আধুনিক মানব সভ্যতার এক বড় অভিশাপ প্লাস্টিক দূষণ। বর্তমানে প্লাস্টিক সস্তা, টেকসই ও সহজে বহনযোগ্য। তাই দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু চারপাশে প্রতিনিয়ত এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব আজ আমাদের পরিবেশ, স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সর্বোপরি গোটা পৃথিবীরই তার ভুক্তভোগী।
প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ রূপ: প্লাস্টিক একটি অপচনশীল পদার্থ। সামান্য প্লাস্টিকের কণা বা পলিথিন ব্যাগ মাটিতে মিশে যেতে শত শত বছর সময় নেয়। ফলে, যত্রতত্র ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপান্তরিত হয়ে মাটির অনুজীব ও উর্বরতা ধ্বংস করে কৃষিজমির ব্যপক ক্ষতি করছে। এমনকি ব্যাহত করছে ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক প্রবাহও। এই দূষণের প্রকৃষ্ট প্রমাণ - বর্ষাকালে শহরের ড্রেন, নালা ও নর্দমাগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে। সৃষ্টি হয় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা। শুধু আমাদের সামাজিক পরিবেশেই এর প্রভাব সীমাবদ্ধ নয়। প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব আজ সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য প্রাণী এই প্লাস্টিক খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে, যা তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে ভীতিজনক বিষয় হলো, সাধারণত প্লাস্টিক পচে প্রকৃতিতে মিশতে সময় লাগে প্রায় ৪০০ বছরেরও বেশি। এই প্লাস্টিক বছরের পর বছর অতিক্রম করে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং অবশেষে অতি ক্ষুদ্রকণা তথা মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হচ্ছে, যা মাছ ও ফসলের মাধ্যমে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে এবং সেখান থেকে সরাসরি দেহের অভ্যন্তরে গিয়ে স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে। মানুষের শরীরে প্রবেশ করা এই কণাগুলো রক্তপ্রবাহে মিশে যায়। কোষের ক্ষতি, প্রদাহ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। শুধু তা-ই নয়, মরণব্যাধি ক্যান্সার থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে এর প্রভাবে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে, অকালে বৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। বাড়ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা।
কিন্তু এর পেছনে দায় আসলে কার?
একটি বৈশ্বিক পৃথিবীর অংশ হিসেবে আমরা এর সম্পূর্ণ দায় এড়িতে যেতে পারি না। বর্তমানে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বাংলাদেশের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, প্রতিনিয়ত বাড়ছে পৃথিবীর জনসংখ্যা। সেখান থেকে প্লাস্টিকের ব্যবহারও একই হারে বাড়ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার সিংহভাগই সঠিক নিয়মে রিসাইকেল বা ধ্বংস করা হয় না। এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ না করা। গৃহস্থালির পচনশীল বর্জ্য এবং অপচনশীল বর্জ্য অর্থাৎ প্লাস্টিক একসঙ্গে মিশে যাওয়ার কারণে পরবর্তীকালে সেগুলো আলাদা করে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করা কিংবা পরিবেশে রয়ে যাওয়া রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া উন্নত বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব এবং সাধারণ মানুষের অসচেতনতা এই সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলেছে।
উত্তরণের উপায় ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্লাস্টিক দূষণ এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে হলে একটি সুসসংগঠিত ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া গড়ে তোলা প্রয়োজন । এর জন্য প্রাথমিকভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন- ১. প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো ২. একই প্লাস্টিক বারবার ব্যবহার করা এবং ৩. ব্যবহৃত প্লাস্টিককে প্রক্রিয়াজাত করে নতুন পণ্যে রূপান্তর করা।
উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ: প্রতিটি বাসা-বাড়ি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পচনশীল (কাঁচাবর্জ্য) ও অপচনশীল (প্লাস্টিক, কাচ) বর্জ্য ফেলার জন্য আলাদা ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিকল্প পণ্যের ব্যবহার এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সর্বোত্তম হলো পলিথিন নিষিদ্ধকরণ।
পলিথিনের পরিবর্তে পাটের ব্যাগ, কাগজের প্যাকেট ও কাপড়ের থলের ব্যবহার বাড়াতে হবে। সুপারশপ ও কাঁচাবাজারে কড়াকড়িভাবে সেই আইন মান্য করতে হবে। পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণ ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এর আগেও প্লাস্টিক দূষণ রোধে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন ও আইন প্রয়োগ করা হলেও তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল লক্ষ্য করা যায়নি। তাই এক্ষেত্রে আইনের কঠোরতম প্রয়োগ করা একান্ত প্রয়োজন। যদিও বর্তমানে কিছু ভিন্ন চিন্তাধারার উদ্ভাবনী উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ- ইদানীং বাংলাদেশে ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’ বা প্লাস্টিক জমা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী নেওয়ার মতো প্রশংসনীয় উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার জনপ্রিয়তা বা সুপ্রভাবগুলো এখনো তেমন দৃশ্যমান নয়। তাই জরুরিভিত্তিতে সেগুলোকে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে।
প্লাস্টিক দূষণ কেবল কোনো নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। কেবল সরকারের পক্ষে এই দূষণের বিরুদ্ধে গিয়ে লড়াই করে পরিবেশে রক্ষা করা বা সার্বিকভাবে দূষণ রোধ করা সম্ভব নয়। যেহেতু প্লাস্টিকের মতো ক্ষতিকর পদার্থ আমাদের বিশ্ব এবং সুস্থ জীবনযাপনের পথে বড় বাধা, তাই পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে প্রথমেই আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য হলো- জাতীয় কর্মপরিকল্পনা মোতাবেক ২০২৬ সালের মধ্যে একক ব্যবহারের প্লাস্টিক ৯০% কমিয়ে আনা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন ৩০% হ্রাস করা। কিন্তু ২০২৬ সালের শেষে এসেও এর কোনো দৃশ্যমান ফলাফল এখনো লক্ষ্য করা যায়নি। তাই আমরা সকলেই প্রযোজ্য সকল আইন মান্য করা এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক না ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমেই একটি প্লাস্টিকমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি।
লেখক : শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









