পদ গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরের জ্বালানি চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব, যা ফিলিস্তিনের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে রাজনৈতিক জটিলতা ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কারণে এর পুরো সুফল ফিলিস্তিনিরা এখনোও পুরোপুরি ভোগ করতে পারছে না।
ভূমধ্যসাগরের এই উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণী পাওয়া যায়, যা স্থানীয় জেলেদের জীবিকা ও খাদ্যের জোগান দেয়। তাছাড়া গাজা উপকূল ভূমধ্যসাগরের সাথে যুক্ত থাকায় এখানে সামুদ্রিক বাণিজ্য ও বন্দরের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। গাজার যুদ্ধটা সম্পূর্ণ বিশ্ব রাজনীতি দখলের জন্য একটি ক্ষেত্র। একে কেন্দ্র করে ধনী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে। তাই বিভিন্ন দেশে কিছু কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী আখ্যা দিচ্ছে গাজার যুদ্ধকে ইহুদী-মুসলিম যুদ্ধ হিসাবে।
লেখক: কলামিষ্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









