সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের দীর্ঘদিনের বিবিধ সমস্যা ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে পেশাগত অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন শুধু সাংবাদিক নয় সুশীল সমাজের দাবী। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার হুমকির ঘটনায় গোটা জাতি উদ্ধিগ্ন। প্রায়ই সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী এবং টিভি চ্যানেলসমূহের যানবাহনের ওপর যেভাবে মব স্বৃষ্টির মাধ্যমে আক্রমন-আক্রান্ত করা হচ্ছে এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদান যা কোনভাবেই স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না ।
সর্বক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপওা নিশ্চিত ও সহিংসতা দুরীকরণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের নিকট জোড় দাবী জানানো হয় । এ দিকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং সরকারের কখনও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার কোন ইচ্ছে নাই বলে যে দাবী করা হচ্ছে তা কার্যক্ষেত্রে দৃশ্যমান নয়।
বলা বাহুল্য, সংবাদমাধ্যম ও মিডিয়ার কর্মীরা গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও দেশের বহু সাংবাদিকরা এখনও নূন্যতম বেতন, চাকুরীর নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা সেবা, সন্তানদের লেখাপড়াসহ অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। বহু সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ দেশের অন্যান্য প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ প্রাপ্তিতে জটিলতা দুর করার আহব্বান জানালেও কাজ হচ্ছে না । পাশাপাশি নির্দিষ্ট বেতন, কাঠামো, ছুটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডের মত মৌলিক সুযোগ সুবিধার অভাব দুর করার ছাড়াও সরকারের তালিকাভূক্ত সমস্ত প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের পে-স্কেলসহ সাংবাদিকদের স্থায়ী নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যমূলক করার দাবী প্রতিনিয়ত করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের পেনশন প্রর্বতনের মাধ্যমে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ফ্যামিলি পেনশনের আওতায় আনা এবং প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড পাওয়ার ব্যাপারে জটিলতা ও সমস্যা দুর করা দরকার।
এ-ছাড়াও ঈদ, পুজা, নববর্ষসহ বিভিন্ন উৎসব পালনে বোনাস বাধ্যতামূলক করা এবং গৃহহীন সাংবাদিকদের জন্য সরকারি আবাসসহ আবাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন ছাড়াও সাংবাদিকদের পরিবারকে বিনামূল্যে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার সুবিধার আওতায় আনতে “প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বীমা” কার্ড প্রদানের দাবী দেশের আপামর সাংবাদিকদের। তথ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসকের যে সকল মিডিয়া সংক্রান্ত কমিটিতে সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করণের দাবী আজ আর নূতন কিছু নয়।
সাংবাদিকদের স্বার্থে ওয়েজবোর্ড বাস্তাবায়নে সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। নূতন করে সাইবার সুরক্ষা আইন নয় বরং সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পরেছে। বলে রাখা ভাল পূর্বেকার সরকারের পতন হলেও এখনও গণমাধ্যমে স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি। বিগত সরকারের আমলে স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ ভীষণ সংকুচিত থাকলেও অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকরা ভয়ের পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিল। দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করা না হলে সরকারের ওপর থেকে মানুষের আস্থা কমে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
দেশে নূতন করে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ প্রর্বতন করার মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে প্রভাব বৃদ্ধি করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা দুঃখজনক। এ আইনের খসড়ায় এমন কিছু বিধান অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে, যা দেশের জনগণের মৌলিক মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন বা মুক্ত মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঝুঁকি ও আতংক স্বৃষ্টি হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সুশীল সমাজ বা সাংবাদিক সমাজের মতে এই আইন বাস্তবায়িত করার মাধ্যমে সরকার সাইবার