দুর্গা পুজো বাংলা জনপদের বাঙালী হিন্দু ধর্মালম্ভীদের একটি প্রধান উৎসব। উৎসবটি পালিত হয় শরৎ কালে। তবে এর প্রচীন ইতিহাসটাও ব্যাপক। কারণ দুর্গা পুজো কবে থেকে এই উপমহাদেশে প্রচলন শুরু হয় তা নিয়েও রয়েছে নানা মতভেদ। উপমহাদেশের অধিবাসীরা দুর্গা উৎসব পালন করতেন আদিকাল থেকে। আর্যদের আগমেনর পর উপমহাদেশের ধর্মগত শ্রেণী বিন্যেস হয়। তাই দুর্গা পুজোর আদি ইতিহাসটাও আধিবাসীদের মাঝে খুজে পাওয়া যায়। অনেকের মতে তা অনার্যদের সাথে যুদ্ধ করা হুদুর দুর্গা। কারণ আদিবাসীদের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো যে, এরা প্রকৃতির উপাসক। বর্ণ হিন্দুরাও তাদের পুজো আর্চনা, রীতিনীতিতে এই অনার্য সংস্কৃতির অনেক কিছুই গ্রহণ করেছে। দুর্গাপুজোয় ঘটোত্তলোন, নবপত্রিকার পূজা, সন্ধিপূজা সেই প্রকৃতির উপাসনার পরিচয় বহন করে চলেছে।
এছাড়া বাংলা জনপদের সমগ্র জঙ্গলমহল জুড়ে রঙ্গিনী, সাতবহনী, চণ্ডী, কনকদুর্গা-সহ আদিবাসী দেবীদের পূজার পীঠস্থান রয়েছে। চণ্ডী এখানে নানা রূপে পূজিত হন যেমন জয়চণ্ডী, গুপ্তমণি, ভেটিয়াচণ্ডী, কালুয়াষাঁড়, বালিয়াবুড়ি। যা প্রাগার্য সংস্কৃতির অঙ্গ। কুড়মি সমাজের পরব গণনার রীতি অনুসারে আশ্বিনের অষ্টমী তিথিতে জমিনের ধানখেতে গুঁড়ি দিয়ে জাগানোর রীতি আছে। এবং এটা সন্তানসম্ভবা ধান গাছকে স্বাদ খাওয়ানো বলে মনে করা হয়ে থাকে। তাছাড়া আরও একটি প্রবাদ পাওয়া যায় যে, “জিতা ভাসে বোধন আসে।” আদিবাসী সমাজে আশ্বিনের ষষ্ঠী তিথিতে গেরুটিকা, অষ্টমী তিথিতে বিল জাগানো প্রচলিত রয়েছে। আরো রয়েছে পিঠে-পুলি খাওয়ার রীতি। সেই সাথে কাঠি নাচ, দাঁশাই নাচ ইত্যাদি।
ঝাড়গ্রামের আদিবাসীরা বছরে দু-বার দূর্গাপুজার আয়োজন করে থাকেন। একটি দুর্গাপূজার নাম ‘কনক দুর্গাপূজা’। বাংলায় প্রচলিত দুর্গাপূজা মূলত মহিষাসুর-মর্দিনীর পূজা। এ পূজার বিস্তৃত বিবরণ আছে “মার্কণ্ডেয় পুরাণ”-এ। মূল পুরাণটির রচনাকাল খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দী হলেও, দুর্গাপূজার বর্ণনাসহ “দেবীমাহাত্ম্যম” বা “দুর্গা সপ্তশতী” অথবা “শ্রীশ্রীচণ্ডী” অংশটি যোগ করা হয়েছিল আরও অনেক পরে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ ছাড়াও দুর্গাপূজার বর্ণনা পাওয়া যায় “কালিকা পুরাণ” (রচনাকাল ৯ম-১০ম শতাব্দী) এবং “বৃহদ্ধর্ম পুরাণ”-এ (রচনাকাল ১২শ শতাব্দী)। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে রাজা সুরথ মর্ত্যের অধিবাসীদের মধ্যে দেবী মাহাত্ম্য (শ্রীশ্রী চণ্ডী) প্রচার করেছিলেন এবং তিনি ছিলেন বঙ্গে দূর্গাপূজার প্রথম আয়োজক ।
