মার্কসবাদী সাহিত্যিক, আজন্ম বিপ্লবী, উদীচীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, সাংবাদিক, সংগ্রামী রাজনৈতিক কর্মী ও বরণীয় সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব কমরেড রণেশ দাশগুপ্তের ১১৪তম জন্মবার্ষিকী আজ।
রণেশ দাশগুপ্তের জীবনকে যদি একটি শব্দে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে ‘সংগ্রাম’। এমন এক জীবন, যেখানে ছিল না বিশ্রাম, ছিল না আপস ছিল কেবল নিরবিচ্ছিন্ন লড়াই। শৈশব থেকে মৃত্যুর ঠিক আগের দিন পর্যন্ত সেই সংগ্রাম কখনো থেমে থাকেনি।
১৯১২ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া রণেশ দাশগুপ্তের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে রাজনৈতিক সচেতনতার আবহে। তাঁর বাবা অপূর্বরত্ন দাশগুপ্ত ছিলেন চাকরিজীবী ও খ্যাতিমান ফুটবলার। কাকা নিবারণ দাশগুপ্ত ছিলেন গান্ধিবাদী নেতা এবং বিহার কংগ্রেসের সভাপতি। ফলে পরিবার থেকেই রাজনীতি ও দেশভাবনার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। কাকার সূত্রে যুক্ত হন স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে।
ত্রিশের দশকে রাঁচির (বিহার) স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে বাঁকুড়ার কলেজে ভর্তি হন তিনি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে কলেজ থেকে হন বহিষ্কার। রাঁচির হিন্দুপাড়ার থিয়েটার ও ব্যায়ামাগারে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তাঁর। সেখানকার প্রশিক্ষক হরিপদ দে হয়ে ওঠেন তাঁর রাজনৈতিক গুরু, ফলে গড়ে ওঠে বিপ্লবীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। পরবর্তীতে জেঠাতো ভাই বিভূতিভূষণ দাশগুপ্তের অনুপ্রেরণায় যুক্ত হন অনুশীলন সমিতির সঙ্গে। ‘তরুণ সংঘ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে বিপ্লবী রাজনীতির হাতে-কলমে শিক্ষা শুরু হয় তাঁর।
বাঁকুড়া কলেজ থেকে বহিষ্কারের পর কলকাতার সিটি কলেজে ভর্তি হলেও ইংরেজ পুলিশের নজরদারি ও হয়রানিতে পড়াশোনা ব্যাহত হয়। বাধ্য হয়ে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হন। এই সময় তিনি থাকতেন কবি জীবনানন্দ দাশের বাড়িতে। জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন তাঁর মাতুল, এই আত্মীয়তার সূত্রে সাহিত্যজগতের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
বাবার অবসরের পর পরিবারসহ মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গাউরদিয়া গ্রামে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু পদ্মার ভাঙনে গ্রাম বিলীন হয়ে গেলে সবকিছু হারিয়ে পরিবারসহ ঢাকায় চলে আসেন। শুরু হয় চরম অর্থকষ্টের জীবন। বাধ্য হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। যোগ দেন ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকায়।
ম্যাক্সিম গোর্কির মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে লেখা একটি প্রবন্ধই তাঁকে স্থায়ীভাবে নিয়ে আসে লেখালেখির ভুবনে। ক্রমে বামপন্থী রাজনীতি তাঁর চিন্তা ও চেতনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ঢাকায় প্রথম কমিউনিস্ট সংগঠন গড়ে ওঠে তাঁর হাত ধরেই। অচ্যুত গোস্বামী ও সোমেন চন্দের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রগতি লেখক সংঘ’। সোমেন চন্দের হত্যাকাণ্ডের পর কিরণ শংকর সেনগুপ্তের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেন সংঘের পাক্ষিক মুখপত্র ‘প্রতিরোধ’। এই সংকলনের প্রায় সব সম্পাদকীয়ই ছিল তাঁর লেখা।
কারাগার যেন রণেশ দাশগুপ্তের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশভাগের আগে ও পরে প্রগতিশীল রাজনীতি ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কারণে তাঁকে বারবার কারাবরণ করতে হয়। পাকিস্তান আমলের প্রায় পুরো সময়টাই কেটেছে জেল আর মুক্ত জীবনের দোলাচলে। এই সময়েই ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে কারাগারের ভেতর মুনীর চৌধুরীকে ‘কবর’ নাটক লেখায় উদ্বুদ্ধ করেন তিনি এবং তাঁর উদ্যোগেই নাটকটি কারাগারে মঞ্চস্থ হয়।
১৯৫৫ সালে মুক্তি পেয়ে যোগ দেন ‘সংবাদ’ পত্রিকায়। পত্রিকাটিকে প্রগতিশীল চিন্তার মুখপত্রে রূপ দেওয়ার পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষ পালন উপলক্ষে আবার গ্রেপ্তার হন। শেষবার কারাগার থেকে মুক্তি পান ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পর।
১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর শহীদুল্লাহ কায়সার, সত্যেন সেনসহ একঝাঁক তরুণকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’। অধিকার, স্বাধীনতা ও সাম্যের সমাজ নির্মাণে উদীচী হয়ে ওঠে এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। সভা-সমিতি, পত্রিকায় লেখা ও বেতার নিবন্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরলেও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর গভীরভাবে মর্মাহত হন। ১৯৭৫ সালের ১ নভেম্বর কলকাতায় একটি সভায় যোগ দিতে গিয়ে আর দেশে ফেরেননি। অভিমান ও বেদনা বুকে নিয়ে কলকাতায় স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন বেছে নেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।
প্রচণ্ড অর্থকষ্ট সত্ত্বেও আপসহীন ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত। ভারত সরকার ভাতা দিতে চাইলে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন, এমনকি ভারতের নাগরিকত্বও গ্রহণ করেননি।
আলো দিয়ে আলো জ্বালা, উপন্যাসের শিল্পরূপ, শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশ্নে, ল্যাটিন আমেরিকার মুক্তি সংগ্রাম, কখনো চম্পা কখনো অতশী—এমন অসামান্য প্রবন্ধ তাঁর কলমে জন্ম নিয়েছে। সম্পাদনা করেছেন জীবনানন্দ দাশের কাব্যসম্ভার, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সুকান্ত ভট্টাচার্যের কাব্যসমগ্র। অনুবাদ করেছেন ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতা। বহু ভাষায় পাণ্ডিত্য থাকলেও কোনোদিন আদর্শের সঙ্গে আপস করেননি তিনি।
রণেশ দাশগুপ্তের জীবন ছিল যেন সাধু-সন্তের জীবন। নিরন্তর ত্যাগ ও আদর্শের পথে আত্মনিবেদন। কিংবদন্তি এই বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীর জীবন সংগ্রাম, ত্যাগ ও আদর্শের এক অনমনীয় প্রতিচ্ছবি।



সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