জগতে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করার এক ধরনের পায়তারা করছ্ েযা মানবাধিকার লংগন । ফ্যাসিষ্ট সরকারের সময় সংবাদপত্র, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা সব সময় ডিজিটাল বা সাইবার সিকিউরিটি আইনের ভয়ে তটস্থ বা আতংকের মধ্যে ছিল ঠিকই কিন্তু দেশে বর্তমানে এক ধরনের মব ভায়োলেন্স-এর মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেলসমূহ ভয়ে তটস্ত দেখে দেশের সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিক সমাজ খুবই উদ্ধিগ্ন। দোহাই লাগে, সাংবাদিকদের সত্য কথা লেখা ও বলার পরিবেশ কখনও নষ্ট করবেন না তাতে গণতন্ত্র হুমকির মধ্যে পরবে, যা কাহারো কাম্য নয় ।
সরকার স্বচ্ছতা, নিরাপওা ও সংবাদপত্র এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গিকারবদ্ধ এবং এই মৌলিক মূল্যবোধগুলো রক্ষা ও উন্নয়নে সকল পক্ষকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। বলে রাখা ভাল, আজকাল সমাজে সোশ্যাল মিডিয়া অত্যান্ত গুরুত্ব বহন করছে। এ মিডিয়া এখন সকলের হাঁতে হাঁতে। একজন অতি সাধারণ ব্যক্তি মানুষও ফেসবুক, মোবাইল, ইন্টারনেট ইত্যাদির মাধ্যমে একটি প্লাটফর্মকে ব্যবহার করে মিডিয়া হিসাবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ গ্রহণ করছে। এ মিডিয়াতে যে কেউ চাইলেই অতি সহজে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য যাচাই-বাছাই করে নিজের মতামত সহজেই তুলে ধরতে পারেন। এখন অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দ্রুত ন্যায় বিচার পেয়ে আসছে ইহা কম কথা নয়।
রাষ্ট্রীয়ভাবে গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপওা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়ার জন্য রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের দাবী। ইতিপূর্বে মব ভায়োলেন্সের ভয়ে দেশের অনেক সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীকে চাকুরী হারাতে হয়েছে। মূলত: হত্যা মামলার ভয় ও মব সন্ত্রাস এখন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের দমন-পীড়নের এক ধরনের নয়া কৌশল বা হাতিয়ার গড়ে উঠেছে। আজকাল অনেক সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের জামিন পাওয়ার অধিকার উপেক্ষিত। অনেক গণমাধ্যমকর্মীর বিরুদ্ধে শত শত ডায়েরি-মামলা রয়েছে। দেশে কোনোভাবেই যেন প্রতিস্রোতের হিংসার উদাহরণ সৃষ্টি করতে দেওয়া ঠিক নয়। অনেক সময় দেখা যায় সংবাদপত্র গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসীদেরকে উসকে দিতে দেখা যায়। বলে রাখা ভালো সাংবাদিকদের হেনস্তা করা ভাল লক্ষণ নয়।
ইহা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের জন্য ক্ষতিকর। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে অনেক সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীদের আজকাল পদে পদে সমস্যায় পরতে হয় ইহা দুঃখজনক। এই ধরনের ঘটনায় শুধু সরকার নয় রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় পাশাপাশি সরকারের জনপ্রিয়তা উপর আঘাত আসে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের নিরাপত্তা মত প্রকাশের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত হবে বলে দেশবাসী আশা করে। তবে সংবাদপত্রর স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমে মব ভায়োলেন্সের হুমকি বন্ধ না হলে এক্ষেত্রে দূর্বৃওদের রাজত্বের আগমন ঘটতে পারে। কেউ যেন সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর ফ্যাসিষ্ট সরকারের কায়দায় জোর করে হস্তক্ষেপ করতে না পারে সেদিকে সরকারসহ সুশীল সমাজ ও রাজনীতিবিদদের সচেতন থাকতে হবে।
বিগত সরকার প্রথমে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার সিকিউরিটি আইন প্রর্বতন করার মাধ্যমে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদেরকে দমন ও বিচার করার ভূমিকা পালন করেছে। তবে সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গঠনে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
তাই আশাকরি দেশের সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপওা কোন ভাবেই যেন খর্ব করা না হয় সেদিকে সকল পক্ষকে মানবিক ও উদারতার ভূমিকা পালনের পাশাপাশি নূতন করে সাইবার সুরক্ষা আইন নূতনভাবে প্রবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে প্রভাব বৃদ্ধি করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা ভালভাবে যাচাই-বাছাই করা হউক। প্রয়োজনে সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী বা সুশীল সমাজের মতামত নেওয়া যেতে পারে।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









