জন্মেছি এই বাংলায়, ধন্য তাই এই জীবন। বাংলাদেশ একটি বহু ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের দেশ। হাজার বছরের ইতিহাসে এ ভূখণ্ডে নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেছে। পারস্পরিক সহাবস্থান, সম্প্রীতি ও মানবিক সম্পর্ক আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস নয়; এটি একই সঙ্গে বহুত্ববাদী, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক একটি সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষার ইতিহাস। এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে আছে নানা ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির মানুষের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান। মসজিদের আজান, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, গির্জার প্রার্থনা কিংবা বৌদ্ধবিহারের প্রার্থনা- সব মিলিয়েই বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন। এই শক্তির ভিত কখনো কখনো সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় বিদ্বেষ, গুজব, রাজনৈতিক স্বার্থ ও সামাজিক অসহিষ্ণুতায় আক্রান্ত হয়।
সাম্প্রদায়িকতা কোনো হঠাৎ তৈরি হওয়া সমস্যা নয়। এটি মানুষের চিন্তা, সামাজিক আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরে ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়। প্রথমে তৈরি হয় ‘আমরা’ ও ‘তারা’-র বিভাজন। এরপর ভিন্ন ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষ সম্পর্কে সন্দেহ ও অবিশ্বাস জন্ম নেয়। এক পর্যায়ে সেই অবিশ্বাস ঘৃণায় রূপ নেয় এবং সুযোগ পেলে তা সহিংসতায় পরিণত হয়। তাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু কোনো ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং অন্যের ধর্ম, বিশ্বাস ও অধিকারকে সমানভাবে সম্মান করাই অসাম্প্রদায়িকতার মূল কথা। একজন মানুষ যেমন তার ধর্ম পালন করবেন, তেমনি অন্য একজনেরও একই অধিকার থাকবে। এই পারস্পরিক সম্মানই একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রের ভিত্তি। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা, সমঅধিকার এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বিষয়।
অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা আছে। অনেকে মনে করেন, অসাম্প্রদায়িকতার অর্থ ধর্মকে অস্বীকার করা। অসাম্প্রদায়িকতা মানে হলো- রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে নাগরিক অধিকারের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করবে না এবং প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব ধর্ম পালন করার পাশাপাশি অন্যের ধর্মীয় স্বাধীনতাকেও সম্মান করবে।
বাংলাদেশের সংবিধানে এই ধারণার সুস্পষ্ট ভিত্তি রয়েছে। সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ১২ অনুচ্ছেদে সাম্প্রদায়িকতা দূর করা, কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা না দেওয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ করা এবং কোনো নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীর বিরুদ্ধে বৈষম্য বা নিপীড়ন দূর করার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্মসহ বিভিন্ন পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার নীতি রয়েছে। আবার ৪১ অনুচ্ছেদে নাগরিকের ধর্ম পালন, চর্চা ও প্রচারের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি তার সাংবিধানিক অধিকার।
বাংলাদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও এ দেশের নাগরিকত্ব কোনো একটি ধর্মের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুসারে দেশের মোট জনসংখ্যার ৯১ দশমিক ০৪ শতাংশ মুসলিম, ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ হিন্দু, ০ দশমিক ৬১ শতাংশ বৌদ্ধ, ০ দশমিক ৩০ শতাংশ খ্রিস্টান এবং ০ দশমিক ১২ শতাংশ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। এই পরিসংখ্যান আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়- বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা বহুধর্মীয়। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্বও বহুধর্মীয় নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি বাস্তব সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় হতে পারে, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনো সংখ্যালঘুর অধিকার হরণ করার লাইসেন্স হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি বোঝা যায় সে রাষ্ট্রে কমসংখ্যক মানুষের অধিকার কতটা নিরাপদ, তা দিয়ে। সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তি তখনই মহৎ হয়ে ওঠে, যখন তা দুর্বল বা কমসংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, শোষণ, বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ধর্মের পরিচয় তখন মানুষের ঐক্যের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে লড়েছেন, জীবন দিয়েছেন এবং একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছেন। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন একটি রাষ্ট্রের, যেখানে মানুষ তার অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললে অসাম্প্রদায়িকতার কথাও বলতে হবে। আজকের প্রজন্মকে তাই শুধু ১৯৭১ সালের তারিখ ও ঘটনা মুখস্থ করালে হবে না। তাদের বোঝাতে হবে- কেন মানুষ একটি বৈষম্যহীন ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রের জন্য জীবন দিয়েছিল। সাম্প্রদায়িকতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো এটি মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট করে।
