হাতে সনদ, চোখে স্বপ্ন - কিন্তু সামনে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই। বছরের পর বছর চাকরির প্রস্তুতি, একের পর এক আবেদন, পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা; এভাবেই অসংখ্য শিক্ষিত তরুণের জীবনের মূল্যবান সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। যে বয়সে তাঁদের কর্মজীবন গড়ে ওঠার কথা, সে বয়সে অনেকেই পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। প্রশ্ন হলো, শিক্ষা যদি স্বাবলম্বী হওয়ার পথ তৈরি করতে না পারে, তবে এই শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য কোথায়? শিক্ষিত বেকারত্ব নিছক চাকরির সংকট নয়; এটি শিক্ষা, শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যকার অসংগতির প্রতিফলন।
প্রতিবছর স্নাতকের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু তাঁদের যোগ্যতা কাজে লাগানোর মতো মানসম্মত কর্মসংস্থান কি যথেষ্ট তৈরি হচ্ছে? তরুণদের ভবিষ্যৎ যদি শুধু নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ আর ফল প্রকাশের ওপর নির্ভর করে, তবে সমস্যাটি ব্যক্তির নয় ব্যবস্থারও। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার ফল ও সনদ অর্জন যতটা গুরুত্ব পায়, বাস্তব দক্ষতা অর্জন ততটা নয়। অনেক স্নাতক কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ, প্রযুক্তি ব্যবহার, সমস্যা সমাধান ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে থাকেন। নিয়োগদাতারা অভিজ্ঞতা চান, অথচ নতুনদের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সীমিত।
ফলে, তৈরি হয় এক নিষ্ঠুর বৃত্ত- অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরি নেই, চাকরি ছাড়া অভিজ্ঞতা নেই। এ দায় শুধু শিক্ষার্থীদের নয়। শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে পাঠ্যক্রমের সংযোগ দুর্বল থাকলে, ইন্টার্নশিপ ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত হলে, সনদধারী বেকার বাড়বেই। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকে শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে চলবে না; শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনে প্রবেশের উপযোগী করে তোলাও তাদের দায়িত্বের অংশ। সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আকর্ষণের পেছনে রয়েছে চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত আয় ও সামাজিক মর্যাদার প্রত্যাশা। কিন্তু যখন একটি সরকারি পদের জন্য হাজারো প্রার্থী বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন, তখন প্রশ্ন ওঠে কেন কর্মজীবনের প্রবেশদ্বার এত সংকীর্ণ? নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে।
বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা, ফলাফল ও চূড়ান্ত নিয়োগে অযৌক্তিক বিলম্ব প্রার্থীদের সময়, অর্থ ও কর্মজীবনের সম্ভাবনা নষ্ট করে। নিয়োগের প্রতিটি ধাপে সময়সীমা নির্ধারণ, অগ্রগতি প্রকাশ এবং বিলম্বের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে, শুধু সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের ঝোঁককে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বেসরকারি খাতে ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও পেশাগত উন্নতির সুযোগ নিশ্চিত না হলে স্থিতিশীল চাকরির আকাঙ্ক্ষা কমবে কেন? বিকল্প কর্মসংস্থানকে বাস্তবসম্মত ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলাই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ। কর্মরত থাকলেই কর্মসংস্থানের সমস্যা মিটে যায় না।
অনেক শিক্ষিত তরুণ নিজের শিক্ষার সঙ্গে অসংগত কাজে যুক্ত হন, কেউ স্বল্প মজুরিতে কাজ করেন, আবার কেউ অনিশ্চিত অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে আটকে থাকেন। তাঁদের শিক্ষা ও দক্ষতা যথাযথভাবে কাজে না লাগলে ব্যক্তি যেমন বঞ্চিত হন, তেমনি জাতীয় উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সহজ অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা, ব্যবসায়িক জটিলতা হ্রাস এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণও জরুরি, যাতে কাজের সন্ধানে তরুণদের বড় শহরে ছুটতে না হয়।
শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে বেকারত্ব কমানো যাবে না, যদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের জন্য কাজ তৈরি না হয়। দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, কোন বিষয়ে কতজন স্নাতক হচ্ছেন, কোন খাতে কী দক্ষতার চাহিদা রয়েছে এবং শিক্ষিত তরুণেরা কতটা কর্মসংস্থান পাচ্ছেন এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। অনুমাননির্ভর পরিকল্পনা দিয়ে শ্রমবাজারের সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলে ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী তরুণদের অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শসেবা সহজলভ্য করতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, বেকারত্বকে ব্যক্তিগত অযোগ্যতার সিলমোহর হিসেবে ব্যবহার না করা। দক্ষতার ঘাটতি থাকলে তা দূর করতে হবে; কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগই সীমিত হলে শুধু তরুণদের প্রস্তুতি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। রাষ্ট্রকে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দক্ষতা গড়তে হবে এবং নিয়োগদাতাদের নতুনদের সুযোগ দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষিত তরুণেরা দেশের বোঝা নন; তাঁরা দেশের উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান শক্তি।
তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বছর যদি শুধু চাকরির প্রস্তুতি ও ফলাফলের অপেক্ষায় কেটে যায়, তবে ক্ষতি শুধু ব্যক্তির নয়, পরিবার, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রেরও। যে রাষ্ট্র তরুণদের শিক্ষিত করে, সেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাঁদের যোগ্যতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা। তরুণদের শুধু অপেক্ষা করতে বলা কোনো কর্মসংস্থাননীতি নয়। অপেক্ষার প্রজন্ম ভাঙতে হলে সনদের সঙ্গে কাজের সংযোগ, বিনিয়োগের সঙ্গে কর্মসংস্থান এবং প্রতিশ্রুতির সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার আলো জ্বলবে, কিন্তু সম্ভাবনার দরজা বন্ধই থাকবে।
লেখক : শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