যা পরে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, রাবণ বধের আগে শ্রীরামচন্দ্র দেবী পার্বতী বা দুর্গার কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে শরৎকালে, তা তিনি করেছিলেন বিল্ববৃক্ষতলে দেবীর বোধন করে। শরৎকাল দেবপূজার 'শুদ্ধ সময়' না হওয়ায় এই পূজা 'অকালবোধন' নামে পরিচিত। এই পূজা থেকেই বাংলায় শারদীয় দুর্গাপূজার সূচনা হয় বলে মনে করা হয়। তবে রাজা সুরথকে চিত্রগুপ্তবংশী রাজা (চিত্রগুপ্তের বংশধর) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘দূর্গা সপ্তশতী দেবী মাহাত্ম্য’ এবং ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণে’। তিনি তার রাজ্য এবং তার সমস্ত সম্পত্তি হারান। সবকিছু হারিয়ে তিনি তার ভাগ্য ফেরাতে তার রাজধানী বলিপুর (বর্তমানে বোলপুর) ত্যাগ করেন।
সেই সুযোগে প্রিয় অমাত্যগণ তাঁর সম্পদ এবং সেনা দখল করে নেন। মনের দুঃখে রাজা বনে চলে যান এবং ঘুরতে ঘুরতে ঋষি মেধার আশ্রমে উপস্থিত হন। ঋষি মেধা রাজা সুরথকে যথাযোগ্য সম্মানের সাথেই আশ্রয় দেন। তবু রাজা তাঁর হারানো রাজ্যের ভাল-মন্দ চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠেন। সেই আশ্রমেই তিনি “সমাধি” নামের এক বৈশ্যের (মানে ব্যবসায়ীর) সাথে পরিচিত হন এবং কথা প্রসঙ্গে জানতে পারেন, সমাধি বৈশ্যে নিজের স্ত্রী-পুত্র দ্বারা বিতাড়িত। তবু তিনি সুরথ রাজার মতোই পরিবারের ভাল-মন্দ চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন। সবকিছু ভেবে তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগল, যারা তাঁদের সাথে এত অন্যায় করেছে, কেন তাঁরা এখনো তাদের প্রতি এরকম মায়াবদ্ধ হয়ে আছেন।
দু’জনই ঋষি মেধার কাছে এর উত্তর জানতে চাইলে ঋষি তাঁদের বললেন, ‘এসবই পরমেশ্বরী শক্তি মহামায়ার প্রভাব’। রাজা সুরথ আরও জানতে চাইলে ঋষি মেধা রাজাকে দেবীমাহাত্ম্য সংক্রান্ত বাকী তিনটি কাহিনী শোনান। সবশেষে ঋষির কথায় অনুপ্রাণিত রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি নদীর তীরে তিনবছর কঠোর তপস্যায় দূর্গার পূজা করেন। তপস্যা শেষে দেবীর কৃপায় রাজা সুরথ তাঁর হারানো রাজ্য ফিরে পান এবং বৈশ্য সমাধি লাভ করেন তত্ত্বজ্ঞান।
জানা যায় যে, বেলিয়াবেড়ার বালিপাল গ্রামে আবার স্তূপীকৃত পোড়ামাটির হাতি-ঘোড়ার ‘ছলনে’ দুর্গাপুজো করেন বাগদি দেহুরি। লোকশ্রুতি, এখানে দেবীর স্বপ্নাদেশে কেঁদগাছের জঙ্গলে পুজো শুরু হয়েছিল। তাই দেবীর নাম ‘কেঁদুয়া’। একটি গর্তের মধ্যেই দেবীর অধিষ্ঠান। দূর্গাপুজোর সময় সেই গর্তে দেহুরি নিজের হাত চিরে কয়েক ফোঁটা রক্ত দেন। জামবনির যুগিবাঁধে পোড়া মাটির হাতি ঘোড়ায় প্রতীকী ভাবে পূজিতা হন ‘দূর্গামণি’। এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম দূর্গাপূজা। আর তাতে অংশ নিয়ে ছিলেন গড় জঙ্গলের আদিবাসীরা। আজও সাঁওতাল মহল্লায় ঘেরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গড় জঙ্গলের এই দূর্গাপূজার সূচনা হয় ধামসা-মাদলের আওয়াজে।
