আজ ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবস। ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশে ‘স্ট্যামারিং রিমুভ সেন্টার’ দিনটিকে স্বল্প পরিসরে নিয়মিত পালন করে আসছে। র্যালি, সমাবেশ ও প্রচারণামূলক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। যেহেতু জাতীয়ভাবে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না, তাই তোতলামি সচেতনতা দিবস সর্বসাধারণের জানাশোনার বাইরেই থেকে যায়। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আমরা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের এবং সমস্যা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া ছাত্রদেরকে সঙ্গে নিয়ে নিজস্ব পরিসরে আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবস পালনের উদ্যোগ নিয়েছি।
কীভাবে শুরু দিবস পালন
১৯৯৮ সাল থেকে সর্বপ্রথম আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে ২২ অক্টোবরকে তোতলামি সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল কথা বলার আড়ষ্টতাজনিত প্রতিবন্ধকতার মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ও সমাধান করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা সংবলিত কুসংস্কার দূর করা। পৃথিবীতে অন্তত ১ শতাংশ মানুষের এই আড়ষ্টতাজনিত সমস্যা আছে বলে ধারণা করা হয়। সেই হিসাবে বিশ্বে কমপক্ষে ৮ কোটি আর বাংলাদেশে ১৮ লক্ষ মানুষ তোতলামির সমস্যায় ভুগছে।
গত ১৪ বছর যাবৎ আমি এককভাবে সহস্রাধিক মানুষকে এই সমস্যা থেকে সমাধানের পথে আনতে পেরেছি। এই প্রচেষ্টা আজও অব্যাহত আছে।
তোতলামির কারণ কী
তোতলামির মূল কারণ আদতে কী? কী কারণে তোতলামি হয়? যদিও তোতলামি হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। আবার বিভিন্ন কারণেই এটা হতে পারে। এর মধ্যে
কয়েকটি কারণ উল্লেখ করছি-
* ছোটবেলা থেকে খুব বেশি আতঙ্কিত বা উদ্বিগ্ন থাকলে।
* শিশুকালে কঠোর বা অতিরিক্ত শাসনের ফলে।
* আচমকা শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে।
* অতি দ্রুত কথা বলার কুঅভ্যাসের কারণে।
* শিশুকালে কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে ভয় পেলে এবং বারংবার ঐ ব্যক্তির সম্মুখীন হলে।
* শিশুকালের কোনো অভ্যাস জোরপূর্বক বদল করলে। যেমন- বাঁহাতিকে ডান হাতে কাজ করতে বাধ্য করলে।
* শিশুকালে বাবা মা বা আপনজন ছাড়া একা কাটানোর জন্যও হতে পারে।
* ভয়ঙ্কর কোনো দুর্ঘটনার সম্মুখীন হলে।
* কোনো রোগের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায়। যেমন- দীর্ঘকালীন জ্বর হলে তোতলামি হতে পারে।
* মস্তিস্কে আঘাতজনিত কারণেও এ রকম হতে পারে।
অন্য কোনো তোতলা লোককে অনুকরণ ও ভেংচি কাটার কারণেও অনেকের তোতলামি হয়। স্থান, কাল, পাত্রভেদে সমস্যা কম-বেশি হতে পারে। নতুন পরিবেশে কথা বলতে গেলে, অপরিচিত লোকের সঙ্গে, উচ্চ ব্যক্তিতসম্পন্ন এবং কড়া ধাঁচের কারও সাথে কথা বলতে গেলে, সামাজিক সমাবেশে এবং মৌখিক ইন্টারভিউয়ের সময় তোতলামি বেড়ে যায়। হঠাৎ করে নিজের নাম, বাবার নাম, ঠিকানা বা নিজের মোবাইল ফোন নম্বর বলতেও সমস্যায় পড়তে হয়।
তোতলামি কি কোনো রোগ?