একটি সমাজ তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ তার প্রতিবেশীর ওপর আস্থা রাখতে পারে। কিন্তু যদি একজন মানুষ ভাবেন- ‘ও অন্য ধর্মের, তাই সে আমার নয়’, তাহলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়। সাম্প্রদায়িকতা মানুষের পরিচয়কে সংকুচিত করে। একজন মানুষ তখন আর শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, প্রতিবেশী বা সহনাগরিক হিসেবে পরিচিত হন না; তাকে শুধু একটি ধর্মীয় পরিচয়ের মাধ্যমে দেখা হয়। এর ফলে ব্যক্তির অপরাধের দায়ও কখনো পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। একজন ব্যক্তি অপরাধ করলে তার বিচার হবে ব্যক্তি হিসেবে। কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায় অপরাধী নয়। এই সহজ সত্যটি আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় বারবার মনে রাখা দরকার। সাম্প্রদায়িকতার বিস্তারে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি বড় ঝুঁকির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
একটি মিথ্যা পোস্ট, বিকৃত ছবি কিংবা পুরনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার নামে প্রচার করে মুহূর্তের মধ্যে মানুষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করা সম্ভব। বিশেষ করে, ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কোনো একটি মিথ্যা অভিযোগকে সত্য ধরে নিয়ে মানুষ যদি আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তাহলে নিরপরাধ মানুষের জীবনও বিপন্ন হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আমাদের নতুন ধরনের নাগরিক দায়িত্ব প্রয়োজন। কোনো উত্তেজনাকর পোস্ট দেখলেই শেয়ার না করে আগে যাচাই করতে হবে। তথ্যের উৎস কোথায়, ছবিটি বা ভিডিওটি আসল কিনা, ঘটনাটি কোন সময়ের- এসব যাচাই করা জরুরি। আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি হতে হবে- আগে যাচাই, পরে প্রচার। এই একটি অভ্যাস সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার অনেক ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে।
বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, উপাসনালয়ে আক্রমণ, সম্পত্তি দখল, হুমকি ও অন্যান্য ঘটনার বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংগঠন ও সরকারি সংস্থা তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে, এসব তথ্যের সংখ্যা ও শ্রেণিবিন্যাসে পার্থক্য রয়েছে। কোনো সংগঠন কোনো ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে বিবেচনা করেছে, অন্যদিকে সরকারি কোনো তদন্তে সেটিকে সাধারণ অপরাধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে, পরিসংখ্যান ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। কিন্তু তথ্যের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক থাকার কথা নয়- কোনো নাগরিকের ওপর অন্যায় হলে তার বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কোনো মন্দিরে হামলা হলে তার বিচার যেমন জরুরি, তেমনি কোনো মসজিদ, গির্জা বা বৌদ্ধবিহারে হামলা হলেও বিচার জরুরি। কোনো ধর্মের মানুষের বাড়িঘরে হামলা হলে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের ভিত্তিতেই বিচার হতে হবে। রাষ্ট্রের কাছে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই প্রধান বিষয় হওয়া উচিত।
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে শিক্ষা। একজন শিশু যখন ছোটবেলা থেকেই শিখবে যে, ভিন্ন ধর্মের মানুষ তার শত্রু নয়, বরং তারই মতো একজন মানুষ; তখন বড় হয়ে তার মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের জায়গা সংকুচিত হবে। জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০-এ অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ব, সহনশীলতা ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু পাঠ্যবইয়ে অসাম্প্রদায়িকতার কথা লিখে দিলেই হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশও হতে হবে অসাম্প্রদায়িক।
শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে- নিজের ধর্মকে ভালোবাসা এবং অন্যের ধর্মকে ঘৃণা করা এক বিষয় নয়। নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকা এবং অন্যের বিশ্বাসের অধিকারকে সম্মান করা পরস্পরবিরোধী নয়। বিদ্যালয় ও কলেজে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ বাড়ানো দরকার। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয় ও সংলাপ বাড়াতে হবে। কারণ, অচেনা মানুষকে ভয় করার অন্যতম কারণ হলো তাকে না-জানা। ধর্মীয় নেতারা সমাজে অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাঁদের বক্তব্য সাধারণ মানুষের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধবিহারের ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্ব শুধু ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা চাইলে শান্তি, মানবিকতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানের শক্তিশালী বার্তা সমাজে ছড়িয়ে দিতে পারেন। নিজের ধর্মের মূল্যবোধ ব্যাখ্যা করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি বিদ্বেষ বা অবমাননা যুক্ত করা উচিত নয়। প্রত্যেক ধর্মেই মানবিকতা, ন্যায়, দয়া, সত্য ও শান্তির শিক্ষা রয়েছে। তাই ধর্মকে বিভেদের নয়, মানবিকতার শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা জরুরি।
