বর্জ্য নিয়ে আমরা কোনোকালেই সচেতন জাতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। যেখানে সেখানে অব্যবহৃত জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলতে আমরা সিদ্ধহস্ত। প্রতিদিন বর্জ্য ফেলে আমরা যে ধরিত্রীকে ভারী করছি সেই জ্ঞানটুকু কারও নেই। পরিবেশ নোংরা হচ্ছে। চারদিকে বর্জ্যরে পাহাড় তৈরি হচ্ছে। এরপর সেই বস্তুটি বর্জ্যে পরিণত হয়ে পরিবেশের জন্য তা হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে এই ধারণা আমাদের কম জনের মধ্যেই রয়েছে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আসলে বর্জ্য নিয়ে যে ভাবনাগুলো থাকা দরকার প্রতিটি নাগরিকের সেটি হলো বর্জ্য আমরা কোথায় ফেলব এবং সেই ফেলে দেওয়া বর্জ্য দিয়ে কি করব? আমরা কি সেগুলো রিসাইকেল করতে পারি বা কাজে লাগাতে পারি কোনোভাবে? বর্জ্যকে অধিকাংশ আমরা সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করার চিন্তা করতে পারি না। একটি আধুনিক এবং সুসজ্জিত সমাজ গড়তে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু পরিকল্পনা করা দরকার। প্রতিটি এলাকাভেদে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম থাকা দরকার। মানব বর্জ্য এবং প্রতিদিনের ব্যবহৃত বর্জ্যগুলো একসাথে সংগ্রহ করে তা একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখার ব্যবস্থা থাকা দরকার। তবে এর সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা থাকা আবশ্যক।
এবার একটু বাইরের দেশ থেকে ঘুরে আসি। আমরা যেখানে যত্রতত্র বর্জ্য পদার্থ নিয়ে নাকানি-চুবানি খাচ্ছি তখন চীন প্রয়োজনে আবর্জনা পাচ্ছেই না! চীন সমস্যাগুলো সমাধান করেই সামনে এগুচ্ছে। এই যেমন জনসংখ্যা অধিকাংশ দেশেই সমস্যা, আবার চীনের কাছে তা সম্পদ।
জনসংখ্যা সমস্যা না সম্পদ এই বিতর্ক চীন নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। একইভাবে, বর্জ্য পদার্থ নিয়ে যখন সবাই হিমশিম খাচ্ছে তখন চীন হাঁটছে অন্য এক পথে। বর্জ্য পদার্থের প্রযুক্তিগত ব্যবহার কাজে লাগিয়ে বর্জ্য পদার্থের টেকসই সমাধান বের করে ফেলেছে। এটা লেখার জন্য লেখা নয়, এটাই বাস্তব। এতটাই বাস্তব যে এক্ষেত্রে চীন রীতিমতো উদাহরণ হতে পারে। ‘আবর্জনা ফুরিয়ে যাচ্ছে চীনে!’ দেশটি এত দক্ষভাবে আবর্জনা রিসাইকেল করেছে যে, এখন তাদের কাছে পর্যাপ্ত আবর্জনাই নেই। এই অসাধারণ কাজটি চীন খুব দক্ষতার সাথেই করে যাচ্ছে। এই বিষয়টিকেই বলা হচ্ছে ‘হাংরি ইনসিনারেটর’। ‘হাংরি ইনসিনারেটর’ বিষয়টি চীনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব আলোচিত হচ্ছে। ‘হাংরি ইনসিনারেটর’ বলতে বোঝায় চীনে যেসব প্ল্যান্ট বা কারখানা আবর্জনা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি তৈরি করছে তারা এখন পর্যাপ্ত আবর্জনা পাচ্ছে না। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ধারণাটি নতুন নয় এবং বিভিন্ন দেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। বিশ্বের বহু দেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর বেশিরভাগই বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এক্ষেত্রে চীন এক নম্বর অবস্থানে রয়েছে। চীন বর্জ্য থেকে প্রতিবছর ১ লাখ ১৮ হাজার ৬৪৫ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর ৭১ হাজার ৭১৪, জার্মানি ৫৭ হাজার ২০০, যুক্তরাজ্য ৪১ হাজার ৭৯৪ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এছাড়া ব্রাজিল, জাপান, ইটালি, থাইল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, সুইডেনসহ আরো অনেক দেশ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। পার্শ্ববর্তী ভারত উৎপাদন করে ৪৫ হাজার ৭৯৫ গিগাওয়াট। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশও বহু আগে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উপাদন করছে। আমরাই শুধু পিছিয়ে আছি। আমাদের বর্জ্যের অভাব নেই। এসব বর্জ্য স্তুপ আকারে ফেলে রাখা হচ্ছে।
শহরের বর্জ্য বা ময়লা থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি (ওয়েস্ট-টু-এনার্জি) একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। প্রতিদিন দেশের বড় শহরগুলোতে হাজার হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। যার সিংহভাগই যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হয় বা পোড়ানো হয়, যা পরিবেশ দূষণেরও কারণ। এই বর্জ্যকে যদি বায়োগ্যাস বা তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়, তাহলে একদিকে জ্বালানি সংকট কিছুটা লাঘব হবে, অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যারও সমাধান হবে। রাজধানীর আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের আগস্টে এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইলের প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় সাধারণত ১২-১৪ টাকা এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুতের গড় ব্যয় ২২-২৪ টাকার মতো।
