কৃষির অগ্রগতি কেবল উন্নত বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা গবেষণার সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সেই সাফল্য কৃষকের মাঠে কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে, তার ওপরও। আর এই সংযোগ গড়ে তোলেন কৃষি সম্প্রসারণকর্মীরা। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে সীমিত জমিতে উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এ ক্ষেত্রে উন্নত জাত ও আধুনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন যেমন জরুরি, তেমনি সেগুলো কৃষকের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের সঙ্গে কৃষকের সারা বছরের শ্রম, বিনিয়োগ ও পরিবারের খাদ্যসংস্থানের প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। ফলনহানি ও বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কায় অনেক সময় তাঁরা নতুন পদ্ধতি গ্রহণে দ্বিধা করেন।
কৃষি সম্প্রসারণের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা হাতে-কলমে প্রযুক্তির কার্যকারিতা দেখিয়ে, সংশয় দূর করে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে কৃষকের সেই দ্বিধা কাটাতে সহায়তা করেন। তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টায় গবেষণার উদ্ভাবন মাঠে বাস্তব রূপ পায় এবং কৃষির আধুনিকায়ন ও খাদ্যনিরাপত্তা এগিয়ে যায়। অথচ কৃষির এই নীরব কারিগরদের অবদান ও প্রাপ্য স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম।
নতুন কোনো জাত বা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা যতটা কঠিন, তা কৃষকের চাষাবাদের চর্চায় প্রতিষ্ঠিত করা অনেক সময় তার চেয়েও কঠিন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক চর্চার ওপর নির্ভর করে একজন কৃষক তাঁর জমিতে চাষাবাদ করেন। ফলে, নতুন জাত বা পদ্ধতি গ্রহণের আগে তাঁর মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ফলন কেমন হবে, উৎপাদন খরচ উঠবে কিনা কিংবা ফসল নষ্ট হলে ক্ষতি সামলাবেন কীভাবে। এসব সংশয় দূর করতে শুধু নির্দেশনা দিলেই চলে না, প্রয়োজন আস্থা অর্জন ও হাতেকলমে সহায়তা।
জনস্বাস্থ্য খাতেও এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে। একসময় ডায়রিয়া ও কলেরায় পানিশূন্যতা মোকাবিলায় লবণ-চিনির দ্রবণ ব্যবহারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে স্বাস্থ্যকর্মী ও গণমাধ্যমকে দীর্ঘদিন কাজ করতে হয়েছে। পরে সহজে প্রস্তুতযোগ্য ওরস্যালাইনের প্রভূত বিস্তার ঘটে এবং মানুষের কাছে জীবনরক্ষাকারী এই পদ্ধতিকে আরো সহজলভ্য করে তোলে।
কৃষিতেও নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে সচেতনতা, সহজ প্রয়োগ এবং কার্যকারিতার প্রতি আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মীরা উঠানবৈঠক, কৃষক প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী প্লট এবং সরাসরি পরামর্শের মাধ্যমে সেই আস্থা গড়ে তোলেন। তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টা ছাড়া আধুনিক কৃষির সুফল এত সহজে কৃষকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হতো না।
বাংলাদেশের কৃষির অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে কৃষকের শ্রম, কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণা, উন্নত বীজ, সেচ, যান্ত্রিকীকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সম্মিলিত প্রয়াসে। তবে, এসব উদ্ভাবনের সুফল মাঠে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরামর্শ ও নিয়মিত তদারকি। কোন অঞ্চলে কোন জাত উপযোগী, কখন বীজ বপন করতে হবে, কীভাবে সার প্রয়োগ করলে অপচয় কমবে কিংবা রোগবালাই দেখা দিলে কী ব্যবস্থা নিতে হবে, এসব বিষয়ে কৃষককে সময়মতো সহায়তা দিতে হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কৃষকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে এই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা কৃষকের সমস্যা চিহ্নিত করেন, প্রযুক্তির ব্যবহার দেখান এবং প্রয়োজন অনুসারে পরামর্শ দেন।
একই সঙ্গে মাঠের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেন। ফলে, গবেষণার জ্ঞান কৃষকের জমিতে পৌঁছায়, আবার কৃষকের বাস্তব অভিজ্ঞতাও কৃষি গবেষণা ও কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সমৃদ্ধ করে। কৃষিজমি সংকুচিত হওয়া, খাদ্যচাহিদা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উৎপাদনের ঝুঁকি বাড়ার এই সময়ে তাঁদের ভূমিকা আরো গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত জমিতে উৎপাদন বাড়ানো, খরচ কমানো এবং কৃষিকে টেকসই পথে এগিয়ে নিতে কৃষি সম্প্রসারণসেবা অপরিহার্য।
কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। কখনো রোগবালাইয়ের আক্রমণ, কখনো খরা বা অতিবৃষ্টি, আবার কখনো সার ও বীজের সংকট তাঁদের কাজকে কঠিন করে তোলে। কৃষির এসব গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের উৎপাদন, আমদানি, মূল্য নির্ধারণ ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একক নিয়ন্ত্রণ নেই। এসব ক্ষেত্রে অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সরবরাহকারী ও বাজারব্যবস্থারও ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু কোথাও সার না পাওয়া গেলে, বীজের মান নিয়ে অভিযোগ উঠলে কিংবা কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে গেলে কৃষকের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয় মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদেরই।