সাম্প্রদায়িকতার আরেকটি বড় উৎস হলো রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় পরিচয়ের ব্যবহার। ধর্ম মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করা হলে তার প্রভাব সমাজের গভীরে গিয়ে পড়ে। রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে। দল থাকবে। নির্বাচন থাকবে। ক্ষমতার প্রতিযোগিতা থাকবে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে ধর্মীয় বিভাজনে রূপ দেওয়া হলে তার ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হয়। সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নির্বাচনী লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে গিয়ে অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে একটি অভিন্ন নৈতিক অবস্থান তৈরি করা। সাম্প্রদায়িকতা মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো আইনের শাসন। কোনো নাগরিকের ওপর হামলা হলে দ্রুত মামলা, তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যে দলের, যে ধর্মের বা যে পরিচয়েরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগ, গুজব বা ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে কাউকে জনতার হাতে তুলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনতার বিচার কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। একটি সভ্য রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলো- অভিযোগ উঠলে পুলিশ তদন্ত করবে, প্রমাণ সংগ্রহ করবে এবং আদালত বিচার করবে।
‘সংখ্যালঘু’ নয়, আগে নাগরিক পরিচয়- এ পরিচয়ই মুখ্য। আমাদের চিন্তার মধ্যেও এ পরিবর্তন দরকার। একজন মানুষকে সারাক্ষণ ‘সংখ্যালঘু’ পরিচয়ে দেখলে তার নাগরিক পরিচয় আড়ালে চলে যায়। তিনি প্রথমে একজন নাগরিক। তাঁর ধর্মীয় পরিচয় তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। রাষ্ট্রের কাছে তিনি অন্য সব নাগরিকের মতোই সমান অধিকার ও নিরাপত্তার অধিকারী। তাই আমাদের ভাষায়ও পরিবর্তন দরকার। সংখ্যালঘুদের ‘রক্ষা করার’ পাশাপাশি তাদের সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলতে হবে। কারণ, অধিকার কোনো দয়া নয়; অধিকার রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার। সম্প্রীতি শুধু উৎসবের দিনে নয়, আমরা প্রায়ই বলি- ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’ কথাটি সুন্দর। কিন্তু অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা শুধু উৎসবের শুভেচ্ছা বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, প্রতিবেশীর উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া, গুজব প্রতিহত করা এবং অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করা- এসবই অসাম্প্রদায়িকতার বাস্তব চর্চা। দুর্গাপূজার সময় মন্দিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি স্থানীয় মুসলমানদেরও সামাজিক দায়িত্ব। একইভাবে ঈদের সময় অন্য ধর্মের প্রতিবেশীর শুভেচ্ছা ও সহযোগিতাও সম্প্রীতির অংশ। সম্প্রীতি তখনই সত্যিকার হয়, যখন তা শুধু উৎসবের দিনে নয়, সংকটের দিনেও দেখা যায়।
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা দরকার। কোন ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বলা হবে, তার একটি স্বচ্ছ সংজ্ঞা ও অভিন্ন পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন। গুজব শনাক্ত ও প্রতিরোধে দ্রুত তথ্য যাচাই ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় মানবিকতা, সহনশীলতা, বহুত্ববাদ, নাগরিক অধিকার ও সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে ধর্মীয় উসকানি থেকে দূরে থাকতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে সম্প্রীতি রক্ষার সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। গণমাধ্যমকে ধর্মীয় বিষয়ে আরো দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল হতে হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বৈচিত্র্য। নদী যেমন বিভিন্ন স্রোতকে ধারণ করে সাগরের দিকে এগিয়ে যায়, বাংলাদেশও তেমনি নানা ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষকে ধারণ করে এগিয়ে এসেছে। এই বৈচিত্র্যকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং এটিই আমাদের সামাজিক সম্পদ। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মানুষ তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয় পাবেন না। যেখানে মন্দিরে পূজা করার সময় একজন হিন্দু নাগরিক নিরাপদ থাকবেন, মসজিদে নামাজ পড়ার সময় একজন মুসলমান নিরাপদ থাকবেন, গির্জায় প্রার্থনার সময় একজন খ্রিস্টান এবং বৌদ্ধবিহারে প্রার্থনার সময় একজন বৌদ্ধ একই নিরাপত্তা অনুভব করবেন। আমরা এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে নাগরিকের পরিচয় আগে- ধর্মীয় পরিচয় পরে। একজন মানুষের ধর্ম তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়; কিন্তু তার নাগরিক অধিকার রাষ্ট্রের বিষয়।
তাই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের দাবি নয়। এটি বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। আজ যদি কোনো একটি সম্প্রদায়ের ওপর অন্যায় হয় এবং অন্যরা নীরব থাকে, তাহলে সেই নীরবতা আগামী দিনে অন্য কারও অধিকারের জন্যও বিপদ ডেকে আনতে পারে। অন্যের অধিকার রক্ষা করা তাই শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; নিজের অধিকার রক্ষারও একটি উপায়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কোন পথ বেছে নিই তার ওপর- বিভেদের পথ, নাকি সম্প্রীতির পথ; ঘৃণার পথ, নাকি মানবিকতার পথ; প্রতিহিংসার পথ, নাকি ন্যায়বিচারের পথ।
আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত- ধর্মকে ভালোবাসব, কিন্তু ধর্মের নামে মানুষকে ঘৃণা করব না; নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকব, কিন্তু অন্যের বিশ্বাসের অধিকার অস্বীকার করব না; নিজের অধিকার চাইব, কিন্তু অন্যের অধিকার কেড়ে নেব না। একজন মানুষকে তার ধর্ম দিয়ে নয়, প্রথমে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ কোনো দূরের স্বপ্ন নয়। এটি আমাদের সংবিধানের অঙ্গীকার। ধর্ম যার যার, অধিকার সবার। বিশ্বাস যার যার, রাষ্ট্র সবার। বাংলাদেশ সবার।
লেখক : শিক্ষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