জার্মানি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। জার্মানি প্রতি বছর বর্জ্য থেকে প্রায় ৫৭,২০০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ৩ কোটি টনেরও বেশি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। জার্মানি মূলত দুটি প্রধান পদ্ধতিতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে অ-পুনর্ব্যবহারযোগ্য কঠিন বর্জ্য উচ্চ তাপে পুড়িয়ে বাষ্প তৈরি করা হয়। সেই বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়। পচনশীল ও কৃষিজাত বর্জ্য অক্সিজেন ছাড়া পচিয়ে মিথেন গ্যাস তৈরি করা হয়। এই মিথেন গ্যাস ব্যবহার করে পরবর্তীকালে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়। শুধু জার্মানি নয়, বর্জ্য সমস্যার সমাধান খুঁজে এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করেছে উন্নত দেশের অধিকাংশই। এজন্যই এসব দেশের রাস্তাঘাটে বর্জ্যের স্তূপ দেখা যায় না। আগামী শতাব্দির জন্য কোনো কোনো দেশের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ হবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সেভাবেই কাজে লাগাতে পারলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড়ো সম্ভাবনা। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এটাই সবচেয়ে সস্তা ও কার্যকরী সমাধান হতে পারে। তবে কাজে লাগাতে হবে।
আবার আসা যাক চীনের কথায়। চীনে বর্জ্য সংকট চরমে! মানে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোর বিপরীত চিত্র। চীনের এসব ইনসিনারেটর এতটাই আবর্জনার অভাবে রয়েছে যে, স্থানীয় আবর্জনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, এমনকি বিদেশ থেকেও বর্জ্য আমদানি করছে তারা। এখানেও একটি সম্ভাবনা রয়েছে আমাদের। বর্জ্য চীনের কাছে রপ্তানি করেও বর্জ্য সমস্যার সমাধান করতে পারি। সাথে রপ্তানি আয়ও বৃদ্ধি পেল। ‘ইনসাইট অ্যান্ড ইনফো’র প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চীনে এক হাজার ১০টি বর্জ্য পোড়ানোর প্রতিষ্ঠান হয়েছে, যা সারা বিশ্বের মোট সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। হাইনান চীনের প্রথম প্রদেশ, যেখানে পুরো প্রদেশজুড়ে আবর্জনা পুড়িয়ে জ্বালানি উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করেছে দেশটি। চীনের সানিয়া শহরে মাঠ পর্যায়ের এক সফরের সময় চায়না নিউজ নেটওয়ার্কের সাংবাদিকরা দেখেছেন, শহরটির পৌরসভা বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনকারী কারখানায় বদ্ধ এক বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য সাইলো রয়েছে, যেখানে ২০ হাজার মেট্রিক টন আবর্জনা রাখা যায়। ওই কারখানায় প্রতি মেট্রিক টন আবর্জনা থেকে ঘণ্টায় প্রায় তিনশ ৪০ থেকে সাড়ে তিনশ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, যা একটি পরিবারের এক মাসের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করার জন্য যথেষ্ট।
চীনের পরিবেশ বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ২০২৪ সালের ‘চায়না ইকোলজিক্যাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল স্ট্যাটাস বুলেটিন’-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে চীনা শহরের ঘরবাড়ির আবর্জনা সংগ্রহের পরিমাণ পৌঁছেছে ২৬ কোটি ২৩ লাখ মেট্রিক টনে, যেখানে পরিবেশের ক্ষতি না করে চীনের নিরাপদে বর্জ্যকে শোধনের সক্ষমতা রয়েছে প্রতিদিন প্রায় ১১ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটির শহুরে ঘরবাড়ির আবর্জনা পোড়ানোর সক্ষমতা প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছাবে। তবে চীনের বর্জ্য শোধন সক্ষমতা এখন সংগৃহীত বর্জ্যের পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি।
ফলে, বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের বিভিন্ন ইনসিনারেশন কারখানা নিজেদের যতটা সক্ষমতা সে পরিমাণ কাজ করতে পারছে না। বেইজিংভিত্তিক আধা-সরকারি থিংক ট্যাংক ‘ই২০ ইনস্টিটিউট’-এর মতে, চীনের বর্জ্য পোড়ানোর বিভিন্ন কারখানার ব্যবহৃত সক্ষমতা কেবল ৬০ শতাংশ। ফলে ৪০ শতাংশ সক্ষমতা ফাঁকা পড়ে আছে। অনেক কারখানা এখন ‘আবর্জনা সংগ্রহ’ শুরু করছে, এমনকি কিছু কারখানা ২০ বছর আগে মাটিতে পুঁতে রাখা পুরনো আবর্জনাও গর্ত খুড়ে বের করছে। এই অবস্থা চীনের প্রযুক্তিগত এবং দক্ষতাগত প্রবৃদ্ধিকেই নির্দেশ করে। আমরা যদি ইনসিনারেটর পদ্ধতি ব্যবহার করি তাহলে বর্জ্য হবে আমাদের শক্তির অন্যতম উৎস। সেটি হলে একই সাথে ক্লিন বাংলাদেশ এবং নিরাপদ জ্বালানির দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









