ডেঙ্গুর শঙ্কা এখন আর শুধু রাজধানী বা বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। শহরের পাশাপাশি গ্রাম-গঞ্জেও জ্বর ও ডেঙ্গু নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিবছর বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে আলোচনা হয়, মশা নিধন অভিযান চলে, নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়- ডেঙ্গু আক্রান্ত একজন সাধারণ মানুষ তার বাড়ির কাছেই কত দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা পাচ্ছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা বড় শহরের হাসপাতালের দিকে তাকালে হবে না। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে বসবাস করেন। তাদের স্বাস্থ্যসেবার প্রথম ভরসা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এসব পর্যায়ে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ, প্রাথমিক চিকিৎসা ও রোগী পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী না হলে অসুস্থ মানুষকে শেষ পর্যন্ত জেলা শহর কিংবা বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটতে হবে। এতে একদিকে রোগীর ভোগান্তি বাড়বে, অন্যদিকে বড় হাসপাতালগুলোর ওপরও বাড়বে অতিরিক্ত চাপ।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গ্রামের বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন। অনেকেই জ্বরকে সাধারণ জ্বর মনে করে কয়েক দিন অপেক্ষা করেন। কেউ স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ নেন, কেউ আবার পরীক্ষা করানোর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারেন না। প্রত্যন্ত এলাকায় কোথায় পরীক্ষা করাতে হবে, কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে কিংবা কোন লক্ষণগুলো ঝুঁকির ইঙ্গিত- এসব তথ্যও সবার কাছে সহজে পৌঁছায় না। ফলে, রোগী কখন চিকিৎসার আওতায় আসছেন, সেটিই হয়ে উঠতে পারে বড় বিষয়।
এখানেই উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ সহজলভ্য করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ের রোগীকে অযথা জেলা শহরে পাঠানোর পরিবর্তে উপজেলা পর্যায়েই পরীক্ষা, চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। আর যেসব রোগীর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন, তাদের জন্য উপজেলা থেকে জেলা এবং জেলা থেকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাকেও এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় জ্বরের রোগী বাড়ছে কিনা, ডেঙ্গুর উপসর্গযুক্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে কিনা- এসব তথ্য দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি শুরুতেই ঝুঁকিপূর্ণ রোগী শনাক্ত করতে পারেন, তাহলে রোগী যেমন দ্রুত চিকিৎসা পাবেন, তেমনি বড় হাসপাতালের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপও কমবে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু হাসপাতালের সংখ্যা বা শয্যা বাড়ানোর চিন্তা করলেই হবে না। হাসপাতালের দরজায় রোগীর ভিড় কেন বাড়ছে, সেটিও দেখতে হবে। দেশের বিভিন্ন এলাকার রোগীরা যদি চিকিৎসার জন্য রাজধানী বা বড় শহরের দিকে ছুটে আসেন, তাহলে বড় সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ বাড়বেই। এতে গুরুতর রোগীরাও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই চিকিৎসাব্যবস্থাকে শুধু শহরকেন্দ্রিক না রেখে মানুষের বসবাসের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
এখানে সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু পরীক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং রোগী পর্যবেক্ষণের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কাগজে-কলমে ব্যবস্থা থাকলেই হবে না, প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ বাস্তবে সেই সুবিধা পাচ্ছেন কিনা, সেটিও নিয়মিত তদারক করতে হবে। কোথাও চিকিৎসক নেই, কোথাও পরীক্ষা করার সুযোগ নেই, কোথাও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট- এ ধরনের সমস্যা থাকলে ডেঙ্গু মোকাবিলার সামগ্রিক উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়বে। ডেঙ্গু মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। এর সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষকেও যুক্ত হতে হবে। একটি ইউনিয়ন, একটি ওয়ার্ড কিংবা একটি গ্রামের মানুষ নিজেদের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন স্থাপনা কিংবা অন্য কোনো জায়গায় পানি জমে থাকলে তা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। কারণ, একটি বাড়িতে জমে থাকা পানি শুধু ওই পরিবারের জন্য নয়, আশপাশের মানুষের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সামাজিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে তাই শুধু প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। স্থানীয় ক্লাব, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনপ্রতিনিধিদের এ কাজে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো সম্ভব। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং জমে থাকা পানির উৎস চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতাগুলো সামনে আনতে পারে।
সচেতনতার একটি ভারসাম্যও জরুরি। জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার জ্বরকে অবহেলা করাও ঠিক নয়। ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া উচিত। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ক্ষেত্রে জ্বরকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া আরো গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের চিন্তার জায়গাটিও বদলাতে হবে। প্রতি বছর রোগী বাড়লে শুধু হাসপাতালের শয্যা বাড়ানোর চিন্তা করলে হবে না। ভাবতে হবে, একজন রোগী কেন এত দূর থেকে হাসপাতালে আসছেন। তার বাড়ির কাছেই যদি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও প্রাথমিক চিকিৎসা পাওয়া যায়, তাহলে তাকে অযথা জেলা শহর কিংবা রাজধানীতে ছুটতে হবে না। অর্থাৎ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা শুধু বড় হাসপাতাল নয়, মানুষের বাড়ির কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রও। ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা এবং প্রয়োজন হলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল- এই পুরো ব্যবস্থাকে একটি কার্যকর ধারাবাহিকতার মধ্যে আনতে হবে। কোথায় রোগী প্রথমে যাবেন, কোথায় পরীক্ষা হবে, কখন তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে এবং কোন অবস্থায় উচ্চতর হাসপাতালে পাঠানো হবে- এসব বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে পরিষ্কার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তাই এর মোকাবিলাও হতে হবে সমন্বিতভাবে। মশা নিধন, পরিচ্ছন্নতা, জনসচেতনতা এবং চিকিৎসাসেবা- সবকিছুকেই একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। বড় শহরে অভিযান চালানোর পাশাপাশি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাকে সক্ষম করা জরুরি। রাজধানী বা বিভাগীয় ও জেলা শহরের হাসপাতাল যত বড়ই হোক, দেশের প্রত্যন্ত এলাকার একজন অসুস্থ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হলো তার বাড়ির কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সেখানে যদি সময়মতো পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাওয়া যায়, তাহলে মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং বড় হাসপাতালগুলোর ওপরও চাপ কমবে। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই তাই শুধু মশার বিরুদ্ধে লড়াই নয়, এটি মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ারও লড়াই। এই লড়াইয়ে সফল হতে হলে বড় শহরের হাসপাতালের দিকে শুধু তাকিয়ে না থেকে ইউনিয়ন ও উপজেলা স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করার দিকেও এখন বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