কালিকাপুরাণের ৬০তম অধ্যায়ের ৩৩ নং শ্লোক। এই শ্লোকে স্পষ্ট বলা হচ্ছে, দশমীর দিন শবর উৎসবের সঙ্গে বিসর্জিতা হবেন দেবী। আচার্য যোগেশচন্দ্র রায় বলেছেন, এই শবরোৎসবের মূলে আছে নববর্ষের উৎসব। তিনি লিখছেন, বিন্ধ্য পর্বতের ডান দিকে শবর জাতি বাস করত। নবরাত্র পার্বন পালনের পর শবরদের রাজা ঘট বিসর্জনে বের হতেন। সারাদিন রাজ পুরোহিত পুজো করতেন রাজার হাতিশালায় হাতিদের, আস্তাবলের ঘোড়াগুলোর আর অস্ত্রাগারে অস্ত্রশস্ত্রের । বিকেল বেলা ঘট বিসর্জনের মিছিলে শামিল হত প্রজারা। নববর্ষের সূচনা সেই দিন থেকে। ‘‘নব বর্ষ আরম্ভে হর্ষক্রীড়া স্বাভাবিক’’ তাই ঘট বিসর্জনের সময় প্রজারা জলকাদা নিয়ে খেলায় মেতে উঠত। কৃষ্ণ যজুর্বেদ অনুসারে, সারা বছর ধরে যজ্ঞ করার পর এই দিনটাতে ঋত্বিকেরা হর্ষধ্বনি করতেন।
মিছিল করে সদলবলে রাজা খানিকটা দূরে মন্দির পর্যন্ত যেতেন। তারপর শমীপত্র নিয়ে ফিরে আসতেন। জনশ্রুতি, কয়েকশো বছর আগে জামবনি পরগনার এক সামন্ত রাজা চিল্কিগড় মৌজা থেকে শবরদের তাড়িয়ে দেন। শবরেরা যুগিবাঁধের কাছে গভীর জঙ্গলে ঘর বাঁধেন। তার পর সেখানে তাঁদের ‘গরামদেবী’ (গ্রামদেবী) ‘দূর্গামণি’কেই সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা ৪৫০ বছরের পুরনো এই মন্দির। কেউ বলেন বনদেবী, কেউ বলেন বনদূর্গা, কেউ আবার গুপ্তমণি। নাম যাই হোক, কথিত আছে, এখানের রাস্তা বা মন্দিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মাকে স্মরণ করলে কার্যসিদ্ধি হবেই। শোনা যায়, আভিজাত্যহীন সাদামাটা এই মন্দির ঝাড়গ্রামের রাজা নরসিংহ মল্লদেব নির্মাণ করিয়েছিলেন। এই মায়ের মন্দিরের পুজো কোনও পুরোহিতের দ্বারা হয় না, পুজো হয় লোধা-শবর সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে।
এখানে দূর্গা পুজো শুরুর আগে হয় পাঁঠাবলি, পুজোর সময়ে কোনও চণ্ডীপাঠ হয় না, লোধা শবররা নিজেদের মতো করে পুজো করেন। এখানে মা পাথরে বিরাজমান, মা প্রদীপ বা মোমবাতির আলোয় গুপ্ত অবস্থায় থাকেন। বাল্মীকির রামায়ণে রামের দুর্গাপূজার কোনো বিবরণ নেই। কিন্তু রামায়ণের পদ্যানুবাদ করার সময় কৃত্তিবাস ওঝা কালিকাপুরাণ ও বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এর কাহিনি কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে সংযোজিত করেছেন। কৃত্তিবাসি রামায়ণ অনুসারে, রাবণ ছিলেন শিবভক্ত। মা পার্বতী তাকে রক্ষা করতেন। তাই ব্রহ্মা রামকে পরামর্শ দেন, শিবের স্ত্রী পার্বতী কে পূজা করে তাকে তুষ্ট করতে। তাতে রাবণ বধ রামের পক্ষে সহজসাধ্য হবে। ব্রহ্মার পরামর্শে রাম শরৎকালে পার্বতীর দুর্গতিনাশিনী রূপের বোধন, চণ্ডীপাঠ ও মহাপূজার আয়োজন করেন। আশ্বিন মাসের শুক্লা ষষ্ঠীর দিন রাম কল্পারম্ভ করেন। তারপর সন্ধ্যায় বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস করেন। মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও সন্ধিপূজার পরেও দুর্গার আবির্ভাব না ঘটায়, রাম ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে মহানবমী পূজার পরিকল্পনা করেন। হনুমান তাকে ১০৮টি পদ্ম জোগাড় করে দেন। মহামায়া রামকে পরীক্ষা করার জন্য একটি পদ্ম লুকিয়ে রাখেন। একটি পদ্ম না পেয়ে রাম পদ্মের বদলে নিজের একটি চোখ উপড়ে দুর্গাকে নিবেদন করতে গেলে, দেবী পার্বতী আবির্ভূত হয়ে রামকে কাক্সিক্ষত বর দেন।
