ইসলামে জুমার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময়। সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে শুক্রবারকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এ দিন মুসলমানরা মসজিদে একত্র হয়ে জামাতে জুমার নামাজ আদায় করেন, আল্লাহর ইবাদতে সময় কাটান এবং ধর্মীয় আলোচনা ও খুতবা শোনেন। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে জুমার নামাজের গুরুত্ব, ফজিলত এবং এ দিনের বিশেষ কিছু আমলের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
জুমার নামাজ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; বরং এটি মুসলমানদের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।
জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সূর্য উদিত হওয়া দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো শুক্রবার। এ দিন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এ দিনই তাকে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে। আর শুক্রবারেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।’—সহিহ মুসলিম
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শুক্রবার মানবজাতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এ দিনের বিশেষ মর্যাদা ও তাৎপর্য রয়েছে।
জুমার নামাজের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত
১. এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত গুনাহের কাফফারা
জুমার নামাজের অন্যতম বড় ফজিলত হলো, এটি এক সপ্তাহের ছোটখাটো গুনাহ মাফের মাধ্যম হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা এবং এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান—মাঝখানের গুনাহগুলোর কাফফারা হয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা হয়। —সহিহ মুসলিম
অর্থাৎ নিয়মিত নামাজ আদায়, জুমার জামাতে অংশগ্রহণ এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার মাধ্যমে একজন মুসলমান নিজের আত্মশুদ্ধির সুযোগ পান।
২. দোয়া কবুলের বিশেষ সময়
শুক্রবারের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এ দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলমান আল্লাহর কাছে কল্যাণকর কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শুক্রবারে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। —সহিহ বুখারি ও মুসলিম
হাদিসের ব্যাখ্যায় এ বিশেষ সময়টি কখন, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেক আলেম আসরের পর থেকে সূর্যাস্তের আগের সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই এ সময় বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।
৩. ফেরেশতারা আগত মুসল্লিদের নাম লিখে রাখেন
জুমার দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতারা অবস্থান করেন। যারা আগে মসজিদে আসেন, তাদের নাম ক্রমানুসারে লিখে রাখেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শুক্রবার ফেরেশতারা মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে আগত মুসল্লিদের নাম লিখতে থাকেন। ইমাম যখন খুতবার জন্য বের হন, তখন তারা তাদের খাতা বন্ধ করে খুতবা শুনতে বসেন।—সহিহ বুখারি
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, জুমার নামাজে আগে উপস্থিত হওয়ার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
৪. আগে মসজিদে গেলে বেশি সওয়াব
জুমার দিন যত আগে মসজিদে যাওয়া যায়, তত বেশি সওয়াবের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিন প্রথম সময়ে মসজিদে যাওয়ার সওয়াবকে উট কোরবানি করার সওয়াবের সঙ্গে তুলনা করেছেন। পরবর্তী সময়ে আসার জন্য যথাক্রমে গরু, দুম্বা, মুরগি ও ডিম দানের সওয়াবের কথা উল্লেখ করেছেন। —সহিহ বুখারি ও মুসলিম
তাই শেষ মুহূর্তে মসজিদে না গিয়ে যথাসম্ভব আগে উপস্থিত হওয়া উত্তম।
৫. জুমার নামাজ মুসলমানদের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক
জুমার নামাজে ধনী-গরিব, ছোট-বড়, উচ্চ-নিচু সবাই একই কাতারে দাঁড়ান। এখানে সামাজিক অবস্থান বা সম্পদের ভিত্তিতে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মুসলিম সমাজের ঐক্য সুদৃঢ় করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
৬. খুতবা শোনা ও ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের সুযোগ
জুমার খুতবা মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ। খুতবার মাধ্যমে ইমাম কোরআন-হাদিসের আলোকে মানুষকে সৎকাজ, ন্যায়বিচার, মানবিকতা, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিন খুতবা চলাকালে কেউ তার পাশের ব্যক্তিকে চুপ থাকতে বললেও সে অনর্থক কথা বলেছে।—সহিহ বুখারি ও মুসলিম
তাই খুতবা চলাকালে কথা বলা, মোবাইল ব্যবহার বা অন্য কাজে মনোযোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
৭. শুক্রবার নবীজি (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠের দিন
শুক্রবার ও শুক্রবারের রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা শুক্রবার আমার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। কারণ তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।—সুনানে আবু দাউদ
তাই শুক্রবারে বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করা একজন মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আমল।
৮. সুরা কাহফ তিলাওয়াতের বিশেষ ফজিলত
শুক্রবার সুরা কাহফ তিলাওয়াত করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি শুক্রবার সুরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে নূর আলোকিত হবে। —আল-মুস্তাদরাক, হাকিম; সুনানে দারিমি
তাই শুক্রবারে সুরা কাহফ তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।
৯. পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা অর্জনের সুযোগ
ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজে যাওয়ার আগে গোসল করা, পরিষ্কার পোশাক পরা, মিসওয়াক করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য শুক্রবার গোসল করা কর্তব্য। —সহিহ বুখারি ও মুসলিম
এ ছাড়া মসজিদে যাওয়ার আগে শরীর ও পোশাক পরিষ্কার রাখা এবং অন্য মুসল্লিদের কষ্ট হয় এমন কিছু থেকে বিরত থাকা উচিত।
১০. আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদতের বিশেষ সুযোগ
পবিত্র কোরআনের সুরা জুমার ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ —সুরা আল-জুমা, আয়াত ৯
এ আয়াতের মাধ্যমে জুমার নামাজের গুরুত্ব এবং এ সময় দুনিয়াবি কাজকর্ম ছেড়ে আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