তোতলামি কোনো রোগ নয় জন্মগত বা বংশগতও নয়। এটা দীর্ঘদিনের অভ্যাসগত ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। তোতলামি যেহেতু রোগ নয়, তাই কোনো ওষুধই এই সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখে না। তোতলামি সমস্যার সমাধানে মেন্টর হিসেবে আমার ১৪ বছরের অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি ঘটনা শেয়ার করছি। পেশায় প্রকৌশলী একজন লোক। কুমিল্লায় তার বাড়ি। তিনি নামকরা একজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছেন। ডাক্তার তার জিহ্বার অপারেশনের জন্য বলেন, অপারেশন করেনও। কিন্তু ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং ভুক্তভোগী ব্যক্তি আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হন, কিছুটা শারীরিকভাবেও। এ রকম বহু ঘটনার অভিজ্ঞতার কথা বলা যাবে। আবার কেউ কেউ পরামর্শ দেন মুখে সীসা বা মার্বেল রাখার জন্য। অথবা বিশেষ ব্যক্তির কাছ থেকে পানিপড়া নিয়ে পান করার জন্য। এসব আদতে ভ্রান্ত ধারণা বা কুসংস্কারের অংশবিশেষ। আর এসব প্রয়োজনহীন বা প্রতারণামূলক কাজে কেউ যেন ভুক্তভোগী অসহায় ব্যক্তিকে জড়াতে না পারে, সেজন্যই তোতলামি সচেতনতা দিবস পালন করা হয়।
সমস্যা অস্বীকার করা উচিত নয়
অস্বীকার বা এড়িয়ে গিয়ে তোতলামি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় না। মুখোমুখি হতে হবে, লড়াই করতে হবে। লড়াই মানে জোরজবরদস্তি নয়। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মেন্টরের তত্বাবধানে থেকে তার শিখানো পদ্ধতি মেনে চললে, অনুশীলন করলে এবং বাস্তবায়ন করলে সহজেই পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। সমস্যা হচ্ছে, বেশির ভাগ ভুক্তভোগী স্বীকার করতেই চায় না তার তোতলামি আছে! কেউ লুকিয়ে রাখে, আড়াল করে চেপে রাখতে চায়। কিন্তু আগুন যেমন ঢেকে রাখা যায় না, তেমনি তোতলামিও। তারা সবসময় পালিয়ে বেড়ায় আর এই প্রবণতা তাকে অন্তর্মুখী সাদাসিধা মানুষে পরিণত করে। এরা জীবনযুদ্ধে পিছিয়ে পড়ে। সংসারযুদ্ধে পরাজিত হয়। এমনও দেখা যায়, প্রতিকার চাইতে গিয়েও অন্যের নামে চালিয়ে দেয়। নিজের নাম, পরিচয় গোপন রেখে সমাধান চায়। সমস্যার সমাধান চাইলে প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হবে- আমার তোতলামি আছে; এর সমাধান চাই।
তোতলামি থাকলেই রোগী নন
তোতলামির সমস্যা নিয়ে আসা ব্যক্তিকে আমরা রোগী বলি না। আমরা তাকে শিক্ষার্থী বা ছাত্র বলি। আমরা কোনো চিকিৎসা দিই না। সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় প্র্যাকটিসগুলো শেখাই, দিকনির্দেশনা দিই। তাকে জীবনের পথে চলার সুর ও ছন্দটুকু শিখিয়ে দিই। সে যেন কর্মজীবনে, ব্যক্তিজীবনে স্বাচ্ছন্দ্যজনক জীবনযাপন করতে পারে। সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে চলতে পারে।
সমস্যায় মোকাবেলায় করণীয় কী
* প্রথমে নিজের অন্তরাত্মার সঙ্গে একমত হতে হবে যে, আমার তোতলামির সমস্যা আছে। এটা সারাতে চাই।
* সারানোর জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ।
* দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন মেন্টরের শরণাপন্ন হওয়া। তার পরামর্শ অনুযায়ী চলা।
* মেন্টরের শেখানো পদ্ধতিতে প্র্যাকটিস করা এবং কৌশলগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করার মধ্যেই সমাধান নিহিত।
শেষ কথা, সকলের মনে জমে থাকা অযৌক্তিক চিন্তা, ক্লেদ আর ভ্রান্ত ধারণা দূর করা জরুরি। এই প্রত্যয় হোক এবারের আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবসের অঙ্গীকার।
লেখক : কোর্স পরিচালক, স্ট্যামারিং রিমুভ সেন্টার


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