ইতিহাস থেকে আরও জানা যায় , প্রায় ২২,০০০ বছর পুর্বে ভারতে প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠি থেকেই দেবী পুজা প্রচলিত শুরু হয়। হরপ্পা ও মাহেঞ্জোদারো সভ্যতা তথা সিন্দু সভ্যতায় এসে তা আরো গ্রহনযোগ্য , আধুনিক ও বিস্তৃত হয়। মাতৃ প্রধান পরিবারের মা প্রধান শক্তি , তার নেতৃত্বে সংসার পরিচালিত হয়, তার নেতৃত্বে শত্রুনাশ হয় । তাই মাকে সামনে রেখে দেবীর বিশ্বাস গড়ে উঠে শাক্ত সম্প্রদায় মত। এই মতানুসারে দেবী হলেন শক্তির রুপ, তিনি পরমব্রক্ষ্ম। শাক্ত মতে কালী বিশ্ব সৃষ্টির আদি কারণ। অন্যান্য দেব দেবী মানুষের মঙ্গলার্থে তারা বিভিন্ন রুপে প্রকাশ মাত্র। মহাভারত অনুসারে দুর্গা বিবেচিত হন কালীর আরেক শক্তি রুপে।
নানা অমিল ও বৈচিত্রতা থাকা সত্বেও কিভাবে কালী দুর্গার রুপের সাথে মিশে এক হয়ে গেল সে রহস্য আজোও অজানা। কেউ কেউ ধারনা করেন, সিন্ধু সভ্যতায় (হরপ্প ও মাহঞ্জোদারো সভ্যতা) দেবী মাতার , ত্রিমস্তক দেবতা , পশুপতি শিবের পুজার প্রচলন ছিল। দুর্গা শিবের অর্ধাঙ্গিনী - সে হিসাবে দেবী মাতার পুজা হতে পারে। সতাতন ধর্মের আর্য ঋষিরা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রতীক হিসাবে দেবী দুর্গার আর্শীবাদ লাভের জন্য আরাধনা করতেন। মার্কণ্ডুয়ে পুরাণ মতে চেদী রাজ বংশের রাজা সুরাথা খীষ্ট্রের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গ (বর্তমানে ঔড়িষ্যা) নামে দুর্গা পুজার প্রচলন ছিল। বাংলা জনপদে প্রথম পুজার প্রচলন শুরু করেন সম্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৫) রাজত্ব কালে রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণের আমলে এই পুজার প্রচললন হয়। আবার মন্তান্তরে প্রচলিত আছে যে , প্রথম পুজা শুরু হয় নদীয়াতে রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের আমলে (১৭১০-১৭৮৩)। কিন্তু জীমুত বাহনের (আনুমানিক ১০৫০-১১৫০) , দুর্গোৎসব নির্ণয়, বিদ্যাপতির (১৩৭৪-১৪৬০) দুর্গভক্তিতরঙ্গিণী , শুলাপাণির(১৩৭৫-১৪৬০) দূর্গোৎসব বিবেক, কৃত্তিবাস ওঝার (আনুমানিক ১৩৮১-১৪৬১) রামায়ণ, বাচস্পতি মিশ্রের (১৪২৫-১৪৮০) ক্রিয়া চিন্তামণি, রঘুনন্দনের (১৫শ -১৬শতক) তিথিতত্ত্ব এই সকল গ্রন্থে দুর্গা পুজার বিস্তৃত বর্ণনা থাকায় অনুমান করা হয় যে , বাংলায় দুর্গা পুজা দশ বা একাদশ শতকেই প্রচলিত ছিল। হয়তো কংস নারায়ণ কিংবা রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের সময় থেকে জাকজমক পুর্ণ ভাবে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। উনিশ শতকে কলকাতায় মহাসমারোহে দুর্গাপুজা অনুষ্ঠিত হতো। অষ্টাদশ শতকের শেষ অব্দি ইউরোপিয়ানরাও দুর্গোৎসবে অংশ গ্রহন করতো। কোথাও কোথাও যাত্রাগান , পাচালি কবিগানের আসর বসত । ধনীদের বাড়ীতে বাইজি ,নর্তকী , বা গায়িকারা অংশ নিতো। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে দুর্গাপুজার অস্তিত্ব পাওয়া যায।