অথচ সমস্যার মূল কারণ নির্ধারণ বা সমাধানের পূর্ণ ক্ষমতা তাঁদের হাতে থাকে না। তারপরও তাঁরা কৃষকের পাশ থেকে দূরে সরে যান না; বরং বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজেন, প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেন এবং উৎপাদন ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যান। এই বাস্তবতায় উপকরণ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এতে কৃষক যেমন দ্রুত সহায়তা পাবেন, তেমনি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর অন্যের ব্যর্থতার দায় চাপানোর প্রবণতাও কমবে। কৃষকের আস্থা অর্জনে যাঁরা প্রতিদিন মাঠে কাজ করেন, তাঁদের নিজেদের কর্মজীবনও সব সময় স্বস্তিদায়ক নয়।
পর্যাপ্ত জনবল, যাতায়াতের ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের অভাব অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের সেবাকে বাধাগ্রস্ত করে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের পদোন্নতিজট, অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং কর্মজীবনে অগ্রগতির অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে কর্মীদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব পালনের পরও একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি সঠিক সময়ে পদোন্নতি না পান, তাহলে তা তাঁর ব্যক্তিগত হতাশার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের দক্ষ জনবল ব্যবস্থাপনাকেও প্রভাবিত করে। তাই পদোন্নতিজট নিরসন, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী পদোন্নতির ব্যবস্থা, শূন্য পদ পূরণ এবং দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জবাবদিহি বজায় রাখতে হবে। কারণ, ন্যায্য অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা এবং দায়িত্ব পালনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা পরস্পরবিরোধী নয়। বরং কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে তাঁদের দক্ষতা বাড়বে, কৃষকের কাছে সেবার মান উন্নত হবে এবং প্রতিষ্ঠানটি আরো কার্যকর হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতের কৃষি আরো বেশি জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতানির্ভর হবে। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের খরচ কমানো, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পানি ও সারের অপচয় রোধ এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষিপদ্ধতির বিস্তার নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
কৃষকের কাছে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পরামর্শ পৌঁছে দিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, অঞ্চলভিত্তিক সমস্যার সমাধান এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষি উপকরণ সরবরাহকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও কাজের উপযোগী পরিবেশ দিতে হবে। তাঁদের কাজের মূল্যায়নও শুধু কতটি সভা বা প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয়েছে, তার ভিত্তিতে না করে কতজন কৃষক নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করেছেন, উৎপাদন খরচ কতটা কমেছে এবং কৃষকের সমস্যার কতটা সমাধান হয়েছে, তার ভিত্তিতে করা উচিত। এতে কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের বাস্তব ফলাফল বোঝা সহজ হবে এবং কর্মীদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের কৃষির সাফল্য কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্জন নয়। কৃষকের শ্রম, কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণা, সরকারের নীতি, কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা এবং মাঠপর্যায়ের সম্প্রসারণ কার্যক্রমের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। তবে, নতুন প্রযুক্তিকে কৃষকের আস্থা ও দৈনন্দিন চর্চার অংশ করে তোলার ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জমি কমছে, খাদ্যচাহিদা বাড়ছে এবং জলবায়ুর অনিশ্চয়তা বাড়ছে; তাই কৃষির টেকসই অগ্রগতির জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।
কৃষকের পাশে থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ন্যায্য পদোন্নতি, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, পেশাগত মর্যাদা এবং কাজের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সম্মান জানানো নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষির ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা।
কৃষকের মনে আস্থা তৈরি করে যাঁরা নতুন প্রযুক্তির পথ খুলে দেন, সংকটের সময়ে পরামর্শ দেন এবং গবেষণার জ্ঞানকে মাঠের সাফল্যে রূপ দেন, তাঁরাই কৃষি উন্নয়নের অন্যতম নীরব কারিগর। কৃষকের পাশে আস্থার প্রতীক হয়ে থাকা এই মানুষগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই হবে কৃষির অগ্রযাত্রাকে আরো শক্তিশালী করার অন্যতম পদক্ষেপ।
লেখক : কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