১১ শতকে অভিনির্ণয় এ মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণীতে দুর্গার বন্ধনা পাওয়া যায়। ১৫১০ সালে কুচ বংশের রাজা বিশ্ব সিংহ কুচবিহারের দুর্গা পুজার আয়োজন করেছিলেন। ১৬১০ সালে কলকাতার বারিশার রায় চৌধুরীর পরিবারের পুর্ব পুরুষরা প্রথম দুর্গা পুজার আযোজন করেছিলেন বলে অনেকেরই ধারণা। আধুনিক যুগে দুর্গা পুজার প্রাথমিক ধাপ ১৮তম শতকে নানা বাদ্য যন্ত্র প্রয়োগে ব্যাক্তিগত ভাবে বিশেষ করে জমিদার বা রাজ কর্মচারীরা আয়োজন করে। বিহারের পাটনাতে ১৮০৯ সালের দুর্গা পুজার ওয়াটার কালার ছবির ডকুমেন্ট পাওয়া গেছে। ওড়িষ্যার রামেশ্বরপুরে একই স্থানে ৪০০শত বছর ধরে সম্রাট আকবরের আমল থেকে দুর্গা পুজা হয়ে আসছে বলেও ধারণা করা হয়। ১৭৬১ সালে বার ইয়ার বা বারোয়ারি পুজা প্রথম আয়োজন করে হুগলির গুপ্ত পাড়ার ১২ জন বন্ধু মিলে । সম্ভবত সেই থেকে বারো ইয়ারী পুজা শুরু। ১৯১০ সালে সনাতন ধর্মউৎসাহিনী সভা ভবানীপুরে বলরাম বসু ঘাট লেনে ,রামাধনমিত্র লেনে, সিকদার বাগানে ঘটা করে বারোইয়ারী পুজার আয়োজন করা হয়।
ভারতীয় দার্শনিক ও ধর্মপ্রচারক স্বামী বিবেকানন্দ সর্ব প্রথম কলকাতার বেলুড় মঠে ৯ জন কুমারীর পুজার মাধ্যমে এর কুমারী পুজার পুণ প্রচলন করেন। হিন্দু সমাজে বাল্য বিবাহ , সতীদাহ , চির বিধবাসহ নানা অবিচারে নারীরা নিপীড়িত ছিল। চীর কুমার স্বামী বিবেকান্দ নারীকে দেবীর আসনে সম্মানীত করার জন্যই এই পুজার প্রচলন করে ছিলেন। তবে এর আগেও অনেক স্থানে কুমারী পুজা হয়েছে। ১৯০১ সালের পর প্রতি বছর দুর্গা পুজার অষ্টম তিথিতে এ পুজা চলে আসছে। আধ্যাত্বিক এবং জাগতিক কল্যানই এই কুমারী পুজার মুল লক্ষ্য। জগতের দ্বিধাদ্বন্ধ ও অশুভের ভেদাভেদ ভুলে মায়ের কৃপা লাভ করাই মানব জীবনের লক্ষ হোক এই বিশ্বাস রয়েছে দুর্গা পুজার আরাধনা করা হয়।
বাংলায় দেবী দুর্গার যে মুর্তিটি সচরাচর দেখা যায় পরিবার সমন্বিতা বা সপরিবারে দুর্গামুর্তি। এই মুর্তির মধ্যস্থলে দেবী দুর্গা সিংহবাহিনীও মহিষাসুরমর্দিনী, তার মুকুটের উপর শিবের ছোট মুখ, দেবীর ডানপাশে উপরে দেবী লক্ষী ও নিচে গণেশ বাম পাশের উপরে দেবী সরস্বতী ও নিচে কার্তিক। কলকাতার সার্বণ রায় চৌধুরীর পরিবার ১৬১০ সালে দুর্গার সপরিবারের পুজার প্রচলণ করেন বলে ধারণা করা হয়। তবে বাঙলার কোন কোন অঞ্চলে দুর্গা পরিবারের দেবদেবীর অবস্থানের কাঠামোগত কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা গেলেও সারা বাংলায় দেবী দুর্গা সপরিবারে পুজিত হন। বর্তমানে, দুর্গাপূজা একটি সর্বজনীন উৎসব যা হেরিটেজ স্বীকৃতি পেয়েছে এবং বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
লেখক : কলামিষ্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









